কৃষকের জয় ভয় ধরালো সব দলেই

0

অমল সরকার

তিন বিতর্কিত কৃষি আইন (Farm Laws) বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (PM Narendra Modi) শুক্রবার বলেছেন, ‘আমি দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইছি। আমরা কৃষি আইন তিনটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ, প্রদীপের আলোর মতো সত্য সব কৃষক (Farmers) ভাইকে আমরা বোঝাতে পারিনি। আন্তরিক ও পবিত্র মন নিয়ে স্বীকার করছি, আমাদের চেষ্টায় নিশ্চয়ই ভুল ছিল।’

নরেন্দ্র মোদীকে তাঁর সাত বছরের জমানায় আর কখনও এভাবে নতজানু হতে দেখা যায়নি, যা শুক্রবার দেশ প্রত্যক্ষ করেছে তিন বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিলের ঘোষণাকালে। মোদীর এই বয়ানকেই এখন হাতিয়ার করছে বিজেপি। তারা দেখাতে চাইছে, প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি এতে আরও মজবুত হল। মোদীর প্রধান বলভরসা অমিত শাহ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রনায়কোচিত। অন্যদিকে, বিরোধীদের বক্তব্যের নির্যাস, দাম্ভিক, একনায়ক, স্বৈরাচারী নরেন্দ্র মোদীর উচিত শিক্ষা হল।

নরেন্দ্র মোদীর নতজানু হওয়ার কারণ দিনের আলোর মত স্পষ্ট। পাঞ্জাবের পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশ নিয়েও বিজেপির দিন দিন চিন্তা বাড়ছে। রামমন্দির নির্মার্ণ, হিন্দু-মুসলিম বিভাজন ইত্যাদি চেনা অস্ত্রের ধার কমেছে, বুঝেছে বিজেপি। আর লখনউয়ের কুর্সি হাতছাড়া হয়ে গেলে দিল্লির গদি যে টলমল করতে শুরু করবে কে তা না জানে। তাই এই সহনশীলতার ভালোমানুষি।

কিন্তু বিরোধী নেতা-নেত্রীরা কেউই হয়তো স্বীকার করবেন না, যে মোদীর পরাজয়ে তারা যেমন উল্লসিত, তেমনই কৃষকের এই বিজয় তাদের জন্য এক অশনি সংকেত। তা হল, রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ার বাইরে সমাজের নানা স্তরের মানুষের যোগদানের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন দানা বেঁধেছে। তাই-ই শুধু নয়, তা বিরাট সাফল্য অর্জন করল। স্বাধীনতার পরবর্তী ৭৫ বছরে এমন সাফল্যের নজির কম আছে।

সাম্প্রতিক অতীতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বিরোধী আন্দোলনও ছিল এমনই তেজি, জেদি নাগরিক সংগ্রামের দৃষ্টান্ত। শেষ পর্যন্ত আইনটি বাতিল করা না গেলেও নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরা সেটি কার্যকর করার আগে এখন দশবার ভাবছেন। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল সিএএ-র বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। মুখ্যমন্ত্রী মাইলের পর মাইল প্রতিবাদী পদযাত্রা করেছেন। বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দলের অভাবনীয় সাফল্যের পিছনে সিএএ বিরোধী আন্দোলনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানবেন কি না জানিনা, আইনটির বিরুদ্ধে তৃণমূল এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলি যত না প্রতিবাদ সংগঠিত করেছে তার চাইতে অনেক বেশি করেছে নির্দলীয় নাগরিক উদ্যোগ। ‘নো ভোট টু বিজেপি’ ট্যাগ লাইনে যে প্রচার সামাজিক সংগঠনগুলি করেছে, সময়ের সমীকরণে ভোট বাক্সে তার সুবিধা পেয়েছে তৃণমূল। যে কারণে বিজেপি, এমনকী কংগ্রেস, সিপিএমও ওই আন্দোলনকে তৃণমূলের স্পনসর বলে গালমন্দ করতে ছাড়েনি।

