অসমে এবার উত্তরপ্রদেশ মডেল

উন্নয়ন নয় হিন্দুত্ব। একেবারে আরএসএস মার্কা কড়া হিন্দুত্ব। যা শেখায়, বিধর্মী মাত্রেই সন্দেহভাজন। গোমাতার হত্যাকারী। ভুলিয়ে ভালিয়ে হিন্দু মেয়েদের ফাঁদে ফেলতে তৈরি। প্রতিবাদীরা দেশের শত্রু। সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে তাদের গোপন যোগসাজশ। পুলিশ তাদের আমৃত্যু জেলে পুরে রাখুক। কোনও বড় অপরাধীকে নাগালে পেলে কোর্ট-কাছারির ঝামেলার মধ্যে যাওয়ার দরকার নেই। পুলিশ সোজা চালিয়ে দিক গুলি। পরে বলা হবে, সে এনকাউন্টারে মারা গিয়েছে। দেশের মানুষ মনে করে, এমনতর ধারণা নিয়েই চার বছর উত্তরপ্রদেশে সরকার চালাচ্ছেন যোগী আদিত্যনাথ।

এই ধ্যানধারণা ও কাজের পদ্ধতি ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে বিজেপি মহলে। অসমে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা যে ব্যবস্থাগুলি নিতে শুরু করেছেন তাতে স্পষ্ট, তিনি উত্তরপ্রদেশ মডেলে চলতে চান।

২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশের ভোটে যোগীর মূল অস্ত্র ছিল মেরুকরণ। তিনি ও বিজেপির অপর নেতারা বোঝাতে চেয়েছিলেন, হিন্দুরা সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও নানা ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই অনাচার শেষ হবে। ২০২১ সালে অসমেও বিজেপির প্রচারের মূল সুর ছিল একই। উত্তর-পূর্বের ওই রাজ্যে এআইইউডিএফ নেতা বদরুদ্দিন আজমলকে প্রধান শত্রু হিসাবে সাব্যস্ত করেছিল গেরুয়া ব্রিগেড। তারা প্রচার করেছিল, বদরুদ্দিন আজমল বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের স্বার্থরক্ষা করতে চান। তাঁকে মদত দিচ্ছে কংগ্রেস।

হিন্দুত্ববাদীদের একটা বড় আশঙ্কা হল, ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে মুসলিমরা একদিন দেশে সংখ্যাগুরু হয়ে উঠবে। তাতে দুর্দশা হবে হিন্দুদের। সেই ধারণার বশবর্তী হয়ে উত্তরপ্রদেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নীতি চালু করতে চলেছেন যোগী। তাতে বলা হয়েছে, যে দম্পতি দুইয়ের অধিক সন্তানের জন্ম দেবেন, তাঁরা সরকারি চাকরি পাবেন না। সরকারের নানা কল্যাণমূলক প্রকল্প থেকেও বঞ্চিত হবেন।

যোগীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে গত ১৮ জুন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ঘোষণা করেছেন, অসমে কোনও দম্পতি দু’টির বেশি সন্তানের জন্ম দিলে রাজ্যের নানা কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না।

গতবছর নভেম্বরের শেষে বেআইনি ধর্মান্তর নিয়ে অধ্যাদেশ জারি করে উত্তরপ্রদেশ সরকার। প্রকৃতপক্ষে ‘লাভ জেহাদ’ ঠেকাতেই ওই অর্ডিন্যান্স আনা হয়। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে পুলিশ ওই অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ১৪ টি মামলা করে। গ্রেফতার হন ৫১ জন।

গত ১১ জুলাই হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, তিনিও অসমে লাভ জেহাদের বিরুদ্ধে আইন আনবেন। সেই আইন অনুযায়ী ভাবী দম্পতিকে বিয়ের একমাস আগে তাঁদের ধর্ম ও আয়ের পরিমাণ জানাতে হবে। অসমের মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, শুধু মুসলমানরাই যে লাভ জেহাদ চালায় তা নয়। হিন্দু যুবকরাও অনেক সময় পরিচয় গোপন করে মেয়েদের ফাঁদে ফেলে।

