বাংলাদেশে যা হল তা এক চক্রান্তের হিমশৈলের চূড়ামাত্র

0

অংশুমান কর

গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশে যা হয়েছে যে কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তার নিন্দা করবেন। করছেনও। কিন্তু কতগুলি প্রাণ চলে যাওয়া এবং কয়েকটি দুর্গাপ্রতিমা ও মণ্ডপ ধ্বংস হওয়াতেই এই নারকীয় ঘটনার পরিসমাপ্তি মনে করলে ভুল মনে করা হবে। এ এক গভীর পরিকল্পিত চক্রান্তের হিমশৈলটির চূড়ামাত্র।
কেবল এই উপমহাদেশেই নয়, বিগত এক দশক ধরে গোটা পৃথিবী জুড়েই মৌলবাদী শক্তির কাজকর্ম গতি পেয়েছে। প্রায়শই রাজনীতির মূলস্রোতে প্রকাশ্যে বা ঘুরপথে প্রবেশ করেছে মৌলবাদ। নিয়ন্ত্রণ করেছে রাজনীতির গতিপথ, রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড। বলা বাহুল্য, আমাদের দেশ ও বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। দু’টি দেশেই সাম্প্রতিক অতীতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। হয়তো মাত্রায় তা এদেশে বেশি। তাই প্রচারও পেয়েছে বেশি। দুঃখের এটাই যে, হিন্দু মৌলবাদকে যাঁরা দ্বিধাহীনভাবে আক্রমণ করেন, অনেক সময়েই মুসলিম মৌলবাদকে নিন্দা করতে গিয়ে তাঁরা থমকে যান। ভুলে যান যে, মৌলবাদকে আসলে কোনও ধর্মের সঙ্গেই যুক্ত করা যায় না। ভুলে যান যে, কোনও ধর্মই অন্য ধর্মাবলম্বীদের আক্রমণ করার বা অবজ্ঞা করার কথা বলে না। ভুলে যান যে, মৌলবাদ নিজেই একটি ধর্ম। তার একটিই মন্ত্র: কূপমণ্ডুকতা। ভুলে যান যে, মুনাফার সঙ্গেও মৌলবাদের এক গভীর সম্পর্ক আছে। আজ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় একথা বলার সময় এসেছে যে, হিন্দু মৌলবাদের মতোই সমান বিপজ্জনক মুসলিম মৌলবাদ বা ক্রিশ্চান মৌলবাদ। একথা মানতেই হবে যে, যদি এ দেশে সংখ্যাগুরুর একটু বেশি দায়িত্ব থাকে সংখ্যালঘুকে নিরাপত্তার আশ্বাস ও ভরসাটুকু দেওয়ার, তাহলে বাংলাদেশেও সংখ্যালঘুদের এই নিরাপত্তা ও ভরসা দেওয়ার দায়িত্ব সংখ্যাগুরুদেরই বেশি। সেই কাজে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরুরা যে সবসময় সফল হয়েছেন, এমনটা বলা যাবে না।
এটিও মানতেই হবে যে, কুমিল্লায় যে-ঘটনাটি ঘটেছে, সেই ঘটনাটির পরে যত দ্রুত যে পরিমাপে ওদেশের সরকারের প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত ছিল, তত দ্রুত এবং সেই পরিমাপের প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি। হলে, এই তাণ্ডব দু’দিন ধরে চলত না। দোষীদের কাউকে ছাড়া হবে না- একথা মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন ঠিকই, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তাঁর সরকার নড়েচড়ে উঠতে যে ঈষৎ দেরি করেছে সেই বিষয়ে সন্দেহ নেই। আশার কথা এই যে, কুমিল্লার ঘটনার মূল চক্রীকে শনাক্ত করা গেছে। ফেসবুকে নানা ধরনের ভিডিও ভাইরাল করছিলেন যাঁরা, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে প্রগতিশীল মানুষেরা পথে নেমেছেন। নিন্দা করেছেন এই ঘটনার। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে রক্ষা করার আবেদন করছেন। আশা করা যায় যে, বাংলাদেশে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসবে। দোষীরা শাস্তি পাবে।
কিন্তু, এই ঘটনা থেকে ফায়দা যাঁরা তোলার তাঁরা ফায়দা তুলে নিয়েছেন। এই বছরটি দেশভাগের (আমাদের স্বাধীনতারও) পঁচাত্তর বছর। দেশভাগ এবং দাঙ্গার স্মৃতিকে উসকে দিতে এই ধরনের একটি ঘটনা যে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন ছিল তা বলাই বাহুল্য। যে কুমিল্লায় ঘটনার সূত্রপাত, সেই কুমিল্লার পড়শি শহর আমাদের দেশের ত্রিপুরার আগরতলা। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে জিগ্যেস করছিলেন, কুমিল্লার এই ঘটনার সঙ্গে কি ত্রিপুরার আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের কোনওই যোগ নেই? কঠিন প্রশ্ন। উত্তরটি কিন্তু সোজা নয়। যোগ কি এই রাজ্যেরও নেই? শত চেষ্টা করেও গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে এ রাজ্যে দাঙ্গা লাগানো যায়নি। এইবার কি ওপারের উত্তাপে এপারকে পোড়ানো যাবে একটু? এই উদ্দেশ্য কি নেই কিছু পাকা মাথার? ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে রাজনীতির বৈতরণী পার হওয়া যাঁদের চিরকালের লক্ষ্য? অবশ্য শুধু এক পক্ষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এক ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন নেতাকে বামপন্থীদের কেউ কেউ পশ্চিমবঙ্গের গত বিধানসভা নির্বাচনে বিপত্তারণ মনে করেছিলেন। এই ঘটনার পরে তাঁর একটি বক্তৃতার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, তিনি পুরোনো ফর্মে। হুংকার দিচ্ছেন একজন মৌলবাদীর মতোই। বাঘের পিঠে সওয়ার হলে সেই বাঘ তো সওয়ারিকে একদিন পেড়ে ফেলবেই।
আসলে, এই বিভাজন সম্ভব হচ্ছে, কারণ সাম্প্রদায়িকতা রুখতে যে নিরবচ্ছিন্ন অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিচর্চার প্রয়োজন ছিল-দু’দেশেই সেই কাজটি গত কয়েক দশকে ব্যাহত ও অবহেলিত হয়েছে। এই অবহেলার রন্ধ্রপথেই প্রবেশ করেছে কালনাগিনী। একত্রে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীর বদলে আমরা যতই পৃথক পৃথকভাবে রবীন্দ্রজয়ন্তী আর নজরুল জন্মোৎসব পালন করেছি, ততই আমরা (হয়তো অনেকখানি নিজেদের অজান্তেই) প্রশ্রয় দিয়ে গেছি বিভাজনের রাজনীতিকে।
হিমশৈলের চূড়াটি দেখা গেছে। সতর্ক হওয়ার ও প্রতিরোধ করার এটাই আদর্শ সময়। যে কোনও ধরনের অপপ্রচার ও উসকানিমূলক বক্তব্যকে প্রতিহত করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, সংগঠিত সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের একটিই অস্ত্র। সেটি হল চেতনা। সঠিক সংস্কৃতির চর্চাই সেই অস্ত্রটিকে ক্ষুরধার করতে পারে।
You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.