আগেই খেয়াল করা উচিত ছিল

কথায় আছে, এক যাত্রায় পৃথক ফল হয় না। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরাও ভেবেছিল, করোনার বছরে যখন মাধ্যমিকে সকলকে পাশ করানো হয়েছে, তাদের বেলায়ও তাই হবে। কিন্তু রেজাল্ট বেরোতে তারা বিশ্রী একটা চমকের মুখে পড়ল। দেখা গেল, ১৮-২০ হাজার ছেলেমেয়ে ফেল করেছে।

পরীক্ষা হল না, অথচ তারা অকৃতকার্য হল। এমনটা কী করে সম্ভব? আসলে স্কুলগুলো উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদে কম নম্বর পাঠিয়েছিল। রাজ্য সরকার স্থির করেছিল, ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমিক, একাদশ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা ও দ্বাদশ শ্রেণির প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা বা প্রজেক্টের নম্বরের ওপরে ভিত্তি করে উচ্চ মাধ্যমিকের নম্বর দেওয়া হবে। সেইমতো স্কুলগুলি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদে নম্বর পাঠায়। সেই নম্বরের ভিত্তিতে পাশ-ফেল নির্ধারিত হয়েছে।

২২ জুলাই রেজাল্ট বেরোনর পর থেকেই শুরু হয় বিক্ষোভ। পাশ করানোর দাবিতে রাজ্যের নানা প্রান্তে পথ অবরোধ, টায়ার জ্বালানো, ঘেরাও ইত্যাদি চলতে থাকে। এই আন্দোলন ছিল অরাজনৈতিক। কিন্তু তার ফলে কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন উঠে আসে। প্রথমত, পরীক্ষা না নিয়ে কি কাউকে ফেল করানো যায়? দ্বিতীয়ত, কোনও ছাত্র স্কুলে কম নম্বর পেলেও উচ্চ মাধ্যমিকে ভাল নম্বর পেতেই পারে। অনেক সময় স্কুলে চেপে নম্বর দেওয়া হয় যাতে ছেলেমেয়েরা আত্মসন্তুষ্ট না হয়ে পড়ে। বোর্ডের পরীক্ষার জন্য ভালমতো প্রস্তুতি নেয়। তাই স্কুলের নম্বরের ভিত্তিতে ফেল করানো কতদূর সঙ্গত? তৃতীয়ত, স্কুল যখন বোর্ডে কোনও ছাত্রের নাম পাঠায়, ধরে নেওয়া সে বোর্ডের পরীক্ষায় বসার উপযুক্ত। অর্থাৎ তার উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্যতা আছে। এই যুক্তিতে বলা যায়, এবছর যে নামগুলি উচ্চ মাধ্যমিক সংসদে গিয়েছিল, তারা নিশ্চয় স্কুলের মূল্যায়ন অনুযায়ী পাশ করার উপযুক্ত ছিল। এরপরে তাদের ফেল করানো হল কেন?

আর একটা কথাও খেয়াল করা উচিত। প্রায় দু’বছর ধরে অতিমহামারীর প্রকোপে স্কুলগুলি বন্ধ রয়েছে। এই সময় সম্পন্ন ঘরের ছাত্রছাত্রীরা অনলাইনে ক্লাস করেছে। অনেকে গৃহশিক্ষকের কাছেও পড়েছে। কিন্তু দরিদ্র ঘরের ছেলেমেয়েরা সেই সুযোগ পায়নি। তাদের অনেকের বাবা-মা খুব বেশি লেখাপড়া জানেন না। তাই তাঁরা ছেলেমেয়েকে পড়াশোনায় সাহায্য করতে পারেন না। স্কুল বন্ধ থাকায় তাদেরই পড়াশোনার ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। দেখা যাবে, যারা ফেল করেছে, তাদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের ছাত্রছাত্রী। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের একথা ভাবা উচিত ছিল।

রাজ্যের নানা জায়গায় ছাত্রবিক্ষোভ বাড়তে থাকায় তার আঁচ লাগে নবান্নে। উচ্চ শিক্ষা দফতরের কর্তারা সংসদের কাছে কৈফিয়ৎ তলব করেন। দু’পক্ষের ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। উচ্চ মাধ্যমিকে ফেল করানো নিয়ে প্রশাসন যে অসন্তুষ্ট, সেকথা বুঝিয়ে দেওয়া হয় সংসদকে।

গত সোমবার সন্ধ্যায় উচ্চ মাধ্যমিক সংসদের সভানেত্রী মহুয়া দাস জানান, ফেল করা ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে তাঁরা যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছেন। স্কুলগুলি নতুন করে যে নম্বর পাঠিয়েছে, তাতে আগে ফেল করাদের ৯০ শতাংশ পাশ করে গিয়েছে। এরপরেও যারা অকৃতকার্য রয়ে গিয়েছে, তারা সংসদে যোগাযোগ করতে পারে। তাদের আবেদন সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট সারা জীবন কাজে লাগে। বিশেষত চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব অনেক। এমনিতে দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। তাও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে কোনও ছেলে বা মেয়ে চাকরি পাওয়ার আশা করতে পারে। কিন্তু ফেল করলে সেই স্বপ্নটুকুও মিলিয়ে যায়। সেজন্যই অকৃতকার্যদের এত বিক্ষোভ।

কাউকে ফেল করালে তার কী ক্ষতি হতে পারে, সেকথা সংসদের প্রথমেই খেয়াল করা উচিত ছিল। অতিমহামারীর সময় ছেলেমেয়েদের মূল্যায়ন করার জন্য প্রয়োজন ছিল মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু প্রথমে সংসদের কর্তারা যন্ত্রের মতো কাজ করেছেন। স্কুল থেকে যে নম্বর পাঠিয়েছে, তার ভিত্তিতে হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে ফেল করিয়েছেন। নবান্নের ধমক খেয়ে তবে তাঁদের হুঁশ হয়েছে। এই হুঁশটা আগে ফিরলে ভাল হত।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More