তাই বলে তৃণমূলের স্বস্তিতে থাকার অবকাশ নেই। কারণ, উদীয়মান নাগরিক আন্দোলনের চরিত্র অনেকটাই আমফান, ইয়াসের মতো। আচমকাই মুখ ঘুরিয়ে উৎস মুখে ধাওয়া করে। কারণ, আন্দোলনগুলি জনস্বার্থবাহী ইস্যুভিত্তিক। ফলে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ স্লোগানে গলা মেলানো মানুষের কথা আগামী দিনে কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে, বিশেষ ইস্যুতে তৃণমূলের কাছে বেসুরো ঠেকবে না হলফ করে বলা মুশকিল। কারণ, এখানে কোনও দল বা জোটের নীতি, আদর্শ, নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষার দায় নেই।

সেই কারণেই শাসক-বিরোধী নির্বিশেষে সব দলই তলে তলে নাগরিক আন্দোলন নিয়ে শঙ্কিত। কারণ, দুটি। এক, জনস্বার্থ সুরক্ষিত রাখার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলের অপরিহার্যতা দিন দিন কমছে। অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে তাদের গুরুত্ব। দুই, দুর্নীতি, স্বজনপোষন, নীতিহীনতা, দলবাজি, দল ভাঙানোর রাজনীতি, পরিবারতন্ত্র, ইত্যাদি ঘিরে বেশিরভাগ মানুষ রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি বীতশ্রদ্ধ। রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় জন আন্দোলন শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে।

তাই বলে মানুষ প্রতিবাদ বিমুখ, ধরে নেওয়া ভুল। বরং, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণেই জেগে উঠছে আন্দোলনের নয়া চেহারা। যে আন্দোলনের এক বা একাধিক প্রধান মুখ আছে, কিন্তু একক কর্তৃত্ব নেই। অর্থাৎ ওয়ান অ্যামাং ইকুয়াল। বাংলাদেশে হালে গণ অধিকার পরিষদ নামে নতুন এক দলের জন্ম হয়েছে। দলটি মূলত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সাবেক নেতা-কর্মীদের নিয়ে গঠিত। সে দেশের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান দলগুলি জন-সাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ। এ দেশের আপের জন্মবৃত্তান্তও আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়।

ভোটের স্বার্থ থাক বা না থাক, আন্দোলনের চাপেই নরেন্দ্র মোদীর মতো মানুষকে কৃষি আইন নিয়ে শেষ পর্যন্ত পিছু হঠতে হল। প্রশ্ন হল, কৃষি আইনের থেকে জিনিসপত্রের দাম কি কম বড় সমস্যা? আইন তিনটির বিরুদ্ধে মূলত পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তর প্রদেশ এবং রাজস্থানের একাংশের কৃষকেরা আন্দোলন করছিলেন। অন্যদিকে, জিনিসপত্রের দাম নিয়ে গোটা দেশের মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। আর কে না জানে মূল্যবৃদ্ধির যন্ত্রণা থেকে রেহাইয়ের চাইতে বড় জনস্বার্থ আর কিছু হতে পারে না। জুতো মেরে গরুদানের মতো মাসের পর মাস, দিনের পর দিন পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়িয়ে নিয়ে সামান্য কমানোর ভালোমানুষি করে নিশ্চিন্তে আছেন নরেন্দ্র মোদী।

প্রধানমন্ত্রী একবার কথায় কথায় জানিয়েছিলেন, এই বয়সেও তাঁর ডিপ স্লিপ হয়। বালিশে মাথা রাখা মাত্র ঘুমিয়ে পড়েন। প্রধানমন্ত্রীর আরও সৌভাগ্য হল, অপদার্থ বিরোধী দলগুলি এমন কোনও আন্দোলনের মুখে তাঁকে দাঁড় করাতে পারছে না যাতে তাঁর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে।

