নারীস্বাধীনতার প্রশ্নে কেমন ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের অবস্থান

 ওয়াহিদা খন্দকার

আজ ২৬ জুন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৮৪ তম জন্মদিন। কিন্তু ইদানীংকালে তাঁর জন্মদিন উদযাপনে দারুণ অনিহা চোখে পড়ে। কেবলমাত্র তাঁর ছবির বুকে মালা রেখে স্মরণের দায় সারে কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান। সাধারণ মানুষও প্রায় ভুলতে বসেছে তাঁকে। অথচ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উনিশ শতকের অন্যতম সাহিত্যিক ও সাংবাদিকমাত্রই নন, তিনি ‘বঙ্গদর্শনে’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকও। ‘কমলাকান্ত’ ছদ্মনামে তাঁর লেখা গদ্যগুলো বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
যেকোনও সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন যে বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে ছিল একজন সুন্দর সৃজনশীল প্রতিভা এবং গভীর স্পর্শকাতর মানবিক মন। ভারত তথা বাঙালি সমাজকে এক ধাক্কায় আধুনিকতার উঠোনে পৌঁছে দেওয়া মনীষীদের মধ্যে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ নাবিক। শুধুই কি ‘বন্দেমাতরম’-এর স্রষ্টা! মনোযোগ সহকারে পাঠ করলে দেখা যাবে শুধু উপন্যাস নয় দর্শন, রাজনীতিতত্ত্ব, সমালোচনা, ধর্মতত্ত্ব এবং সর্বোপরি রসবোধে সেসময়ে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তাঁর আগে বাংলাভাষার যথেষ্ট চর্চা হলেও, গদ্যসাহিত্যের আড়ষ্টতা কাটিয়ে তিনিই প্রথম বাংলাভাষাকে যৌবন দান করলেন। তাঁর হাত ধরেই পরিণতি লাভ করল বাংলাভাষা।
বঙ্কিমচন্দ্রের পরিবার
 ছিল ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, আধুনিক রুচিসম্পন্ন। সেখানে ইংরেজ সাহেব মেমসাহেবদের সঙ্গে ছিল তাঁদের অগাধ মেলামেশার সুযোগ, যা বঙ্কিমের চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। হয়ত সেভাবেই ইঙ্গ-বঙ্গ সংস্কৃতিকে মিলিয়ে দেবার মনোভাব গড়ে উঠেছিল তাঁর মধ্যে। তিনি দেখেছিলেন নারী স্বাধীনতার রকম। বুঝেছিলেন নারী-মুক্তি ছাড়া সমাজের আসল মঙ্গলসাধন সম্ভব নয়। তাই ঘোমটাধারী নারী সমাজকে আধুনিকতার জিওনকাঠি ছোঁয়াতে চেয়েছেন। তিনি মনে করেন মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ থাকলে সমাজে অবশ্যই নারী পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এক্ষেত্রে তিনি পশ্চিমি দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলের দ্বারা কিছুটা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তবে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে অনুকরণ করেননি। তিনি বলেছেন‚ “মনুষ্যে মনুষ্যে সমানাধিকারবিশিষ্ট। স্ত্রীগণও মনুষ্যজাতি অতএব স্ত্রীগণও পুরুষের তুল্য অধিকারশালিনী। যে যে কার্য্যে পুরুষের অধিকার আছে, স্ত্রীগণেরও সেই সেই কার্য্যে অধিকার থাকা ন্যায়সঙ্গত।”

