টিকি-কাটা জমিদার কালীপ্রসন্ন, সর্বস্ব বিলিয়ে দেন ‘মহাভারত’ প্রচারে

অভিজিৎ বেরা

হিন্দু স্কুলের একটি ক্লাস। ধুতি পাঞ্জাবি পরা শিক্ষক ইতিহাসের ক্লাস নিচ্ছেন। শ্রেণিকক্ষ নিশ্চুপ। একটি ছেলে লুকিয়ে লুকিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছে। হঠাৎ তার মাথায় পড়ল একটি চাঁটি। না শিক্ষকের নয়, পাশে বসা তারই সহপাঠীর। অমনি শোরগোল পড়ে গেল ক্লাসে। কাঁদতে কাঁদতে ছেলেটি অভিযোগ জানাল। সহপাঠী নির্বিকার। যেখানে মারামারি আর তামাশা সেখানেই সে উপস্থিত। চতুরতা তার যেমন উপভোগ্য, তেমনই পরিহাসপ্রিয়। জবাবদিহি চেয়ে শিক্ষক তাকে ক্লাসের মধ্যে দাঁড় করালেন। সে গম্ভীরভাবে বলল “মহাশয়! আমি জাতিতে সিংহ, জাতীয় স্বভাব ত্যাগ করিতে না পারিয়া একে আজ মারিয়াছি”। স্বভাব তিনি সত্যিই ত্যাগ করতে পারেননি। ফল যা হওয়ার হল। বিদ্যাশিক্ষা অসম্পূর্ণ রইল। তা বলে যে জীবন থেমে গেল তা নয়।  

জমিদারপুত্র কালীপ্রসন্ন। জোড়াসাঁকোর সিংহ পরিবার কলকাতার হিন্দু সমাজে সুপরিচিত। দেদার সম্পত্তির মালিক। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন। মা আর ঠাকুমার কাছে মানুষ। প্রতিদিন ঘুমোতে যাওয়ার আগে তাঁরা বালক কালীপ্রসন্নকে নানা উপকথা শোনাতেন। কোনও কোনওদিন কবিকঙ্কণ, কৃত্তিবাস আর কাশীরামের পয়ার। তিনিও সেইগুলি শুনে শুনে মুখস্থ করে স্কুলে, বাড়িতে আর মায়ের কাছে আওড়াতেন। মা খুশি হয়ে পয়ার পিছু একটি করে সন্দেশ প্রাইজ দিতেন। পাছে বেশি মিষ্টি খেলে তোৎলা হয়ে যান(এমন কুসংস্কার প্রচলিত ছিল সেকালে) সেই ভয়ে ছাদের পায়রাগুলিকে কিছু ভাগ দেওয়া হত। আর একটি শাদা বেড়াল ছিল তার নাম মুঞ্জুরি, সেও ক্কচিৎ সন্দেশের প্রসাদ লাভ করত।

যখন বয়স ১৩, ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল কালীপ্রসন্নের। কয়েকদিন ধরে সিংহবাড়িতে নাচগান চলল। বাগানে বসল ভিয়েন। আর সেখানে সাহেব বিবিদের জমকালো মজলিশ। দেশীয় বাবুরা যারপরনাই আমোদ-প্রমোদ করলেন। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের পত্র দেওয়া হল। সামাজিক বিদায়ে ঘড়া, থালা, শঙ্খ ও রৌপ্য নির্মিত লোহা দেওয়া হল। সিংহ পরিবারের বিষয়রক্ষক হরচন্দ্র ঘোষ অত্যন্ত সুনিয়মে সব পরিচালনা করলেন। সমস্ত খবরের কাগজে বেরল সে খবর। ‘সংবাদ প্রভাকর’ লিখল “আহা! বাবু নন্দলাল সিংহ মহাশয় জীবিত থাকিলে এই বিবাহে তিনি অকাতরে অর্থব্যয় করিতেন। এইক্ষণে আমাদিগের সেই বিলাপ করা বিফল মাত্র, পরমেশ্বর সমীপে প্রার্থনা করি, তিনি কালীপ্রসন্নবাবুকে দীর্ঘায়ু ও পরম সুখে রক্ষা করুন।”

