যুগসন্ধির অন্ধকারে আলোকশিখায় পথ দেখিয়েছেন শ্রী মা সারদা

বেবী সাউ

অরূপের যদি রূপ হয়, তবে তা কেমন রূপ? যদি এমন হয়, সেই রূপ বহু দিন ধরে মানুষের সংস্কারহীন মনের আশ্রয় হয়ে উঠল? কেমন হয় তবে তা? অনেকেই বলবেন এমনটা হয়ই না। কারণ এমনটা হওয়া এক ইউটোপিয়া মাত্র। কিন্তু রামকৃষ্ণদেবের সমাধিগ্রস্ত হওয়ার মতোই, বোধিতে আচ্ছন্ন মনোজগতের গভীর নির্জন অবস্থার মতোই, এমন অরূপের রূপদর্শন বাঙালির পক্ষে সম্ভব হয়েছিল মা সারদার মধ্যে দিয়ে।
এক গ্রাম্য ঘরামি চালাতে খড় ছাইছিল। কাজ শেষে সে নেমে এল। মা সারদা বললেন, ‘বাবা অনেক কাজ করেছ এবার একটু খেয়ে নাও।’ ঘরামি বলল– ‘আমি যে মুসলমান!’ সারদা বললেন- ‘আমি সকলের মা।’ ঘরামির কোনও কথা না শুনে তাকে ঘরে বসিয়ে খাওয়ালেন মা সারদা। শুধু তাই নয়, খাবার শেষে তার এঁটো জায়গাটা অব্দি নিজের হাতে মুছলেন।
যে সময়ের কথা এটি, বাংলার ইতিহাসে তা এক সন্ধিক্ষণ। একদিকে সামন্ততন্ত্র, জমিদারতন্ত্র,  ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র তাদের পিছিয়ে থাকা মনের দাঁত-নখ নিয়ে প্রস্তুত এই কলকাতা শহরেও। অন্যদিকে সে সময়েই বাংলার শ্রেষ্ঠ গীতিকাব্য, উপন্যাস, গল্প, দর্শন, বিজ্ঞানচর্চার সময়। একদিকে প্রবল ধর্মভেদ, জাতিগত ঈর্ষা। আর অন্যদিকে আধুনিকতার ইঙ্গিত। রামকৃষ্ণদেবের মধ্যে যে দার্শনিক উদারতার মহত্ব আমরা পাই, তা যেন এক বিরল কাব্যপ্রতিভার সাক্ষী। সেই কাব্যপ্রতিভার এক সামাজিক সংস্কারকের রূপ হলেন দুইজন। স্বামী বিবেকানন্দ ও মা সারদা।
তিনি ছিলেন আগুনের মতো তেজদৃপ্ত। তখন দেশব্যাপী জেগে উঠছে ইংরেজ হটাও আন্দোলনের আগুন। মা কিন্তু আমার মাতৃভূমি এমন ভাবাবেগে আপ্লুত হননি বা প্রশ্রয় দেননি। অথচ নিজস্ব যুক্তি ও চিন্তায় স্বদেশ-চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং নিজেও প্রত্যয়ী থেকেছেন। সেসময় ইংরেজ সরকার প্রতিমুহূর্তে মায়ের বাড়ির প্রতি কড়া নজর রেখেছিল। তবে সন্দেহ থাকলেও সাহসে কুলোয়নি মা-কে বিরক্ত করার। ‘শ্রীশ্রীমা’-র কাছে কোনও কিছু অজ্ঞাত ছিল না। অসামান্য ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী ‘মা’ রাজশক্তিকে উপেক্ষা করে গেছেন দৃঢ় অথচ শান্ত আচার আচরণে। তাঁর স্নেহের ছত্রছায়ায় বহু বিপ্লবী আশ্রয় পেয়েছেন সেসময়। এসব কর্মকাণ্ডই সম্পন্ন হত নীরবে-নিভৃতে।
একবার স্বামীজী শিবানন্দজীকে চিঠিতে লিখলেন, ‘যার মা-র ওপর ভক্তি নেই তার ঘোড়ার ডিম হবে। সোজা বাংলা কথা। ঠাকুর বরং যাক। ঠাকুরের থেকে মা বড়ো দয়াল। মা-কে তোমরা বোঝনি। মায়ের কৃপা লক্ষগুণ বড়ো।’তাই মায়ের বিকল্প আর কোনও বড় শক্তি হতে পারে না এ যুগেও। মায়ের অন্তর শক্তির ঊর্ধ্বে আজও আমরা যেতে পারিনি কেউ, মায়ের চেতনা সেইরূপ।
