এক বৃদ্ধের মৃত্যু ও মোদী সরকার

0

কোনও সভ্য দেশে মানুষকে এভাবে মরতে হয় না। এমনকি সে যদি নিকৃষ্ট অপরাধী হয়, তা হলেও না। ফাদার স্ট্যান স্বামী বন্দি অবস্থায় যেভাবে মারা গেলেন, তাতে আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত হল। তিনি কত বড় অপরাধী ছিলেন, হিংসায় প্ররোচনা দিতেন কিনা, তা এখনও প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু মোদী সরকার বিরোধীদের প্রতি যে কত নিষ্ঠুর তা প্রমাণিত হয়ে গেল। ভারতের আদালত নাগরিকদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করতে কতদূর সক্ষম, প্রশ্ন উঠল তা নিয়েও।

৮৪ বছরের বৃদ্ধ স্ট্যান স্বামীর জামিনের আবেদন বার বার নাকচ হয়েছে। তিনি যে অসুস্থ, সেকথাই মানতে চায়নি এনআইএ। সোমবার দুপুরে যখন বম্বে হাইকোর্টে তাঁর জামিনের আবেদনের ওপরে শুনানি চলছে, তখনই হোলি ফ্যামিলি হসপিটালের মেডিক্যাল ডিরেক্টর আয়ান ডিসুজা ঘোষণা করলেন, ফাদার স্ট্যান স্বামী আর নেই।

চলতি বছরের শুরুতে বৃদ্ধ ধর্মযাজকের উকিল আদালতে দ্রুত জামিনের জন্য আর্জি জানিয়েছিলেন। বিরক্ত হয়ে বিচারক বলেন, আমাদের ওপরে আস্থা রাখুন। আস্থা রাখতে রাখতে আসামির জীবনদীপ নিভে গেল। অনেকের মনে পড়তে পারে, শাসক দলের বশংবদ এক সাংবাদিক আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে যখন ধরা পড়েছিলেন, তখন কত তৎপর হয়েছিল কোর্ট। দ্রুত জামিন পেয়েছিলেন সেই ব্যক্তি। বৃদ্ধ ধর্মযাজকের বেলায় আদালত যদি তার অর্ধেক তৎপরতা দেখাত, তাহলে তিনি অন্তত শান্তিতে মরতে পারতেন।

স্ট্যান স্বামী ছিলেন জেসুইট পাদ্রি। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ঝাড়খণ্ডে আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করছেন। পুলিশ নকশাল সন্দেহে আদিবাসী যুবকদের ঢালাও ধরপাকড় করলে তিনি প্রতিবাদ করতেন। কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাতে আদিবাসীদের জমি তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতেন। সরকারের আরও নানা পলিসির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। সরকারের কাছে তিনি ছিলেন অপছন্দের মানুষ।

ভীমা কোরেগাঁও কেসে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

১৮১৮ সালে দলিতদের নিয়ে গঠিত এক বাহিনী মারাঠা পেশোয়াদের যুদ্ধে হারিয়ে দেয়। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি সেই বিজয়ের ২০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পুনেতে দলিতদের জনসভা হয়েছিল। সেই সভাকে কেন্দ্র করে মারদাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি ঘটে। একজন মারাও গিয়েছিলেন। ওই হিংসার জন্য ২ জানুয়ারি পুলিশ দু’জন হিন্দুত্ববাদী নেতার নামে মামলা করে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পাল্টে যায় আইনরক্ষকদের অবস্থান। তারা বলে, পুরো ঘটনার পিছনে ছিল মাওবাদীদের ষড়যন্ত্র। এলগার পরিষদ নামে মাওবাদীদের এক ফ্রন্টাল অর্গানাইজেশন নাকি পুনেয় দলিত সমাবেশের আয়োজন করেছিল।

এরপর শুরু হয় ধরপাকড়। সমাজকর্মী তথা আইনজীবী সুধা ভরদ্বাজ, নাগপুরের আইনজীবী সুরেন্দ্র গ্যাডলিং, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হানি বাবু, কবীর কলা মঞ্চ নামে এক সাংস্কৃতিক সংগঠনের কয়েকজন সদস্য সহ মোট ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

স্ট্যান স্বামী গ্রেফতার হয়েছিলেন ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল মারাত্মক। তিনি নাকি দেশবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত। তাঁর সঙ্গে সিপিআই মাওবাদী নামে সন্ত্রাসবাদী দলটির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে।

আশির কোঠায় পৌঁছানো কোনও মানুষের দেহে নানারকম রোগ থাকা স্বাভাবিক। বৃদ্ধ ধর্মযাজকের ছিল পার্কিনসনস রোগ। মুম্বইয়ের জেলে আট মাস থাকাকালীন তাঁর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটে। পার্কিনসনস রোগের জন্য তাঁর হাত কাঁপত। সরাসরি কাপ বা গ্লাস থেকে জল খেতে পারতেন না। সিপার দিয়ে জল খেতে হত। জেলে পোরার সময় এনআইএ-র বীরপুঙ্গবরা বৃদ্ধের সিপার কেড়ে নেয়। পরে জেল থেকে বারবার আবেদন করেও তিনি সিপার পাননি। এনআইএ বিরোধিতা করেছিল। হয়তো তাদের মনে হয়েছিল, জল পান করার স্ট্র-র মধ্যে থাকতে পারে মারাত্মক বিস্ফোরক। যার সাহায্যে জেলের মধ্যে হুলস্থূল বাঁধিয়ে দিতে পারেন ওই বৃদ্ধ।

প্রায়ই শোনা যায়, চোরা পথে জেলের মধ্যে কোনও মাফিয়া ডনের হাতে পৌঁছে গিয়েছে মোবাইল। সে ফোনে বাইরে চ্যালাচামুণ্ডাদের হুকুম দিচ্ছে। তেমন শাঁসালো কয়েদি হলে জেলে আরও নানারকম আরামের জিনিসও পৌঁছে যায়। কিন্তু স্ট্যান স্বামী তো তাদের কেউ নন। অনেকে বলছেন, বন্দি অবস্থায় চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে তাঁকে মেরে ফেলাই গভর্নমেন্টের উদ্দেশ্য ছিল।

মোদী সরকারের উদ্দেশ্য সফল। বিরোধী নেতারা এখন স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু নিয়ে টুইট করছেন বটে কিন্তু তাঁরা বেশিদূর এগোবেন বলে মনে হয় না। শীঘ্রই চুপ করে যাবেন। এবং বিচারবিভাগীয় হেপাজতে হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকবে।

এখন যে দলটি দেশ শাসন করছে, তারা নিজেদের বলে গোমাতার সন্তান। গরুর জীবনের প্রতি তাদের খুব মায়া। কিন্তু তারা মানুষের জীবনের তত দাম দেয় না। সুতরাং স্ট্যান স্বামীদের মরতেই হবে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.