বৈচিত্র্যময় জীবনকথায় স্বামী অভেদানন্দ (দ্বিতীয় পর্ব)

স্বামী অভেদানন্দের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মত। স্বামীজির ডাক পেয়ে তিনি লন্ডন যান এবং সেখানে নিয়মিত রাজযোগ, জ্ঞানযোগ ও বেদান্ত সম্বন্ধে বক্তৃতা দিতে থাকেন।

অনিরুদ্ধ সরকার

ঠাকুর এসেছেন ভক্ত রামরতন দত্তের বাড়িতে। নরেনকে দেখতে না পেয়ে ঠাকুর খবর নিলেন ও জানতে পারলেন নরেন অসুস্থ। ব্যাকুল ঠাকুর নরেনের খোঁজ নিতে পাঠালেন কালীপ্রসাদ সহ আরও অনেককে। নরেন তার অসুস্থতার কথা জানাল সবাইকে। শেষে কালীপ্রসাদের জোরাজুরিতে নরেন গেল ঠাকুরের কাছে। ঠাকুর নরেনের মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- “কী হয়েছে রে তোর মাথায়?”
নরেন বলল, “মাথায় একটা অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে।”
শুনে ঠাকুর নরেনের মাথায় হাত রাখলেন।
নরেন চমকে উঠে বলল- “মশাই আপনি কী করলেন মাথার যন্ত্রণা একেবারে উধাও হয়ে গেল!”
ঠাকুর একগাল হেসে বললেন, “অনেক হয়েছে, এবার গান গেয়ে শোনা দেখি।”
নরেন তানপুরা বাজিয়ে গান ধরল। তাল দিতে লাগল কালীপ্রসাদ।
১৮৬৬ সালের ২ অক্টোবর কোলকাতায় জন্ম কালীপ্রসাদের।

বাবা রসিকলাল চন্দ্র ও মা নয়নতারা। কালীপ্রসাদ প্রথমে সংস্কৃত বিদ্যালয়ে পড়েন ও পরে ওরিয়েন্টাল সেমিনারি থেকে এনট্রান্স পাশ করেন।