রামচন্দ্র প্রশ্ন করেন- ‘কে গো তুমি’? বালিকার উত্তর- এই আমি তোমার কাছে এলুম। যারা পূর্ব পূর্ব অবতারদের লীলাসঙ্গিনী রূপে এসেছিলেন, যদি ঐতিহাসিক দৃষ্টি দিয়ে বিচার করি তাহলে অধ্যাত্মিক অভ্যুত্থানের জন্যে তাদের অবদানের স্বল্পতা দেখে বিস্মিত হই। কিন্তু শ্রীশ্রীমা যেভাবে ঠাকুরের ভাবধারাকে চারিদিকে প্রসারিত করতে সমর্থ হয়েছেন তা দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। ঠাকুর নিজেও মাকে শরীর ত্যাগের আগে বলেছিলেন: “এ (শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে) আর কি করেছে তোমাকে এর অনেক বেশি করতে হবে।” সেই অনেক বেশি কাজ শ্রীমা করেছেন তাঁর আজীবনের কর্মসাধনায়। ঠাকুরের সন্তানরা মাকে ঠাকুরের থেকে পৃথকরূপে দেখতেন না। ঠাকুরেরই মাতৃরূপে আর একটি অভিব্যক্তি দেখতেন। শ্রীশ্রীমা নিজেও বলেছেন: “ঠাকুরের জগতে প্রত্যেকের উপর মাতৃভাব ছিল। সেই মাতৃভাব জগতে বিকাশের জন্যে আমাকে এবার রেখে গেছেন।” তবেই সারদাদেবী সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন: “ও সারদা,সরস্বতী,জ্ঞান দিতে এসেছে। রূপ থাকলে পাছে অশুদ্ধ মনে দেখে লোকের অকল্যাণ হয়। তাই এবার রূপ ঢেকে এসেছে। ও (সারদা) জ্ঞানদায়িনী, মহাবুদ্ধিমতী।” তেলোভেলোর মাঠে এক দস্যুদম্পতি সারদাদেবীকে কালীরূপে দেখেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রীমায়ের স্বমুখেই শুনেছিলেন এক কাহিনি। জয়রামবাটীতে মায়ের বাড়িতে একটি পোষ্য বিড়াল ছিল। ব্রহ্মচারীগণ তখন মায়ের সেবক। তিনি বিড়ালটিকে আদর-যত্ন তো করতেনই না, বরং মাঝেমধ্যে একটু-আধটু প্রহারাদিই করতেন। একবার কলকাতা আসার সময় ব্রহ্মচারীদের ডেকে মা বললেন: শোনো, বেড়ালগুলোর জন্য চাল নেবে। যেন কারও বাড়ি না যায়। লোকে গাল দেবে, বাবা। তারপর ভাবলেন শুধু এইটুকু বলাতেই বেড়ালের জগৎ ফিরবেনা। তাই আবার বললেন: “দেখো বেড়ালগুলোকে যেন মেরোনা। ওদের ভেতরেও তো আমি আছি।” ‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’ তিনিই যে আমাদের শ্রীশ্রীমা হয়ে এসেছেন। নিজ মাতৃভাবকে অবলম্বন করে তিনিই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। মা স্বমুখে বলেছেন: আমার শরৎ যেমন ছেলে, এই আমজাদও তেমন ছেলে। শরৎ বা স্বামী সারদানন্দ ছিলেন রামকৃষ্ণ মিশনের কর্ণধার, সম্পাদক। আর আমজাদ এক পাড়াগেঁয়ে ডাকাত। মা বলেছেন-“আমি সতেরও মা, অসতেরও মা”। মা যে কতটা বাস্তববাদী ছিলেন টাব বোঝা যায় ‘শ্রীশ্রীমা’ সম্পর্কে স্বামী বীরেশ্বরানন্দের বক্তব্যে- একবার দুজন যুবক এল। দুজনেই রাজদ্রোহী। মা তাদের স্নান করতে পাঠালেন। তারা স্নান করে এলে তাদের দীক্ষা দিলেন। তারপর তাদের খাইয়ে দাইয়ে তাড়াতাড়ি অন্যত্র যেতে বললেন। এসব ছেলেদেরও দীক্ষা দিতে মা এতটুকু ভয় পেতেন না। মা তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দীক্ষা দিয়ে গেছেন।
