ও শেরনি

জয়শীলা গুহ বাগচী

“যে মেয়ে মিছিল করে সেও রাঁধে সেও চুল বাঁধে”

যে কথাবার্তা নিয়ে এসেছি এই স্পেসটুকুর ভেতর তার মূল সুর মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘অর্ধেক পৃথিবী’ কবিতার এই লাইনটি। আমি উত্তরের একটি ছোটো শহরে থাকি। শিক্ষকতা করতে যেতে হয় প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামের স্কুলে। এছাড়া আর পাঁচজনের মতো একটি সাংসারিক জীবন যাপন করি। এই যৎসামান্য জীবন-পরিধির ভেতর নিজের অন্তরের তাগিদে চোখ ও মন সর্বদা খুলে রাখার চেষ্টা করি। স্কুলে যাবার এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবার জন্য পাবলিক ট্রান্সপোর্ট আমার একমাত্র ভরসা। আমি এবং আমার মত অনেক কর্মরত নারী পুরুষেরও। যাতায়াত মিলিয়ে এই আড়াই তিন ঘণ্টায় কতরকম যে জীবনকে দেখা হয় রোজ… দু’একটা তার ছবি না দিলে লেখাটা তেমন জমবে না।

দৃশ্য ১ – সকাল সোয়া ন’টায় বাড়ির সামনে টোটোর জন্য দাঁড়িয়ে আছি। একটু পরেই বাস ছেড়ে দেবে। যথেষ্ট টেনশন হচ্ছে। অথচ টোটো অমিল। মিনিট সাতেক পর যে টোটো পেলাম সেখানে আগে থেকেই যে মেয়েটি তার বাচ্চাকে নিয়ে বসে রয়েছে, সে আমার পূর্বপরিচিতা। সেও শিক্ষিকা এবং বাসস্টপেই যাবে। সে তার বাচ্চাটিকে প্রথমে তার মায়ের কাছে রাখবে তারপর সে বাস ধরবে। দেরি হবার ভয়ে যেতে দিলাম তাকে। 

দৃশ্য ২ঃ  সকাল সাড়ে নয়টার বাস ছেড়ে দিয়েছে, সেই চলন্ত বাসে কোনোরকমে পড়তে পড়তে মরতে মরতে উঠে এলেন কেকা দি। কেন্দ্রীয় সরকারের বেশ উঁচু পদেই আছেন তিনি। এই মাঝবয়েসেও যথেষ্ট সুন্দরী । কিন্তু মুশকিল হল, রোজই তিনি কোনোভাবে শাড়ি পেঁচিয়ে বাস ধরেন সেটা এমন যে না বোঝার কিছু নেই এবং তার ঘাড় পর্যন্ত ছাটা চুল থেকে রোজ টপটপ করে জল পড়ে। একদিন জিজ্ঞেস করেছি , “ কেকাদি আপনার রান্নার মাসি আসেনি?” ভীষণ অবাক হয়ে তিনি জানালেন তার বাড়িতে তিনিই সমস্ত রান্না সেরে বাসে ওঠেন। অন্য কারুর রান্না বাড়ির কেউ মুখেও দেবে না।  

দৃশ্য ৩ ঃ  কেকাদি দাঁড়িয়ে, রোজই দাঁড়িয়ে যান। বাস কিছুটা যাবার পর শহরের রেলগেটে আটকাতেই হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়ল পিঙ্কি, সেও শিক্ষিকা । এইমাত্র সে খবর পেয়েছে বাচ্চা দেখার মাসি আসেনি। সুতরাং তাকে ফিরে যেতে হবে। কেকাদি বসার জায়গা পেয়ে হাঁফ ছাড়ল। 

