বাংলার হেঁশেল- পোস্ত দিয়ে কী না হয়

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

মেয়েদের তো সেভাবে নিজের ঘর বলতে কিছু হয় না। কারও কারও হয়ত হয়। পুরুষ শাসিত সমাজে সেটা ব্যতিক্রমী ঘটনা। আমাদের দেশে নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলতে ক’জন নারীই বা পারেন! জন্ম মুহূর্ত থেকে পরিবারের কোনও না কোনও সদস্যের কাছ থেকে অবহেলা পাওয়া, মুখঝামটা খাওয়া নারী সেই যে চুপসে যান… আর মেলতেই পারেন না নিজেকে। নিজের গুণগুলোকে ঠিক ঠিক ভাবে বিকশিত করার ক্ষেত্রেও অনেক বাধা পেরোতে হয় মেয়েদের।
জন্ম থেকেই নানান যুক্তিহীন নিয়মের অধীনে থাকতে হয় নারীকে। নিজের বাড়িতেই। যেখানে তার নিকটজন থাকে, সেখানেই। ওই একই বাড়িতে তার পিঠোপিঠি ভাইরা অন্যভাবে বড় হয় তার সামনেই।
বন্ধুর বাড়ি যাওয়া, নিজেদের ছাদে ঝপাং ঝপাং করে লাফানো… এসবে লাগাম পরানো হয়। খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রেও ভেদাভেদ চোখে পড়ে। খুব উদারমনস্ক বাড়ি হলেও এই ভেদ সূক্ষ্মভাবে থাকে। বাবার অবর্তমানে ওই বাড়ি দাদার অথবা ভাইয়েরই হয়। বাড়ির মেয়ে হয়ে যায় অনাহূত। শাশুড়ি’মা’- এই গালভরা কথাটা ১৫ বছরের পরেও অবাস্তব শোনায়। হাস্যকর মনে হয়।
শাশুড়ি যেমন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মা হয়ে উঠতে পারেন না, তেমনই ব্যাটার বউও কন্যা হয়ে উঠতে পারে না। কেন পারে না তার স্বপক্ষে দুই দলের মানুষের কাছেই যথেষ্ট যুক্তি আছে। কারণও আছে জবরদস্ত। তবে মেয়েদের নিজের বাড়ি বলে যে কিছু হয় না, সেটা দুপক্ষই স্বীকার করে নেন।
নিজের বাড়ি নেই বলেই বিয়ের পর বাবা মা’র কাছে গিয়েও মেয়েরা শান্তি পায় না। নিজের ঘর, কিশোরীকালের নানান স্মৃতি যা পুরোনো সুটকেসে যত্ন করে তুলে রেখেছিল… চুলের ফিতে, প্রিয় নায়ক-নায়িকার পিকচার পোস্টকার্ড, বন্ধুর চিঠি, ফুল-ফল-নাম-দেশ খেলা পুরনো খাতাখানা… কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না আর। বেশিদিন থাকলে মা বাবা দাদা বিরক্ত হন। লোকে বুঝে যাবে জামাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নেই। আশেপাশের প্রতিবেশীদের জবাব দিতে হবে।
আমার মেয়ে/আমার বোন যতদিন ইচ্ছে আমাদের কাছে থাকবে… দরকার পড়লে সারাজীবন থাকবে, তাতে তোমাদের কী! এটা তো ওরও বাড়ি। খুব কম মেয়েই নিজের বাড়ির আপনজনদের কাছে থেকে এ রকম কথা শোনে। তাই স্বামী বা শাশুড়ির ওপর রাগ হলে, এমনকী সন্তানদের ওপরে অভিমান করে ক’দিন নিরুদ্দেশ হওয়ার জন্য মেয়েদের একটা বাড়ি খুঁজতে হয়। ক’দিন থাকার জন্য। বুকের মধ্যে চেপে রাখা কষ্টগুলোকে ওগরানোর জন্য একটা ফাঁকা ঘর লাগে। আমি কত মেয়েকে এই সব বিষণ্ণ দিনগুলোতে বন্ধুর বাড়িতে চলে যেতে দেখেছি। তখন তাদের ফোন অফ থাকে। শত্রুরা বলে পরিবারকে টাইট দেওয়ার কৌশল। সত্যিই কি তাই?
মেয়েটি তো বন্ধুর বাড়িতে এসেও শাশুড়ির ওষুধ খাওয়ার টাইম হলে বারবার ঘড়ি দ্যাখে। মিতুল কি গানের ক্লাস থেকে ফিরল? আচ্ছা মিতুলের বাবা কি দুর্গাপুরে ফোন করে তার খোঁজখবর করছে?
শাশুড়ি নিশ্চয়ই মনে মনে তার মা-বাবাকে গালাগালি করছেন? ফোন করে অপমানজনক কথাবার্তা বলছেন? বন্ধুর বাড়ির বালিশ ভিজে যায় চোখের জলে। তবুও মনকে শক্ত করে। এই কটা দিন রুটিনের ধার ধারে না মেয়েটি। বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে। দুপুর বারোটায় চা আর গোলারুটি খায়। বন্ধুর বাড়ি হলেও এমনি এমনি তো থাকা যায় না! বন্ধুর জন্য শাড়ি, টুকটাক উপহার আনতে হয়। দুদিনের বাজার করে দেবার পরেও… এভাবে থাকতে অস্বস্তি হয়। কারণ একইভাবে নিজের সংসার সামলাতে গিয়ে ল্যাজে-গোবরে অবস্থা বন্ধুদেরও। অবশ্য যে বন্ধুরা প্রতিষ্ঠিত হয়ে একা থাকে ‘নিজের’ বাড়িতে, তাদের কথা আলাদা।
কদিনের মধ্যে রাগ অভিমান থিতু হয়ে এলে তাকে বাড়ি ফিরতে হয়। ভুল বললাম। তার তো বাড়িই নেই। তাকে মিতুলদের বাড়িতে ফিরতে হয়।