মা যখন উদ্বোধনে অত্যন্ত অসুস্থ তখন একদিন এক পার্সি যুবক এসে উপস্থিত। তিনি মঠে অতিথি হয়ে কয়েকদিন ধরে বাস করছিলেন। এখন মায়ের কাছে এসেছেন তাঁকে দর্শন করতে এবং তাঁর কাছে দীক্ষা নিতে। মায়ের তখন এত অসুখ যে দর্শন একেবারে বন্ধ। এই যুবক নীচে বসে রইলেন। তাঁকে দোতলায় যেতে দেওয়া হল না। মা কিন্তু কিভাবে জেনে গেলেন যে, এই যুবকটি নীচে তাঁর দর্শনের জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি তখন একজনকে বললেন তাকে তাঁর কাছে ডেকে নিয়ে আসতে। মা তাকে দীক্ষা দিয়ে নীচে পাঠালেন। স্বামী সারদানন্দ এই ঘটনার কথা জানতে পেরে মন্তব্য করলেন- “মায়ের যদি এক পার্সি শিষ্য করার ইচ্ছে হয়ে থাকে তাহলে আমার আর কী বলার আছে?” এই পার্সি যুবকটি আর কেউ না, চিত্রজগতের বিখ্যাত অভিনেতা ও প্রযোজক বম্বের সোরাব মোদি। সেইজন্যে বিবেকানন্দের মতো ঠাকুর-অন্ত প্রাণ ভক্ত বার বার বলেছেন, মায়ের স্থান ঠাকুরেরও উপরে। হঠাৎ একটু খটকা লাগতে পারে। রামকৃষ্ণের আদর্শ সারা পৃথিবীতে প্রচার করার ভার যে বিবেকানন্দের উপর ঠাকুর দিয়ে গিয়েছেন, তাঁর মুখে এ কী কথা? কিন্তু বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছিলেন, মায়ের মাধ্যমে ঠাকুর স্বয়ং নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁদের। বিবেকানন্দ তাই গুরুভাইদের ডেকে ডেকে বলতেন, ওরে, তোরা এখনও মাকে চিনলি না।
বিশ্বজয় করে দেশে ফেরার পর পার্লামেন্ট অব রিলিজিয়নে বিবেকানন্দের বক্তৃতা সকল শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলল। ফিরে আসার পর মায়ের সঙ্গে তাঁর একটি সুন্দর সাক্ষাৎকারের বিবরণ আছে। স্বামীজি সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করলেন মায়ের পায়ে। কতদিন পরে তাঁকে দেখে মায়ের চোখে পুত্রস্নেহ। উপস্থিত সকলে এক অপূর্ব স্বর্গীয় পরিবেশ উপলব্ধি করলেন।
পাশ্চাত্যের রমণীদের সঙ্গে মায়ের সখ্যের উপরও আছে কৌতূহলোদ্দীপক কিছু আলোচনা। গ্রামের মেয়ে সারদা, এক বর্ণ ইংরেজি জানেন না। কিন্তু চমৎকার আলাপচারিতা চালিয়ে যান সারা বুল, মিস ম্যাকলয়েড বা সিস্টার নিবেদিতার সঙ্গে। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে, কিন্তু আহার করেন এঁদের সকলের সঙ্গে। সিস্টার নিবেদিতা বলেন, মা, তুমি আমাদের কালী। মা বলেন, না না, তবে তো আমাকে জিভ বার করে রাখতে হবে। নিবেদিতা বলেন, তার কোনও দরকার নেই। তবু তুমি আমাদের কালী, আর ঠাকুর হলেন স্বয়ং শিব। মা মেনে নেন। নিজ হাতে রঙিন উলের ঝালর দেওয়া হাতপাখা বানিয়ে দেন নিবেদিতাকে। নিবেদিতার সে কী আনন্দ এমন উপহার পেয়ে! সকলের মাথায় হাতপাখা ছোঁয়াতে থাকেন। মা বলেন, মেয়েটা বড় সরল। আর বিবেকানন্দের প্রতি আনুগত্য দেখবার মতো। নিজের দেশ ছেড়ে এসেছে গুরুর দেশের কাজে লাগবে বলে। নিবেদিতার ভারতপ্রেম অতুলনীয়। এসব ছিল মায়ের মহিমা। মা ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দাদের পরাস্ত করেছিলেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দাপ্রধান চার্লস অগস্টাস টেগার্ট-এর রিপোর্টের (১৯১৪) ভিত্তিতে বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল বিপ্লবীদের সাহায্য করা এবং আশ্রয় প্রদানের অভিযোগে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রধান কার্য্যালয় বেলুড়মঠকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার জন্য ১৯১৬ সালের ১১ ডিসেম্বর বিশেষ বৈঠক ডেকেছিলেন। সে খবর পেয়েই শ্রীমা চটজলদি মঠের তৎকালীন সম্পাদক সারদানন্দ এবং জোসেফিন ম্যাকলাউডকে পাঠালেন কারমাইকেলের কাছে। মা বুঝিয়ে বলতে বলেন যে, বেলুড় মঠকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে ব্রিটিশ সরকারেরই বিড়ম্বনা বাড়াবে। শেষপর্যন্ত কারমাইকেলের হস্তক্ষেপে ব্রিটিশ সরকার বেলুড় মঠকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা থেকে বিরত হয়। ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের বিশেষ নজর ছিল বেলুড় মঠ, উদ্বোধন, জয়রামবাটি, কোয়ালপাড়া ইত্যাদি স্থানের উপরে। সেই সময়ে অনেক বিপ্লবী মায়ের অনুমতি নিয়েই আশ্রয় নিতেন এইসব জায়গায়। তরুণ বিপ্লবীদের জন্য তাঁর ভালবাসার অভাব ছিল না। স্বামী প্রেমানন্দ একটি চিঠিতে লিখেছেন, “শ্রীমার আদেশ পালনই আমাদের ধর্ম, কর্ম। আমরা যন্ত্র, তিনি যন্ত্রী। যাকে যা বলবেন, সে তাই করতে বাধ্য।” প্রেমানন্দের শ্রীমা সারদা সম্পর্কিত অভিমত এই যে, ‘রাজরাজেশ্বরী মা শাক বুনে খাচ্ছেন, ভক্তের এঁটো কুড়োচ্ছেন, কাঙালিনী সেজে ছেঁড়া কাপড় তালি দিয়ে পরছেন।’
এইসব কাহিনিগুলি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। আর তা হল, রামকৃষ্ণদেব যে কাজটি শুরু করেছিলেন, তার সার্থক বাহক ছিলেন মা সারদা। তুলনা না করেই তাই বলা যায় সক্রেটিসের শিষ্যদের মতো তিনিও আসলে রামকৃষ্ণদেবের তেমনই এক শিষ্যা,  যিনি নিজে স্বয়ং হয়ে উঠেছিলেন একজন কুসংস্কারহীন বীরাঙ্গনা।
বাংলা তথা ভারতীয় সমাজের সন্ধিক্ষণে মা সারদা হাতে এক আলোকশিখা নিয়ে অন্ধকারে পথ দেখিয়েছেন। সেই আলোকশিখাকে মনে রেখে তা পুনরায় জ্বালানোর দায়িত্ব এখন আমাদের।
You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More