বঙ্কিমের হাতেই নারীবাদী রচনার সার্থক সূচনা হয়। তাঁর লেখাতেই প্রকাশ পায় নারীকে মর্যাদা দেওয়ার কঠোর মনোভাব। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা এর আগে বিদ্যাসাগর, রামমোহন বলেছেন ঠিকই কিন্তু নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা তিনিই প্রথম সোচ্চারে লিখলেন। ‘সাম্য’ গ্রন্থের পঞ্চম পরিচ্ছদই সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারীবাদী লেখা। যা প্রকাশিত হয় ১৮৭৯ সালে। আর নারীমুক্তির অন্যতম পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া জন্মালেন ঠিক এর পরের বছর। রোকেয়ার লেখা সামনে আসার আগে পর্যন্ত বঙ্কিমই ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একমাত্র নারীবাদী লেখক। পুরুষের দ্বারা নারীর অবদমন বা শোষণের কথা বলতে গিয়ে তিনি পারিবারিক বিধিনিষেধকে কড়া ভাষায় আক্রমন করেছেন। ভারতীয় নারীদের গৃহবন্দী করে রাখার নিয়মকে তিনি ঘৃণা করতেন। একে তিনি বন্য পশুকে বন্দি করে বশে রাখার নিষ্ঠুরতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “ধর্মরক্ষার্থে যে স্ত্রীগণকে পিঞ্জরনিবদ্ধ রাখা আবশ্যক, হিন্দুমহিলাগণের এরূপ কুৎসা আমরা সহ্য করিতে পারি না।”
বাড়ির কাজ হোক বা লেখাপড়া বা পৈতৃক সম্পত্তি- সবেতেই নারীর সমান অধিকারের কথা তিনি যুক্তি দিয়ে তুলে ধরলেন। নারীদের শুচিতা রক্ষা করার কথা যেমন বলেছেন, তেমন তিনি পুরুষদেরও ব্যাভিচারী হতে নিষেধ করেছেন। পুরুষের মতো নারীদেরও সব জায়গায় ভ্রমণের অধিকার আছে। যে ধর্ম নারীর এটুকু স্বাধীনতা স্বীকার করে না, সে ধর্ম বিলুপ্ত হওয়াই শ্রেয় বলে তিনি মনে করেন। এমন কথা সেসময়কার পরিমণ্ডলে বলতে পারা তথা লিখতে পারা একটা বৈপ্লবিক দৃষ্টান্তের পরিচায়ক সেটা স্বীকার করতেই হয়। তাঁর ভাষায়, “যে ধর্ম এরূপ বস্ত্রাবৃত বারিবৎ, সে ধর্ম থাকা না থাকা সমান— তাহা রাখিবার জন্য এত যত্নের প্রয়োজন কী? তাহার বন্ধন ভিত্তি উন্মূলিত করিয়া নূতন ভিত্তির পত্তন কর।” বঙ্কিমচন্দ্রের এই উক্তি সব কালে সব ধর্মীয় সমাজের জন্য যথার্থ ও প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে আমাদের সমাজ অনেক উন্নত, তবু কোথায় যেন এখনও মনে হয় সমাজ নারীদের বেঁধে রাখার যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। একজন পুরুষের সর্বত্র যাতায়াতে কোনও বাধা নেই, কিন্তু নারী মাত্রই বিভিন্ন প্রশ্ন উঠে আসে। নারীরা নিজেও তাকে সংস্কার বলে মনে করে।

শুধুমাত্র আমাদের দেশে নয়, তিনি লক্ষ্য করেছেন সারা পৃথিবীতেই নারীদের এই দুর্দশা। তাঁর ভাষায়, “স্ত্রীগণ সকল দেশেই পুরুষের দাসী।”
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নানা নিয়ম তৈরি করে, কৌশল করে নারীকে মুষ্টিবদ্ধ করে রাখার চেষ্টাই করে গেছে।নারীদের নিজের ইচ্ছেকে প্রধান্য দিয়ে স্বাধীনতা ভোগ করা কোনও দেশের পুরুষতন্ত্র স্বীকার করেনি। বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তাভাবনা তাই আজও সমান প্রাসঙ্গিক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের মধ্যে দেখা যায় পুরুষেরা কঠোর হাতে নারীদের শাসন ও শোষণ করছে। এই একবিংশ শতকে এসেও সে প্রবণতা সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি। হবে বলেও মনে হয় না। একজন পুরুষ, নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে যতটা স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে, একজন নারী তা কখনওই পারে না। সমাজের তথাকথিত মানসিকতা তাকে সেই অনুমতি দেয় না। তবে ইউরোপীয় নারীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের দেশে যে পরিমাণে স্ত্রীগণ পুরুষাধীন, ইউরোপে বা আমেরিকায় তাহার শতাংশও নহে।”
এখনও এই শতাংশ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। শহরাঞ্চলের শিক্ষিত আপাত-স্বাধীন নারীদের দেখে বিচার করলে হবে না। গ্রামীণ নারীদের জীবনে তথাকথিত কোনও স্বাধীনতা নেই। চরম দুর্দশায় তাদের জীবন কাটে। আমরা যে অন্ধকারে ছিলাম, সে অন্ধকারেই রয়েছি।

