রেড ভলেন্টিয়ার্স – জীবন জীবনের জন্য

সন্দীপ কুমার মণ্ডল

অন্ধকারের মাঝেও কিছু আশার আলো থাকে। কিছু মানুষ নিজের বিপদ উপেক্ষা করে ছুটে যান অন্যের বিপদে। ভয়ঙ্কর সংকটকালে যখন দেশজুড়ে ত্রাহি ত্রাহি রব, বেঁচে থাকাটাই বড় চ্যালেঞ্জ, জীবনের লড়াই মৃত্যুর সঙ্গে। তখনই বিপদ অগ্রাহ্য করে আক্রান্ত মানুষের দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন কিছু মানুষ। যেখানে অনায়াসেই ভুলে যাওয়া যায় রাজনীতির রং। এদের কেউ কলেজ পড়ুয়া, কেউ বা সদ্য পাসড আউট। সারা দেশে যখন শ্মশান, কবরের মাটির জন্য হাহাকার, তখন এই বাংলায় বিপরীত একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বসে আছে এই তরুণ তুর্কির দল। মানুষের প্রাণ বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ। যতই অসম হোক, তবু এই করোনাযুদ্ধে মানুষকে ভরসা যোগাচ্ছে সহনাগরিকদেরই একাংশ।

সারা ভারতের পাশাপাশি বাংলাতেও আছড়ে পড়েছে করোনা অতিমারীর দ্বিতীয় ঢেউ। সংক্রমণের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে প্রতিদিন। এপ্রিল মাসের শেষদিক থেকেই লাগামছাড়া বেড়ে চলেছে এই সংক্রমণ। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হসপিটাল বেড ও অক্সিজেনের চাহিদা। বর্তমানে আক্রান্ত রোগীর তুলনায় যা সত্যিই অপ্রতুল। পরিকাঠামোর অভাবে মোট আক্রান্তের প্রায় তিন চতুর্থাংশ মানুষের চিকিৎসা চলছে বাড়িতেই।

এমন অনেক পরিবার আছে যেখানে বাড়িতে প্রায় সবাই করোনা আক্রান্ত। হাটবাজার, রান্নাবান্না বন্ধ, ওষুধ-পথ্য আনার লোক নেই। অক্সিজেন লেভেল নেমে যাচ্ছে হু হু করে। না আছে অ্যাম্বুলেন্সের বন্দোবস্ত, না আছে হাসপাতালে যোগাযোগ করার লোক অথবা শক্তি। না আছে হসপিটাল পর্যন্ত পৌঁছে দেবার লোক। সমস্যা অনেক, কিন্তু সমাধানের পথও আছে। প্রয়োজন জানিয়ে দরকার শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট। ঝড়-বাদল, দিন-রাতের তোয়াক্কা না করে, দূরত্বের পরোয়া না করে, লকডাউনে যোগাযোগ ব্যবস্থার ভরসা না করে এগিয়ে আসছে একদল স্বেচ্ছাসেবী তরুণ–তরুণী। তাদের এই কর্মকাণ্ডে শুধু একটাই লক্ষ্য বিপন্ন মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া। এই দুর্মর ইচ্ছাশক্তির কোনও ধর্ম নেই, জাত নেই, রঙ নেই।

SFI, DYFI, CPIM এইরকম বামপন্থী রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে এই ছেলেমেয়েগুলোকে মাপতে যাওয়াটা এমুহূর্তে ভুল। তারা এমন এক পথের যাত্রী, যার সামনে যেকোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেই খুব তুচ্ছ বলে মনে হয়। এদের দল নেই, দলনেতা নেই, হাইকমান্ড নেই, কোনও কেন্দ্রীয় নির্দেশ নেই। আছে শুধু মানুষের প্রয়োজনে বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবণতা। কোনও সরকারী মদতপুষ্ট NGO নয় এরা। বরং অসংগঠিত, স্বঘোষিত এক অসরকারী সংস্থা। বর্তমানে যাদের নাম ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’

