পেগাসাস নিয়ে খোলাখুলি জানাক সরকার

কথায় আছে, পাপ কখনও চাপা থাকে না। দু’বছর আগে একবার সরকারের বিরুদ্ধে ফোনে আড়িপাতার অভিযোগ উঠেছিল, কিছুদিন হইচই হওয়ার পরে সব চাপা পড়ে যায়। গত রবিবার আরও একবার সেই অভিযোগ উঠেছে।

ভারত সহ ১৬ টি দেশের সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিরা গত দু’বছর ধরে তদন্ত করে জানতে পেরেছেন, এদেশে অনেকের মোবাইলে আড়ি পাতা আছে। তাঁরা কার সঙ্গে কী কথা বলছেন, হোয়াটস অ্যাপে কী চ্যাট করছেন, সব অন্যে জানতে পারে। যে স্পাইওয়ারের মাধ্যমে এই নজরদারি চালানো হয়, তার নাম পেগাসাস। ইজরায়েলের এনএসও নামে একটি সংস্থা ওই স্পাইওয়ার বিক্রি করে। কিন্তু কোনও দেশের সরকার ছাড়া কেউ পেগাসাস কিনতে পারে না। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে মোদী সরকারই কি সকলের ওপরে নজর রাখছে?

এই প্রসঙ্গে অনেকের নিশ্চয় জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটটিফোর উপন্যাসের কথা মনে পড়বে। তাতে এমন একটা দেশের কথা আছে, যার শাসককে বলা হয় ‘বিগ ব্রাদার’। তিনি কোনও বিরোধিতা সহ্য করেন না। কেউ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু  বলছে, লিখছে বা ভাবছে কিনা, তার ওপরে সবসময় নজর রাখেন। নাগরিকদের সবসময় স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, ‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ’। আমাদের দেশে অনেকে ভাবছেন, মোদীই কি বিগ ব্রাদার?

গত দু’বছর ধরে পেগাসাস নিয়ে তদন্ত করে সাংবাদিকরা যা জানতে পেরেছেন, তার একটি অংশ গত রবিবার নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে। আগামী দিনে নাকি এসম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানা যাবে। কাদের ফোনে আড়ি পাতা হত, সবার নাম প্রকাশিত হবে।

আপাতত যে নামগুলি জানা গিয়েছে, তাই চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সোমবার যিনি লোকসভায় সরকারপক্ষের হয়ে সওয়াল করছিলেন, সেই অশ্বিনী বৈষ্ণোর ফোনেই নাকি আড়ি পাতা হয়। একথা সত্যি হলে বলতে হয়, মোদী তাঁকে মন্ত্রী করেছেন বটে, কিন্তু পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি। তাই তাঁর গোপন কথাগুলি জানার চেষ্টা করেন।

২০১৯ সালে ভোটের আগে মোদীর বিরুদ্ধে বিধিভঙ্গের অভিযোগ তুলেছিলেন তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা। তাঁর ফোনেও নাকি আড়ি পাতা আছে।

অযোধ্যা মামলা ও রাফায়েল চুক্তি নিয়ে মামলার বিচার করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। এক মহিলা তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তোলেন। তাঁর ফোনেও নাকি কে বা কারা আড়ি পেতে রেখেছে।

সরকারের কোভিড মোকাবিলা পলিসি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ভাইরোলজিস্ট গগনদীপ কাং। তিনি ফোনে কী বলছেন, তাও নাকি কারা আড়ি পেতে শোনে।

এছাড়া যাঁদের ফোনের কথাবার্তা গোপনে শোনার ব্যবস্থা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে আছেন এলগার পরিষদের অভিযুক্তরা। যাঁদের একজন, স্ট্যান স্বামী সম্প্রতি মারা গেলেন। বিরোধী নেতাদের মধ্যে রাহুল গান্ধী, তৃণমূল কংগ্রেসের তরুণ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফোনও নাকি নিরাপদ নয়। ভোটকৌশলী প্রশান্ত কিশোর বলেছেন, তিনি আগেই জানতেন তাঁর ফোনে আড়ি পাতা আছে। সেজন্য তিনি পাঁচবার ফোনের হ্যান্ডসেট পরিবর্তন করেছেন। কিন্তু তাতেও রেহাই পাননি।

পেগাসাস কেলেংকারি প্রকাশের পর ৪৮ ঘণ্টা কাটতে চলল। এখনও সরকার একবারও বলেনি, পুরো অভিযোগ মিথ্যা। লোকসভায় ও লোকসভার বাইরে বিজেপি নেতারা সকলকে বোঝাতে চেষ্টা করছেন, বিরোধীরা দেশদ্রোহী। যে পোর্টালে পেগাসাসের কথা প্রকাশিত হয়েছে, তারা ফেক নিউজ ছড়ায়। ‘কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ’ সংবাদ মাধ্যম বিদেশি রাষ্ট্রের অর্থ পায় ইত্যাদি।

একই অস্ত্র বার বার প্রয়োগ করলে ভোঁতা হয়ে যায়। বিজেপি নেতারা যখনই বিপাকে পড়েন, বিরোধীদের নামে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ তোলেন। এখন প্রশ্ন হল, দেশদ্রোহিতার সংজ্ঞা ঠিক করবে কে? সরকারের বিরোধিতা করা মানেই কি দেশদ্রোহিতা?

জরুরি অবস্থার সময় কংগ্রেসিরা স্লোগান দিত ‘ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা’। অর্থাৎ ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধিতা করা মানেই দেশদ্রোহিতা। বিজেপি নেতাদের মানসিকতাও আলাদা নয়। তাঁদের কাছে মোদী বিরোধিতা মানে দেশের বিরোধিতা।

সভ্য জগতে আড়ি পাতা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। ১৯৭২ সালের ১৭ জুন আমেরিকায় ওয়াটারগেট নামে এক বাড়িতে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের বৈঠক হয়েছিল। সেখানে গোপন টেপ রেকর্ডার ফিট করে রেখেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। বিরোধীদের কথা আড়ি পেতে শোনাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। সেকথা জানাজানি হওয়ার পরে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। আমেরিকার ইতিহাসে ওই ঘটনা ওয়াটারগেট কেলেংকারি নামে পরিচিত।

গণতান্ত্রিক দেশের নিয়ম হল, জনতার দরবারে প্রতিটি দলকে তার নীতি ও কর্মসূচির কথা বলতে হয়। বেশিরভাগ মানুষ যে দলকে পছন্দ করে, তারাই সরকারে আসে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলকে মানুষের ওপরে নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বিরোধীদের ফোনে আড়ি পাতা মানে সরকার কূটকৌশলের ওপরে নির্ভর করছে। মানুষের ওপরে তার ভরসা নেই।

ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, নাথিং ইজ আনফেয়ার ইন ওয়ার অ্যান্ড লাভ। সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখনই নানা অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে।

ভারতে পেগাসাস কেলেংকারির কথা একবার নয়, দু’বার শোনা গেল। এবার সরকারের অন্তত প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে বলা উচিত, ব্যাপারটা কী? আড়ি পাতা হচ্ছে নাকি হচ্ছে না? মোদী সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা যদি বজায় রাখতে হয়, তাহলে পেগাসাস নিয়ে প্রশ্নের খোলাখুলি জবাব দিতে হবে। প্রতিপক্ষকে দেশদ্রোহী বলে থামিয়ে দিলে চলবে না।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More