জলের অক্ষর পর্ব ১৬

কুলদা রায়

ঈশ্বর নিজের হাতে কিছু লিখলে লিখতেন ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসটি। নিজে হতেন সোনাবাবু, জ্যাঠামশাই, মুশকিল আসানের লম্ফ পীর অথবা ঈশম। পুরনো অর্জুন গাছে লিখে রেখে যেতেন, ‘আমরা ওপারে চলিয়া গেলাম’
হয়তো তখন
ঈশম নদীর পাড় ধরে হেঁটে চলেছে। নৌকার পাশে পাশে। ফতিমা ঘুম থেকে উঠলেই দেখতে পাবে, গাঁদা ফুলগুলো ফুটে আছে। বুড়ো কর্তাদের বাড়ির দরোজায় তালা। আর পাগল জ্যাঠা হাতির পিঠে চড়ে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ জানেই না। শুধু হাওয়ায় কান পাতলে কখনও বা শোনা গেলেও যেতে পারে, ‘গাৎচোরেৎশালা’। হয়তো বা সেটা হাওয়ার শব্দ। পাতার শব্দ। অথবা তরমুজের খেতে তারা ঝরার শব্দ। ঈশ্বর এইরকম করেই কথা বলেন। 

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় চলে গেলেন। চলে গেলেন বিভূতি বন্দ্যোপাধায়ের পথ ধরে। রেখে গেলেন সোনাকে, রাইনাদি গ্রামটিকে। তার লটকন ফলকে।
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে
কয়েকদিন কথা হয়েছিল ফোনে। তিনি কোলকাতায়। আমি নিউ ইয়র্কে। তাঁর বাড়িতে তখন রাজমিস্ত্রী কাজ করছিল। আর হাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তিনি এর মধ্যেই কথা বলছিলেন নীলকণ্ঠ পাখি নিয়ে। বলছিলেন শিশুর মতো নিরহংকারে। অকপটে। বলছিলেন ঈশ্বরের গলায়। 

 

আজ আবার পড়ছি কথাসাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘চতুষ্পাঠী’। উপন্যাসটির কলেবর খুব বেশি বড় নয়। ১৬০ পৃষ্ঠা। ১৯৯৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল কলিকাতা পুস্তকমেলায়। সেটা জানুয়ারি মাস। এটাই স্বপ্নময়ের প্রথম উপন্যাস।
‘চতুষ্পাঠী’ উপন্যাসটি
স্বপ্নময় চক্রবর্তী আমাকে দিয়েছিলেন কয়েক বছর আগে এক জুন মাসে। একুশ বছর আগেকার বইটি। কাগজগুলো একটু মলিন হয়েছে। কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করলেই বাঁধাই খুলে যায়।

উপন্যাসটি শুরু হয়েছে ব্রহ্মচারী শব্দটি দিয়ে। ছয়টি শব্দ দিয়ে চারটি লাইন। এটা আসলে ছড়া বা গ্রাম্য শোলোক–
‘ব্রহ্মচারী
দণ্ডধারী
দণ্ড দিয়ে
কুত্তা মারি। ‘
পৈতে হচ্ছে এক
ব্রাহ্মণ বালকের। কিন্তু উপন্যাসের শুরুর চারটি লাইন পৈতের মন্ত্র নয়। পৈতের মন্ত্র গম্ভীর–‘প্রজাপতি ঋষি পঙক্তিশছন্দো দণ্ডাগ্নি দেবতে উপনয়নে মানবক দণ্ডার্পণেবিনিয়োগ…। ‘
মানবক মানে
ছোটো ছোটো ছেলে। তারা কেন গুরুগম্ভীর মন্ত্র মানবে? মাথা মুণ্ডিত করে, লাঠি হাতে করে উপনয়নে উপনীত হলেও তারা মজার ছড়াতেই আগ্রহ বোধ করে। 

