আমার সেজকাকু মান্না দে (একাদশ পর্ব)

সুদেব দে

সজ্ঞীতসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর সম্পর্কে কাকার বক্তব্য আর তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে লিখেছিলাম গত দুটি পর্বে। আমার সেজকাকু মান্না দে’র সঙ্গে থাকার সূত্রে তাঁর বক্তব্য যেটুকু শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছে, শুধু সেটুকুই আমি তুলে ধরছি আপনাদের সামনে। তবে শুধু লতাজি নয়, আশাজিকে নিয়েও নানাসময় নানা কথা বলেছেন সেজকাকু মান্না দে। এই দুই বোন যে সাক্ষাৎ সরস্বতীর বরপুত্রী সে কথা কাকা কথাপ্রসঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, বারবার বলেছেন। আশাজিকে নিয়েও রয়েছে অনেক গল্প। সেসব গুছিয়ে নিশ্চয়ই পরের কোনও পর্বে শোনাব আপনাদের।

আমি দে ঘরানার তৃতীয় প্রজন্মের একমাত্র সঙ্গীতশিল্পী। পারিবারিক প্রথা মেনে সঙ্গীত শিখেছি, গানই আমার প্রফেশন। তাই মনে করি, আমার দাদু সঙ্গীতসম্রাট কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কথা এ প্রজন্মের মানুষের কাছে তুলে ধরা খুবই দরকার। আমি এর আগেও দাদুকে নিয়ে টুকরো টুকরো নানা কথা আপনাদের কাছে বলেছি। আজ আরও কিছু কথা ভাগ করে নেব আপনাদের সঙ্গে।

আগেই বলেছি কাজের সূত্রে সেসময় বম্বেতে থাকতেন কাকা। আমরা থাকতাম কলকাতায়। খুবই ব্যস্ততম শিল্পী ছিলেন কাকা, কাজ নিয়ে মাঝেমধ্যে কলকাতায় আসতেন ঠিকই, কিন্তু চরম ব্যস্ততায় সেসময় দম ফেলার সময় থাকতো না তাঁর। আমি সেই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একজন, যার জন্য হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করে বসতেন সেজকাকা। তাঁর সাহচর্য আর স্নেহ পেয়েছি, এ আমার পরম সৌভাগ্য। গানবাজনায় আমার প্রাথমিক তালিম চলেছিল আমার প্রথম শিক্ষাগুরু আমার বাবা শ্রী প্রণব দে’র কাছে। তারপরে আমি মহাপণ্ডিত মহেশ প্রসাদ মিশ্র’র কাছেও তালিম নিই। যাই হোক দাদু, মানে কৃষ্ণচন্দ্র দে’র প্রসঙ্গে ফেরা যাক।

আমার দাদু সঙ্গীতাচার্য কৃষ্ণচন্দ্র দে’কে দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার। তবে তাঁর নানা গল্প শুনেছি সেজকাকার মুখে৷ তিনি ছিলেন আমার বাবা-কাকাদের গুরু। দাদু যে ওস্তাদজির কাছে তালিম নিতেন, সেখানে তাঁর সঙ্গে বাবা আর সেজকাকাও যেতেন। যেহেতু উনি অন্ধ মানুষ, তাই যখন যা শিখতেন, তার নোট করে নেওয়ার দায়িত্ব থাকত বাবা-কাকার উপর। তার পাশাপাশি তালিম চলাকালীন একটু আধটু গলাও মেলাতেন ভাইপোরা। তেমনই একদিন তালিম চলছে মালকোষ রাগের। এই মালকোশ রাগের পর্দা হল স/গ/ম/ ধ/ ন/স। এর মধ্যে ‘মা’ শুধু শুদ্ধ পর্দা। বাকি সব কোমল। মানে কোমল গা, কোমল ধা, কোমল নি। সেদিন তালিম শেষে ওস্তাদজি চলে যাওয়ার পর কাকা দাদুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আচ্ছা এই মালকোশ রাগে অন্যান্য পর্দা লাগে না কেন? এ প্রশ্ন আমাদের অনেকের মনেই জাগে। আমরাও অনেকসময় গান গাইতে গিয়ে ভাবি, এই একএকটা রাগের এক একরকম চলন কেন? সেদিন দাদু বুঝিয়ে বলেছিলেন, কেন সব নোট সব রাগে লাগেনা! এই রাগরাগিণীর সঙ্গে আমাদের প্রকৃতির এক গভীর যোগাযোগ আছে। মালকোষ হল গভীর রাতের রাগ, সেই গম্ভীর ভাবই ধরা আছে এর চলনে।পরবর্তীকালে কাকা আমায় মালকোশ রাগ শেখাতে গিয়েও কিছু কথা বলেছিলেন, এটা গানবাজনার যারা চর্চা করেন, বা গানের ছাত্র যারা, তাদের জানা খুব দরকার, সেজন্যই শেয়ার করছি আজ। কাকা আমায় বলেছিলেন, ‘এই যে মালকোশের কোমল গান্ধার, এই একই পর্দা কিন্তু অন্যান্য রাগেও ব্যবহার হয়। কিন্তু বিভিন্ন রাগের ক্ষেত্রে বদলে যায় তার এপ্লিকেশন। এই কোমল গা কিন্তু দরবারি কানাড়াতেও আছে। আবার জৌনপুরিতেও আছে, আবার মিঞা কি মলহারেও আছে। অথচ এই প্রত্যেকটা রাগেই কিন্তু কোমল গান্ধারের এপ্লিকেশন একেবারে আলাদা।

