নাচিছে যেন কোন প্রমত্ত দানব

সুমন মল্লিক

“শুষ্কতাপের দৈত্যপুরে দ্বার ভাঙবে ব’লে,
রাজপুত্র, কোথা হতে হঠাৎ এলে চলে৷৷
সাত সমুদ্র-পারের থেকে        বজ্রস্বরে এলে হেঁকে,
দুন্দুভি যে উঠল বেজে বিষম কলরোলে৷৷”

আজকাল বড় বড় সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়গুলো এলে শুধু দুন্দুভি বেজে ওঠে না, পূর্বাভাস পেলেই বেজে ওঠে মাইক। তাতে নিরন্তর চলে সতর্কতামূলক প্রচার, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার বার্তা৷ প্রশাসন ও সরকারী তরফে তৎপরতা চোখে পড়ে৷ মানুষও এখন আগের থেকে অনেক বেশি সচেতন৷ ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার যুগে প্রতি মুহূর্তের আপডেট পেয়ে যায় মানুষ। গুছিয়ে নিতে পারে, তৈরি করে নিতে পারে নিজেদের৷ তবু প্রকৃতিই সর্বশক্তিমান৷ তার প্রবল প্রতাপের কাছে মানুষ চিরকালই অসহায়৷ তাই প্রতিটি সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের সময়, শত তৎপরতা ও আগাম প্রস্তুতি সত্ত্বেও, মানুষের অসহায়তা, দুর্দশা এবং ক্ষয়ক্ষতির অন্ত থাকে না৷

এই করোনাকালেই খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে আমরা দু-দুটি অতি শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড়ের সাক্ষী থাকলাম– ‘তাউটে’, যা সপ্তাহখানেক আগেই ভারতের পশ্চিম উপকূলে ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়েছে এবং ‘ইয়াস’, যা প্রবল গতি ও শক্তি নিয়ে এক প্রমত্ত দানবের মতো নাচতে নাচতে ধেয়ে এসে ইতিমধ্যেই আছড়ে পড়েছে ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে৷ গতবছর মে মাসের এরকম সময়েই আমরা ‘আমফান’-এর ধ্বংসলীলা দেখেছি৷ দেখেছি মহানগর থেকে প্রান্তিক গ্রামের অসংখ্য মানুষের কষ্ট ও দুর্দশা, ত্রাণের জন্য কাতর আবেদন, সঞ্চয় ও সম্বলহীন হবার দুঃখ, স্বজন হারাবার কান্না৷ এসব দেখলে কথা হারিয়ে যায়, কবিত্ব কেঁপে ওঠে, অক্ষর পাথর হয়ে যায়৷

বাংলাদেশ ও ভারত– এই দু’টি দেশ বছর বছর বারবার বিধ্বস্ত হয়ে চলেছে একের পর এক অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে৷ সাম্প্রতিককালে ‘আয়লা’, ‘হুদহুদ’, ‘তিতলি’, ‘ফণী’, ‘বুলবুল’-এর তাণ্ডবলীলা আমরা দেখেছি৷ গ্রামের পর গ্রাম তছনছ হয়ে গেছে৷ প্রবল জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গেছে বাড়িঘর৷ জমির ফসল জমিতেই নষ্ট হয়েছে৷ দিনের পর দিন একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে থেকেছে কিছু কিছু অঞ্চল৷ বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় মানুষ পানীয়জলের অভাব বোধ করেছে৷ জেলার পর জেলা, একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের স্বাভাবিক জনজীবন ফিরতে সময় লেগেছে দু’সপ্তাহ থেকে দু’মাস, কোথাও কোথাও তারও বেশি৷ সুতরাং সহজেই অনুমেয় এই সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়গুলি মানুষের জীবনকে তো তছনছ করেই, সেইসঙ্গে মানুষের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকেও অনেকটা পেছনে ঠেলে দেয়৷

তাউটের ধ্বংসলীলা

আজকাল একটি ঝড়ের খবর প্রচারিত হবার পরদিন থেকেই বিভিন্ন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলিতে কবিতার ঝড় ওঠে৷ ‘আমফান’-এর সময় এই বিষয়টি ভীষণভাবে চোখে পড়েছিল৷ এখন প্রশ্ন হল, একটি ঘূর্ণিঝড় যখন হাজার হাজার মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে, তখন আমরা কী শুধুই সেই ঝড়ের রূপবর্ণনা করব? কষ্টে থাকা, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষগুলোর কথা ভাববো না? ভাবেন অনেকে নিশ্চয়ই৷ তাই তো এইসব দুর্যোগের দিনে বিভিন্ন ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, এন জি ও, ওয়েলফেয়ার স্যোসাইটিকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়৷ অনেকে মিলে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও ঝাঁপিয়ে পড়েন৷ প্রশাসনিক ও সরকারী সহায়তা তো থাকেই৷

