একটা উপনির্বাচন পর্যন্ত শান্তিতে হবে না এ রাজ্যে?

ভোট মানেই অশান্তি (Trouble)। একথা মেনেই নিয়েছে রাজ্যের মানুষ। গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, ভোট হলেই বিভিন্ন দলের সমর্থকরা পরস্পরের ওপরে চড়াও হয়। বোমা পড়ে। অনেকে হতাহত হয়। বিরোধীরা পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করে। দাবি তোলে, কেন্দ্রীয় বাহিবীর অধীনে ভোট করাতে হবে। সাধারণ মানুষ এইসব ঝামেলার মধ্যে থাকে না। ভোটের দিনে বেশি রাস্তায় বেরোয় না তারা। কোনওরকমে নিজের ভোটটা দিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ে। কিন্তু ভবানীপুরে উপনির্বাচনের ক্ষেত্রে ছবিটা অন্যরকম হবে বলে আশা করা গিয়েছিল। কারণ সেখানে আছেন হাইপ্রোফাইল প্রার্থী। অশান্তি হলে তিনি অস্বস্তিতে পড়বেন।

বাস্তবে দেখা গেল, ভবানীপুরও শান্ত রইল না। বৃহস্পতিবার সেখানে ভোট। করোনা পরিস্থিতিতে প্রচার শেষ হয়েছে সোমবার। এদিন সকাল থেকেই সেখানে ছিল টেনশন। বেলা গড়াতেই শুরু হয় বিক্ষিপ্ত অশান্তি। যদুবাবুর বাজারের কাছে বিজেপির সর্বভারতীয় সহ সভাপতি দিলীপ ঘোষকে ধাক্কাধাক্কি, মারধরের অভিযোগ ওঠে। দিলীপবাবুর নিরাপত্তারক্ষী রিভলভার বার করে তেড়ে যান জনতার দিকে। ওইসময় বিজেপির দুই কর্মী মুকুন্দ ঝা এবং ভাবনারায়ণ সিংকে মারধর করা হয়। আহত হয়ে তাঁরা ভর্তি হন হাসপাতালে।

উপনির্বাচনে প্রচারের শেষ দিনে তৃণমূলের কোনও তারকা ক্যাম্পেনারকে দেখা যায়নি। অন্যদিকে বড় নেতাদের দিয়ে প্রচারে রীতিমতো ঝড় তুলতে চেয়েছিল বিজেপি। ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত আটটি ওয়ার্ডে অন্তত ১০ জন নেতাকে পাঠিয়েছিল গেরুয়া ব্রিগেড। অশান্তি শুধু দিলীপবাবুকে কেন্দ্র করে হয়নি। অভিযোগ, রাজ্যের আর এক প্রথম সারির বিজেপি নেতা অর্জুন সিংও প্রচারে গিয়ে গণ্ডগোলের মুখে পড়েছিলেন। খোদ প্রার্থী প্রিয়ঙ্কা টিবরেওয়ালকে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে প্রচারে বাধা দিয়েছে পুলিশ।

সোমবার গোলমালের কিছুক্ষণ পরেই সাংসদ স্বপন দাশগুপ্তের নেতৃত্বে বিজেপির এক প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনে যায়। তাঁদের অভিযোগ, তৃণমূলের এক বিধায়কের অনুগামীরা গোলমাল করেছে। ওই বিধায়ককে অবিলম্বে এলাকা থেকে সরানো দরকার। না হলে ভোটের দিন ফের অশান্তি হতে পারে। একইসঙ্গে কলকাতা পুলিশের ডিসি সাউথকেও সরানোর দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগ, তিনি শাসক দল তৃণমূলের হয়ে কাজ করছেন। দিলীপ ঘোষ তো একধাপ এগিয়ে বৃহস্পতিবারের ভোট স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছেন।

তৃণমূলও চুপ করে বসে নেই। তাদের অভিযোগ, বিজেপির তরফে উস্কানি ছিল। তা থেকেই অশান্তির সূত্রপাত। দিলীপবাবু নাকি করোনা টিকাকরণ কেন্দ্রে ঢুকে প্রচার করছিলেন। তখন ‘সাধারণ মানুষ’ প্রতিবাদ করেন। একটি পুজো মণ্ডপেও নাকি অশান্তির চেষ্টা হয়েছিল। মহিলাদের সঙ্গে অভদ্র আচরণ করা হয়েছে।

তৃণমূলের আরও একটি অভিযোগ, দিলীপবাবুর নিরাপত্তা রক্ষীর পিস্তলের আঘাতে তাদের এক কর্মী আহত হয়েছেন। তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

যতদিন না ভোট মিটছে, ততদিন এইরকম চাপান-উতোর চলতেই থাকবে। কিন্তু এর মাঝে যে প্রশ্নটা বড় হয়ে উঠছে, তা হল, একটা উপনির্বাচন পর্যন্ত এরাজ্যে শান্তিতে হয় না কেন?

শোনা যাচ্ছে, দিদির অনুগামীরা চান, তিনি ভবানীপুর থেকে অন্তত ৪০ হাজার ভোটে জিতুন। গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূল বিপুল জয়লাভ করেছে ঠিকই কিন্তু এর মধ্যে কাঁটা হয়ে আছে নন্দীগ্রামে মমতার পরাজয়। তাঁর অনুগামীদের আশা, নেত্রী ভবানীপুরে বড় ব্যবধানে জিতলে সেই লজ্জা দূর হবে। সম্ভবত সেজন্যই তাঁরা চাইছিলেন না, বিজেপি ভবানীপুরে বেশি প্রচার করুক। লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হল, দিলীপবাবু সোমবার যে এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন তা ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে পড়ে। গত বিধানসভা নির্বাচনে এই ওয়ার্ডে বিজেপি লিড পেয়েছিল।

ভবানীপুরে গোলমালের ঘটনায় নির্বাচন কমিশন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রিপোর্টও তলব করেছে। হয়তো তারা কিছু ব্যবস্থাও নেবে। কিন্তু শুধু আইনি ব্যবস্থা নিয়ে কি গোলমালের সম্ভাবনা দূর করা যায়? এক পার্টির লোক যদি ভিন্ন পার্টির লোককে সহ্য না করতে পারে, বিতর্কের চেয়ে গায়ের জোরের ওপরেই আস্থা রাখে বেশি, তাহলে কি অশান্তি আটকানো সম্ভব? শান্তির জন্য প্রয়োজন সহিষ্ণুতা। আমাদের এ রাজ্যে তার বড়ই অভাব।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More