মোদী ক্ষমতায় আসার আগে ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে পেট্রল-ডিজেলের দামে বাড়তি কর চাপানোর নিয়ে সরব ছিলেন। দেখা যাচ্ছে, তাঁর সরকার কর বাবদ অনেক বেশি অর্থ নাগরিকের পকেট কেটে নিচ্ছে। অন্যদিকে, অসহিষ্ণুতার চাদরে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে গোটা দেশ। বিভাজনের রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক মন্তব্য করার যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে গেরুয়া শিবিরে। সেই সঙ্গে নানা ভাবে নাগরিক অধিকার খর্ব করার প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে। কেন্দ্রের শ্রম আইনের আধারে ওই সব রাজ্যে শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার খর্ব করে মালিকের হাতে বেতন, চাকরি ছাঁটাইয়ের চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রদান করা হচ্ছে। অধিকার শব্দটি নিয়েই যেন বিজেপির আপত্তি।

এই অসহনীয় পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ পথে-ঘাটে, অফিসকাছারিতে, সামাজিক মাধ্যমে টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু রাজপথে প্রতিবাদ নেই। করোনার কড়াকড়ি নিছকই অজুহাত। কলকারখানার সামনেও নেই আপোসহীন লড়াই-সংগ্রাম। ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলি তাই বছর বছর ধর্মঘটের ডাক দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। আসলে শ্রমিক-কর্মচারী, ছাত্র, শিক্ষক, লেখক-শিল্পী প্রভৃতি সমাজের নানা অংশের সঙ্গে রাজনৈতিক দলেক নীতি-আদর্শের সেতুবন্ধনের কাজ ট্রেড ইউনিয়নের মতো যে গণ সংগঠনগুলি করত, লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে অনেক কাল আগেই সেগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে। আসল কারণ, রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিই মানুষের আস্থাহীনতা।

দুর্ভাগ্যের হল এই পরিস্থিতিই এখন মোদীর পৌষমাস। বিরোধী দলগুলির প্রতি মানুষের অবিশ্বাসকে দিন দিন আরও খুঁচিয়ে তুলতে তিনি অস্ত্র করেছেন কেন্দ্রীয় সরকারের নানা এজেন্সিকে। এমন কোনও রাজ্য নেই যেখানে বিরোধী দলের প্রথমসারির নেতা-মন্ত্রীর ডেরায় সিবিআই-ইডি-আয়কর বাহিনী হানা দেয়নি।

তবে এই কৌশলে মোদীও বেশিদিন নিজেকে আড়াল করতে পারবেন না। ক্রমবর্ধমান নাগরিক আন্দোলন একদিন এই বিরোধী পরিসরেরও দখল নেবে। হয়তো সেই কারণেই মোদীর বিশেষ আস্থাভাজন, দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল দিন কয়েক আগে হায়দরাবাদে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘নাগরিক সমাজই এখন সবচেয়ে বড় যুদ্ধাস্ত্র। নাগরিক সমাজকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় স্বার্থে আঘাত করার চেষ্টা হতে পারে।’

সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্তের সময় দেশ বিরোধী শক্তির এমন চেষ্টা অসম্ভব নয়। সমস্যা অন্যত্র। লাভ জেহাদ, ঘর ওয়াপসির মতো গেরুয়া শিবিরের বিভাজন তত্ত্ব প্রচারেরও প্রধান হাতিয়ার সামাজিক মাধ্যম এবং ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অসংখ্য সংগঠন। কৃষক বিদ্রোহ, সিএএ বিরোধী আন্দোলনের মতো নাগরিক উদ্যোগগুলিই সেখানে গেরুয়া বাহিনীর প্রধান প্রতিপক্ষ। মোদীর ভারতে তাই সরকার বিরোধী আন্দোলনকারীদের গায়ে দেশ-বিরোধী তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় স্বার্থ আর সরকার ও শাসক দলের স্বার্থের কোনও ফারাক থাকছে না।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.