বাংলার হেঁশেল- ভর্তায় ভোলবদল

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

একটা সময়ে রগরগে খাবারদাবার আর ভাল্লাগে না। এর সঙ্গে যৌবন ঢলে পড়া, হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল’র কোনও সম্পর্ক নেই।
যিনি নিজে প্রায়শই মাংস রাঁধেন, শিলের উল্টোদিকের এবড়োখেবড়ো অংশটার ওপর ঘষে-ঘষে মাছের আঁশ তোলেন কিম্বা শিঙ্গিমাছের পিঠ চিরে লম্বা সুতোর মতো অংশটা তুলে ফেলে দেন… দুপুরে চান করার পরেও তার হাত থেকে আঁশটে গন্ধ বেরোয়। পাতিলেবুর রস, সাবান দিয়ে পরিষ্কার করার পরেও যেন আঁশ গন্ধটা যেতে চায় না। আসলে সেটা নয়। পাতিলেবুর রস মাখার পরে হাত থেকে আঁশ গন্ধটা চলে গেলেও মন থেকে যেতে চায় না। তাই বাড়ির অন্য সবাই যখন শীতের নতুন আলু আর মটরশুঁটি দিয়ে শিঙ্গিমাছের ঝোল ভাতের মধ্যে ঢেলে নেন আয়েস করে, তখন বাড়ির রাঁধুনি পেঁয়াজ শুকনোলংকা মচমচে করে তেলে ভেজে ওটা দিয়ে আলুসেদ্ধ মেখে ভাত খায়। লাউ দিয়ে শোল মাছ রেঁধে তাতে ওপর থেকে ধনেপাতা ছড়িয়ে দেওয়া- সেটাও সবাই যখন থালা চেটে খায়, তখন রাঁধুনি ঝাল ঝাল দু’চারটে সবজির ভর্তা বানিয়ে দুপুরের খাওয়া সারে।
লটে বা বেলে মাছের ঝুরো কিংবা নতুন আলু আর দেশি টমাটো দেওয়া মুরগির ঝোলেও আপত্তি রাঁধুনির। রাঁধুনির মন চাইছে আঁশ গন্ধ বর্জিত কোনও ঝাল ঝাল পদ যেটা দিয়ে এক থালা ভাত একনিমেষে উড়ে যাবে।তরকারিতে চিনি দিলে আজকাল ডাক্তারবাবুরা বড্ড রাগ করেন। বলেন “মিষ্টি সিরাপগুলোও সুগারফ্রি হচ্ছে, এখনও মান্ধাতা আমলের মতো তরকারিতে চিনি চালিয়ে যাচ্ছেন! চারটে তরকারি, চাটনি খেলে রোজ ক’চামচ চিনি ঢুকছে বডিতে সেটা অঙ্ক কষে দেখবেন একবার।” একজন সফল অঙ্কবিদের মতো মুখ করে তাঁর চিনি কম, চিনি বাদ ইত্যাদি উপদেশ শুনে গুটিগুটি পায়ে বাড়ি ফিরে বিশাল চিন্তায় পড়ে যেতে হয়।
তরকারিতে একটু মিষ্টি দিলে স্বাদ বাড়ে। নুনমিষ্টির সঠিক অনুপাতে তরকারি মুখরোচক হয়ে ওঠে। ছোটোবেলা থেকে সেটাই জানি। ছোটো থেকে তরকারিতে চিনি দিতে দেখেছি মা’কে, ঠাকুমা’কে, দিদা’কে- প্রায় সবাইকেই। তবে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলাম চিনি দেওয়ার সময় তাঁরা একটু গোপনীয়তা রক্ষা করতেন। ফাঁকতালে তরকারিতে টুকুস করে এক চা চামচ চিনি ফেলে দিয়ে পরিবেশন করার সময় কর্তাকে বলতেন “কুমড়োটা কোত্থেকে নিয়েছো গো এত্ত মিষ্টি! একটুও চিনি দিতে হল না…”
অত ঝামেলার কী দরকার! ভর্তা খাওয়ার অভ্যেস করুন। তেল কম লাগে। চিনি লাগেই না। আর দারুণ খেতে। যারা একটু ঝাল ঝাল টাইপের খাওয়াদাওয়া পছন্দ করেন, ভালোবাসেন, ভর্তা তাদের জন্য আদর্শ। ভর্তা দু’রকমের। একটা ভর্তা হল সবজি সেদ্ধ করে বা পুড়িয়ে কাঁচা তেল, কাঁচালঙ্কা, কাঁচা পেঁয়াজকুচো নুন দিয়ে মাখা।

