সংখ্যার জোরে বলীয়ান নরেন্দ্র মোদীকে শেষে ক্ষমা চাইতে হল

0

বিশ্বনাথ চক্রবর্তী

স্বাধীনোত্তর ভারতে এনডিএ সরকারের তিন কৃষি আইন (Farm Law) ছিল এক অর্থে যুগান্তকারী। চলে আসা কৃষি, কৃষক ও কৃষি অর্থনীতির সম্পর্ককে পুরোপুরি বাজারিকরণের উদ্দেশে আনা এই তিন কৃষি আইনকে ঘিরে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, নাগাল্যান্ড থেকে কচ্ছ পর্যন্ত তীব্র কৃষক বিক্ষোভের সম্মুখীন হতে হয়েছিল নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) সরকারকে। দেশে আজ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষকদের আন্দোলনই ছিল সবচেয়ে বৃহত্তম ও দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন। এই আন্দোলন সাঁওতাল বিদ্রোহের থেকেও অনেক ব্যাপকতর ছিল এবং দীর্ঘমেয়াদী এই আন্দোলনে প্রায় ৬০০ কৃষকের মৃত্যু ঘটে নানা কারণে।

রাকেশ টিকায়েতের নেতৃত্বে সংযুক্ত কৃষক মোর্চা যে কেন্দ্রবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করেছিল তাতে সমস্ত বিরোধী পক্ষের সমর্থন থাকলেও আন্দোলনকে কখনওই কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ব্যানারে রাকেশ নিয়ে যেতে চাননি। কৃষকদের দ্বারা পরিচালিত অরাজনৈতিক মঞ্চই আন্দোলনের সাফল্যের নেপথ্যের অন্যতম কারণ। মোদী সরকার শত চেষ্টা করেও তাই এই আন্দোলনকে ভাঙতে পারেনি।

শুধু দেশের ভিতরে নয়, দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের কৃষক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। খ্যাতনামা পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ বা রেহানার মতো কলাকূশলীরা কৃষকদের সঙ্গে সহমত পোষণ করে মোদী সরকারের কৃষি আইনের বিরোধিতা করেছেন।

দ্বিতীয়বার একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বিজেপি তাঁর মূল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলিকে পালন করতে শুরু করে। কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বিলোপ থেকে শুরু করে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন প্রণয়ন এবং সর্বোপরি করোনা মহামারী কালে কার্যত কোনও আলোচনা ছাড়াই সংসদে সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে কৃষিক্ষেত্রের এই তিনিটি আইন একদিনের অল্প আলোচনাতেই পাশ করিয়ে নেয়। অভিযোগ উঠেছিল, রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও কার্যত নানা কায়দায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে আইন পাশের জন্য। যা নিয়ে বিরোধীদের তীব্র আপত্তি ছিল।

রাহুলের কথাই সত্যি হল! বুদ্ধদেব-মোদী কোথাও যেন মিলে গেলেন

প্রধানমন্ত্রীকে এই প্রথম সারা দেশের কাছে ক্ষমা চাইতে হল কৃষি আইন প্রত্যাহারের কথা জানিয়ে। এতে ভারতীয় গণতন্ত্র যে কেবলমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতায় চলে না, গণতন্ত্রে বিরোধী স্বরকে উপেক্ষ করতে পারে না শাসকদল, সেটা আরও একবার প্রমাণ হল। ভারতীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরও একবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হল বলা যায়।

নরেন্দ্র মোদীর থেকে বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদের সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করার জন্য রাজীব গান্ধী মানহানি আইন পাশ করিয়েছিলে। উদ্দেশ্য ছিল সরকারের সমালোচনা থেকে সাংবাদিকদের বিরত রাখা। সেইসময়েও দীর্ঘমেয়াদী ভাবে সাংবাদিকরা দেশজুড়ে আন্দোলন করেছিলেন। শুরুতে রাজীব গান্ধীর সরকারও আইন প্রত্যাহার করতে রাজি ছিল না। কিন্তু শেষপর্যন্ত সংবাদমাধ্যম ও জনগণের চাপে একই কায়দায় তিনিও ক্ষমা চেয়ে আইন প্রত্যাহার করেছিলেন।

কী কারণে নরেন্দ্র মোদীর সরকার বাধ্য হল এই তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে?

