কৃষকদের সঙ্গে আগেই সরকারের বৈঠক করা উচিত ছিল

0

কৃষি আইনকে কেন্দ্র করে যে একটা বড় ধরনের গোলমাল পাকিয়ে উঠতে চলেছে, বোঝা গিয়েছিল মাস দু’য়েক আগে। কেন্দ্রীয় সরকারের তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবের কৃষকরা ট্রেন আটকে বসেছিলেন দীর্ঘদিন। তাতে যাত্রীরা যেমন অসুবিধায় পড়েছিলেন, তেমনই বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল রেল। বিজেপি বলেছিল, এর পিছনে পাঞ্জাবের কংগ্রেস সরকারের উস্কানি আছে। কথাটা হয়তো পুরোপুরি মিথ্যা নয়, কিন্তু শুধুমাত্র উস্কানি দিয়ে দু’মাস ধরে আন্দোলন চালানো যায় না। রাজ্যের বহু কৃষকই নিশ্চয় ভাবছিলেন, নতুন আইনে তাঁদের সর্বনাশ হবে। তাই তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রেললাইনে বসে পড়েছিলেন।

রেল অবরোধ ওঠার কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হল ‘দিল্লি চলো’ অভিযান। আন্দোলনকে এনে ফেলা হল একেবারে রাজধানীতে। আন্দোলনের নেতৃত্ব জানতেন, দিল্লিতে কিছু হলে আন্তর্জাতিক মহলের নজর পড়বে। এখানে কৃষকদের ওপরে দমন-পীড়ন চালালে নানা দেশ নিন্দা করবে। তাতে অস্বস্তিতে পড়বে বিজেপি সরকার।

রেল রোকো চলার সময়েই যদি কেন্দ্রীয় সরকার চাষিদের সঙ্গে বসে একটা মিটমাট করে নিত, ব্যাপারটা এতদূর গড়াত না।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার তিনটি কৃষি আইন পাশ করায়। তার মূল কথা তিনটি। প্রথমত চাষিরা রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রিত মান্ডির বাইরেও তাঁদের ক্ষেতের ফসল বিক্রি করতে পারবেন। এর জন্য কোনও কর দিতে হবে না। দ্বিতীয়ত, চাষিরা ফসল বিক্রির জন্য সরাসরি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবেন। তৃতীয়ত, কৃষি পণ্য মজুত ও সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। সব কিছু ঠিক হবে বাজারের ওঠাপড়া অনুযায়ী।

যতদূর মনে হয়, কৃষি পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে খোলা বাজারের নীতি অনুসরণ করতে চায় কেন্দ্রীয় সরকার। নতুন কৃষি আইনে সেই মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছে। আগে নেহরুর সমাজতান্ত্রিক মডেলে অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল রাষ্ট্রের প্রবল উপস্থিতি। সবেতেই ছিল নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্স রাজ। ১৯৯১ সাল থেকে আমাদের দেশ যাত্রা করেছে সংস্কারের পথে। মনমোহন সিং-এর পথ ধরে হেঁটে নরেন্দ্র মোদী কৃষিকে নিয়ন্ত্রণের ফাঁস থেকে মুক্তি দিতে চাইছেন।

কৃষকরা যদি শস্যের ন্যায্য দাম না পান, অসাধু ব্যবসায়ীরা যদি গোপনে ফসল মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেন, তাহলে নিশ্চয় সরকার হস্তক্ষেপ করবে। না হলে পুরো ব্যাপারটা বাজারের ওপরেই ছেড়ে দেওয়াই ভাল। যে দলগুলি কৃষি আইনের বিরোধিতা করছে, তারা কি সেই লাইসেন্স রাজের যুগে ফিরে যেতে চায়? ক্ষমতায় এলে তারা কি নেহরু অর্থনীতিকে ফিরিয়ে আনবে? মনে হয় না।

