মেয়েদের কথা আজও মেয়েদের শরীরেরই কথা, বৈশাখীর আত্মবিশ্বাসটা দেখল না কেউ

শাশ্বতী সান্যাল

সম্প্রতি ইন্টারনেটে একটি ভিডিও মারাত্মকরকম ভাইরাল হয়েছে। ফেসবুক থেকে ইন্সটাগ্রাম সর্বত্র ভরে গেছে ভিডিও ক্লিপিংসে। কী দেখানো হচ্ছে সেই ক্লিপিংসগুলোয়? জনপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীতের তালে তালে নাচছেন দুজন পরিচিত রাজনৈতিক মুখ। আর সেই নাচকে ঘিরেই ধেয়ে এসেছে নেটিজেনদের হাজারো মন্তব্য, মজা, ব্যঙ্গ কটূক্তির চোখা চোখা বাণ। এখন প্রশ্ন হল, ব্যঙ্গবিদ্রূপ কি তাঁদের রাজনৈতিক কর্মদক্ষতা নিয়ে? না। মতাদর্শগত ফারাক নিয়ে? না। আর্থিক কেলেংকারির অভিযোগ, কারচুপি বা অন্য কোনও ইস্যু নিয়ে? একেবারেই না। মন্তব্যগুলোর মধ্যে দিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক সত্তাকে নয়, সরাসরি আক্রমণ করা হচ্ছে তাদের ব্যক্তিগত যাপনকে, তাঁদের সম্পর্ককে। আরেকটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কটূক্তির বেশিরভাগটাই ধেয়ে এসেছে এই জুটির নারী সঙ্গীটিকে লক্ষ্য করে। বা বলা ভালো, তাঁর শরীর ইঙ্গিত করে।
বেশ কিছুদিন আগেই দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে আমাদের দেশের আইন স্বীকৃতি দিয়েছে। এ দেশের আইনের চোখে এখন অ্যাডাল্টরি আর যাই হোক, ক্রাইম নয়। দেশের আইনব্যবস্থা সাবালক হলেও আমরা সাবালক হতে পেরেছি কি? পারিনি। আর তার জ্বলন্ত প্রমাণ তো এই ভিডিওই।দুজন মানুষ, যে প্রফেশনেই থাকুন না কেন, ব্যক্তিগত বোঝাপড়া নিয়ে তাঁরা যদি একসঙ্গে থাকতে চান, ‘বিবাহ’ নামক ইন্সটিটিউশনের বাইরে গিয়ে কেবলমাত্র নিজেদের শর্তে সম্পর্ক গড়ে তোলেন, আইন তাকে বৈধতা দিলেও আমরা দিতে পারছি না। তাঁদের দেখে চোখ টিপছি, রসালো মন্তব্য করছি, উঁকি মারতে চাইছি তাঁদের বেডরুমে। সব দিক দিয়েই মজার খোরাক করে তুলছি তাঁদের।
বিষয়টাকে নেহাত
 সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভুলে গেলে চলবে না, এই নেটিজেনেরা কিন্তু আমাদের বৃহত্তর সমাজেরই অংশ। রীতিমতো শিক্ষিত অংশ। ডিগ্রিধারী রুচিশীল গর্বিত বাঙালি, ব্যক্তিস্বাধীনতায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করা বাঙালি, অথচ তাঁদের ভাষা কী দীন! দৃষ্টিভঙ্গি কী ভীষণ চটুল, রসালো, যৌন ফ্রাস্ট্রেশনে ভরা!