কিশোর কালীপ্রসন্ন

ছোটোবেলা থেকেই বাংলাভাষার প্রতি প্রবল টান ছিল কালীপ্রসন্নর। বন্ধুরা যখন হ্যাটকোট পরে বিভিন্ন সভা সমিতিতে ইংরেজিতে লেখা ভাষণ পড়ে হাততালি কুড়োত, তিনি তখন মোটা চাদর ও চটিজুতো পরে দীন বঙ্গভাষাকে ‘অনুপম অলঙ্কারে বিভূষিতা’ করার চেষ্টা করেছিলেন। ভণিতা তাঁর একদমই পছন্দ ছিল না। তৎকালীন ব্রাহ্মণ সমাজের ভণ্ডামি তাঁকে ক্রুদ্ধ করত। একবার কোনও এক তিথি উপলক্ষ্যে সিংহবাড়িতে এক ব্রাহ্মণকে একটি গরু দান করা হয়েছে। তা সেই ব্রাহ্মণ ফেরার পথে গরুটিকে এক কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেয়। খবর পেয়ে কালীপ্রসন্ন সেই ব্রাহ্মণের টিকি কেটে নেন! এও শোনা যায় যে, মোটা অর্থের বিনিময়ে তিনি ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের টিকি কিনে নিতেন। আর কাটা টিকিগুলি কত টাকায় কেনা একটা কাগজে লিখে সেগুলি আলমারিতে সাজিয়ে রাখতেন। ক্রমে তাঁর নাম হয়ে যায় “টিকি কাটা জমিদার”। তবে প্রকৃত গুণী পন্ডিতদের তিনি যথেষ্টই শ্রদ্ধাভক্তি করতেন।

মোটা চাদর ও চটিজুতো পরে জমিদারতনয় কালীপ্রসন্ন

সন ১৮৫৭। কালিদাসের ‘বিক্রমোর্ব্বশী’ নাটকটি তিনি বাংলায় অনুবাদ করলেন। নাটকটি আসলে পুরূরবা রাজার সঙ্গে স্বর্গের নর্তকী ঊর্বশীর প্রেমকাহিনি। কালীপ্রসন্ন ঠিক করলেন নিজেই পুরূরবার ভূমিকায় অভিনয় করবেন। যেমন বলা তেমনই কাজ। দিন নেই রাত নেই রিহার্সাল চলতে লাগল। অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। কলকাতার সমস্ত দেশি ও ইওরোপিয় গণ্যমান্য মানুষ এলেন তাঁর অভিনয় দেখতে। হলে তিল-ধারণের জায়গা নেই। বহু মানুষ টিকিট না পেয়ে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে গেল। অভিনয় দেখে তাক লেগে গেল সবার। সমস্ত পত্রপত্রিকা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করল। সকলের মুখেই এক কথা, সতেরো বছরের বালকের এত প্রতিভা!

‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ ছিল তৎকালীন যুগের একটি বিখ্যাত পত্রিকা। সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় নীলকর পীড়িত দরিদ্র প্রজাদের জন্য শুধু কলমযুদ্ধই করতেন না, তাদের জন্য অকাতরে টাকাও বিলোতেন। হঠাৎ তাঁর মৃত্যু হলে আর্থিক দুরবস্থার কারণে পত্রিকা বন্ধ হওয়ার জোগাড় হল। এরকম একটা পত্রিকার মৃত্যু কখনওই কাম্য নয়। তাছাড়া তাঁর পরিবারও চরম বিপদে পড়েছে। থাকবার বাড়িটি পর্যন্ত ইংরেজ সরকার দখল নিতে চায়। কালীপ্রসন্ন এগিয়ে এলেন। পঞ্চাশ হাজার টাকায় কিনে নিলেন পত্রিকাটি। শুধু তাই নয় তিনি হরিশ্চন্দ্রের মত মহান বাঙালির স্মৃতিমন্দির নির্মাণের জন্য পাঁচ হাজার টাকাও দান করলেন। একটি পুস্তিকা ছাপিয়ে সমস্ত ভারতবাসীর কাছে আবেদন করলেন মুক্তহস্তে অর্থ দেওয়ার জন্য। অচিরেই ভরে উঠল তহবিল। সেবার দীনবন্ধুর নীলদর্পণ-এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে রেভারেন্ড লং সাহেব শাস্তি পেলেন। ইংরেজ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জরিমানার টাকা কালীপ্রসন্নই দিয়েছিলেন। তিনি যে আদালতে অর্থ নিয়ে গেছেন, তা তাঁর বন্ধুরাও ঘুণাক্ষরে জানতে পারেনি। সেই সময় ‘নীলদর্পণ’ মোকদ্দমার বিচারক স্যর মর্ডন্ট ওয়েল্‌স্‌ প্রায়ই বাঙালিদের মিথ্যেবাদী ও বর্বরের জাতি বলতেন। এর প্রতিবাদে কালীপ্রসন্ন, রাজা রাধাকান্ত নবরত্নের নাটমন্দিরে একটি সভা আহ্বান করলেন। নির্দিষ্ট দিনে গণ্যিমান্যিরা কেউ না এলেও শহরের সাধারণ লোক রৈ রৈ করে ভেঙে পড়ল। বসবার জায়গা পর্যন্ত রইল না। দশ লক্ষ মানুষের সই জোগাড় করে পাঠিয়ে দেওয়া হল সরকার বাহাদুরের কাছে। ভর্ৎসিত হলেন ওয়েল্‌স্।

‘নীলদর্পণ’ লেখক দীনবন্ধু মিত্র

বিধবাবিবাহ জনপ্রিয় করার জন্য যারা বিধবাবিয়ে করবেন, তাদের একহাজার টাকা অর্থমূল্য দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন কালীপ্রসন্ন। কলকাতায় প্রথম বিশুদ্ধ জলের কল তাঁর টাকাতেই তৈরি হয়েছিল। পরে কলকাতার ‘অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট’ ও ‘জস্টিস অব দ্য পিস’ নির্বাচিত হন। মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনারের দায়িত্বও পালন করেছেন। বিদেশফেরত মাইকেল মধুসূদনকে বাঙালিজাতি শুরুতে মোটেই স্বাগত জানায়নি। অন্ত্যমিলহীন অমিত্রাক্ষর ছন্দ চিনে উঠতে তাদের যথেষ্ট সময় লেগেছিল। কালীপ্রসন্নই প্রথম প্রকাশ্য সভায় একটি দামি রুপোর পানপাত্র আর অভিনন্দনবার্তা দিয়ে তাঁর প্রতিভা সকলের সামনে আনেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁকে নিয়ে লেখেন। মাইকেলের জীবনী রচয়িতা লিখেছেন “কালীপ্রসন্নবাবুর অভ্যর্থনা মধুসূদনের প্রতিভার অতি গৌরবজনক পুরস্কার”

‘আলালী’ ভাষা তখন বেশ জনপ্রিয়। তিনি ঠিক করলেন তাঁর নতুন রচনা এই ভাষাতেই লিখবেন। সবাইকে দেখিয়ে দেবেন সহজ কথ্য বাংলায় কেমন সুন্দর গদ্য লেখা যায়। নিজের মাতৃভাষাতেই কেমন বাজি খেলানো যায়, তুবড়ি ফাটানো যায়, ফোয়ারা ছোটানো যায়। তার মানে যে তিনি বিদ্যাসাগরী ভাষার বিরোধী ছিলেন তা নয়। কিন্তু হুতোম প্যাঁচার যা বিষয়বস্তু, তা এই ভাষায় না লিখলে নকশাগুলোকে এত জীবন্ত করা যেত না। ‘কলিকাতার ইতিহাস’ নামক বইতে রাজা বিনয়কৃষ্ণ দেব বাহাদুর লিখেছেন “হয়তো এমন দিন আসিলেও আসিতে পারে, যখন লোক হুতোম প্যাঁচা পড়িবে না, কিন্তু এমন দিন কখনই আসিবে না যখন লোক হুতোম প্যাঁচা পড়িয়া আনন্দ ও উপকার লাভ না করিবে”।

কালীপ্রসন্নের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ সেই সমাজের জীবন্ত দলিল