নারী শিক্ষা প্রসারেও অকপট বঙ্কিম। মেয়েমানুষেরা শুধু বাড়ির কাজ করবে বলে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হবে এটা তিনি মানতে নারাজ। যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সঠিক সমঝোতা থাকে তাহলে সংসারের কাজ দুজনই ভাগ করে নিতে পারে। কিন্তু তা শুধু বাড়ির মহিলাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়াকে তিনি ন্যায়সঙ্গত মনে করেন না।
“একজন গৃহকর্ম লইয়া বিদ্যাশিক্ষায় বঞ্চিত হইবে, আর একজন গৃহকর্মের দুঃখে অব্যাহতি পাইয়া বিদ্যাশিক্ষায় নির্বিঘ্ন হইবে, ইহা স্বভাবসঙ্গত হউক বা না হউক, সাম্যসঙ্গত নহে।”
নারীশিক্ষা বিষয়ে এমন উক্তি বা মনোভাব সেসময়ের সমাজের শুধু নারীদের নয় পুরুষ জাতিকেও উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। বহুবিবাহ বিরোধী ছিলেন বঙ্কিম। হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বহুবিবাহ নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছেন তিনি। তিনি বলেছেন, “এ দেশে অর্দ্ধেক হিন্দু, অর্দ্ধেক মুসলমান, উভয় সম্বন্ধেই সে আইন হওয়া উচিত। “
বঙ্কিমচন্দ্র যে ধর্মীয় সমতার কথা বলেছেন, আজকের দিনেও তা দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক ও মঙ্গলময়।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৮৬৫ থেকে ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত বাংলায় পাশ্চাত্য রেনেসাঁসের ঢেউ আকাশ ছুঁয়েছিল। তার প্রভাব সেসময়ের সব লেখকদের লেখাতেই কমবেশি পড়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখাতেও আমরা দেখতে পাই তাঁর সৃষ্ট চরিত্রেরা, বিশেষত কিছু নারী চরিত্র যেন উনিশ শতকীয় ভাবধারায় ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ। আধুনিকতার সোনার কাঠি পেয়েছিল তারা। নবজাগরণের অভিঘাতেই তো ‘দুর্গেশনন্দিনী’র আয়েষা সমাজ-ধর্ম-সংসারের তোয়াক্কা না করে জগৎসিংহকে ভালোবেসেছে। আবার সেই প্রিয় মানুষকেই উদারভাবে অন্যের হাতে তুলেও দিতে পেরেছে। নিজের আত্মা ও শরীরের ওপর যে শুধু নিজেরই অধিকার থাকবে আয়েষার মধ্য দিয়ে সে কথাই বলতে চাইলেনলেখক।
‘বিষবৃক্ষ’এর কুন্দনন্দিনী আবার ধর্ম নির্ধারিত সতীত্বের নিয়ম মানতে পারেনি। নিজের অস্তিত্বকে বিনষ্ট করার সাহসও দেখিয়েছে। নিজেকে নিজের মতো পরিচালিত করার এই যে সাহস লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন, রেনেসাঁসের প্রভাবিত আধুনিক নারীবাদী সত্তার প্রকাশ ঘটেছে। সূর্যমুখী ও হিরার মধ্যেও যে অকপট প্রতিশোধ ইচ্ছা দেখা গেছে, তাও উনিশ শতকীয় নারীবাদকেই ইঙ্গিত করে। শৈবলিনীর মধ্যে আমরা দেখেছি বিবেক-দংশনহীন ইনস্টিংটের তাড়না। নিজের অন্তরাত্মাকে প্রাধান্য দেওয়ার এই ইচ্ছে উনিশ শতককেও ছাপিয়ে যেতে চেয়েছে। বিশ শতকের আধুনিকতার প্রায় সূচনাও করে দিয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র তার সৃষ্ট নারী চরিত্রের মাধ্যমে। ‘দেবী চৌধুরানী’র প্রফুল্লর মধ্যে আত্মসম্মানবোধের প্রখরতা দেখতে পায় পাঠক। ‘সীতারাম’ উপন্যাসের শ্রীকেও দেখা গেছে স্বামী বিচ্ছেদের পরও যে তার নিজের একটা জীবন আছে, অস্তিত্ব আছে তা সে অনুভব ও উপভোগ করেছে। বিবাহের বাইরে এসে নারীজীবনকে এখানে অন্যভাবে উপস্থাপন করেছেন বঙ্কিম।

একথা ঠিক যে, শেষপর্যন্ত তিনি সেই নারী-চরিত্রদের সমাজের মূলস্রোতে আবার ফিরিয়ে এনেছেন, কিন্তু তারপরও পাঠককে নারীর individual সত্তার কথা মনে করিয়েছেন। উপলব্ধিতে একটা প্রশ্ন এবং অনুভূতিতে একটা দাগ কাটতে পেরেছেন, যা সেসময়ের সমাজের জন্য যথার্থ কল্যাণকর। সিমন দ্য বোভোয়ার অনেক পরে লিখেছেন “One is not born, but rather becomes a woman”
কিন্তু অনেক আগেই এই কথার সারমর্ম বঙ্কিমচন্দ্রের নারীবাদী মনোভাবে প্রকাশিত। তাই বঙ্কিমচন্দ্রের রচনা সকলের গভীরভাবে পাঠ করা উচিত। তাঁর নারীচেতনা চিরনতুন, তা কোনওদিন প্রাসঙ্গিকতা হারাতে পারে না। আমাদের উচিৎ বঙ্কিমচন্দ্রকে নতুন নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে পাঠ করা, অনুভব করা।

তথ্যঋণ –
১.বিদ্যাসাগর বঙ্কিম : তুলনামূলক বিচার- কালি ও কলম
২. বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের মেয়েরা – দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
৩.বঙ্কিম রচনাবলী
৪. বঙ্কিমচন্দ্রের সাম্যচিন্তায় নারী-পুরুষ — কমলেশ পোদ্দার।
৫. সিমোন দ্য বোভোয়র- দ্য সেকেন্ড সেক্স

 

 

লেখক ওয়াহিদা খন্দকর তরুণ কবি ও গদ্যকার। যুক্ত আছেন শিক্ষকতার পেশায়। জন্মসূত্রে উত্তরবঙ্গ নিবাসী হলেও, কর্মসূত্রে থাকেন দক্ষিণবঙ্গে।

 

 

 

 

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More