‘ভাই শীর্ষ তুমি কি অন্তর্যামী?’

উত্তম দত্ত

মানুষটিকে প্রথম দেখি কলকাতার রোটারি সদনের একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানে। স্মার্ট ঝকঝকে পাতলা চেহারা, সুন্দর পুরুষালি কণ্ঠস্বর, চেয়ারে বসার সপ্রতিভ ভঙ্গি, শান্ত ও নীচু স্বরে কথা বলার স্টাইল প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ করেছিল আমাকে। ‘শার্দূল সুন্দরী’র স্রষ্টার সঙ্গে সেখানেই প্রথম আলাপ। মনে আছে, আমিই নিজে থেকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। সেদিন বাড়ি ফিরে এসে নেড়ে চেড়ে দেখছিলাম তাঁর ‘সন্ধ্যারাতের শেফালি’, ‘ইথারসেনা’, ‘পরমনিধি’। অবাক হয়ে ভাবছিলাম কী অদ্ভুত বিষয়বৈচিত্র্য মানুষটির লেখায়। যিনি মিস শেফালিকে নিয়ে লিখতে পারেন, তিনিই আবার অনায়াসে লেখেন ‘প্রিন্স গোবর গোহ’ কিংবা ‘মাউন্ট রাধানাথ’এর মতো লেখা।

‘রাঢ় বনতলি’ ডাকে সেবার দুর্গাপুরে গিয়েছিলাম। ছিলাম বিশাল একটা হোটেলের ওপরতলায়। আমার ঠিক নীচের ফ্লোরে ছিল শীর্ষ। প্রতিদিন ব্রেকফাস্ট টেবিলে যাবার আগে মেসেজ করত : ‘ নীচে খেতে গেলাম। আপনিও আসুন।’
অসম্ভব মার্জিত তার স্বভাব। কখনও উচ্চকণ্ঠ হতে শুনিনি। কিন্তু আমাকে চমকে দিয়েছিল তার পড়াশোনার পরিধি। একদিন দুপুরে ভিড়ে ঠাসা গাড়িতে চলেছি অনুষ্ঠান-মঞ্চের দিকে। সঙ্গে গাদাগাদি করে বসা একগুচ্ছ কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক। আমি যথারীতি সামনের সিটে, ড্রাইভারের পাশে। পিছনে ধোঁয়া, চিৎকার, ঈষৎ টলোমলো খেউড় ও অবিন্যস্ত সংলাপ। শীর্ষ বলল : ‘আপনি বুদ্ধিমান, ভিড় এড়িয়ে আগেই সামনের সিটটা দখল করেছেন।’
আমি বললাম : ‘সম্ভবপরের জন্যে সব সময়ে প্রস্তুত থাকাই সভ্যতা’।
শীর্ষ অমনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠল : ‘আহা, শেষের কবিতা’। (এটা যে অমিত রায়ের সংলাপ তা ও ঠিক ধরে ফেলেছে)।

চলন্ত গাড়িতেই কথা হচ্ছিল এক সদ্য বিখ্যাত তরুণী কবিকে নিয়ে। একজন কবি চিৎকার করে তার যাবতীয় ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলে উঠল : ‘ও তো ভয়ংকর মিথ্যেবাদী। যা নয় তার দশগুণ বাড়িয়ে বলে। ‘
আমি একবার পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে বললাম: ‘মেয়েদেরই বিস্তর অলংকার সাজে এবং বিস্তর মিথ্যাও মানায়।’

এটাও আসলে রবীন্দ্রনাথ থেকে ঝাঁপা। বাকিরা কেউ কিছু না বলে হেসে উঠল। কিন্তু শীর্ষ ঠিক ধরে ফেলল: ‘আহা, ঘরে বাইরে’।
এভাবেই মানুষটি আমার বিস্ময়বোধের উপরে উপর্যুপরি পীড়ন করতে থাকে। ওর পড়াশোনার নিখুঁত দখল দেখে আরও মনোযোগী হয়ে পড়ি ওর প্রতি।

সেবার মঞ্চে ‘বাংলা কবিতার বিবর্তন’ বিষয়ে এক ঘণ্টার একটা ভাষণ দিয়ে মনে মনে ভাবছিলাম, উপস্থিত দর্শকদের সহ্যশক্তির উপর খুব অত্যাচার করে ফেললাম। কিন্তু আমাকে তাজ্জব করে দিয়ে গাড়িতে ফিরতে ফিরতে শীর্ষ বলল : আপনার এই চমৎকার বলা শুনে মনে হল, পরের জন্মে ঠিক বাংলা নিয়ে এম এ করব।’

