করোনার দ্বিতীয় ঢেউ- আমাদের প্রত্যেকের হাতেই রক্ত লেগে আছে

অভিজিৎ ধর

কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আমাদের মেরুদণ্ড প্রায় ভেঙে দিয়েছে। প্রথম ঢেউয়ের পরে নভেম্বর মাস থেকে বেশ কিছুদিন ধরে সংক্রমণ তলানিতে ছিল। বিশেষ করে আমরা যদি জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি এই দুটো মাস ধরি তাহলে দেখা যাবে ভারতবর্ষে দৈনিক সংক্রমণ ২ লক্ষ থেকে কমে প্রায় দশ হাজারে নেমে এসেছিল। এই সংক্রমণ কমে যাওটাকে ইতিবাচক ধরে নিয়ে আমরা আবার মেতে ওঠলাম পুরোনো ছন্দে। শুরু হলো উৎসব, উদযাপন, হৈ-হুল্লোড়ের ফোয়ারা। পৌষপার্বন থেকে ক্রিসমাস, ইংরেজি নববর্ষের নেশায় মাতাল তখন আমরা। এ যেন এক নতুন প্রতিযোগিতা! করোনা আমাদের এবছরের দুর্গাপুজো কেড়ে নিয়েছে, কালিপুজোয় বাজি পোড়ানো নামক উদ্দাম তামসিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত রেখেছে। এবার সুদে-আসলে উশুল করে নেওয়ার পালা। অতএব ক্রিসমাস-ই আমাদের দুর্গাপুজো। নববর্ষই আমাদের কালিপুজো।

হইহই করে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। আমার মতো বাঙালি, যাদের মাস দুয়েক বেড়াতে না গেলে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, এই বুঝি নাভিশ্বাস উঠবে ভেবে অক্সিজেন সিলিন্ডারের খোঁজ নিতে হয়, তারা আবার নেমে পড়লাম অজানাকে জয় করতে। দীঘা, পুরী, দার্জিলিং লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল। আগে থেকেই কিছু মানুষ সতর্ক করছিলেন বটে ‘দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক হতে পারে’, কিন্তু সে কথায় আমল দিতে গেলে উৎসবের ইঁদুরদৌড়ে পিছিয়ে পড়তে হয়। সবকিছু নর্মালাইজ করতে ব্যস্ত তখন আমরা। অথচ ইতিহাস বলছে মহামারীর প্রথমের থেকে দ্বিতীয় ঢেউটিই সবসময় মারাত্মক হয়। কিন্তু সে সব থোরাই কেয়ার? আমরা আবার নিজেদের ছন্দে ফিরে গেলাম। উপায়ও হয়তো ছিলনা। হোটেল, ক্লাব, পর্যটন শিল্প যে ভাবে যুঝছিল তাতে পর্যটনশিল্পকে চাঙ্গা করার ভীষণ প্রয়োজন ছিল। ‘দেশের উন্নয়নের দায়িত্ব দেশবাসীর’ এমন একটা স্লোগান তুলে পথে নামল দেশপ্রেমিকেরা। শিকেয় উঠল মাস্ক পরার বিধান, সামাজিক দূরত্ববিধি।

কিন্তু প্রশ্ন হল, এতে আখেরে লাভ হল কি? যেটুকু হল, সেটুকুও সাময়িক। আর তার সঙ্গেই ত্বরান্বিত হল সেকেন্ড ওয়েভ। করোনা শুধু ফিরেই এল না, ফিরে এল আরও ভয়ংকর চেহারা নিয়ে। সংক্রমণের পারদ চড়ছিল হু হু করে। তার মধ্যেই গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো পশ্চিমবঙ্গ সহ কয়েকটি রাজ্যে ফিরে এল ভোটরঙ্গ। এ তো আবার বাৎসরিক উৎসব নয়, এই রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন হয় পাঁচ বছর পরে পরে। এমন মহাযজ্ঞকে ঘিরে মাতামাতি হবে, এ আর আশ্চর্য কী! এবার শুরু হল জনসমুদ্র তৈরি করার প্রতিযোগিতা। দেশজুড়ে তাবড় তাবড় নেতারা নেমে পড়লেন দড়ি টানাটানিতে। এর ডাকে জনসভায় দশ লাখ লোক আসে তো ওর ডাকে পনেরো। ফেসবুক,ইউটিউব জুড়ে দাউদাউ করছে ‘দেশপ্রেম’। সবাই বলছে ব্রিগেড চলো। লোকবল দেখানোর তাগিদে ‘দো গজ কি দুরি’, মাস্ক, স্যানিটানজার সবই তখন কল্পবিজ্ঞানের গল্প। ফল যা হওয়ার তাই হল। সংক্রমণের এক ভয়াবহ চেহারার সাক্ষী থাকল ভারতবর্ষ। দেশে দৈনিক সংক্রমণের হার যেখানে দশ হাজারে নেমে এসেছিল, সেখানেই গত মার্চ মাসে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই সক্রিয় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ১৬,০০০ ছাড়িয়ে গেল। তবুও ছাড়বার পাত্র নন দাদা দিদিরা। দরকারে অন্য রাজ্য থেকে লোক এনে প্রতিযোগিতায় প্রথম হবার লক্ষ্যে মাঠ ভরালেন ঠিকই কিন্তু মাঠে মারা গেল স্বাস্থ্যবিধি, সমস্ত নিয়মকানুন। আমরা বোধহয় বুঝতেই পারলাম না দেশে নেতা নির্বাচন করার নামে স্বয়ং যমদূতকে ডেকে আনলাম। মে মাস নাগাদ একবারে সর্বশক্তি নিয়ে দেশজুড়ে আছড়ে পড়ল করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। হাসপাতালে বেডের অভাব, অক্সিজেনের অভাব, হাজারে হাজারে মৃত্যু, রাবণের চিতার মতো অনির্বাণ গণচিতা- সাক্ষী থাকলাম অনেককিছুরই। একদিকে কল্পনাতীত ভয়াবহতা, স্বাস্থ্যপরিকাঠামোর ভেঙে পড়া, আর অন্যদিকে মানুষের দুর্দশাকে পুঁজি করে কিছু মানুষের গুছিয়ে নেওয়ার প্রয়াস, লোভ-লালসা, কালোবাজারি।একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, গুজরাত, দিল্লি, কর্ণাটক, কেরল, তামিলনাড়ু, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, পাঞ্জাব, তেলেঙ্গানা, উত্তরাখণ্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ— এই ১৬টি রাজ্যেই সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ বেড়েছিল। তার মানে যেখানে জনঘনত্ব বেশি, দোকানপাট, শপিংমল, সিনেমা হল, বড় বাজার, জমায়েতের জমকালো আয়োজন— সেখানেই সংক্রমণ বেশি। কারণ ভিড় পেলেই ‘সার্স কভ-টু’ ভাইরাসটি টুক করে জমিয়ে বসে পড়ে। এর মাঝে আবার কুম্ভ মেলায় লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ লোকের সমাবেশ প্রমাণ করে দিল আমরা এখনও সেই তিমিরেই পড়ে আছি। শুধু ধর্মীয় ডুবকি লাগিয়ে পরলোকের সুখ-সুবিধে গুছিয়ে নিতেই প্রায় ৩০ লাখ পুণ্যার্থী জমা হয়েছিল এই ভয়ংকর সময়ে।