দু-চারদিন কাটানোর মত অনেকটা নিজের বাড়ির টাইপের একটা ঘর ভাড়া পাওয়া গেলে বেশ হত! হোটেল নয়। ঘরোয়া টাইপের বাড়ি। লাল সিমেন্টের টানা বারান্দা। পর পর অনেকগুলো ঘর। এক একটা ঘরে এক একটা মেয়ে তাদের সাংসারিক বিষণ্ণতা কাটাতে আসবে। কেউ আসবে বসিরহাট থেকে। কেউ বেহালা বা বাঁশদ্রোণী থেকে। মুড়াগাছা থেকে আসবে আর একজন। মফস্সল এলাকায় পুরোনো আমলের পলেস্তরা খসা বাড়ি বলে পার-ডে ভাড়া বেশ কম। টানা এক সপ্তাহ থাকলেও গায়ে লাগবে না। এসি নেই, কিন্তু ওয়াইফাইয়ের সুবিধা আছে। কফি পাওয়া না গেলেও এখানে চমৎকার দুধ চা পাওয়া যায় দুবেলা। পাশের গ্রামের এক বৃদ্ধা আর এক তরুণী রান্না করে দিয়ে যায়। বাসন মেজে দেয় এক বোবা বউ। সাধারণ খাবার, কিন্তু অসাধারণ তার স্বাদ। অনেকটা মায়ের হাতের রান্নার মতোন।আশেপাশে দ্রষ্টব্য তেমন কোনও জায়গা না থাকলেও সেই বাড়ির লাগোয়া একটা নদী থাকবে। নদীতে নৌকা বাঁধাই থাকে। মাঝিকে ডাক দিলেই হল! ঘুরিয়ে আনবে খুব সামান্য অর্থের বিনিময়ে। প্রচুর গাছপালা ও দিগন্ত বিস্তৃত কৃষিখেত দেখতে দেখতে নদীর ধারেই অনেকটা সময় কেটে যাবে। সংসারের জ্বালাপোড়াগুলো ঠান্ডা বাতাসে জুড়িয়ে যাবে। ক্ষমার ভাব আসবে মনে। এই লাল বারান্দার বাড়িতে থাকলে রান্না করার ঝুট-ঝামেলা থেকে বেশ কদিন ছুটি মেলে। বাসন মাজার ঝামেলা নেই। দুপুরে মাছের ঝাল আর ভাত হলে রাতে রুটির সঙ্গে চিকেন না পনীর…. তা নিয়ে মাথা খারাপ হওয়ার কোনও চান্সই নেই। শাশুড়ির ভ্যাজর ভ্যাজর থেকেও কদিন মুক্তি। মুক্তি মিতুলের বাবার নিস্পৃহ চাহনি আর উদাসীনতা থেকেও। খালি মিতুলের জন্যই এই নিজের বাড়ির মতোন বাড়িটা থেকে ফিরে যাওয়া সংসারে।
তবে যাওয়ার আগে সুরাঁধুনি বৃদ্ধা মাসিমার কাছ থেকে পোস্ত চিকেন, ইলিশ পোস্ত আর আমড়া পোস্তর রেসিপি ভালো করে শিখে নিতে হবে।
মিতুল পোস্ত পেলে আর কিচ্ছুটি চায় না।