সন্ধেবেলা জনা পাঁচ ছয় মিলে তরল আগুন নিয়ে বসা হল। সামনে এক প্লেট স্ন্যাক্স আর বাদামি পানীয়। পান না করেও এই জাতীয় আসরে বসে থাকার অভ্যেস আছে আমার। সকলের পানপাত্রে দ্বিতীয়বার ঢালা হচ্ছে। আমি দু’আঙুলে একটা বাদামের দানা প্লেট থেকে তুলে মুখে পুরে চিবোতে থাকি। সবাই নিজের ঘোরে ছিল। ঈষৎ আচ্ছন্ন। কিন্তু শীর্ষ হঠাৎ কৌতূহলী হয়ে মৃদুস্বরে জানতে চাইল : ‘আপনি খাচ্ছেন না?… খান না?… এখন খাবেন না? নাকি একেবারেই খান না?’
আমি একটু হেসে মাথা নাড়লাম দুপাশে। বুঝলাম, অল্প নেশা হলেও সে ঠিক লক্ষ করেছে আমার হাতে কোনও সোমপাত্র নেই।

‘এখন ডুয়ার্স’ পত্রিকার আমন্ত্রণে একবার শীতকালে গিয়েছিলাম ডুয়ার্সের মূর্তিনদীর তীরে আয়োজিত এক সাহিত্যবাসরে। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ছোটো বড় কবিদের দুর্দান্ত সমাবেশ ঘটেছিল সেবার। এসেছিলেন রণজিৎ দাশ ও সুধীর দত্তের মতো কবিরা। ছিলেন বিমল লামা আর বিপুল দাসের মতো বড় সাহিত্যিকেরাও। একপাশে মূর্তিনদী, তার ওপাশে ঘন অরণ্য। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত মুক্তমঞ্চে কবিতাপাঠ হচ্ছে। সেখানেই আবার দেখা হল শীর্ষর সঙ্গে। ‘আপনি’ বাদ দিয়ে বেমালুম ‘তুমি’ বললাম তাকে। ফিরে এসে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট দিয়েছিলাম আমাদের বাক-ব্যবহারে ‘আপনি-তুমি-তুই’ নিয়ে। তার শুরুতেই লিখেছিলাম : ‘আগে প্রায় সবাইকে আমি ‘আপনি’ বলতাম। কেউ বারণ করলে বাধ্য হয়ে ‘তুমি’তে নামতাম। এখন কেন জানি না ‘তুমি’ বলার প্রবণতা বাড়ছে আমার। সেদিন কথাসাহিত্যিক শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও দুম করে ‘তুমি’ বলে ফেললাম মূর্তি নদীর সান্ধ্য-উস্কানিতে। সেও মাথা নেড়ে দিব্যি মেনে নিল। অথচ ওর সঙ্গে পরিচয় মাত্র কদিনের।’

এর প্রতিক্রিয়ায় তৎক্ষণাৎ শীর্ষ আমাকে লিখেছিল ভারী সুন্দর একটি মন্তব্য, যা ওর মতো হৃদয়বান লেখকের পক্ষেই বলা সম্ভব :

‘উত্তমদা, আমার কন্যা ছোট থেকেই আমাকে তুই বলে। একদিন, তখন ক্লাস টু-থ্রি হবে, স্কুল থেকে ফিরে আমাকে বলল, “তোর সঙ্গে একটা দরকারি কথা আছে।”
মুখোমুখি বসে বললাম, কী কথা?
বলল, “আমি যে তোকে তুই বলি, এটা কি ভুল?”
বুঝলাম, স্কুলে বন্ধুদের কেউ হয়ত বলেছে। আমি বললাম, তুই আমাকে ভালবাসিস তো! তা হলেই হবে। তুই বললি, না তুমি, তাতে কিছু যায় আসে না।
শুনে, নিশ্চিন্ত হয়ে চলে গেল! ‘

