বৈচিত্র্যময় জীবনকথায় স্বামী অভেদানন্দ (প্রথম পর্ব)

দক্ষিণেশ্বর যাওয়ার অপরাধে বাবা তালাবন্দি করে রাখতেন ছেলেকে। স্কুলের টিফিনের পয়সা জমিয়ে সে কিনেছিল পাতঞ্জল দর্শন। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, "তোর ব্রহ্মজ্ঞান হবে।"

অনিরুদ্ধ সরকার

সকাল থেকে বাড়ির সদর দরজা তালাবন্ধ করে রেখেছেন বাবা। ছেলের ঘরেও ঝোলানো আছে মস্ত তালা। বাবা ছেলেকে তালাবন্দি করে রেখেছেন, পাছে ছাড়া পেয়েই দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি চলে যায়। দিনের শেষে বাবা রসিকলাল ভাবলেন, দিন গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। ছেলেকে আর সারাদিন ঘরে বন্ধ রাখা উচিত নয়। উচিত শিক্ষা দিয়েছেন ছেলেকে। এবার তালা খোলা যাক। তালা খুললেন রসিকলাল। ও মা! তালা খুলতেই ঘরবন্দি ছেলে পাগলের মত ছুট লাগালো দক্ষিণেশ্বরের দিকে। রসিকলাল তো দেখে থ।
এদিকে ছেলে হাঁফাতে হাঁফাতে গিয়ে হাজির শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে। ঠাকুর মৃদু হেসে বললেন- “ঈশ্বরের জন্য এরকম ব্যাকুলতাই তো চাই।”
এই ছেলে আর কেউ নন কালীপ্রসাদ, পরে যাঁর নাম হয় স্বামী অভেদানন্দ। যাঁর লেখা ‘মরণের পারে’ পড়ে আজও বহু যোগী মহাত্মা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন স্বামী অভেদানন্দকে।
ছেলে কালীপ্রসাদের দক্ষিণেশ্বর যাওয়া একেবারে পছন্দ করতেন না রসিকলাল। একদিন হন্তদন্ত হয়ে হাজির হলেন দক্ষিণেশ্বরে। শ্রীরামকৃষ্ণকে গিয়ে বললেন “আমি কালীপ্রসাদের বাবা। আমার ছেলে যাতে মন দিয়ে লেখাপড়া করে, ঘর সংসার করে, আপনি দয়া করে ওকে একটু সেই উপদেশ দিন।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঠাকুর বললেন, “আপনার ছেলের মধ্যে যোগীর লক্ষণ রয়েছে। ও যোগ-সাধনার জন্য অধীর হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় ওর বিয়ে দিলে তার ফল কি ভাল হবে?”
রসিকলাল ঠাকুরের মুখে একথা শুনে চুপ করে গেলেন।
এদিকে বিয়ে নিয়ে বাড়ির সঙ্গে কালীপ্রসাদের বিরোধ তখন তুঙ্গে। একদিন ঠাকুর তাকে ডেকে বললেন, “তোর কি বিয়ে করার ইচ্ছে আছে?”
কালীপ্রসাদ বলল, “না।”
– “তুই বিয়ে করিস না। তোকে ধ্যান শিখিয়ে দিচ্ছি। রোজ রাতে বিছানায় বসে ধ্যান করবি, তারপর আমায় এসে পরদিন বলিস কী দেখলি।”
– “আপনার কাছে না এলে আমার মন কেমন করে ঠাকুর। কিন্তু ভাড়ার জোগাড় না হলে রোজ আসব কী করে বলুন!”
ঠাকুর শুনে বললেন- “ও এই তোর ভাবনা। তুই যাহোক করে এখানে চলে আসিস। এখান থেকে ফেরার ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে। ও নিয়ে ভাবিস না। এখান থেকে অনেকেই কলকাতা ফেরে। তাদের কারও সঙ্গে তোকে পাঠিয়ে দেব।”
এদিকে বেশ কয়েকদিন কালী দক্ষিণেশ্বর আসেনি। কিছুদিন পরে কালী আসতেই ঠাকুর জানতে চাইলেন কালীর না আসার কারণ।
কালী বলল, “বাবা মা আটকে রাখেন। আসতে নিষেধ করেন। কী করে আসব!”

