বৈচিত্রময় জীবনকথায় স্বামী অভেদানন্দ (শেষ পর্ব)

নিউইয়র্ক বেদান্ত সোসাইটির অধ্যক্ষ পদে ইস্তফা দিয়ে ঠাকুরের টানে দেশে ফিরেছিলেন। কলকাতায় শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। তিব্বত ও কাশ্মীর থেকে উদ্ধার করেছিলেন যিশুখ্রিষ্টের অসমাপ্ত জীবন কাহিনি। নিবেদিতা মারা গেলে দার্জিলিঙে তাঁর সমাধি মন্দির নির্মাণ করে দেন তিনি। মৃত্যুর আগে একদিন সুভাষকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, "বিজয়ী ভব"।

অনিরুদ্ধ সরকার

লন্ডন থেকে অভেদানন্দ যাবেন আমেরিকা। ইংল্যান্ড থেকে যে জাহাজ ছাড়বে তার নাম এস এস লুসিটেনিয়া। টিকিট কিনতে যাওয়ার সময় কেউ একজন তাঁকে টিকিট কিনতে বারণ করলেন। অভেদানন্দেরও কী খেয়াল হল তিনিও টিকিট কাটলেন না।
পরদিন সকালে সংবাদপত্র খুলেই চমকে গেলেন অভেদানন্দ। আগেরদিন রাতে আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে গেছে এস এস লুসিটেনিয়া।
অভেদানন্দের চোখে জল। মনে মনে উপলব্ধি করলেন ঠাকুরই তাঁকে রক্ষা করেছেন। বরাহনগর মঠে সারাদিন বই পড়তেন অভেদানন্দ। আর তা নিয়েই রামকৃষ্ণের অন্য শিষ্যদের মধ্যে কথা শুরু হল অভেদানন্দকে নিয়ে। কথা উঠল, কালী মঠের কোনও কাজই করেনা। সারাদিন বই পড়ে।
কথা গিয়ে পৌঁছল স্বামীজির কানে। স্বামীজি বিরক্ত হয়ে বললেন – “তোদের কত হাণ্ডা আছে নিয়ে আয়! আমি মেজে দিচ্ছি! তোদের একটা ভাই যদি সারাদিন পড়াশুনা নিয়ে থাকে তাতে তোদের এত গাত্রদাহের কী আছে?”

গ্রন্থকীট অভেদানন্দ
এক লেখায় অভেদানন্দ লিখছেন, “আমি আর শরৎ স্বামীজীর পেছন পেছন ঘুরতাম তাই স্বামীজী আমাদের নাম দিয়েছিলেন ‘কালুয়া’, ‘ভেলুয়া’।
অভেদানন্দ লিখছেন, “আর একবার কী হয়েছে, ভারতের চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন রামকৃষ্ণের শিষ্যরা। আমরাও ঘুরছি। হঠাৎ একদিন স্বামীজীকে দেখার ভারী ইচ্ছা হল। কিন্তু তাঁর ঠিকানা জানা নেই। স্বামীজি তখন গুজরাটে। রাস্তায় যেতে যেতে পোরবন্দরের বিখ্যাত পণ্ডিত শঙ্কর পাণ্ডুরঙ্গের সঙ্গে দেখা। তাঁকে স্বামীজির কথা জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন– ‘এই সেদিন স্বামী সচ্চিদানন্দ নামে ইংরাজী জানা এক সন্ন্যাসী এসেছিলেন।খুব পণ্ডিত লোক।’ তাঁর কাছ থেকে জানলাম সচ্চিদানন্দ জুনাগড়ের দিকে গেছেন। আমি মনে মনে বুঝলাম এই সচ্চিদানন্দই আমাদের স্বামীজী। জুনাগড়ে গিয়ে সূর্যরাম ত্রিপাঠির বাড়ি গিয়ে দেখলাম স্বামীজী বসে আছেন। আমায় অপ্রত্যাশিতভাবে দেখে তিনি আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন। তিনি আমাকে দেখিয়ে ত্রিপাঠী মহাশয়কে বললেন– ‘ইনি আমার গুরুভাই, একজন অদ্বিতীয় বেদান্তী। আপনি এঁর সঙ্গে বেদান্তের বিচার করুন।’ কিছুদিন পর আমি আর স্বামীজী দু’জনেই আবার যাত্রা শুরু করলাম। আবার একইভাবে মহাবালেশ্বরে নরোত্তম মুরারজী দেশাইয়ের বাড়িতে উঠে দেখি স্বামীজী বসে আছেন। খুব তো একচোট হাসাহাসি হল। স্বামীজী আমাকে বললেন –’বেশ বাবা, তুমি আমার পিছু নিয়েছ দেখছি।’ ”