যখন আঠেরো বছর বয়স ঠিক করলেন মহাভারতের বাংলা অনুবাদ করবেন। কিন্তু করতে গিয়ে দেখলেন এ কাজ একার পক্ষে করা অসম্ভব। তৎক্ষণাৎ ছুটলেন বিদ্যাসাগরের কাছে পরামর্শ নিতে।সব শুনে তিনি বললেন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত নিয়োগ করতে। সেইমত বরাহনগরে একটি বাড়ি দেখা হল। নাম দেওয়া হল ‘সারস্বতাশ্রম’ ও ‘পুরাণ সংগ্রহ কার্য্যালয়’। আটজন পণ্ডিতের সহযোগিতায় আট বছর ধরে চলল সেই অনুবাদের কাজ। মহারানি ভিক্টোরিয়াকে সেটি উৎসর্গ করা হল। এরকম একটি ব্যয়বহুল পুস্তক, অথচ তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বিনামূল্যে বিতরণ করবেন সে বই। সেইমত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হল— 

বিজ্ঞাপন।

শ্রীযুক্ত কালীপ্রসন্ন সিংহ মহোদয় কর্তৃক গদ্যে অনুবাদিত
বাঙ্গালা মহাভারত।

মহাভারতের আদিপর্ব্ব তত্ত্ববোধিনী সভার যন্ত্রে মুদ্রিত হইতেছে, অতি ত্বরায় মুদ্রিত হইয়া সাধারণে বিনামূল্যে বিতরিত হইবে। পুস্তক প্রস্তুত হইলেই পত্রলেখক মহাশয়দিগের নিকট প্রেরিত হইবে। ভিন্ন প্রদেশীয় মহাত্মারা পুস্তক প্রেরণ জন্য ডাকস্ট্যাম্প প্রেরণ করিবেন না। কারণ, পূর্ব্ব প্রতিজ্ঞানুসারে ভিন্ন প্রদেশে পুস্তক প্রেরণের মাসুল গ্রহণ করা যাইবে না। প্রত্যেক জেলায় পুস্তক বণ্টন জন্য এক একজন এজেন্ট নিযুক্ত করা যাইবে,তাহা হইলে সর্ব্বপ্রদেশীয় মহাত্মারা বিনাব্যয়ে আনুপুর্ব্বিক সমুদায় খণ্ড সংগ্রহ করণে সক্ষম হইবেন।

                                                               শ্রী রাধানাথ বিদ্যারত্ন।

                                                              বিদ্যোৎসাহিনী সভার সম্পাদক।

মহাভারতের সম্পূর্ণ প্রকাশ ও বিতরণে প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা খরচ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ উড়িষ্যায় বিস্তৃত জমিদারি আর কোলকাতার বেঙ্গল ক্লাব বিক্রি করে দিতে হয় কালীপ্রসন্নকে। সংসারে চরম আর্থিক অনটন নেমে আসে। একে একে বন্ধুবান্ধব আত্মীয়রা দূরে সরে যেতে শুরু করে। কেউ কেউ চরম প্রতারণাও করেন। বহু সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যায়। ঋণের দায়ে জর্জরিত কালীপ্রসন্ন অনিয়মিত জীবন কাটাতে শুরু করেন। শরীরে দুরারোগ্য রোগ বাসা বাঁধে। ডাক্তারেরা কোনও আশা দেখাতে পারেন না। মাত্র তিরিশ বছর বয়সে এক দুপুরের পড়ন্ত হলুদ আলোয় ইহলোক ত্যাগ করেন তরুণ কালীপ্রসন্ন। শেষযাত্রায় গুটিকয় মানুষ ছাড়া পাশে ছিল না কেউই। রাতের মধ্যেই নশ্বর দেহ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পরদিন সকালে কলকাতায় বুকে সূর্য উদয় হল ঠিকই, কিন্তু অস্তে গেল কালীপ্রসন্ন সিংহ নামের সিংহশাবক। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এত স্বল্প আয়ুতে এত এত কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় জীবনের মাপ কোনও কোনও ক্ষেত্রে বয়স দিয়ে নয় কীর্তি দিয়েই যদি মাপা যেত !

 

তথ্যসূত্রঃ ‘মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ’-মন্মথনাথ ঘোষ 

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More