ঠাকুর বললেন, “কাউকে না জানিয়ে আসবি। আর হাতে পয়সা না থাকলে ওই দেখ ওখান থেকে নিয়ে নিবি।”

ভক্তদের মাঝে ভাবাবিষ্ট পরমহংসদেব
স্কুলের টিফিনের পয়সা জমিয়ে কালীপ্রসাদ কিনেছিল পাতঞ্জল দর্শন। কিন্তু পড়ানোর লোকের অভাব। শেষে সে গিয়ে ধরল প্রসিদ্ধ বক্তা শশধর তর্কচূড়ামণিকে। কালীপ্রসাদ শশধর তর্কচূড়ামণির বক্তৃতা শুনেছে অ্যালবার্ট হলে। কালীপ্রসাদ তাই সোজা গিয়ে ধরল শশধর তর্কচূড়ামণিকে। এদিকে পণ্ডিতমশাই কালীপ্রসাদকে ছোটো ছেলে ভেবে বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। প্রথমে সময় নেই বললেন, তারপর হালকা চালে বুঝিয়ে দেবেন বলে জানালেন। জেদ চাপল কালীপ্রসাদের।
একজন সিদ্ধ যোগীগুরুর অন্বেষণ করতে শুরু করল কালীপ্রসাদ। সহপাঠী যজ্ঞেশ্বর ভট্টাচার্যের কাছে শুনল দক্ষিণেশ্বরে এক সিদ্ধ পুরুষ থাকেন। নাম শ্রীরামকৃষ্ণ। কলকাতার দিকপাল লোকেরা তাঁর কাছে যান।
একথা শুনে পায়ে হেঁটে একদিন কালীপ্রসাদ পৌঁছে গেল দক্ষিণেশ্বর। ঠাকুর সেদিন বাইরে গেছিলেন। ঠাকুরের এক ভক্ত কালীপ্রসাদকে বললেন, “পরমহংসদেব রাতে ফিরবেন। মায়ের প্রসাদ খেয়ে এখানে অপেক্ষা কর।”
গভীর রাতে ঠাকুর ফিরলেন। কালীপ্রসাদকে এটা সেটা নানান প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বললেন, “পূর্বজন্মে তুমি যোগী ছিলে। একটু বাকি ছিল যা এজন্মে হবে। এই তোমার শেষ জন্ম।” বলে তার জিভে কিছু একটা লিখে দিলেন।
দক্ষিণেশ্বরে একদিন ঠাকুর জোর করে কালীর মাথায় নখ দিয়ে চিমটি কেটে দিলেন। আর বললেন, “তোর ব্রহ্মজ্ঞান হবে। এই স্থানে মন স্থির করবি। তোতাপুরিও আমার কপালে একখণ্ড কাচ বিদ্ধ করে বলেছিলেন ওই বিন্দুতে মনস্থির করবি।”
ঠাকুরের কথামতো কালীপ্রসাদ পঞ্চবটীর নীচে ধ্যান করতে শুরু করেন।
ক্রমশ…

 

তথ্যঋণ: 

১ | মন ও মানুষ –  স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ
২ |জন্মসার্ধশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলী, উদ্বোধন কার্যালয়
৩ |শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণকথামৃত- শ্রীম কথিত
৪ | উদ্বোধন পত্রিকা , মাঘ ১৩৯৬
৫ |মরণের পারে- স্বামী অভেদানন্দ
৬ |আমার জীবন কথা – স্বামী অভেদানন্দ
৭| Life Beyond Death: A Critical Study of Spiritualism, by Swami Abhedananda.
৮| Ramakrishna Kathamrita and Ramakrishna: Memoirs of Ramakrishna, by Swami Abhedananda.
৯| আমার জীবন-কথা (Autobiography) by Swami Abhedananda.
১০| Journey into Kashmir and Tibet, by Swami Abhedananda.
১১| How to be a Yogi, by Swami Abhedananda. Forgotten Books, 1902.
১২| True Psychology, by Swami Abhedananda, Pub. by Ramakrishna Vedanta Math, 1965.
১৩| Yoga Psychology, by Swami Abhedananda, Prajnanananda. Pub. by Ramakrishna Vedanta Math, 1967.
১৪| Complete Works of Swami Abhedananda, by Abhedananda. Pub. by Ramakrishna Vedanta Math, 1970.
১৫| Swami Abhedananda: A Spiritual Biography, by Moni Bagchee. Published by Ramakrishna Vedanta Math, 1968.
১৬| রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ
১৭|  ARCIS, Abedananda Research Centre For Indian Sciences
Picture courtesy : Vedanta Society Newyork and California
লেখক অনিরুদ্ধ সরকার বাংলা ভাষা-সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। সাংবাদিকতা ও সিনেমা নিয়ে পড়াশোনা। লেখকের  একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে দুখানি ভ্রমণকাহিনিও রয়েছে।

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More