গুরুভাইয়েদের সঙ্গে বিবেকানন্দ- স্বামী অভেদানন্দ, বাম দিক থেকে তৃতীয়

স্বামীজী সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে অভেদানন্দজীর চোখে জল আসত সে কথা অনেক প্রত্যক্ষদর্শীরাই তাঁদের লেখায় উল্লেখ করেছেন।
স্বামীজির বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে এক লেখায় অভেদানন্দ লিখছেন, “স্বামীজি আমায় বারবার বলতেন, উত্তর কলকাতা হল ঠাকুরের লীলাস্থল। তাই কলকাতায় ঠাকুরের নামে একটা আশ্রম স্থাপিত কর। কলকাতা থেকে বেলুড় অনেকদূর, কলকাতার মানুষজনের ভিতর ঠাকুরের ভাব প্রচার করতে গেলে একটা আশ্রম বা বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করা দরকার। স্বামীজী বিদেশেও একথা বহুবার আমাকে বলেছিলেন। বলেছিলেন, আমার বড় ইচ্ছা কলকাতায় ঠাকুরের একটা প্রচারকেন্দ্র স্থাপিত হোক। আমাদের সকল গুরুভাইদের লীলাস্থলও কলকাতায়। আমি যদি না পারি তবে তোমরা এ কাজ কোরো।”
অভেদানন্দর অপ্রকাশিত ডায়েরির
একটি অংশ থেকে জানা যায় ‘বেদান্ত সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে বিবেকানন্দর সঙ্গে অভেদানন্দের এক দীর্ঘ কথোপকথন হয়।

যেখানে স্বামী বিবেকানন্দ বলছেন– “I, though a humble servant of my Lord, take this opportunity to bless you for having been able to fulfill one of my mission to start a hall for spiritual educational purpose in the very heart of the city which was once the center of Lila of our Master.”
নিউইয়র্ক বেদান্ত সোসাইটির অধ্যক্ষ পদে ইস্তফা দিয়ে ঠাকুরের টানে দেশে ফিরে এসেছিলেন অভেদানন্দ।

নিউইয়র্কের বিখ্যাত বেদান্ত সোসাইটি

স্বামী অভেদানন্দকে স্বামীজি তাঁর মৃত্যুর বছর পাঁচ-ছয়েক আগে এক বার্তা দিয়েছিলেন।