রাজনৈতিকভাবে ওঁদের অপছন্দ করার অধিকার আমার-আপনার আছে বৈ কি। ব্যক্তিগতভাবেও আছে। ওঁদের জীবনযাপন, রুচি বা তার প্রকাশের ধরন আপনার অপছন্দ হতেই পারে। কিন্তু পছন্দ করিনা বলেই তাঁদের ব্যক্তিগত যাপনকে, আনন্দ, উচ্ছ্বাসকে নীতিজ্ঞানের নিক্তি দিয়ে মাপার অধিকার কি আদপেও আছে আমাদের? আমার মতো নয় বলেই কারো দিকে একদলা থুতু ছিটিয়ে দেব, আবার নিজেদের শিক্ষিত, রুচিশীল, আধুনিক মানুষ হিসাবে দাবি করব- এ এক হাস্যকর দ্বিচারণ! অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়ার এই নীতিপুলিশগিরি নতুন কিছু নয়। আগেও বহুক্ষেত্রে, বহু ঘটনায় ভার্চুয়াল খাপ বসতে দেখেছি আমরা। আগামীতেও দেখব। কিন্তু এক্ষেত্রে আরেকটা বৈশিষ্ট্য নজর কাড়ল। এইসব মন্তব্যর সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে বডিশেমিং, মহিলাটির শরীরকে ঘিরে নানা কটূক্তি৷ তাঁর দেহের গড়ন, ওজন, এক্সপ্রেশন- তুলোধোনা করা হয়েছে প্রায় সবকিছুকেই। আর যাঁরা করেছেন, আশ্চর্যের ব্যাপার তাঁদের সিংহভাগই মহিলা।কয়েক মুহূর্তের জন্য যদি আমরা তাদের রাজনৈতিক জীবন ভুলে যাই, তাদের ব্যক্তিগত যাপন থেকেও কিছুক্ষণের জন্য চোখ সরিয়ে নিই, তাহলে কিন্তু একটা জিনিস আপনিও মানবেন। দৈহিক ওজনের তোয়াক্কা না করে রীতিমতো আনন্দ আর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নেচেছেন ওই অধ্যাপিকা মহিলা। এই আত্মবিশ্বাস প্রশংসার দাবি রাখে। নাচের ব্যাকরণটাও যে তাঁর একেবারে অজানা নয়, হাত-পায়ের মুদ্রাই বলে দিচ্ছিল সে কথা। প্রশংসা নাহয় নাই করলাম। রুচিতে বাধলে আমরা তো এড়িয়েও যেতে পারতাম ভিডিওটা। তাঁদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সম্মান করতে পারতাম। কিন্তু সেটা আমরা করিনি। শুরু থেকে শেষ সবটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে, তারপর আক্রমণ করেছি।
বডি শেমিং শব্দটার সঙ্গে আমাদের আপাত পরিচয় ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু এখনও অনেকেই জানিনা বিষয়টার অন্তর্নিহিত গুরুত্ব কতখানি। আমাদের মাথায় সৌন্দর্যের এমন কিছু বাঁধাধরা-ছককষা সংজ্ঞা ঢুকে গেছে, যা থেকে বেরিয়ে আসা বেশ কষ্টসাধ্য। কোন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মা হতে গিয়ে মোটা হয়ে গেছেন! কার শরীর ভেঙে গেছে? কার গায়ের রং কালো, দেহের গড়ন, স্তনের আকার এসব নিয়ে আগ্রহের অন্ত নেই আমাদের। আর তাঁর ফল হচ্ছে মারাত্মক। শরীরের আকার, আয়তন বা ওজন নিয়ে প্রকাশ্য মন্তব্য, সমালোচনা বা টিটিকিরি মানুষকে কতটা হতাশাগ্রস্ত করে তুলতে পারে তার অজস্র জ্বলন্ত উদাহরণ রয়েছে চারপাশে। ২০১৬ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ওই এক বছরেই আমেরিকাতে প্রায় ৪২ লাখ মানুষ কসমেটিক সার্জারি করিয়েছেন। শরীরকে নিখুঁত করতে এদেশেও চাহিদা বাড়ছে ব্রেস্ট এনহ্যান্সমেন্ট সার্জারির মতো খরচসাপেক্ষ চিকিৎসার। অথচ সবাইকেই যে সৌন্দর্যের তথাকথিত ছাঁচে একই মাপকাঠিতে সুন্দর হতে হবে, তার তো কোনও মানে নেই। প্রতিটি মানুষই নিজের মতো করে সুন্দর। কিন্তু সেই বিষয়টিকে মেনে নেয়ার প্রবণতা আমাদের নেই। আর এখানেই প্রতিবেদনের মূল জিজ্ঞাসা। আজ এই একুশ শতকে দাঁড়িয়ে আমরা মেয়েরা ঠিক কোন অবস্থানে আছি তবে? নারীর মূল্যায়ন কি আজও শুধুই শরীরী? মেয়েদের কথা মানে কি শুধুই তাদের শরীরের কথা?

হ্যাঁ, মেয়েদের কথা মানে আজও মেয়েদের শরীরের কথা। তাদের নিয়ে আলোচনা মানেই তাদের শরীরের আলোচনা। এটাই নারী সম্পর্কে এ সমাজের mainstream mentality, লিখিত বা অলিখিত মনোভাব। গার্গী, মৈত্রেয়ী, খনাদের প্রজ্ঞা নিয়ে অত কথা হয়নি, যত কথা হয়েছে ঊর্বশী রম্ভাদের শরীরশৈলী নিয়ে, তাদের বুকের ভাঁজ আর ঊরুসন্ধির গভীরতা নিয়ে। কৈকেয়ী মন্থরাদের অতিসক্রিয় বিরোধী-রাজনীতি, কুন্তি তারা মন্দোদরীদের ব্যক্তিত্ব, দূরদৃষ্টি বা দুর্দশা- যৌনদোষে ঢাকা পড়ে গেছে সবই। শরীরের ঊর্ধ্বে নারীর যাবতীয় দোষগুণই যেন অনুল্লেখ্য, আলোচনার অযোগ্য। মহাভারতের আগুন নারী দ্রৌপদীর সংগঠনশক্তি, প্রজ্ঞা, অপমান, অভিমান নিয়ে কটা কথা হয়েছে বলুন তো! তার থেকে ঢের বেশি কথা হয়েছে তাঁর লাস্য নিয়ে, রূপ নিয়ে, পাঁচ পুরুষের সঙ্গে বিছানা ভাগ করা নিয়ে আর অতিঅবশ্যই প্রকাশ্য রাজসভায় বস্ত্রহরণ নিয়ে। এই প্রতিটি প্রসঙ্গেই ঘুরে ফিরে এসেছে তাঁর শরীরের কথা, তাঁর ব্যক্তিগত যাপনের কথা।
রামায়ণের রচনাকাল খ্রীস্টপূর্ব তৃতীয় শতক (মতভেদে চতুর্থ)। মহাভারতও নয় নয় করে খ্রিস্ট জন্মের হাজার বছর আগের। এই কয়েক হাজার বছরে সভ্যতা এগিয়ে গেছে। কিন্তু মানসিকতা? সত্যিই কি এগিয়েছি আমরা? উত্তরটা কঠিন নয়। এই ভিডিও আরেকবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল বাস্তবটা।

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More