পোস্ত মধ্যবিত্তের হাত থেকে ফসকে গেছে। সুজি বা রামদানা না মেশানো ভেজালমুক্ত ভালো পোস্ত ২০০০ ছুঁই ছুঁই। নিরামিষের দিনগুলোতে গিন্নিরা চোখ বুজে পোস্তর ওপরে ভরসা করতেন। সঙ্গে সব রকমের সবজি বা আমাদা দেওয়া ঘন মুগের ডাল আর পোস্তর একখান পদ। ব্যাস! একটুকরো গন্ধরাজ লেবু বা কাগজি লেবু থাকলে ভালো, না থাকলেও অসুবিধা হত না। পোস্ত একাই সন্তুষ্টি দিতে সক্ষম। কিন্তু আজকাল পোস্ত খাবো বললেই খাওয়া যায় না।
ভাবতে হয়। বাজেটের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। তবুও মাসে এক আধবার বাঙালির মেনুতে পোস্ত থাক। বাঙালির জীবন থেকে অনেককিছুই তো চিরতরে চলে গেছে… পোস্তটা থাকুক। একদিন না হয় বাজেটকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে পোস্ত দিয়ে দুপুরের মেনু সাজাই!

পোস্ত চিকেন

উপকরণ- চারশো গ্রাম চিকেন, চারটে বড় সাইজের পেঁয়াজ, এক টেবিল চামচ আদা রসুন বাটা, তিনটে কাঁচালংকা বাটা, লাল-সবুজ কাঁচা লংকা আটটা, পোস্ত ৪ টেবিল চামচ, হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো এক চা চামচ, জিরে গুঁড়ো দেড় চা চামচ, পরিমাণ মত নুন, চিনি, তেজপাতা, গরম মশলার গুঁড়ো (ছোট এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি), সরষের তেল আধকাপ।
প্রণালী- পেঁয়াজগুলোকে ঝিরিঝিরি করে কেটে নিতে হবে। গ্যাসে কড়াই বসান। আধ কাপ সর্ষের তেল থেকে খুব অল্প তেল কড়াইতে ঢেলে নিয়ে অর্ধেক পেঁয়াজের বেরেস্তা করে নিন। চাইলে তেলের বদলে অল্প ঘি দিয়ে পেঁয়াজগুলোকে ভাজতে পারেন। পেঁয়াজ মুচমুচে সোনালি রঙের হলে একটা পাত্রে তুলে রাখুন। এবার ওই কড়াইতেই ৪ টেবিল চামচ পোস্ত আর চারটে লাল কাঁচালংকা ভেজে নিন। পোস্ত হালকা ব্রাউন হলে নামিয়ে ঠান্ডা হতে দিন। ঠান্ডা হলে ভাজা পেয়াঁজ, ভাজা পোস্ত, ভাজা কাঁচালংকা একটু নুন দিয়ে মিক্সিতে ভালো করে পিষে নিন।এবার একটা হাঁড়িতে বাকি সর্ষের তেলটুকু গরম করে একটা তেজপাতা ফোড়ন দিন। ঝিরি ঝিরি করে কেটে রাখা অর্ধেক পেঁয়াজ তেলে দিয়ে বাদামি করে ভাজুন। আদা-রসুনবাটা, কাঁচালংকা বাটা দিয়ে কষুন। মাংসগুলো দিয়ে দিন। নেড়েচেড়ে মশলার সঙ্গে মাংস মিশিয়ে নিন। এবার হলুদ গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো দিয়ে নেড়ে এক কাপ গরম জল মিশিয়ে ঢেকে দিন। আঁচ কমিয়ে দিন। মাংস একটু ফাটা ফাটা হলে ভাজা পেঁয়াজবাটা এবং পোস্তবাটা মাংসে ঢেলে দিন। ভালো করে সবটা মাংসের সঙ্গে মিলিয়ে দিন। নুন দিন। অল্প চিনিও দিয়ে দিন এই সময়। আর এক কাপ গরম জল দিয়ে ঢাকনা এঁটে দিন। গ্রেভি মাখো মাখো হয়ে এলে গরমমশলার গুঁড়ো এবং চারটে আস্ত কাঁচালংকা ছড়িয়ে দিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে গ্যাস অফ করে দিন। পোস্ত চিকেন রেডি।