আবার পেঁয়াজ শুকনোলঙ্কা তেলে ভেজে সেদ্ধডিম এবং আলু একসঙ্গে মাখলে চমৎকার লাগে। মসুর ডাল সেদ্ধ করে ভাজা পেঁয়াজ, ভাজা শুকনোলঙ্কা দিয়ে মেখে খেতেও বেশ ভালো। পটল শিকে গেঁথে গ্যাসের ঢিমে আঁচে পুড়িয়ে কাঁচালঙ্কা, কাঁচা পেঁয়াজ, নুন আর সর্ষের তেল দিয়ে মেখে গরম ভাতের সঙ্গে খেয়ে দেখবেন, খাদ্য অভ্যাসের একঘেয়েমি ব্যাপারটা কীভাবে এক নিমেষে হাওয়া হয়ে যায়!
তবে বরবটি ভর্তা, সিম ভর্তা, মিষ্টি কুমড়ার খোসা ভর্তা অথবা যেকোনও সবজির খোসা ভর্তা করতে হলে সামান্য সরষের তেল গরম করে তার মধ্যে খোসাগুলোকে নেড়ে নিয়ে কাঁচা ভাবটা আগে দূর করতে হয়।
সবজির খোসাকে ঠিকভাবে ভাজা বা ভর্তা করে খেলে আপনার দুমুঠো ভাত বেশি লাগবেই।
আপনাদের মুখের স্বাদ ফেরানোর জন্য তিনটে ভর্তার রেসিপি থাকল আজ।

বরবটি চিংড়ি ভর্তা

এটা আপনারা চিংড়ি না দিয়েও করতে পারেন । তবে ডিপ ফ্রিজে দু চারটে চিংড়ি অবহেলায় পড়ে থাকলে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করুন।

উপকরণ: কিছুটা বরবটি আঙুলের সাইজের মাপে কেটে নিতে হবে… এক বাটি মত। ১ টা শুকনো লঙ্কা, কাঁচা লঙ্কা ২-৩টি, চার কোয়া রসুন, ১টা বড় সাইজের পেঁয়াজ ঝিরি ঝিরি করে কাটা, দু চারটে চিংড়ি পরিষ্কার করে নুন হলুদ মেখে রাখা। পরিমাণ মত নুন আর অল্প সর্ষের তেল।প্রণালী: প্রথমে একটা কড়াইতে দু চা চামচ সর্ষের তেল গরম করে শুকনো লংকাটা মচমচে করে ভেজে তুলে রাখুন। এবারে ওই তেলেই রসুন, কাঁচা লংকা, কাটা পেঁয়াজগুলোকে হালকা ব্রাউন করে ভেজে একটা পাত্রে ঢেলে নিয়ে নুন হলুদ মাখানো চিংড়িগুলোও ভেজে তুলে রাখুন। এবার ওই কড়াইতেই কেটে রাখা বরবটিগুলো দিয়ে নেড়েচেড়ে ঢিমে আঁচে ঢেকে রাখুন কিছুক্ষণ। খেয়াল রাখবেন ভাজাটা যেন পোড়া পোড়া না হয়ে যায়! তাহলে বরবটি তার সবুজ রং হারিয়ে ফেলে পোড়ামুখো হয়ে যাবে। প্রয়োজন হলে আর একটু তেল যোগ করতে পারেন। বরবটি নরম হয়ে এলে নামিয়ে ঠান্ডা হতে দিন। ঠান্ডা হলে ভাজা শুকনো লঙ্কা, রসুন, পেঁয়াজ, কাঁচালংকা, চিংড়ি, বরবটি, আন্দাজমতো নুন… সব একসঙ্গে শিলে পিষে নিন। এবার দু’তিন ফোঁটা সর্ষের তেল দিয়ে ওই শিলেই বরবটি মেখে তুলে রাখুন পাত্রে। ভর্তাটা গোল করে একটা পাত্রে তুলে নেওয়ার পর হাঁড়ি থেকে কটা ভাত নিন। শিলের ওপরে এদিক সেদিক লেগে থাকা বরবটিগুলো ভাতের সঙ্গে মাখিয়ে একটা মণ্ড বানিয়ে নিলেই শিল পরিষ্কার হয়ে যাবে। এরপর শিল-নোড়া ভালো করে ধুয়ে মুছে তুলে রাখুন। মিক্সিতে পিষলেও হবে।