ছবি- সোশ্যাল মিডিয়া

এদের উত্থান কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার অনেক আগেই।  করোনার প্রথমদিকেও নিরলস কাজ করে গেছে এই তরুণ তুর্কিরা, তবে কিছুটা অন্যভাবে। আক্রান্ত রোগীদের বাড়ি বাড়ি তারা সেসময় পৌঁছে দিয়েছে দুবেলার খাবার। ব্যক্তিগত উদ্যোগে, নিজেদের খরচে সাধ্যমতো রান্না করে পৌঁছে গেছে সেইসব বাড়িতে যাদের বাড়িতে প্রায় সকলেই আক্রান্ত, হাঁড়িটুকুও চড়ছেনা। সেসময় কেউ তৈরি করেছে দশজনের খাবার, কেউ বা কুড়ি জনের। এবং বিচ্ছিন্নভাবেই পৌঁছেছে ক্ষুধার্ত ও অপারগ মানুষের কাছে। পরবর্তীতে এই বিচ্ছিন্নভাবে রান্না করার পদ্ধতিটিকে একত্রিত করা হয়। একজায়গায়, একসঙ্গে গড়ে ওঠে একশজন, দেড়শ জন বা তারও বেশি মানুষের খাবারের ব্যবস্থা। বেঁচে থাকার এই যৌথ আয়োজন, সম্মিলিত রূপ, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজনে তৈরি হওয়া এই অন্নসত্রের নামকরণ করা হয় –  “শ্রমজীবী ক্যান্টিন”। দিকে দিকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই শ্রমজীবী ক্যান্টিন।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়তেই হু হু করে বাড়তে শুরু করেছিল সংক্রমণ। সরকার যেখানে ব্যর্থ, সেখানেই নতুন উদ্যমে মাথা তুলে দাঁড়াল লালফৌজ। রোগাক্রান্তের বাড়িতে খাবারের পাশাপাশি তারা পৌঁছে দিতে শুরু করল, বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। রোগীর জন্য ওষুধ, অক্সিজেন। রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, বেডের ব্যবস্থা করা। অ্যাম্বুলেন্স ডাকা। রোগীর বাড়ি স্যানিটাইজ করার মতো জীবনদায়ী কাজও। উদ্দেশ্য– আপনারা বাড়িতে থাকুন, সুস্থ হন। আমরা রাস্তায় আছি, দরকার পরলেই ডাকুন।

কিন্তু প্রশ্ন হল, এত বড় কর্মকাণ্ড চলছে কীভাবে? কারা লিড করছে এতবড় একটা কর্মযজ্ঞকে? আগেই উল্লেখ করেছি, এদের কোনও দলপতি নেই, আছে শুধু একদল উদ্যমী তরুণ তরুণী। সবটাই হচ্ছে দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্নভাবে। আসলে এই অতিমারীতে কিছু না কিছু করার তাগিদ আছে সবারই। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ। কোথায় কত বেড, কোথায় কত অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর সেইসব তথ্য জোগাড় করে সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়ে দিচ্ছে কেউ। লক্ষ্য আর কিছুই নয়, আরও আরও মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া। কেউ বা সাধ্যমতো নিজে রান্না করে লিখছে, “ঠিকানা দিলে পৌঁছে দেব”। কোন অটোচালক লিখছে, “প্রয়োজনে জানান, হাসপাতালে পৌঁছে দেব”। অবিশ্বাস্য হলেও, এ সবই স্বতঃপ্রণোদিত তাগিদ।

প্রধানত গোষ্ঠী ও অঞ্চলভিত্তিক এক একটা গ্রুপে কাজ করছে রেড ভলান্টিয়ারেরা। পাড়া বা ওয়ার্ডভিত্তিক পাঁচ ছয়জনের এক একটি দল। তাদের কেউ আছে সরাসরি ফিল্ডে, কেউ বা ব্যাকএণ্ড অপারেশনে। ব্যাকএণ্ড থেকে অক্সিজেন সাপ্লায়ারদের ডাটা সংগ্রহ করা হচ্ছে ও ভ্যালিডেট করা হচ্ছে। হিসেব রাখা হচ্ছে স্টক থেকে দাম, সবকিছুরই। আর এই বিষয়টি করতে হচ্ছে প্রায় প্রতি ২-৩ ঘন্টা অন্তর অন্তর, কারণ প্রতিমুহূর্তেই বদলে যাচ্ছে রিসোর্স। চাহিদা আর যোগানের অসামঞ্জস্যের বড় সমস্যা তো আছেই।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও লিড চোখে পড়লে, সরাসরি বা অন্য কোনওভাবে কোনো লিড পেলে সেসব ভ্যালিডেট করা সোর্স কাজে লাগানো হচ্ছে লোকেশন অনুযায়ী। সেখানে দৌড়চ্ছে যারা ফিল্ডে রয়েছে সেইসব স্বেচ্ছাসেবী। পৌঁছে দিচ্ছে অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর। যেখানে সরকারী হাত এসে পৌঁছচ্ছে না, সেখানেই হাজির এই নবীন ব্রিগেড। প্রয়োজনে সারারাত বসে থাকছে রোগীর কাছে।