দই পোস্ত ইলিশ

উপকরণ- তিন টুকরো ইলিশ, ফেটানো টক দই এক টেবিল চামচ, পোস্তবাটা দু টেবিল চামচ, কাঁচা লংকাবাটা এক চা চামচ, সাদা সর্ষে বাটা এক চা চামচ, কালো জিরে আধ চা-চামচ, অল্প হলুদগুঁড়ো, নুন স্বাদ মতো, সর্ষের তেল অল্প, কটা আস্ত কাঁচালংকা।প্রণালী- সব মশলা দিয়ে মাছগুলো মেখে নিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন। এবার কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে কালোজিরে আর একটা কাঁচালংকা ফোড়ন দিন। কাঁচা লংকাটা চিরে দেবেন। এবার মশলা মাখানো মাছগুলো কড়াইতে আস্তে করে ঢেলে দিন। মশলা ধোয়া জলটুকু দিয়ে আঁচ ঢিমে করে কড়াই ঢেকে দিন। কিছুক্ষণ পর সাবধানে মাছগুলোকে উল্টে দিন। আবার ঢেকে দিন। হয়ে এলে অল্প সর্ষের তেল আর দুচারটে আস্ত কাঁচালংকা ছড়িয়ে গ্যাস অফ করে দিন।

আমড়া পোস্ত

উপকরণ- দশ বারোটা কচি আমড়া, একটা কাঁচালংকা সহ পোস্তবাটা দু টেবিল চামচ, নুন, অল্প হলুদগুঁড়ো, গোটা সর্ষে আধ চা চামচ, চিনি ৩/৪ চা চামচ, এক চা চামচ পাঁচফোড়ন গুঁড়ো, (পাঁচ ফোড়ন চাটুতে সেঁকে গুঁড়ো করে নেওয়া) শুকনোলঙ্কা দুটো, দেড় চা চামচ সর্ষের তেল।

প্রণালী- কচি আমড়ার খোসা ছাড়িয়ে দু ভাগ করে বেশ কিছুক্ষণ জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে। তাতে কষা ভাবটা চলে যাবে। এবার কড়াইতে তেল গরম করে শুকনোলংকা দুটো ভেজে তুলে রাখতে হবে। তারপর সর্ষে ফোড়ন দিন। সর্ষেগুলো চড়বড় করে উঠলে আমড়া দিয়ে দিন। নুন হলুদ দিয়ে নেড়েচেড়ে একটু জল দিন। আমড়া সেদ্ধ হলে চিনি দিন। খুব মিষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ কচি আমড়া অতটাও টক হয় না। এবারে পোস্ত দিয়ে একটু ঢেকে দিন। বেশ মাখা মাখা হয়ে এলে পাঁচফোড়নের গুঁড়ো ছড়িয়ে গ্যাস অফ করুন। শুকনোলংকা দিয়ে সাজিয়ে সার্ভ করুন আমড়া পোস্ত।

 

লেখিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা, ভালোবাসেন রকমারি রান্না আর রন্ধনবিষয়ক আড্ডা।

বাংলার হেঁশেল- ভর্তায় ভোলবদল

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More