এনকাউন্টারে মৃত্যুতেও উত্তরপ্রদেশকেই অনুসরণ করছে অসম। গত মার্চে পাওয়া একটি হিসাবে জানা যায়, চার বছরে উত্তরপ্রদেশে গুলি করে মারা হয়েছে ১৩৫ জন অপরাধীকে। সম্প্রতি দিল্লির একজন অ্যাডভোকেট জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করেছেন, হিমন্ত বিশ্বশর্মা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে অসমে এনকাউন্টার খুব বেড়ে গিয়েছে। গত ১ জুন থেকে পুলিশ ২০ টি এনকাউন্টার করেছে। অন্তত পাঁচটি ক্ষেত্রে অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছে।

পুলিশ অপরাধীদের গুলি করে মারছে শুনলে অনেকেই খুব খুশি হয়। তারা ভাবে, অপরাধীরা নরকের কীট। তাদের আবার মানবাধিকার কীসের। কিন্তু এই ভাবনায় বড় রকমের ত্রুটি আছে। সভ্য সমাজে কাউকে বিনা বিচারে মানুষ মারার অধিকার দেওয়া হয় না। তাছাড়া সবসময় যে অপরাধ দমনের জন্য এনকাউন্তার করা হয়, তা নয়। বড় অপরাধীদের সঙ্গে প্রায়ই উঁচু মহলের যোগাযোগ থাকে। তাকে কোর্টে পেশ করলে সে অনেকের নাম বলে দিতে পারে। সেই ভয়ে অনেক সময় অপরাধীকে এনকাউন্টার করে দেওয়া হয়। এমনও অভিযোগ উঠেছে, একশ্রেণির পুলিশ কোনও অপরাধী গোষ্ঠীর থেকে টাকা খেয়ে বেছে বেছে বিরোধী গোষ্ঠীর দুষ্কৃতীদের মেরেছে।

২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, দেশ জুড়ে গুজরাত মডেল চালু করবেন। বছরে দু’কোটি ছেলেমেয়ে চাকরি পাবে। কালোবাজারি, মজুতদারি বন্ধ করে জিনিসপত্রের দাম কমাবেন। বিদেশের ব্যাঙ্কে গচ্ছিত ভারতীয়দের বেআইনি অর্থ ফেরাবেন। তা থেকে প্রত্যেকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকবে ১৫ লক্ষ টাকা। একইসঙ্গে মোদী স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’। অর্থাৎ সরকার জাতি-ধর্ম বিচার না করে সকলের কল্যাণের জন্য কাজ করবে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সাধারণত কেউ রাখে না। বিজেপিও রাখেনি। এখন বিজেপি উন্নয়নের কথা বলতে গেলে লোকে হাসবে। তার ওপরে অভিযোগ উঠেছে, করোনা পরিস্থিতি ঠেকাতে বিজেপি ব্যর্থ। অতিমহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ের আগে পর্যাপ্ত পরিমাণে হাসপাতালের বেড ও অক্সিজেনের ব্যবস্থা রাখলে এত মানুষ মরত না।

এই অবস্থায় ধর্মকে আশ্রয় করা ছাড়া বিজেপির সামনে কী উপায় আছে? ভারতীয়রা ধর্মপ্রাণ। গেরুয়া ব্রিগেডের আশা, করোনা কালে দল তথা সরকারের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তা রামনাম করেই পুষিয়ে নেওয়া যাবে। তাই গুজরাত মডেলকে ছাপিয়ে উঠেছে ইউপি মডেল। প্রতিটি মডেলের পিছনে একজন নেতা থাকেন। গুজরাত মডেলের পিছনে ছিলেন মোদী। ইউপি মডেলের পিছনে আছেন যোগী। ইউপি মডেল যত জনপ্রিয় হবে, ততই বড় হবে যোগীর ভাবমূর্তি। শেষকালে বিজেপিতে শীর্ষ স্থানটি নিয়ে মোদীর সঙ্গে যোগীর লড়াই শুরু হলে আশ্চর্যের কিছু নেই।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More