তবে কি এই পুরো কাজটিই খুব সুষ্ঠভাবে হচ্ছে? মানুষ দুহাত ভরে আশীর্বাদ করছে তাদের? সবাই তাদের সহযোগীতা নিচ্ছে আর ধন্য ধন্য করছে? একই বাড়ি থেকে একই কাজের জন্য চারবার ডাকা হচ্ছে কখনও কখনও। একবার জানালা দিয়ে টাকা গলিয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে মুদিখানা থেকে কিছু জিনিস এনে দিতে। আবার ঘণ্টাখানেক পরেই হয়তো ডাকা হল চায়ের দুধ এনে দিতে। না, স্বেচ্ছাসেবীরা এই কাজে বিরক্ত নয়। তারা মানুষের পাশে থাকবে বলেই রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু পাশাপাশি এটাও মনে রাখা দরকার, যে ছেলেটি বা মেয়েটিকে এই চা, শ্যাম্পু আনার মতো তুচ্ছ কাজে ব্যস্ত রাখা হল, সেই সময়ে সে হয়তো কোনও মুমূর্ষু রোগীকে অক্সিজেন বা ওষুধ পৌছে দিতে পারত। ঘরগেরস্থালির সাধারণ প্রয়োজনের থেকে একজনের জীবন যে অনেক বেহি দামি, সেকথা কবে বুঝব আমরা!

এর বিপরীত দৃশ্যও আছে, আর সৌভাগ্যবশত সেগুলোরই। সদ্য করোনা জয় করা বাবা, তার মেয়ের ১২ বছরের জন্মদিনে অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর কেনার জন্য চেক তুলে দিলেন রেড ভলেন্টিয়ার্সের হাতে, যদি আরও দুটো প্রাণ বাঁচে সেই আশায়। তাঁর মেয়ের মতো আরও অনেক ছেলে মেয়ে তাদের বাবা-মা’কে ফিরে পাক এই প্রার্থনায়। এখানেই তরুণ ভলিন্টিয়ারদের জয়।

কিন্তু এই রেড ভলেন্টিয়ার্সরাও তো মানুষ। তাদের কি এই করোনা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা নেই? যখন করোনায় মৃতকেও বাড়ির লোকের কাছে হস্তান্তর করছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, সৎকারের অনুমতিটুকুও মিলছে না স্বজনদের, তখন এই ছেলেগুলো নিজেদের জীবন বিপণ্ণ করে যুদ্ধে নেমেছে। ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো, অন্যান্য ফ্রন্টলাইনাদের মতো তাদেরও একমাত্র সহায় সাহস আর সচেতনতা। করোনা ছোঁয়াচে রোগ। কিন্তু এমনও নয় যে ছুঁলেই সংক্রমিত হয়ে যাবে। চিকিৎসাশাস্ত্র মতে, সংক্রমণ তখনই ঘটে যখন আক্রান্তের লালারস, অন্যজনের শ্বাসনালীতে পৌঁছোয়। যা সম্ভব হাঁচি, কাশি বা কথাবলার সময় বেরিয়ে আসা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম লালাকণার মাধ্যমে। মাস্ক, স্যানিটাইজার, গ্লাভস ও পি পি ই কিট রক্ষাকবচ হতে পারে অনেকাংশেই। স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য মানুষের মতো তারপরেও রেড ভলেন্টিয়ার্স আক্রান্ত হচ্ছে। সুস্থ হলে আবার নেমে পড়ছে কর্মযজ্ঞে সামিল হতে। কোনওকিছুর বিনিময়ে নয়, শুধুই আত্মশক্তিতে ভর করে উঠে দাঁড়াচ্ছে এই নবীন করোনাযোদ্ধার দল।

২০১৯ বিধানসভা ভোটের বিচারে ও বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী, কম্যুনিস্টদের জন্য একটাও বিধানসভা বরাদ্দ করেনি বাংলার মানুষ। ভোট শতাংশ কমবেশি পাঁচ। আগামীতে এই শতাংশ কমবে না বাড়বে, নাকি একেবারেই মুছে যাবে সে কথা সময় বলবে। কিন্তু একটা কথা হলফ করে বলা যায় ভারতের কোভিড-১৯ অতিমারীর ইতিহাসে এই লালসৈনিকেরা বেঁচে থাকবে ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ নামে; জেগে থাকবে শুধুমাত্রই মানবিকতার জন্য। একথা আজও সমানভাবে সত্য, “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য”।

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More