মহম্মদ রফির সঙ্গে আমার দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে

দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’কে নিয়ে আমার সেজকাকা নানা সময়ে এত কথা বলেছেন, সেগুলো যেমন যেমন মনে আসছে আমি তেমন তেমন বলছি। সবই স্মৃতি থেকে তুলে আনা কথা, তথ্যগত কোনও ভুল থেকে গেলে আপনারা নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন। দাদুকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কাকা একবার কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির মজলিশের অভিজ্ঞতা শুনিয়েছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র দে’কে না কি কোনও আসরেই আগে গান গাইতে দেওয়া হত না। আসলে আমার দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে এমন একজন শিল্পী যিনি ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, ঠুংরি, গজল, রাগপ্রধান, রাগাশ্রয়ী, নজম – সব গান সমান দক্ষতায় গাইতে পারতেন। আর শেষে কীর্তন গেয়ে আসর এমন মাৎ করে দিতেন, যে ওঁর পরে আর কেউ গান গাইতে সাধারণত সম্মত হত না। সেদিন কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির মজলিশে অনেক বিখ্যাত শিল্পী এসেছিলেন। শচীন দেব বর্মন, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী এবং আরও অনেক বিখ্যাত মানুষের নাম ছিলে সেদিনকার আর্টিস্ট লিস্টে। এদের মধ্যে শচীন দেব বর্মন তো আমার দাদুর কাছে গান শিখেছেন দীর্ঘদিন। কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছে তালিম নেওয়ার জন্য আমাদের বাড়িতেও যাওয়া-আসা ছিল তাঁর।

যেসময়ের কথা বলছি, তখন সেজকাকাও সদ্য তরুণ, নামডাক হয়নি। দাদুর সঙ্গে তানপুরো বাজাতে বা হারমোনিয়ামে এসিস্ট করতে যেতেন। কাকা বলছেন, “এত সুন্দর সাজানো জায়গা। আমরা পৌঁছে গেছি, কিন্তু বাবুকাকার ডাক আর আসছে না।” মঞ্চে প্রথম উঠেছিলেন সম্ভবত ভীষ্মদেব চ্যাটার্জি। একে একে সবার গান হয়ে যাওয়ার পর প্রায় শেষরাতে দাদুর ডাক পড়ে। দাদু তখন খানিক বিরক্তও হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু মঞ্চে উঠেই চমকে দিলেন দাদু। কাকা পরে আমায় বলেছিলেন, তুমি যখন একটা আসর করবে, তখন আসরের শ্রোতাদের মানসিকতা বুঝে, বা আগের আর্টিস্টের পারফরম্যান্স বুঝে তোমায় গান বাছতে হবে। এই কাজটা যত নিখুঁত হবে, আর্টিস্ট হিসাবে ততই তোমার সার্থকতা।

এই আসরেও দাদু হঠাৎ করে কাফি রাগের একটা বন্দিশ ধরলেন। কাফিতে আছে কোমল গা আর কোমল নি। সুরটার মধ্যেও একটা চাঞ্চল্য আছে। হোলির গানে যেমন কাফি ঠাট ব্যবহার হয়। তার উপর কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কণ্ঠ! অমন গলা ক’জনের হয়! সেই উদাত্ত কম্বুকণ্ঠে আচমকা উনি ধরলেন কাফি রাগের একটা বন্দিশ। শুরুতেই আসর মাৎ করে দিলেন তিনি। আগের সব সুর মুছে গিয়ে শ্রোতাদের কানে এই একটা সুরই যেন দুলতে শুরু করল। তখন ভোর হয় হয়। তাই কাফির পরেই তিনি ধরলেন যোগিয়া। ভারী মিষ্টি রাগ ‘যোগিয়া’, অথচ তার একটা আলাদা গাম্ভীর্যও আছে। ওই রাজকীয় পরিবেশে সারারাতের ক্লান্তি ভুলে শ্রোতারা টানটান হয়ে বসেছেন ততক্ষণে। প্রথমে কাফি, তারপর যোগিয়া, একেবারে বিপরীত মেরুর একটা রাগ, এই আশ্চর্য নির্বাচন দিয়ে শুরুতেই আসর মাৎ করে দিয়েছিলেন দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে। তারপর সেই ভোররাতে নিমগ্ন শ্রোতাদের সামনে তিনি ধরলেন কীর্তন। কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কীর্তন তো সাধারণ কীর্তন নয়। একটা অন্যরকম ডিভাইন এপ্রোচ ছিল তার। কী অপরিসীম ভালোলাগা যে তৈরি হত, লোকে যে কী আত্মমগ্ন হয়ে সেই গান শুনতেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আজও যদি কেউ ইউটিউবে সার্চ করেন কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কীর্তন সম্বন্ধে, বা অন্য গান সম্বন্ধে, বেশ কিছু গান পাবেন এখনও। অমন কণ্ঠ, অমন মডিউলেশন, অমন এক্সপ্রেশন আর ওই উদাত্ত গলা। সে কীর্তন শুনে সেদিন কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতেও শ্রোতার আসনে বসে হাউ হাউ করে কেঁদে ভাসিয়েছিল মানুষ। কাকা বলছেন, “আমি কী তানপুরো বাজাব! আমিও তো কাঁদছি হাউ হাউ করে। অবচেতনে আমার হাত থেকে বাজনা সরে যাচ্ছে।”… এইরকম মাদকতা ছিল কৃষ্ণচন্দ্র দে’র।

ক্রমশ…

মেল যোগাযোগ – [email protected]

আমার সেজকাকু মান্না দে (দশম পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More