হাসতে হাসতে মজার ছলে অ্যাবিউজ করছে মানুষ, প্রমাণ হল আরেকবার

সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায় 

মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হলে প্রথম কথা হয় আবহাওয়া কিংবা একে অন্যের চেহারা নিয়ে। মন নিয়ে কিন্তু কথা হয় না কখনও। হঠাৎ রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে, কেউ কাউকে জিগ্যেস করে না, মন কেমন আছে! অথচ এই সমাজ, মানুষ, পারিপার্শ্বিক সবকিছু তো সবচেয়ে বেশি করে প্রভাব ফেলে মনের উপর। এমনকী ওই যে চেহারা, সেই চেহারা নিয়ে করা মন্তব্যও তো সোজা গিয়ে ঢুকে পড়ে মনে। “আগের থেকে মনে হচ্ছে অনেকটা রোগা হয়ে গেছিস, শরীর খারাপ?” কিংবা “এত মোটা হলি কী করে রে, দরজা দিয়ে ঢোকা যাচ্ছে তো? দুটো চেয়ার দেব?” এই আপাত নিরীহ বাক্যগুলো কিন্তু আপনাকে বা আমাকে দাঁড় করায় আয়নার সামনে, সে আয়না কখনও কাচের আবার কখনও বা মনের। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা ভাবতে থাকি, খুব কি বাজে দেখাচ্ছে তবে? নিজেকে যেন বহিরঙ্গ দিয়ে নতুন করে মেপে নিতে চাই। কিন্তু আমাদের মনটাকে কেমন দেখাচ্ছিল তখন? সে নিয়ে ভাবিত নন অপরজন। কে এই অপরজন? যিনি জেনে বুঝে বা অজান্তে যেটা করছেন সেটাকে বলে ‘বডি শেমিং’ আর এই ‘বডি শেমিং’ (body shaming) যার অন্তর্ভুক্ত তাকে বলা যায় ‘লিঙ্গুইস্টিক অ্যাবিউস’। লিখিত বা কথ্যরূপে অন্য মানুষকে আঘাত করা।এইসব প্রসঙ্গ দৈনন্দিন নানা ঘটনাতেই উঠতে পারে, তবে সাম্প্রতিক সময় উঠছে এক ব্যক্তির ‘নাচ’কে ঘিরে। সম্প্রতি একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে কলকাতা শহরের প্রাক্তন মেয়র আর তাঁর বান্ধবী একটি ফোটোশ্যুট করছেন, আর তাতে বান্ধবী মহিলাটি একটি গানের সঙ্গে নাচছেন।

ট্রোলিংয়ের এই উল্লাসমঞ্চ অসহনীয় হলেও অপ্রত্যাশিত নয়

নাচের জন্য গানটি খুব উপযুক্ত ছিল কি না, বা একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও একজন প্রাক্তন অধ্যাপিকার কাছ থেকে সমাজ ঠিক কীরকম ব্যবহার আশা করে এইসব বিতর্কিত প্রশ্ন। সে আশা রাখা উচিত, নাকি ব্যক্তির ইচ্ছেই প্রাধান্য পাবে এও অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু যে প্রসঙ্গে এই ‘বডি শেমিং’এর কথা উঠল তা হল এই যে সেই নাচকে ঘিরে যে মন্তব্যগুলো ভেসে উঠল সোশ্যাল মিডিয়ায় তা ভয়ঙ্কর। কখনও আশঙ্কা প্রকাশ করা হল সেই নাচের কারণে বারান্দা ভেঙে পড়বে কিনা, আবার কখনও নৃত্যরতা প্রাক্তন অধ্যাপিকেকে তুলনা করা হল হাতির সঙ্গে। নানা রকম ছড়া, টিপ্পনিতে ভরে গেল কমেন্ট বক্স, যার বেশিরভাগটাই মহিলার চেহারা নিয়ে। অসুবিধের জায়গা এখানেই।

‘বডি শেমিং’ যে কেবল নারীরই করা হয় তা একেবারেই নয়, পুরুষেরও করা হয় এবং বহু ক্ষেত্রেই নারীর প্রতি করা বডি শেমিং নিয়ে তবু দুএকটি প্রতিবাদ শোনা যায়, পুরুষকে নিয়ে করা হলে সেটুকুও শোনা যায় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। তবে এ কথা ঠিক যে বহুদিন থেকেই এক বিশেষরকম চেহারার দাবি নারীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, সে দাবি সমাজের নাকি লালসার? আর সেই জন্যই বোধহয় আজও ধরে নেওয়া হয় একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারীর কম খিদে পায়। সম্প্রতি চলে গেলেন নারীবাদী ও সক্রিয় সমাজকর্মী কমলা ভাসিন, উনিও এই মতের (নারীর কম খিদে পাওয়ার) তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন ওঁর ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং জেন্ডার’ প্রবন্ধে।

সবচেয়ে সাংঘাতিক কথা এই যে এক্ষেত্রে বহু মহিলাকেও দেখা গেল জোর গলায় এই ‘বডি শেমিং’-এর পক্ষে কথা বলতে। স্পষ্ট করে লিখতে যে ‘মোটা’ হলে, হাসাহাসি করা যাবে না কেন’! এই মহিলাদের মধ্যে কেউ কেউ কবি, লেখক, উচ্চপদে চাকুরিরতা, এমনকী গবেষকও। এই ঘটনা যেন চোখে আঙুল দিইয়ে দেখিয়ে দিল, নতুন করে বোঝা গেল, কীভাবে পিতৃতন্ত্র ঢুকে থাকে পুরুষ নারী উভয়ের মধ্যেই। আর নিজেদের অজান্তেই এই পিতৃতন্ত্রের ধারক ও বাহক হয়ে জীবন কাটায় মানুষ। একজন মানুষ রোগা বা মোটা হয় নানান কারণে- স্ট্রেস, ডিপ্রেশন, থাইরয়েডের মতো অসুখে, অথবা ভিন্ন কারণে। আর সেই মানুষটির প্রতি কোনও খারাপ মন্তব্য ছুঁড়ে দিয়ে আমরা যেটা করি সেটা অ্যাবিউসই, যার থেকে একজনের অবসাদ আসতে পারে আসতে পারে অসুখও। বহু ক্ষেত্রে কাগজ খুললেই আমরা দেখতে পাই, চেহারার বদল ঘটানোর জন্য নানানরকম অবৈজ্ঞানিক ডায়েট অনুসরণ করে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন কেউ, আবার কেউ বা হয়ত প্রাণও হারাচ্ছেন। ফলে অ্যাবিউস মানে কেবল শারীরিক নিগ্রহ নয়, মারধোর নয়, তা শব্দেও হতে পারে, এমনকী হাসতে হাসতে, মজা করতে করতেও অ্যাবিউস করা সম্ভব। সাম্প্রতিক এই ঘটনা আমাদের আরও একবার আমাদের মনে করিয়ে দিল সেই নিষ্ঠুর সত্যিটাই। 

লেখিকা শূন্য দশকের বিখ্যাত কবি ও গদ্যকার। পেয়েছেন বাংলা আকাদেমি, সাহিত্য আকাদেমি যুব সহ একাধিক পুরস্কার

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More