কিছুদিন আগেই কুম্ভমেলা নিয়ে উঠে এসেছে আরও এক মারাত্মক তথ্য। অফিসিয়াল নির্দেশ ছিল কোভিড টেস্টের রিপোর্ট নেগেটিভ না হলে কুম্ভমেলায় অংশ নেওয়া যাবেনা। আর সেখানে বেশিরভাগ পুণ্যার্থীর না কি কোভিড টেস্টটুকুও নাকি হয়নি। আরও মারাত্মক এই যে এর মধ্যে প্রায় এক লাখ লোকের করোনা নেগেটিভের মিথ্যে রিপোর্ট তৈরি করে জমা দেওয়া হয়েছিল। এই পরিসংখ্যানগুলো সত্যিই হাস্যকর। আমরা কাকে ঠকাচ্ছি? পুণ্যের আশায় নিজের প্রিয়জনদেরই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি না কি! এই অদূরদর্শিতার পরিণামও ঘনিয়ে এল যথারীতি। পাল্লা দিয়ে বাড়ল সংক্রমণ। অনিবার্যভাবে সরকার লকডাউন ঘোষণা করলেন আবার। এবার যদিও সম্পুর্ণ লকডাউন নয়, তবু ট্রেন বন্ধ, বাস বন্ধ, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানও যথারীতি বন্ধ। সংক্রমণ লাগামছাড়া হতেই বাতিল হল দশম ও দ্বাদশ শ্রেণীর সমস্ত পরীক্ষা। ধ্বসে গেল আরও একটা শিক্ষাবর্ষ।

এই ক্ষতি অপূরণীয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড একদম ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছাত্র, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষক। এই দ্বিতীয় ঢেউ কেড়ে নিয়েছে লাখ লাখ লোকের চাকরি। দেশের অর্থনীতি তলানিতে। তারপরেও আমরা সতর্ক থাকছি কোথায়? পর্যাপ্ত ভ্যাক্সিন নেই। স্বাস্থ্যপরিকাঠামোর কংকাল বেরিয়ে পড়েছে। অথচ রুজিরোজগারের জন্য আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেরোতেই হবে। একের পর এক ধর্মীয়-রাজনৈতিক সমাবেশ, পার্টি-উৎসব, লোকের জমায়েত হওয়া, ভ্রমণপিপাসুদের বেড়াতে যাওয়ার ঢল- এর থেকে আমরা কয়েকমাস নিজেদের আলাদা রাখতে পারিনা? ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে তৃতীয় ঢেউ। অনিবার্য বিপদসংকেত দেখাচ্ছে পরিসংখ্যান। এর পর তো ঘুরে দাঁড়াবারও জায়গা থাকবেনা। আমি বলছিনা আমরা কোথাও না বেরোলে, জমায়েত না করলে ভাইরাস একেবারে চলে যাবে তবু আমরা কিছুটা তো আটকাতে পারব। কত পরিবারের মা তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন। কত সন্তান মা, বাবাকে খুইয়েছে চিরতরে। সব দায়ভার সরকার বা পরিকাঠামোর ঘাড়ে ফেলে নিশ্চিন্ত হতে পারব কি আমরা? মানি বা না-মানি, রক্ত লেগে আছে আমাদের সবার হাতে। এত পুলিশ, এত ডাক্তারদের আত্মত্যাগ- সবটাই কি মাঠে মারা যাবে? হয়তো আরও একটু সতর্কতা আমাদের বাঁচাতে পারে। এখনও যদি সতর্ক না হই, শুভবোধ জেগে না ওঠে- আগামীতে ক্ষমা করতে পারব তো নিজেদের!

 

(লেখক পেশায় অধ্যাপক। যুক্ত আছেন একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More