এই হল শীর্ষ।

তার ‘শার্দূলসুন্দরী’ এক অসামান্য জনপ্রিয় বই। বাংলা সার্কাসজগতের এক অত্যন্ত বিস্ময়কর নারী এই কাহিনির মধ্যমণি। জাদুকর গণপতি চক্রবর্তী ও সার্কাসসর্বস্ব প্রিয়নাথ, উভয়েরর মাঝখানে সেই নারী সুশীলাসুন্দরী। ভালবাসার কাঙাল সে। তিনজনের পারস্পরিক সম্পর্কের এই অস্থির টানাপোড়েন বয়ন করা হয়েছে এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে।

তবু ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় তার ‘ইথারসেনা’র মতো আশ্চর্য উপন্যাস বাংলায় আর লেখা হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় স্বাধীন বাংলা বেতারের ওপর লিখিত তাঁর অলোকসাধারণ তথ্যভিত্তিক উপন্যাস ইথারসেনা এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। একটা যুদ্ধে সৈনিকদের পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও অনেক বড় একটা ভূমিকা থাকে। অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে শীর্ষ তুলে ধরেছেন তাঁদের কথা।

১৭ ডিসেম্বর ২০২০ ‘দেশ’এর গল্প সংখ্যায় পড়েছিলাম তার ‘বিষাদসিন্ধু’, যে গল্পের শেষে একটি চরিত্র বলছে: ‘আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করব, তার জবাব দেওয়ার পর তুমিও আমাকে একটা প্রশ্ন করবে।… একজন আর একজনের সম্বন্ধে জানতে পারব। আমাদের কী ভালো লাগে, কী খারাপ লাগে, সেসব জানতে হবে না? কথা না হলে জানব কী করে!’

এভাবেই শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায় আজীবন মানুষের সঙ্গে মানুষের অকপট সেতুবন্ধনের কথা বলে গেছেন।

‘দেশ’ পুজোসংখ্যায় (১৪২৭) তাঁর লেখা ‘পঙ্গপাল’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সে গল্পের শেষ অংশটুকুর বর্ণনা কখনও ভোলা যাবে না: ‘ওদের শরীর থেকে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। খিদের গন্ধ। সেই গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে আরও অনেক পঙ্গপাল আসছে। বাতাসে শোনা যাচ্ছে তাদের ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসার সাঁই সাঁই শব্দ। চাঁদের আলো ঢেকে দিয়ে আকাশ অন্ধকার করে ওরা আসছে। লাখ লাখ কোটি কোটি পঙ্গপাল। পেটে যাদের সর্বগ্রাসী খিদে।’

ভেতরে একটি আদ্যন্ত কবি-প্রাণ না থাকলে এমন অলৌকিক সুন্দর বর্ণনা সম্ভব নয়। আসলে শীর্ষ যত বড় সাংবাদিকই হোক ওর ভেতরে একটা লুকোনো কবি-সত্তা ছিল। সেটা ধরা পড়েছে তার কোনও কোনও গল্প উপন্যাসের পৃষ্ঠায়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সে তার সর্বশেষ পোস্টে লিখেছিল :

‘ওরে ঝড় নেমে আয়, আয় রে আমার শুকনো পাতার ডালে,
এই বরষায় নবশ্যামের আগমনের কালে॥
যা উদাসীন, যা প্রাণহীন, যা আনন্দহারা,
চরম রাতের অশ্রুধারায় আজ হয়ে যাক সারা–
যাবার যাহা যাক সে চলে রুদ্র নাচের তালে॥
আসন আমার পাততে হবে রিক্ত প্রাণের ঘরে,
নবীন বসন পরতে হবে সিক্ত বুকের ‘পরে।
নদীর জলে বান ডেকেছে কূল গেল তার ভেসে,
যূথীবনের গন্ধবাণী ছুটল নিরুদ্দেশে–
পরান আমার জাগল বুঝি মরণ-অন্তরালে॥’

এই গানটির প্রথম চারটি শব্দ : ‘ ওরে ঝড় নেমে আয়’। এই গানের শেষ কথাগুলি লক্ষ করে চমকে উঠলাম : ‘পরান আমার জাগল বুঝি মরণ-অন্তরালে॥’

ভাই শীর্ষ তুমি কি অন্তর্যামী? তুমি কি দেখতে পেয়েছিলে আসন্ন মৃত্যুর দেবতাকে? শুনতে পেয়েছিলে তাঁর রহস্যময় পদধ্বনি? তা না হলে ঘুমন্ত পরিজনদের পিছনে রেখে কেন নিশির ডাকে সাড়া দিয়ে অন্ধকার রাত্রিতে বাইরে গিয়েছিলে তুমি?

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More