নদী ও সমুদ্রতীরবর্তী মানুষের জীবন বড়ই কষ্টের৷ উদাহরণস্বরূপ সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষের জীবনের কথা বলা যায়৷ সারা জীবনই তারা কষ্ট করে উপার্জন করে সংসার চালায়৷ এদের কেউ মধু সংগ্রহকারী, কেউ কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহকারী, কেউ জেলে, কেউ বাগদা পোনা সংগ্রহকারী, কেউ কাঁকড়া সংগ্রহকারী, কেউ আবার ঝিনুক ও শামুক সংগ্রহকারী৷ অথচ একটা ঝড়ের থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বাড়িঘর ঠিক করতে করতে, নিজের পরিবারকে সামলে নিতে নিতেই এসে হাজির হয় আরেকটি ঝড়৷ তার ওপর নদী বা সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাসের ফলে দুর্দশা কয়েকগুণ বেড়ে যায়৷ মাটির বাড়ি ভেঙে পড়ে, গবাদি পশুরা লাচার হয়ে যায়, মারাও যায় অনেকক্ষেত্রে৷ ঘোড়ামারার মতো প্রত্যন্ত দ্বীপে যারা থাকে, তাদের কথা একবার ভাবুন৷ চতুর্দিকে শুধু জল আর জল৷ এইসব অঞ্চলে একটা ঘূর্ণিঝড় এলে, ঈশ্বরই বোধহয় মানুষের শেষ ভরসা৷তবে বিগত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি, সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রচুর ‘ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র’৷ আবহাওয়া দফতরও বেশ কিছুদিন আগেই এইসব ঘূর্ণিঝড়গুলির পূর্বাভাস এবং তাদের গতিপ্রকৃতির খবর সঠিকভাবে দিয়ে থাকে৷ যার দরুণ মানুষ, প্রশাসন, বিপর্যয় মোকাবিলা দল, সরকার, সবাই নিজেদের তৈরি করে নিতে পারে এবং প্রাণহানি প্রায় ঘটে না বললেই চলে৷ কিন্তু প্রান্তিক মানুষকে, দুর্গম এলাকায় থাকা মানুষকে কষ্ট ভোগ করতেই হয়, মুখোমুখি হতেই হয় ক্ষয়ক্ষতির৷

‘আমফান’-এর সময় আমরা দেখেছি কীভাবে কলকাতা কার্যত লণ্ডভণ্ড হয়েছিল৷ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে বেশ কিছুদিন অন্ধকারে ডুবে ছিল শহর৷ দেখা দিয়েছিল পানীয় জলের তীব্র সংকট৷ গাছের পর গাছ উপড়ে পড়েছিল রাস্তায়৷ মারা গিয়েছিল অনেক পাখি৷ অন্যদিকে প্রবল ঝড়বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল বইপাড়াতে৷ রাস্তায় জলে ভাসতে দেখা গিয়েছিল অগণিত বই৷ আমরা যারা বইয়ের গন্ধ নিতে ভালোবাসি, এ-দৃশ্য তাদের আহত করেছিল ভীষণভাবে৷

আব্দুল কালাম বলেছিলেন, “The Bay of Bengal is hit frequently by cyclones. The months of November and May, in particular, are dangerous in this regard.” আবার একটা সাইক্লোন অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড়, আবার সেই মে মাস, আবার সেই পরিচিত তৎপরতা ও উদ্বেগ। আবার দুশ্চিন্তা ও আশঙ্কাকে সঙ্গী করেই দিন কাটছে মানুষের৷ বৈদ্যুতিক সংবাদ-মাধ্যমগুলিতে সকাল থেকে রাত অবধি নিরবিচ্ছিন্নভাবে দেখানো হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত নানা খবরাখবর৷ তারই পাশাপাশি চলছে সরকারের সতর্কতামূলক বিজ্ঞাপনও৷ মাইকে বিপদের কথা জানিয়ে প্রচার চলছে, চলছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পৌঁছে দেবার কাজও৷ গোটা দেশ এই মুহূর্তে করোনা ভাইরাসের ‘সেকেন্ড ওয়েভ’-এর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে৷ প্রতিদিন হাজার হাজার সহনাগরিককে আমরা হারাচ্ছি৷ তার ওপর হঠাৎ করে হাজির হল আরেকটি অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’৷ এইবার চ্যালেঞ্জটা সত্যিই আরও কঠিন৷