চাষিরা যদি মান্ডিকে এড়িয়ে অন্যত্র ফসল বিক্রির স্বাধীনতা পান, একশ্রেণির মানুষের ক্ষতি হবে তো বটেই। মান্ডিগুলোকে কেন্দ্র করে ফড়ে, দালাল টাইপের লোকেদের কারবার চলে। রাজ্যের শাসক দলের কর্তাব্যক্তিরাও অনেক জায়গায় বেশ দু’পয়সা রোজগার করেন। মান্ডির গুরুত্ব খর্ব হলে তাঁদের গাত্রদাহ হবেই। এই ধরনের লোকেরাই কৃষি আইনের বিরুদ্ধে খুব উৎসাহের সঙ্গে প্রচার করছেন। বিপরীতে সরকারও চাষিদের পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেনি।

সপ্তাহখানেকের বেশি সময় ধরে চাষিদের দিল্লিতে আসা শুরু হয়েছে। ‘দিল্লি চলো’ অভিযানের শুরুতেই যদি সরকার তাঁদের সঙ্গে বসত, তাহলেও এত মানুষ আসতেন না। মনে হয়, অমিত শাহরা আগে বুঝতে পারেননি, কৃষক সংগঠনগুলি এত লোক জড়ো করবে। সম্ভবত তাঁদের মধ্যে একরকম অহমিকাও কাজ করছিল। তাঁরা কেন্দ্রে শাসক দল। সদ্য বিহারে জিতেছেন। বিভিন্ন রাজ্যের উপনির্বাচনেও ফল সন্তোষজনক। হয়তো ভেবেছিলেন, আমরা কেন নতিস্বীকার করে চাষিদের সঙ্গে কথা বলতে যাব?

সব রুলিং পার্টিই কোনও না কোনও সময় এই ভুলটা করে। এত অহংকারী হয়ে ওঠে যে, বাস্তবের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে যায়। আমাদের রাজ্যে সিপিএমও একসময় সিঙ্গুরের আন্দোলনকে বিশেষ পাত্তা দেয়নি।

সোমবার পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদীকে দেখে মনে হয়েছে, তিনি কৃষক আন্দোলনকে সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না। ওইদিন রাতে চাষিরা যখন দিল্লির হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় খোলা আকাশের নীচে রাত্রিযাপন করছেন, মোদীকে দেখা যায়, বেনারসে গঙ্গাবক্ষে বজরায় ভ্রমণ করছেন। লাইট অ্যান্ড সাউন্ড উপভোগ করছেন।

অমিত শাহ, কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র তোমর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ও অন্যান্য মন্ত্রী অবশ্য এর মধ্যে দফায় দফায় মিটিং করেছেন। পীযূষ গোয়েল ও নরেন্দ্র তোমর মঙ্গলবার কৃষকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। যতদূর জানা যাচ্ছে, পরিস্থিতি বুঝে সরকারের ওপরে চাপ বাড়াচ্ছেন কৃষক নেতারা। তাঁরা বুঝেছেন, সরকার কিছুটা হলেও ব্যাকফুটে চলে গিয়েছে। কৃষক আন্দোলনের স্বরূপ বুঝতে সরকারের যে বিলম্ব হয়েছিল, ইউনিয়নের নেতারা তার সুযোগ নিচ্ছেন পুরোমাত্রায়।

আন্দোলনকারীরা বিজেপিকে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলতে চান। তাঁরা আগেই বলেছেন, দরকার হলে চারমাস আন্দোলন চালাবেন। রাজধানীর পাঁচটি এন্ট্রি ও এক্সিট পয়েন্ট বন্ধ করে দেবেন।

সত্যিই যদি আন্দোলনকারীরা মাসের পর মাস রাজধানীকে অবরোধ করে রাখে, তার সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চায়, তাহলে সরকার হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারবে না। একসময় পুলিশ দিয়ে বিক্ষোভকারীদের হটিয়ে দিতে হবে। তখনই কৃষক নেতারা হইহই করে উঠবেন। তাঁরা দেশের মানুষকে বোঝাতে চাইবেন, আমরা আগেই বলেছিলাম মোদী কৃষকবিরোধী, এবার তা প্রমাণিত হল।

সরকার এই ফাঁদে পা দিলে বিপদ। কৃষকদের সম্পর্কে ঠান্ডা মাথায় সবদিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নইলে কৃষিক্ষেত্রে সংস্কারের প্রচেষ্টা মাঠে মারা যাবে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.