মিষ্টি কুমড়ার খোসা ভর্তা

উপকরণ: একবাটি মিষ্টি কুমড়ার খোসা আঙুলের মত সাইজ করে কেটে নেওয়া। ৩ কোয়া রসুন, ২টো কাঁচা লংকা, একটা মাঝারি মাপের পেঁয়াজ একটু মোটা করে ঝিরিঝিরি কেটে নেওয়া। ৪ চা চামচ সরষের তেল।প্রণালী: কড়াইতে ৩ চা চামচ পরিমাণ তেল গরম করে রসুন, পেঁয়াজ, কাঁচা লংকাগুলো নেড়েচেড়ে কাঁচা ভাবটা কাটিয়ে নামিয়ে নিয়ে কুমড়োর খোসাগুলো ও তেলে ভালো করে নেড়ে নিন। আঁচ কমিয়ে কুমড়োর খোসাগুলো বেশ নরম করে নিতে হবে।
এবার রসুন, পেঁয়াজ, কাঁচা লংকা, কুমড়োর খোসা পরিমাণমত নুন দিয়ে শিলে বা মিক্সিতে পিষে নিয়ে ১ চা চামচ সর্ষের তেল দিয়ে মাখিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

যারা ঝাল ভালোবাসেন অথবা ঝাল খান না কিন্তু ঝাল ঝাল গন্ধটা প্রেফার করেন তাদের জন্য একটা মনের মত রেসিপি রইল।

কাঁচালংকা ভর্তা

উপকরণ: কয়েকটা পেটমোটা কাঁচালংকা ভালো করে ধুয়ে নিন। তারপর ছুরি দিয়ে একটু চিরে বীজগুলো বের করে ফেলে দিন। বীজ ফেলে দেওয়া এই কাঁচা লংকা ৪-৫ পিস, চার কোয়া রসুন, একটা মাঝারি সাইজের পেঁয়াজ কুচো করে কাটা, দু চামচ সর্ষের তেল আর এক টুকরো কাগজিলেবু।প্রণালী: এক চা-চামচ সর্ষের তেল গরম করে কাঁচালংকাগুলোকে অল্প আঁচে উল্টেপাল্টে নরম করে নিন। হয়ে গেলে তুলে রাখুন। বেশ কটা রসুনের কোয়াও ওই তেলে নেড়ে নিন। কাঁচালংকা আর রসুনের রসায়নটা কিন্তু জম্পেশ। খেলেই বুঝবেন। রসুনটা নরম হয়ে এলে কুচোনো পেঁয়াজগুলো ওই তেলে দিয়ে দিন। পেঁয়াজ রং ধরার আগেই অর্থাৎ সাদা থাকতে থাকতেই নামিয়ে নিন। এবারে ওগুলো ঠান্ডা হলে কাঁচালংকা, রসুন, পেঁয়াজ একসঙ্গে নুন দিয়ে ভালো করে হাত দিয়ে মেখে নিন। ওই মাখাতে অল্প পরিমাণে কাগজিলেবুর রস চিপে দিন। মাখার পর হাত ভালো করে ধুতে ভুলবেন না। নইলে সন্ধেবেলা ভুল করে চোখে হাত দিয়ে ফেললে চোখের জলে কাজল ধুয়ে যাবে। সেটা আদৌ ঠিক হবে না।

লেখিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা, ভালোবাসেন রকমারি রান্না আর রন্ধনবিষয়ক আড্ডা।

বাংলার হেঁশেল- কলকাতার ফুটপাতে পাত পেড়ে একদিন

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More