হঠাৎ করেই একদিন স্বামীজি তাঁকে বললেন, “আমি আর বছর পাঁচ ছয়েক বাঁচব, বুঝলে।” অভেদানন্দ স্বামীজির এধরনের কথায় বেশ বিরক্ত হলেন। অভেদানন্দ বিরক্ত হয়েছেন দেখে স্বামীজি বললেন, “তুমি বুঝবে না হে, তুমি বুঝবে না। আমার আত্মা দিন দিন বড় হয়ে যাচ্ছে। এত বড় হয়ে যাচ্ছে যে তা আর আমার এই শরীরের মধ্যে ধরে রাখা যাচ্ছে না। খালি ছেড়ে পালাতে চাইছে।”
৪ জুলাই ১৯০২, চলে গেলেন স্বামীজি। একদিন কলকাতা বেদান্ত মঠে স্বামী অভেদানন্দকে দর্শন করতে গেলেন বেলুড় মঠের যুবা সন্ন্যাসী আত্মস্থানন্দ।আত্মস্থানন্দ লিখছেন, “অভেদানন্দ তাঁর ঘরের মেঝেতে তিন-চার জনের সঙ্গে বসেছিলেন। মহারাজ বসেছিলেন চেয়ারে। আমি যখন ঘরে ঢুকে অন্যদের সঙ্গে বসলাম, মহারাজ আলমারিতে রাখা একটি কৌটো দেখিয়ে বললেন, ‘দেখ, ওই কৌটোটা সােনাতে ভর্তি। নতুন মন্দির তৈরি হচ্ছে এবং খুব শীঘ্রই তার উদ্বোধন হবে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে আমি সােনার সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিলাম এবং সেজন্য ভক্তদের কাছ থেকে সােনা সংগ্রহ করেছিলাম। সংগ্রহের কাজ শেষ। এবার সােনাভর্তি কৌটো নিয়ে সিংহাসন তৈরি করাতে দেব স্যাকরার কাছে।’
একদিন দোকানের উদ্দেশে যাত্রা করলেন তিনি। যে-মুহূর্তে তিনি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে শুরু করলেন, কেউ একজন চিৎকার করে বলে উঠল, ‘তুমি কী করছ? তুমি জান না, আমি ধাতু স্পর্শ করতে পারি না?’ অভেদানন্দজী অবাক হয়ে নীচে নামতে লাগলেন। ভাবলেন, মনের ভুল। তিনি তিন ধাপ নীচে নামলেন। তাঁর মনে হল কেউ খুব ঝাঁকুনি দিল তাঁকে এবং ভৎসনা করে বলল, ‘বােকা, আমি বারবার বললাম যে, আমি ধাতু স্পর্শ করতে পারি না, আর তুমি কিনা আমাকে সােনার সিংহাসনে বসাতে চাও! ফিরে যাও। এবার তিনি বুঝলেন, শ্রীরামকৃষ্ণদেব স্বয়ং তাঁকে তাঁর কাজের জন্য ভৎসনা করছেন। তখন তিনি মহীশূরে চিঠি লিখলেন একটি চন্দন কাঠের তৈরি সিংহাসন পাঠাতে।”
স্বামী অভেদানন্দ একবার কাশ্মীর হয়ে তিব্বত যাত্রা করেন। লাদাখের বৌদ্ধ মন্দির হেমিসগুম্ফা পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে যিশুখ্রীষ্টের অজ্ঞাত জীবনীর কিছু অংশ উদ্ধার করে তাঁর ‘কাশ্মীর ও তিব্বতে’ গ্রন্থে প্রকাশ করেন। ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতায় ফিরে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।নিবেদিতা মারা গেলে ১৯২৫ সালে স্বামী অভেদানন্দ দার্জিলিঙে তাঁর সমাধিক্ষেত্রে স্মৃতি মন্দিরটি তৈরি করে দেন। অভেদানন্দের কথায়, ৭ বার দার্জিলিঙে গেছিলেন নিবেদিতা। আর সব মিলিয়ে ছিলেন ২৭২ দিন। শেষ বার যখন যান তখন সান্দাকফুতে যাওয়ারও কথা ছিল তাঁর। অসুস্থতার জন্য তা বাতিল হয়।
দেড় বছর ধরে অভেদানন্দ খুব অসুস্থ। একদিন হঠাৎ করে এক শিষ্যকে ডেকে বললেন, “আমার সুভাষকে বড় দেখতে ইচ্ছে করছে। ওর কাছে খবর পাঠানোর ব্যবস্থা কর।”
– “সুভাষ, মানে সুভাষচন্দ্র বসু! বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র বসুর কথা বলছেন !”
– “তুই কজন সুভাষকে চিনিস?”
-“দেরি করিস না। সুভাষের কাছে খবর পাঠা।”
খবর পেয়েই ছুটে এলেন সুভাষ। অভেদানন্দ তখন পুরোপুরি শয্যাশায়ী। ঠিকমতো উঠে বসতেও পারেন না। সুভাষকে দেখে উঠে বসলেন। সুভাষকে দেখে অভেদানন্দের আনন্দ আর ধরে না। সুভাষকে বললেন, “সুভাষ তোমায় একবার আলিঙ্গন করি।” সুভাষকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “বিজয়ী ভব।”
– সুভাষের চোখে জল।
১৯৩৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। চলে গেলেন জ্ঞানদীপ্ত সন্ন্যাসী অভেদানন্দ। কলকাতার শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠে নেমে এল শোকের ছায়া। অভেদানন্দের ইচ্ছানুসারে কাশীপুর শ্মশানে শ্রীরামকৃষ্ণের সমাধিস্থলের সামনে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
তথ্যঋণ: 
১ | মন ও মানুষ –  স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ
২ |জন্মসার্ধশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলী, উদ্বোধন কার্যালয়
৩ |শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণকথামৃত- শ্রীম কথিত
৪ | উদ্বোধন পত্রিকা , মাঘ ১৩৯৬
৫ |মরণের পারে- স্বামী অভেদানন্দ
৬ |আমার জীবন কথা – স্বামী অভেদানন্দ
৭| Life Beyond Death: A Critical Study of Spiritualism, by Swami Abhedananda.
৮| Ramakrishna Kathamrita and Ramakrishna: Memoirs of Ramakrishna, by Swami Abhedananda.
৯| আমার জীবন-কথা (Autobiography) by Swami Abhedananda.
১০| Journey into Kashmir and Tibet, by Swami Abhedananda.
১১| How to be a Yogi, by Swami Abhedananda. Forgotten Books, 1902.
১২| True Psychology, by Swami Abhedananda, Pub. by Ramakrishna Vedanta Math, 1965.
১৩| Yoga Psychology, by Swami Abhedananda, Prajnanananda. Pub. by Ramakrishna Vedanta Math, 1967.
১৪| Complete Works of Swami Abhedananda, by Abhedananda. Pub. by Ramakrishna Vedanta Math, 1970.
১৫| Swami Abhedananda: A Spiritual Biography, by Moni Bagchee. Published by Ramakrishna Vedanta Math, 1968.
১৬| রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ
১৭|  ARCIS, Abedananda Research Centre For Indian Sciences
Picture courtesy : Vedanta Society Newyork and California
লেখক অনিরুদ্ধ সরকার বাংলা ভাষা-সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। সাংবাদিকতা ও সিনেমা নিয়ে পড়াশোনা। লেখকের  একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে দুখানি ভ্রমণকাহিনিও রয়েছে।

 

 

 

বৈচিত্র্যময় জীবনকথায় স্বামী অভেদানন্দ (দ্বিতীয় পর্ব)

 

বৈচিত্রময় জীবনকথায় স্বামী অভেদানন্দ (তৃতীয় পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More