জলের অক্ষর পর্ব ১২

কুলদা রায়

একজন অগ্রজ কথাসাহিত্যিক কাল বললেন, একটি গল্প বা উপন্যাস লেখা শুরুর আগে ও শুরুর কিছুক্ষণ পরে দুইবার গল্পকারের উচিত নিজেকে প্রশ্ন করা, এই গল্পটি বা উপন্যাসটি আমি কেন লিখতে চলেছি? এটা কি কোনও অনন্য লেখা হচ্ছে? 

সর্বোপরি একজন লেখককে অবশ্যই ভাবতে হবে- যা তা লিখে পাঠকের মূল্যবান সময় নষ্ট করার কোনও অধিকার আমার নেই।

পচা মাছ যেমন কোনও ক্রেতাকে গছানো অপরাধ, ঠিক তেমনই বাজে গল্পও পাঠককে গছানো অপরাধ।

 

“খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন।”

এই দুটি লাইন দিয়ে শুরু হয়েছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসটি। কয়েকটি তথ্য আছে এই লাইন দুটিতে। ১. স্থান। খালের ধারের বটগাছ। গাছটির গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হারু ঘোষ। হারু ঘোষ লোকটা কে? কীরকম দেখতে- এরকম কিছুই জানা যাচ্ছে না।
২. দ্বিতীয় লাইনে জানা যাচ্ছে আকাশের দেবতা তার দিকে তাকালো। তার দিকে একটু কটাক্ষ করল।

কিন্তু কটাক্ষ শব্দের অর্থ কি চোখ বাঁকা? মানিক এর অর্থ বলছেন না। শুধু বলছেন- ‘কটাক্ষ করিলেন’।

তৃতীয় লাইনে এসে দেখা যাচ্ছে- হারু ঘোষের চুল কাঁচাপাকা। বয়স অনুমান করে নিতে হচ্ছে, চল্লিশ পঞ্চাশ হবে। তার মুখে বসন্তের চিহ্ন আছে। সেকালে বসন্ত রোগ হলে বাঁচা কঠিন। কিন্তু হারু ঘোষ বসন্ত রোগে মরেনি। বেঁচে আছে। হয়তো সেই বাঁচা কঠিন। হয়তো সেই বাল্যকালে তার মরে যাওয়ার কথা ছিল। আকাশের দেবতার কটাক্ষের কারণে হারুর মাথার কাঁচাপাকা চুল আর বসন্তের দাগে ভরা রুক্ষ মুখ পুড়ে গেল। সেখান থেকে বোঝা যাচ্ছে- আকাশের দেবতার কটাক্ষের অর্থ বজ্রপাত। হারু ঘোষের মাথায় বজ্রপাত হয়েছিল।

মানিক সেকথা সরাসরি বলছেন না। পাঠককে চিন্তা করার সুযোগ করে দিয়েছেন। শব্দের ভেতর থেকে বজ্রকে আবিষ্কার করে নিতে হচ্ছে পাঠককে।

তিনি দিচ্ছেন কয়েকটি বর্ণনা বা ডিটেইলস-
“সে কিন্তু কিছুই টের পাইল না। শতাব্দীর পুরাতন তরুটির মূক অবচেতনার সঙ্গে একান্ন বছরের আত্মমমতায় গড়িয়া তোলা চিন্ময় জগৎটি তাহার চোখের পলকে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে।” 

কী ঘটল? হারু অচেতন হয়ে গেল। কিন্তু তার মৃত্যু ঘোষণা করছেন না মানিক। মৃত্যুর বদলে কয়েকটি ডিটেলস বা বিবরণী দিচ্ছেন-
“কটাক্ষ করিয়া আকাশের দেবতা দিগন্ত কাঁপাইয়া এক হুঙ্কার ছাড়িলেন। তারপর জোরে বৃষ্টি চাপিয়া আসিল।

বটগাছের ঘন পাতাতেও বেশিক্ষণ বৃষ্টি আটকাইল না। হারু দেখিতে দেখিতে ভিজিয়া উঠিল। স্থানটিতে ওজনের ঝাঁজালো সামুদ্রিক গন্ধ ক্রমে মিলাইয়া আসিল। অদূরের ঝোপটির ভিতর হইতে কেয়ার সুমিষ্ট গন্ধ ছড়াইয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। সবুজ রঙের সরু লিকলিকে একটা সাপ একটি কেয়াকে পাকে পাকে জড়াইয়া ধরিয়া আচ্ছন্ন হইয়া ছিল। গায়ে বৃষ্টির জল লাগায় ধীরে ধীরে পাক খুলিয়া ঝোপের বাহিরে আসিল। ক্ষণকাল স্থিরভাবে কুটিল অপলক চোখে হারুর দিকে চাহিয়া থাকিয়া তাহার দুই পায়ের মধ্য দিয়াই বটগাছের কোটরে অদৃশ্য হইয়া গেল।’’

মানিক বর্ণনা দিয়েই যাচ্ছে। একটি সাপকে এনে হারুর পায়ের নীচ দিয়ে চালান করে দিচ্ছেন। তবুও বলছেন না হারু জীবিত, না মৃত। 

“মরা শালিকের বাচ্চাটিকে মুখে করিয়া সামনে আসিয়া ছপ-ছপ করিয়া পার হইয়া যাওয়ার সময় একটা শিয়াল বারবার মুখ ফিরিয়া হারুকে দেখিয়া গেল। ওরা টের পায়। কেমন করিয়া টের পায় কে জানে!’

মানিকের এই ডিটেইলস থেকে পাঠক টের পাচ্ছেন হারু এখন ডেডবডি। মৃত। এই মৃত শব্দটা বলার কোনও প্রয়োজনই বোধ করছেন না মানিক। শুধু ইশারা দিয়ে গেছেন। ইশারায় কাফি।

তিনি তো জানেন, এ সমাজটাই হারু ঘোষ। আকাশের কটাক্ষে প্রাণবায়ু বের হয়ে গেছে আমাদের জন্মের আগেই। মৃত মানুষ কোনও কথা বলে না। বলতে নেই। বলে ফেললে তিনি আর গল্পকার থাকেন না। মিথ্যেবাদী হয়ে পড়েন।

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)

(স্কেচটি করেছেন তাজুল ইমাম)

পরের পর্ব আগামী মাসের দ্বিতীয় রবিবার…

জলের অক্ষর পর্ব ১১

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More