মোদীর সামনে আর কোনও পথ খোলা ছিল না

0

দেবাশিস ভট্টাচার্য

সম্প্রতি উত্তর প্রদেশের নির্বাচন নিয়ে দুটি সংস্থার আগাম জনমত সমীক্ষার রিপোর্ট বেরিয়েছে। একটি করেছে সি-ভোটার। আর একটি করেছে পোলস্ট্যাট। যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে বিধানসভার মোট আসন ৪০৩। অর্থাৎ সরকার গড়ার জন্য ন্যূনতম ২০২টি আসন দরকার (UP Election 2022)। দুটি সংস্থাই তাদের সমীক্ষা রিপোর্টে বলেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সামান্য কয়েকটা আসনই বিজেপি বড়জোর বেশি পেতে পারে। ২০১৭-র তুলনায় যা ৬০-৬৫টি কম। প্রাপ্ত ভোটের শতাশের হিসাবেও ২০১৭-র বিধানসভা এবং ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় ৭-৮ শতাংশ কম আসবে বিজেপির ঝুলিতে। অর্থাৎ যোগীর পাঁচ বছরের শাসনের পর উত্তর প্রদেশে এমন অবস্থা নেই যে বিজেপি ক্ষমতা ধরে রাখছেই, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়।
এই অবস্থায় বাংলায় হারার পর উত্তর প্রদেশ নিয়ে কোনও ঝুঁকি আর নিতে চাইল না বিজেপি (BJP)। বাংলায় তাদের তীরে এসে তরী ডুবেছে। এরপর উত্তর প্রদেশেও কোনও অঘটন ঘটে গেলে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের লড়াই বিজেপির জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

উত্তর প্রদেশে ভোটের সমীকরণটা এখনও অস্পষ্ট। কৃষি বিল  বাতিলের ঘোষণায় তা নয়া মোড় নিতে পারে। কিন্তু তার আগেই নির্বাচনী অঙ্ক বেশ গোলমেলে ঠেকছিল বিজেপির কাছ। রাজ্যের জাঠ প্রধান পশ্চিমাংশে ২০১৭ সালে ভোটের আগে মজফ্ফরনগর দাঙ্গার জন্যই বিজেপি সুইপ করেছিল। এবার ওখানে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি ও চরণ সিংয়ের নাতি অজিত চৌধুরীর রাষ্ট্রীয় লোকদলের জোট হচ্ছে। এই জোটের পাশাপাশি তিন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষক বিক্ষোভ বিজেপিকে চিন্তায় ফেলেছে। কারণ, রাষ্ট্রীয় লোকদল মূলত কৃষকদের দল।

পাঞ্জাবে কংগ্রেসের অবস্থা একটা সময় ভালোই ছিল। এবার আপের অবস্থা এখন সেখানে খানিকটা ভালো। দুই সংস্থার পাঞ্জাব নিয়ে প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা রিপোর্টেও তা প্রতিফলিত হয়েছে। বিজেপি-আকালি জোট যেহেতু ভেঙে গিয়েছে, তাই গেরুয়া শিবির সেখানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিংয়ের সঙ্গে জোট করবে। কিন্তু যতই জোট হোক, উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড ও পাঞ্জাবে কৃষকদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে না পারলে বিজেপির ফল খারাপ হতে পারে। এটা দেরিতে হলেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বুঝেছেন।

কুশলী প্রধানমন্ত্রী এই তিন কৃষি আইন বাতিলের ঘোষণা মোক্ষম দিনে করলেন। গত বছরের ২৬ নভেম্বর থেকে দিল্লি সীমান্তে যে কৃষকরা বিক্ষোভ করছেন তাদের মধ্যে হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশের কৃষক থাকলেও বেশিরভাগই পাঞ্জাবের। তাই প্রধানমন্ত্রী আজ বলেছেন, পবিত্র গুরু নানকের জন্মদিনে আর বসে না থেকে বাড়ি ফিরে যান।

সবটা দেখে বলা যায়, নরেন্দ্র মোদীর এটা ওয়ান স্টেপ ফরওয়ার্ড, টু স্টেপ ব্যাকওয়ার্ড এবং ভারতে ভোট বড় বালাই। মোদী বুঝেছিলেন, বাংলার পর উত্তর প্রদেশে হেরে গেলে দলে, সরকারে তাঁর কর্তৃত্ব, একাধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। কোনও সন্দেহ নেই, বিজেপিকে এযাত্রায় ক্ষমতায় আনা, সরকারে টিকে থাকার আসল কারিগর মোদী।

তার উপর কৃষি বিল নিয়ে বিজেপির সঙ্গ ছেড়ে গিয়েছে আকালি দল। এনডিএ ছেড়েছে শিবসেনা। নীতীশ কুমারেরও মতিগতি ভালো না। নানা ইস্যুতে তিনি বিরোধীদের মতোই প্রশ্ন তুলছেন। সব মিলিয়ে মোদীর পক্ষে জেদ ধরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছিল। জিনিসপত্রের দরদাম নিয়ে বেশ কয়েক মাস যাবৎ দেশবাসী ফুঁসছে। পেট্রল-ডিজেলের দাম কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধিতে খানিকটা লাগাম দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তাতে জন-অসন্তোষ দূর হয়নি। আগামী বছরের গোড়ায় পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন আছে। আগামী বছরের শেষে মোদী-অমিত শাহের নিজেদের রাজ্য গুতরাটে ভোট। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন যে মোদীর পক্ষে কৃষি বিল নিয়ে জেদ ধরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছিল।
(লেখক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

 

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকাসুখপাঠ

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.