ছেলেবেলা থেকেই ধর্মে তাঁর বিশেষ আগ্রহ। হিন্দুশাস্ত্রাদি পাঠের সঙ্গে সঙ্গে রেভারেণ্ড ম্যাকডোরেণ্ড, রেভারেণ্ড কালীচরণ বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ প্রচারিত নব্য খ্রিষ্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। কেশবচন্দ্র সেন, প্রতাপচন্দ্র মজুমদার প্রমুখের বক্তৃতা শুনতে প্রায়শই যেতেন অ্যালবার্ট হলে। পণ্ডিত শশধর তর্কচূড়ামণির ষড়দর্শনের আলোচনা তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। শশধর তর্কচূড়ামণি তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব না দেওয়ায় পণ্ডিত কালীবর বেদান্তবাগীশের কাছে পতঞ্জলির যোগসুত্র অধ্যয়ন করেন তিনি।
তারপর হঠযোগ ও রাজযোগ সাধনা করতে শুরু করেন। নির্বিকল্প সমাধিতে আত্মসমাহিত হওয়ার জন্য একজন সিদ্ধ যোগীগুরুর অন্বেষণ করতে শুরু করেন, আর পৌঁছে যান শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে।
গুরুর মৃত্যুর পর কালীপ্রসাদ বরাহনগর মঠের একটি ঘরে নিজেকে আবদ্ধ করে ধ্যানে ডুবে থাকতে শুরু করেছিলেন। এই জন্য তাঁর গুরুভ্রাতারা তাঁকে ‘কালী তপস্বী’ নাম দিয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের তিরোধানের পর স্বামী অভেদানন্দ কমণ্ডুল, ভিক্ষাপাত্র ও সামান্য বহির্বাস সম্বল করে খালি পায়ে হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত ভারতের প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান ও নগরাদি পরিভ্রমণ করেন। ভারত ভ্রমণকালে পাওহারী বাবা থেকে ত্রৈলঙ্গস্বামী- বহু বিশিষ্ট সন্ন্যাসীদের সংস্পর্শে এসেছিলেন অভেদানন্দ। গঙ্গোত্রী ও যমুনেত্রী ভ্রমণ করে তিনি হিমালয়ে কিছুকাল সাধনাও করেন।
গুরুভ্রাতাদের সঙ্গে ধ্যানমগ্ন স্বামী অভেদানন্দ
স্বামী বিবেকানন্দ তখন লন্ডনে। স্বামী অভেদানন্দকে ডেকে পাঠালেন তিনি। স্বামীজির ডাক পেয়ে তিনি লন্ডন যান এবং সেখানে নিয়মিত রাজযোগ, জ্ঞানযোগ ও বেদান্ত সম্বন্ধে বক্তৃতা দিতে থাকেন। সে সময়ে ম্যাক্সমুলার, ডয়সনের মত একঝাঁক দিকপাল দার্শনিকের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয় তাঁর। পরে বিবেকানন্দের নির্দেশে নিউইয়র্কে বেদান্ত আশ্রমের ভার গ্রহণ করেন। সেখানে গীতা, উপনিষদ, সাংখ্য, পাতঞ্জল প্রভৃতি বিষয়ে বক্তৃতা দেন। আমেরিকার বিখ্যাত দার্শনিক উইলিয়াম জেমসের সঙ্গে তাঁর ‘বহুত্বের মধ্যে একত্ব’ বিষয়ে আলোচনা হয়।এর মধ্যেই স্বামী অভেদানন্দ একবার ভারতে ফেরেন ও কিছুদিনের মধ্যেই আবার আমেরিকায় ফিরে যান। কানাডা, আলাস্কা, মেক্সিকো, জাপান, হংকং, ক্যান্টন, ম্যানিলা সহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ভারতের ধর্ম ও দর্শন নিয়ে বক্তৃতা দেন।
স্বামী অভেদানন্দের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মত। তা একবার কী হয়েছে, বিবেকানন্দ তখন গাজিপুরে। হঠাৎ খবর পেলেন অভেদানন্দ অসুস্থ। অভেদানন্দ তখন বারাণসীতে। অভেদানন্দের অসুস্থতার খবর শুনে স্বামীজি গাজিপুর থেকে বারাণসী ছুটলেন। সেবা করে সুস্থ করলেন অভেদানন্দকে। অভেদানন্দ তাঁর স্মৃতিচারণ করে লিখছেন, “পরিব্রাজক অবস্থায় একবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। স্বামীজী জীবন দিয়ে আমার সেবা করেছিলেন। আহা! আমার ভ্রাতা! সেই স্মৃতি আজিও মনে জাগরূক আছে।”
মীরাটে থাকাকালীন স্বামীজি লাইব্রেরি থেকে প্রতিদিন বই আনাতেন। স্বামী অভেদানন্দ বইগুলি নিয়ে আসতেন। পরের দিনই পড়ে তা ফেরত দিয়ে দিতেন স্বামীজি। অভেদানন্দ যেতেন সেগুলি ফেরত দিতে। একদিন লাইব্রেরিয়ানের সন্দেহ হয়। তিনি অভেদানন্দকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ বই কে পড়ে?” 
অভেদানন্দ উত্তর দিলেন, আমাদের আরেক স্বামীজি।
-“একদিনে কীভাবে এত বই পড়া সম্ভব! আমি বই দেব না। আপনি উনাকে আসতে বলবেন।”
অভেদানন্দের কাছে সমস্ত বিষয়ে শুনে স্বামীজি লাইব্রেরি গেলেন। স্বামীজি যেতেই লাইব্রেরিয়ান সেই একই প্রশ্ন করলেন। স্বামীজি মৃদু হেসে বললেন, “আপনি আমার পড়া যে কোনও বই থেকে আমায় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারেন।” স্বামীজির কথামত একটি বই থেকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন লাইব্রেরিয়ান। স্বামীজি শুধু উত্তর দিলেন না, কোন পাতায় কী লেখা রয়েছে প্রায় সবই বলে দিলেন। যা দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে যান লাইব্রেরিয়ান।
স্বামীজি মৃদু হেসে বললেন, “সেরফ মেডিটেশন, আপনিও পারবেন।”

ক্রমশ…

তথ্যঋণ: 
১ | মন ও মানুষ –  স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ
২ |জন্মসার্ধশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলী, উদ্বোধন কার্যালয়
৩ |শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণকথামৃত- শ্রীম কথিত
৪ | উদ্বোধন পত্রিকা , মাঘ ১৩৯৬
৫ |মরণের পারে- স্বামী অভেদানন্দ
৬ |আমার জীবন কথা – স্বামী অভেদানন্দ
৭| Life Beyond Death: A Critical Study of Spiritualism, by Swami Abhedananda.
৮| Ramakrishna Kathamrita and Ramakrishna: Memoirs of Ramakrishna, by Swami Abhedananda.
৯| আমার জীবন-কথা (Autobiography) by Swami Abhedananda.
১০| Journey into Kashmir and Tibet, by Swami Abhedananda.
১১| How to be a Yogi, by Swami Abhedananda. Forgotten Books, 1902.
১২| True Psychology, by Swami Abhedananda, Pub. by Ramakrishna Vedanta Math, 1965.
১৩| Yoga Psychology, by Swami Abhedananda, Prajnanananda. Pub. by Ramakrishna Vedanta Math, 1967.
১৪| Complete Works of Swami Abhedananda, by Abhedananda. Pub. by Ramakrishna Vedanta Math, 1970.
১৫| Swami Abhedananda: A Spiritual Biography, by Moni Bagchee. Published by Ramakrishna Vedanta Math, 1968.
১৬| রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ
১৭|  ARCIS, Abedananda Research Centre For Indian Sciences
Picture courtesy : Vedanta Society Newyork and California
লেখক অনিরুদ্ধ সরকার বাংলা ভাষা-সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। সাংবাদিকতা ও সিনেমা নিয়ে পড়াশোনা। লেখকের  একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে দুখানি ভ্রমণকাহিনিও রয়েছে।

 

 

বৈচিত্র্যময় জীবনকথায় স্বামী অভেদানন্দ (প্রথম পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More