‘প্রথমে বাবলুদাই বলেছিল। তারপর বিজু, শিখা, অন্যান্য কাচ্চাবাচ্চাগুলো, এমন কি অসীমও। বিপ্লবের দিদি স্বপ্নাও মজা পেয়ে হাততালি দিল।’
পুরোহিত কামাখ্যাচরণ বললেন,
‘এই হইল তোমার ভিক্ষাদণ্ড’। কিন্তু মানবকরা বলছে–
‘কুত্তা করে ঘেউ ঘেউ
ব্রহ্মচারী ছুঁস না কেউ।’
কামাখ্যাচরণ বললেন,
‘নাও, এইবার ভিক্ষা। নারীদের নিকট ভিক্ষা গ্রহণকালে কইবা, ওঁ ভবতি ভিক্ষাং দেহি।
পৈতে নেওয়ার পরে
প্রথমে ভিক্ষা চাইতে হবে মায়ের কাছে। কী চাইতে হবে? সত্য। মায়ের কাছে সত্য ভিক্ষা চাইতে হবে। তিনিই জগতের প্রথম এবং শেষ সত্য দিতে পারেন। মায়ের কাছেই সত্য থাকে। মজা করতে করতে স্বপ্নময় এই গুরুগম্ভীর কথাটি বলে দিলেন।
মা কী দিলেন ছেলেকে?
দিলেন একটি আংটি।
আংটির উপরে লেখা ‘বিপ্লব’। বিপ্লব এই ছেলেটির নাম।

বিপ্লব নামটি রেখেছিলেন তাঁর বাবা। সাতচল্লিশের আগে পূর্ববঙ্গে ছিলেন তাঁরা। বাড়িতে চতুষ্পাঠী ছিল। সেখানে বিদ্যা বিক্রয় নয়- দান করা হত। বিদ্যা বিক্রয় করা মহাপাপ। বিপ্লবের ঠাকুরদা অনঙ্গমোহন, তস্য পিতা নীলকান্ত- এঁরা বিদ্যাদানেই জীবন কাটিয়েছেন। সহায়-সম্পত্তি সামান্য যা ছিল তাতে তাঁদের খেয়ে-পরে চলে যেত। আর কোনও চাহিদা ছিল না।
দেশভাগে
তাঁদের সেই সামান্য সম্পদও হারিয়ে গেছে। তাঁরা নি:স্ব হলেন। এ সময়ে তাঁদের দরকার ছিল বিপ্লবের। বিপ্লব তাঁদের সবাইকে স্বস্তির জীবন এনে দিতে পারবে। এই জন্য ছেলের নাম রেখেছেন– বিপ্লব। 

এই তরুণ বাবাটি অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন। মরার আগে পর্যন্ত তাঁর বুড়ো বাবা অনঙ্গমোহনের হাত ধরে বলেছিলেন, আমাকে বাঁচাও।
তিনি এখন দেয়ালে ঝুলছেন।
‘বিপ্লব’ শব্দটিও পালটে গেছে। হয়ে গেছে– বিলু।
বিলুর মা তাকে
দেওয়ালের ছবির কাছে নিয়ে এসেছেন। এখন সত্য ভিক্ষা চাইতে হবে মায়ের কাছে নয়, মানুষের কাছেও নয়– ছবির কাছে।
হায়, যে আখ্যানটি
শুরু হচ্ছে মজার শোলোক দিয়ে, সেই আখ্যানেই স্বপ্নময় আমাদের কখন যে বিষাদের গহ্বরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিচ্ছেন– বুঝতেই পারিনি।
বিভূতির ‘পথের পাঁচালি’র অপু,
অপু, অতীনের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’র সোনার মতো স্বপ্নময় আমাদের মাথায় চিরকালের জন্য গেঁথে দেন আরেকটি মানবকের নাম– বিলু।

‘চতুষ্পাঠী’ উপন্যাসটি বিলু, অনঙ্গমোহন বা বোবাঠাকুরের ব্যক্তিজীবনের কাহিনিমাত্র নয়– এটা দেশভাগ এবং দেশভাগ-উত্তর সর্বহারা, নি:স্ব মানুষের হাহাকারের মহা-আখ্যান।
এই মহা-আখ্যানে
একটি মহাভাষারও মৃত্যু লেখা আছে।
এর প্রতিটা শব্দ সত্য
। মর্মভেদী।

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)
(স্কেচটি করেছেন তাজুল ইমাম)
পরের পর্ব আগামী মাসের দ্বিতীয় রবিবার…

জলের অক্ষর পর্ব ১৫

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More