এইরকম অনেক অনেক ছবি প্রতিদিন দেখি, কোনওটাই স্বস্তির নয়। আমরা সবাই কোনও কোনও দিন এইসবের অংশ হয়ে যাই। অথচ প্রত্যেকটি কর্মরত মহিলা তার কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সমান কাজ করেন। যারা সরকারি চাকুরে সেখানে পুরুষ মহিলা বলে কোন আলাদা বেতন হয় না। শুনেছি অনেক বেসরকারি ক্ষেত্রে এমন বৈষম্যও হয়ে থাকে। এইসব মহিলারা অন্তত তাদের পরিবারের কাছ থেকে একটা স্বস্তিজনক অবস্থান কি আশা করতে পারে না? উপরের প্রত্যেকটি ছবির মধ্যে একজন করে পুরুষ আছেন। মহিলারা কেউ সিঙ্গল মাদার নন। এই পুরুষেরা কতটা সুবিধেজনক অবস্থানে থাকেন তা বলে দিতে হয় না। এ নিয়ে বেশি বলাটাও সমস্যার। কারণ এখনও অনেক মানুষ আছেন যারা মনে করেন মেয়েরা বাইরে কেন যাবে! তারা ঘোমটাটানা গৃহবধূ হবে, সংসার ও বাচ্চা মানুষ ছাড়া যাদের জীবনের আর কোনো উদ্দেশ্য থাকবে না। স্বাভাবিক মানুষের মতো বাঁচতে চাওয়ার অধিকারকে যদি জোর গলায় বলতে যাওয়া হয়, তবে তা নারীবাদ বলে দূরে সরিয়ে রাখা হবে। হ্যাঁ নারীবাদ এখনও একটি অচ্ছুত শব্দ। নারীর অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। অথচ নারীর শারীরিক শ্রম, অর্থ ভোগ করা যায় অনায়াসে। আমার এক আত্মীয়াকে সারাজীবন দেখেছি ছাপা শাড়ি ও প্লাস্টিকের চটি পরে কর্মস্থলে যেতে। কারণ মাইনের সমস্ত টাকা তুলে দিতে হয় চাকরিরত স্বামীর হাতে। তিনি দয়া করে হাতখরচ দেন তবে সেই সুশিক্ষিতা কর্মরতাটি প্লাস্টিকের চপ্পল কিনতে পারেন। কিছু বলতে গেলে মেরে দাঁত ভেঙে দেওয়া হয়। চুল উপড়ে নেওয়া হয়। এইরকম উদাহরণ অজস্র। মহিলারা চাকরি করেন বলে পুরুষতন্ত্রের হাত থেকে রেহাই পান না মোটেও।আরও মজার ব্যাপার হল মেয়েরাই এই সিস্টেমটিকে মাথায় করে বয়ে চলে। ছোটবেলা থেকেই তাকে এই কৌটোটার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, যতই সে বাইরে যাক ঘরের কাজকে কোনওভাবেই অবহেলা করা যাবে না। বাইরের কাজ এবং ঘরের কাজের এই ব্যালান্সটা যে যত সঠিকভাবে করতে পারবে, তার জন্য সমাজের ততই চওড়া হাসি উপহার। এবং তাকে দশভুজা ইত্যাদি নানা নামের পুরস্কার দেওয়া হবে। এক ডাক্তার বান্ধবীর সাথে এই নিয়েই দীর্ঘ কথোপকথন হচ্ছিল। ও আমাকে বোঝালো এই ব্যালান্স করতে গিয়ে শারীরিকভাবে কতখানি ক্ষতিগ্রস্থ হয় মেয়েরা। অনেক মহিলাই সংসার সামলে নিজের খাবারটুকু ঠিকমতো খাননা, এর ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে শরীর ভাঙতে থাকে। শুধু শরীর নয় তার সাথে মনও। ঠিক যেভাবে গৃহবধূদের জীবন থেকে ভালোলাগা বিষয়গুলো মুছে যেতে থাকে, তেমনভাবেই সময়াভাবে, অতিরিক্ত চাপে চাকরি করা মেয়েরা ভুলে যায় তারা একসময় গান গাইত, ছবি আঁকত। শুধু তাই নয় তার সাথে যুক্ত হয় এক তীব্র অপরাধবোধ। সবসময় তার মনে হতে থাকে মা হিসেবে সে সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। অথবা তার পরিবার তার কোনও কাজেই সন্তুষ্ট হচ্ছে না। এবং কাজের জায়গাতেও সে পুরুষদের থেকে পিছিয়ে পড়ছে। এই অনর্থক চাপ নিয়েই চলতে হয় তাকে। এরপরও সে যদি নিজেকে ভালোবাসে, বা সাজগোজ করে তাহলে তো কথাই নেই। সমাজের থেকে তার পাওনা হয় কটূক্তি। কর্মস্থলে সে যদি ভালো কাজ করে সুনাম অর্জন করে, সেখানেও তার জন্য অপেক্ষা করে সন্দেহপ্রবণ মন্তব্য। তখন তার ব্রেনের চেয়েও আলোচ্য হয় আচার আচরণ এবং শরীর। কোনটা কাজে লাগিয়ে সে সুনাম অর্জন করেছে সে বিষয়ে জোর আলোচনা চলে। অথচ এটা আলোচনা হয় না সেই মেয়েটির শরীরে পুষ্টি কতটা রয়েছে! হিমোগ্লোবিন ঠিক আছে তো রক্তে? আজ যে মেয়েরা চাকরি করছেন এর ইতিহাসটা খুব উদারতার নয়। সবটাই সমাজ ও পরিবারের জন্য। নিঃস্বার্থভাবে নারীশক্তিকে স্বীকার করে তাকে বহির্জগতে ঠেলে দেওয়া হয়নি। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর এবং বিশ্বযুদ্ধের পর পুরুষের সংখ্যা কম পড়ায় নারীকে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু সে পথ কখনওই খুব মসৃণ ছিল না। পুরুষ এবং মহিলা শ্রমিকের বেতনের অনেক পার্থক্য থাকত। ইউরোপের চেয়ে আমেরিকায় মেয়েদের অবস্থা একটু উন্নত ছিল। আমেরিকা নতুন দেশ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলছে, নারীদের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এই মহাযজ্ঞ অসম্ভব ছিল। পুরুষের পাশে থেকে তারা লড়াই করেছে। সেই অর্থে প্রতিটি বিপ্লব বা যুদ্ধ তাদের নিজেদের স্বার্থেই নারীদের কয়েকধাপ এগিয়ে দিয়েছে। আমাদের নিজেদের দিকে এবার তাকানো যাক। খেয়াল করবেন দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে বহু উদ্বাস্তু ঘরের মেয়ে-বউকে নিজেদের টিকে থাকার প্রয়োজনে রোজগার করবার অনুমতি দিয়েছে। সিনেমা, থিয়েটার, সরকারি-বেসরকারি চাকরি, সবেতেই উদ্বাস্তু নারীরা মেয়েদের এগিয়ে নিয়ে গেছে এক ধাক্কায় অনেকটা। তারও আগে আমরা অস্বীকার করতে পারি না ব্রাহ্ম মেয়েদের এগিয়ে যাবার পথচিহ্নের কথা। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এটা দেখা যেত ব্রাহ্ম মেয়েরা অবিবাহিত থেকে কোনও প্রতিষ্ঠানের উন্নতিতে নিজেকে সঁপে দিচ্ছেন। আর দেশভাগ পরবর্তী মেয়েরা সংসারের যূপকাষ্ঠে নিজেদের উৎসর্গ করছেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতার মতো। এদের শান্ত স্নিগ্ধ মূর্তিতে সেই যন্ত্রণার রেশ কমই থাকতো। এখন মেয়েরা সংসার ও চাকরি দুইই সমানতালে করতে গিয়ে সারাক্ষণ ভেতরে এক তীব্র অপরাধবোধ নিয়ে তারা এক দুঃসহ জীবনকে টেনে নিয়ে যান। অথচ একটু সমস্যা হলেই পরিবারের বাকিরা বেশিরভাগ সময়ই দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে। কিন্তু রোজগারের টাকা নিতে কোথাও বাঁধে না সেইসব পরিবারের। আবার ঘরে অসুবিধে হলে চাকরির ক্ষেত্রে জোটে অসম্মান। এসব অতিক্রম করে সে মানুষ নয় শুধু একজন নারী হয়ে বেঁচে থাকে। 

