জলের অক্ষর পর্ব ১১

কুলদা রায়

রবীন্দ্রনাথকে আমি প্রথম আবিষ্কার করি আমার আজা মশাইয়ের কাছে। সেটা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের আগের কথা। মা আমাদের নিয়ে তাঁর বাপের বাড়ি গেছেন। নৌকা করে দিয়েছিল বাবা। আমাদের নদীর নাম মধুমতি। ভেড়ারহাটের পরে আড়পাড়ার মিয়াবাড়ির মসজিদ পার করে খালের মধ্যে পড়েছি। সেখানে সাদা আর কালো জল। তারপর উলপুর। তালতলা হয়ে বটবাড়ি। নারিকেল বাড়ি। একটু হেঁটে মামাবাড়ি। এ গ্রামে কোনও নারিকেল গাছ নেই। বণিক মাস্টারমশাই আছেন, তিনিই আমার আজামশাই। মোক্তারি পাস করতে পারেননি। ফেল। প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার। পরতেন খড়ম। পরনে ধুতি। মুখে সাদা দাড়ি।

সন্ধ্যাকালে তিনি বেলতলায় বসলেন। একটা মৃদু হাওয়া উঠেছে। কারা কারা হাট থেকে ফিরছে চড়া গলায় কথা বলতে বলতে। জুনিপোকা জ্বলতে শুরু করেছে। আমার যমজ দুই মাসি বিজুলিবালা আর অঞ্জলিরানি ঘাট থেকে গা ধুয়ে এল। ঝপ করে আঁধার নেমে এল। তিনি মৃদুকণ্ঠে গেয়ে উঠলেন–

“তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিল রে,
তোমারই ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি।”

আমার যমজ মাসিরা গলা মেলালো–

“তুই দিন ফুরালে সন্ধ্যাকালে কী দীপ জ্বালিস ঘরে,
মরি হায়, হায় রে–
তখন খেলাধুলা সকল ফেলে, ও মা, তোমার কোলে ছুটে আসি॥”

মা একটা প্রদীপ ধরিয়ে নিয়ে এল। আজা মশাইয়ের কোলের কাছে রাখা ছিল গীতবিতান। হাওয়ায় পৃষ্ঠা খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল একটা শুকনো পাতা। হাওয়ায় ফরফর করে উড়ল। সেদিকে কারও খেয়াল নেই। আমি দৌড়ে ধরি। কাঁপা কাঁপা আলোতে তাকিয়ে দেখি- পাতার গায়ে কালো কালিতে লেখা-

‘তিনি আমার চোখের আরাম
মনের আনন্দ
আত্মার শান্তি।’

এই তিন লাইন। আর কিছু নেই। অক্ষরগুলো বয়স্কতা হেতু সামান্য বর্ণ হারিয়েছে।

এই পাতার নাম- ছাতিম পাতা। আজামশাই তরুণকালে হেঁটে শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন। ছাতিমতলা থেকে পাতাটি কুড়িয়ে এনেছিলেন। রবি ঠাকুর আরাম, আনন্দ- আর শান্তির কথাটি লিখে দিয়েছিলেন।
আজামশাই এই ছাতিম পাতাটি আমাকে মৃত্যুর আগে দিয়েছিলেন। আমি এখনও চোখ, মন আর আত্মা দিয়ে দেখি।

চরম শব্দটি রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করতেন না। তিনি চাইতেন চরম নয়– পরম হোক। পরমেশ্বর। চরমেশ্বর নয়।

রক্তকরবীর যে রাজাকে সবাই ভয় করে, নন্দিনী সেই রাজাকেই ভয়ঙ্করের দূর্গ থেকে প্রেমে ভালোবাসায় নিয়ে আসেন বাইরে। খোলা আকাশের নীচে। মানুষের কাছে। খুনির মন নিয়ে যে রঞ্জনকে মেরেছেন, সেই খুনীর হুকুমত আর থাকে না। রাজা নয়- মানুষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। নন্দিনী তাকে পরম করে নেন।

হয়তো এ কারণেই ঠাকুর বলছেন, তিনি যদি এসে দেখেন আমাদের হৃদয়ের দরোজাটি বন্ধ, তবু তিনি যেন ফিরে না যান- তিনি যেন দরোজা ভেঙে ভেতরে চলে আসেন। সোজা যেন আসেন চলে প্রাণে। আমার বীণাযন্ত্রে তাঁর নাম ঝংকৃত না হলেও রাগ করে যাবেন না। তাঁর আসার শব্দেও যদি আমার ঘুম না ভাঙে। তবুও তাঁর ফিরে যাওয়া চলবে না। তিনি যেন তখন বজ্রের মতো শব্দ করে আমার ঘুম ভাঙান। যদি দেখেন আমার হৃদয়াসনে অন্য কাউকে বসিয়েছি, তবুও তিনি ফিরে যেতে পারেন না। তিনি রাজার রাজা। পরমেশ্বর। আমার জন্য তিনি আছেন, তাঁর জন্য আমি আছি। 

রবীন্দ্রনাথ হয়তো মনে করতেন, ঈশ্বর বলতে যাকে বুঝি সে অন্য কেউ নয়। সে আমি নিজেই। এই জগতে যে যজ্ঞ চলছে, সেটা বেদনার নয়। সেটা আনন্দের।

কালো বলে জানি যাকে, তাকে যদি প্রাণের আলো জ্বেলে দেখি, তবে দেখতে পাবো, না, কালো নয়– সে সুন্দর। সুন্দর মাঝে মাঝে নানা মুখোশ নিয়ে ঘোরে। সেই মুখোশ তুলে ফেললেই, আবার প্রকৃত সুন্দর বেরিয়ে পড়ে। 

সেকারণে যাকে দূর দূর করে তাড়াই, তাকে তাড়াতে গিয়ে আর তাড়াতে পারি না। আবার ফিরিয়ে আনি। চোখ দিয়ে যাকে দেখি- সেই দেখাটাই সব নয়। সেই দেখার মধ্যে সবটাই সত্যি নয়। সত্যি থাকে আড়ালে, থাকে লুকিয়ে। তাকে দেখতে হবে প্রাণের আলোতে। সে আলোতে কিছুই অপ্রকাশ থাকে না। 

যখন ঝড়ে জলে সব কিছু ভেঙে চুরে পড়ে তখনও আমরা যেন তাঁকে দায়ি না করি। সেই তাঁকেই যেন ভরসা করি, প্রীতি করি। তিনি তখন মধুর হয়ে আসেন বলেই শ্রীমতি রাধিকা নীল শাড়ি পড়ে জল নিঙাড়ি নিঙাড়ি ছুটে যায় তাঁর কাছে। 

সেই সে, আমি অথবা তিনি– আমরা সবাই ভিন্ন কেউ নই। একটি মানুষ।

সেই মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।

 

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)

(স্কেচটি করেছেন তাজুল ইমাম)

পরের পর্ব মাসের শেষ রবিবার…

জলের অক্ষর পর্ব ৯

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More