রাকেশ টিকায়েতেরর নেতৃত্বে কৃষকরা রাজনৈতিক দলগুলির থেকে দূরত্ব বজায় রেখে যে ভাবে স্বাধীন ও দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তাকে রাজনৈতি পথে মোকাবিলা করা বিজেপির পক্ষে কখনওই সম্ভব ছিল না। এই জয়ের পিছনে এটাই মূল কারণ। দ্বিতীয়ত, মুজফফর নগরের মহাপঞ্চায়েতে কৃষকদের বিশাল সমাবেশ বিজেপি নেতৃত্বকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। বিগত তিন দশকে এত বড় কৃষক সমাবেশ উত্তরপ্রদেশ কেন ভারতে কখনও ঘটেনি।

সম্প্রতি লখিমপুরে বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পুত্রের দ্বারা কৃষকদের গাড়ির চাকায় পিষে দেওয়ার ঘটনা উত্তরপ্রদেশের কৃষকদের অসন্তোষকে চরমে পৌঁছে দিয়েছিল। যা ভোটের আগে করা সম্প্রতি জনমতে প্রতিফলিত হয়েছে। এই অবস্থায় আগামী বছর উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড এবং পাঞ্জাব এমনকি পরবর্তী পর্যায়ে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং গুজরাতের নির্বাচনে কৃষকদের সমর্থন রাখতে গেলে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহের সামনে কৃষি আইন প্রত্যাহার করা ছাড়া আর কোনও বিকল্প ছিল না। ফলে কৃষি আইন নিয়ে সারা দেশজুড়ে প্রচার চালালেও শেষ পর্যন্ত ভোট বড় বালাই। ভোটে পরাজয়ের ভয়েই মোদী-শাহ বাধ্য হলেন প্রত্যাহার করতে।

কৃষি আইন প্রত্যাহারে কি বিজেপির খাতায় সবটাই শূন্য নাকি উদ্ভাসিত হল নতুন সম্ভাবনাও?

তিন কৃষি আইনের কারণে বিজেপির শরিকরা, যেমন আকালি দল, আইএনএলডিএ-সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক দল একের পর এক এনডিএ ছেড়ে সরে গিয়েছিল। ফলে কৃষি আইন প্রতত্যাহারের মধ্যে দিয়ে এই দলগুলিকে নতুন বার্তা দিল মোদী সরকার। বিশেষ করে পাঞ্জাবের প্রশ্নে আকালি দলের সঙ্গে বিজেপির পুনর্মিলনের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। উত্তরপ্রদেশে আইএনএলডি-সহ একাধিক আঞ্চলিক দলের সঙ্গেও ভোটে জোট বাঁধার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে কৃষি আইন বাতিলের মধ্যে দিয়ে হারিয়ে যাওয়া জোট সঙ্গীদের বিজেপি আবার ফিরিয়ে আনতে পারে এমন সম্ভাবনাও থাকছে।

বিরোধী শিবিরের উৎফুল্লের কারণ কী?

২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস-সহ বিরোধীদের পরাজয় এবং ২০১৯-এ আবারও ৩০০-র বেশি আসন নিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কী ভাবে বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠবে সে ব্যাপারে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস-সহ বাকি দলগুলি দীশাহীন অবস্থায় ছিল। কৃষক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে মোদী সরকারকে কৃষি আইন প্রত্যাহারে বাধ্য করে বিরোধী পক্ষ বিশেষ করে কংগ্রেস বিপুল উৎসাহে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে নতুন ভাবে আন্দোলনের রাস্তা খুঁজে পেল বলা যায়। ইতিমধ্যেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে আপত্তি রয়েছে বিরোধীদের। এবার কি সিএএ বাতিলের দাবি নিয়ে আন্দোলনে বিরোধী দলগুলিকে নতুন করে পথে দেখা যাবে? সেই সম্ভাবনাও কিন্তু কৃষক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে সূচিত হল।

পরপর দুটি লোকসভা নির্বাচনে বিরোধীদের পরাজয় এবং ভারতীয় রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদীর নিরঙ্কুশ প্রাধান্যকে কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে প্রতিহত করে বিরোধীরা চব্বিশের নির্বাচনের আগে মোদীর বিরুদ্ধে নতুন করে ঝাঁপানোর রসদ জোগাড় করল বলা যায়।

শেষ কথা

রাজনীতির সমীকরণ এবং অঙ্ক বিভিন্ন শিবিরের কাছে বিভিন্ন ভাবে উদ্ভাসিত হলেও এই বৃহত্তম ও দীর্ঘমেয়াদী কৃষক আন্দোলনের জয় ভারতীয় গণতন্ত্রকে মজবুত করল।

(লেখক- রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ব বিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.