         আলোচনার শুরুতেই বলেছিলাম আমার আশেপাশের দেখাটুকু নিয়েই লিখব। এর অন্যথাও নিশ্চয়ই হয়। তবে তার সংখ্যা নিতান্তই কম। বেশিরভাগ সময় চোখে পড়ে বাচ্চা নিয়ে চাকরি করা মায়েদের চোখেমুখে কষ্টের ছাপ। প্রতিষ্ঠান তো কম যন্ত্রণা দেয় না। তাদের সবসময় মনে হয় যেন মা শিশুর অসুস্থতা বা পরীক্ষা নিয়ে মিথ্যে বলে ছুটি আদায় করছেন। যদিও তা তার প্রাপ্য ছুটি। সন্তান প্রতিপালনের ছুটি। সে ছুটি পেতে যে পরিমাণ মানসিক যন্ত্রণা তাকে পেতে হয়, সে মুহূর্তে একজন মায়ের মনে হতেই পারে কেন সে সন্তান ধারণ করেছে? কেনই বা সে মাতৃত্বের সকল যন্ত্রণা একাই বহন করবে? এর পরের প্রজন্মের কাছে আশা তারা আরও উন্নত ও সঠিক চিন্তা নিশ্চয়ই করবে। হয়তো আবার কোনও এক মহান বিপ্লব তার নিজের প্রয়োজনে নারীদের এগিয়ে দেবে, তাদের সম্মান জানাবে। মনে পড়ে আজাদ হিন্দ বাহিনীর নারী রেজিমেন্টের কথা। অথবা এই ত সেইদিন এন আর সির প্রতিবাদ জানাতে পার্ক সার্কাসের বোরখা পরা অন্ধকারের মেয়েরা কীভাবে গর্জে উঠেছিল প্রতিবাদে। সেদিন ওদের মেয়ে নয় মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। তবে একথাও অবশ্যই মনে রাখা দরকার কোনও ধর্ম বা মতবাদ যা পুরুষের তৈরি সেখানে নারী চূড়ান্তভাবে অসম্মানিত। যে ধর্ম বা যে মতবাদ নারীকে সম্মান দেয় না তা পরিত্যাজ্য হওয়াই সঠিক। নারী নির্মাণ করুক তার নিজের জগত । যেখানে নারী পুরুষ কেউ শোষিত নয়। সাম্য আসুক।  

  “ ঘাস মাটি বায়ু জল এতদিন পুরুষের ছিল

     সমাজ পুরুষ ছিল, এইবার উভলিঙ্গ হোক”   ( অর্ধেক পৃথিবী, মল্লিকা সেনগুপ্ত)

লেখিকা জয়শীলা গুহবাগচির জন্ম ও বসবাস উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়িতে। পেশা শিক্ষকতা। শূন্য দশকের কবি ও গদ্যকার। রয়েছে একাধিক কবিতাগ্রন্থ। ২০১৮ সালে অধিযুগ সাহিত্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৯ পেয়েছেন মননের মধু সাহিত্য পুরস্কার। 

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More