করোনা অতিমারীর পর পর দু’টি ঢেউ এবং দীর্ঘ লকডাউনের কারণে মানুষের রুজিরোজগার এমনিতেই চুলোয় উঠেছে৷ কৃষক, ব্যবসায়ী, মৎসজীবী, হকার, মৃৎশিল্পী, অটো টোটো বাস ট্যাক্সিসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ির চালক, হোটেল ও পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষ কেউই আজ ভালো নেই৷ অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্রমশ কোণঠাসা হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত৷ গরীব মানুষের অবস্থা আরও শোচনীয়৷ রোজই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা৷ এইরকম একটা অসহনীয় ও ভয়াবহ পরিস্থিতেই জেলার বুকে ফুঁসতে ফুঁসতে ধেয়ে এল ইয়াস, আরেকটা ভয়ঙ্কর শক্তিশালি ঘূর্ণিঝড়৷ ঝড় পরবর্তী পরিস্থিতিতে মানুষের দুর্ভোগ আর কষ্ট যে আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷ তবে আশার আলো দেখা যায় যখন ‘রেড ভলেন্টিয়ার’ এবং যুব সমাজ দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে৷

এই ভয়াবহ দুর্যোগের সময়ে, যখন গোটা দেশেই গণচিতা ও গণকবর চলছে, নদীতে ভাসছে একের পর এক মৃতদেহ, তার ওপর আছড়ে পড়েছে অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’, তখন আমরা কি শুধুই কাব্য করে ক্ষান্ত হব? ঝড়ের রূপ বর্ণনা করে কবিতা লেখার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হব? ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়বে যে মানুষেরা, যাদের বাড়িঘর ভেঙে পড়বে, যাদের গবাদি পশুগুলো অকাতরে মারা যাবে, যাদের একমাত্র সম্বল নৌকাটি হারিয়ে যাবে চিরতরে, যাদের ফসলের ক্ষতি হবে ভীষণরকম, তাদের পাশে কি আমরা দাঁড়াব না? লক্ষ লক্ষ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও দুঃখ-কষ্টের কথা কি আমরা একবারও ভাববো না? শুধুই লাইনের পর লাইন সাজিয়ে সৃজনভেলায় ভাসব?

ঘূর্ণিঝড়ের পরে ত্রাণের বিষয়টি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ৷ ‘আমফান’-এর সময় আমরা ত্রাণ নিয়ে নানা অভিযোগ ও বিশৃঙ্খলা দেখেছি৷ দেখেছি রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের মধ্যে চাপানউতোর৷ মানুষ যখন প্রকৃতির ধ্বংসলীলার মাঝে ত্রাণের জন্য আশা করে বসে আছে, হাহাকার করছে, তখন এটা একেবারেই কাম্য নয়৷ রাজনীতি ভুলে তখন সবার আগে মানুষের কথা ভাবা উচিৎ৷ এরকম সময়ে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ যাদের ভোট পেয়ে জনপ্রতিনিধিরা জিতেছেন, সেইসব মানুষের বিপদ ও কষ্টের সময় তাদের উচিৎ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের পাশে দাঁড়ানো৷

ঠিক এক বছরের ব্যবধানে আবার হাজির আরেক অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়৷ এবার সেই দানবের নাম ‘ইয়াস’৷ সেই প্রমত্ত দানব তাণ্ডবনৃত্য করতে করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে৷ কোভিডে আক্রান্ত যেসব রোগী হাসপাতালে অক্সিজেন সাপোর্টে রয়েছে, এই দুর্যোগের সময় তারা যাতে নিরবিচ্ছিন্নভাবে অক্সিজেন ও জরুরি পরিষেবাটুকু পায়, তা প্রশাসনকে সুনিশ্চিত করতেই হবে৷ এই কঠিন সময়ে সমস্ত দফতর, প্রশাসন, সরকার, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, এন জি ও এবং সমাজের বিভিন্ন বর্গের মানুষকে একযোগে এগিয়ে এসে উদ্ধারকাজ এবং সমস্ত রকম ত্রাণ নিয়ে বিপর্যস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে৷ প্রকৃতির সামনে মানুষ অসহায়, কিন্তু সহমর্মিতা ও সহযোগিতা নিয়ে মানুষকে পাশে দাঁড়াতেই হবে মানুষের৷ তাহলেই চাকা ঘুরবে, জীবন ঘুরে দাঁড়াবে৷

বর্তমানে শিলিগুড়ি নিবাসী লেখক ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর৷ পেশায় শিক্ষক৷ প্রথম দশকের উল্লেখযোগ্য কবি ও গদ্যকার সুমন মল্লিকের প্রকাশিত কবিতার বই আটটি৷ রয়েছে একটি অনুবাদ কবিতার বইও৷ ‘উত্তরের কবিমন’ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক৷ বর্তমানে ‘শিলিগুড়ি জংশন’ পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত৷ বিভিন্ন পত্রিকা, ওয়েবজিন, দৈনিক সংবাদপত্র এবং বহুল প্রচারিত মাধ্যমে লেখা প্রকাশিত হয়ে চলেছে৷ লিখছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকাতেও৷

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More