ত্রিপুরায় তৃণমূল আসলে কোচবিহারে ওয়াইসির হোর্ডিংয়ের মতো

0

শোভন চক্রবর্তী

দৃশ্য-১
স্থান, কোচবিহার শহর। কাল, উনিশের লোকসভা নির্বাচনের পরে। প্রেক্ষাপট, বাংলায় ১৮টি আসন জিতেছে বিজেপি। সেই সময়েই বিধানসভা উপনির্বাচন হয়েছিল বাংলা লাগোয়া বিহারের কিষাণগঞ্জে। সেই আসনে জিতেছিল, হায়দরাবাদের কট্টর ইসলামিক দল অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই ইত্তেহাদুল মুসলিমিন। যার নেতার নাম আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। সেই জয়ের দোলা লেগেছিল লাগোয়া এলাকাতেও। একদিন সকালে হঠাৎ দেখা যায়, কোচবিহার শহর, দিনহাটা, তুফানগঞ্জের রাস্তায় ঝুলছে আসাদউদ্দিনের ছবি। তাতে বড় বড় হরফে লেখা, ‘এবার লক্ষ্য বাংলা!’

দৃশ্য-২
সেসব কাট আউট তখনও জ্বলজ্বল করছে। দু’চার দিনের মধ্যেই কোচবিহারে কর্মিসভা করতে গেলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলনেত্রী হিসেবে সেই কর্মিসভায় দিদি দুটো কথা বলেছিলেন। এক, আপনারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়াটা কম করুন (কারণ তখন কোচবিহারের তৃণমূল আর গোষ্ঠী কোন্দল প্রায় সমার্থক)। দু’নম্বর কথা বলেছিলেন, একটা দল খুব লাফালাফি করছে। মুসলমানদের ভুল বুঝিয়ে তারা ভোট নিয়ে নিচ্ছে। বিজেপি নেবে হিন্দুদের ভোট, ওরা নেবে মুসলমানদের ভোট, আমরা কি তবে আঙুল চুষব? সেইসঙ্গে মমতা এও বলেছিলেন, রাস্তায় একটা দলের অনেক হোর্ডিং দেখলাম। ওদের একদম বিশ্বাস করবেন না। ওরা ভোট কেটে বিজেপির সুবিধা করে দেয়। ওরা ভোট কাটুয়া। খুব সাবধান। তারপর অবশ্য নিজামের শহর থেকে ওয়াইসি জবাব দিয়েছিলেন, সংখ্যালঘু ভোটে তৃণমূলের জমিদারি আছে নাকি!

দৃশ্য-৩
একুশের ভোটে বাংলায় তৃণমূল একাই ২০০ পার করেছে। ছন্নছাড়া বিজেপি। তারপর সংসদের বাদল অধিবেশনের সময়ে কয়েকদিনের জন্য দিল্লি গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে গিয়ে শরদ পাওয়ার, সনিয়া গান্ধী, শরদ যাদব-সহ আরও অনেকের সঙ্গে দিদি দেখা করলেন। কখনও সনিয়ার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বললেন, কখনও রাজধানীর অন্যত্র বললেন—লক্ষ্য চব্বিশে বিজেপিকে হঠানো।

এ কথা বলে শুধু মমতা থেমে যাননি। বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর কোনও ইগো নেই। চব্বিশে নরেন্দ্র মোদীকে গদিচ্যুত করতে গেলে নেতৃত্বের ব্যাটন কার হাতে থাকল তা নিয়ে তিনি বিন্দুমাত্র লালায়িত নন। তাঁর লক্ষ্য দেশ বাঁচানো। যে ‘দানবীয় শক্তি’ দেশ শাসন করছে, সেই কারাগার থেকে মুক্তি চাই! মমতা একথা বলতে গিয়ে এও বলেছিলেন, যে যেখানে শক্তিশালী সে সেখানে লড়ুক। বাংলায় তৃণমূল শক্তিশালী।

হ্যাঁ একথা বলার অপেক্ষা রাখে না বাংলায় এখন তৃণমূল শুধু শক্তিশালী নয়, মহাশক্তিশালী। ‘৯৮-এ পোঁতা ছোট্ট চারা গাছটা একুশে বিরাট বটবৃক্ষ। মমতার ঘোষণা ছিল, কোভিড মিটলে, সব দলকে নিয়ে ব্রিগেডে সভা ডাকবেন। সেখানে ডাকবেন কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকেও। সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়াই করেই তাঁর উত্থান। দিদি বোঝাতে চেয়েছিলেন, এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতি আর বৃহত্তর স্বার্থে কেরলের সিপিএম সরকারের মুখ্যমন্ত্রীকে ডাকতেও তাঁর কোনও জড়তা নেই। কারণ একটাই, দেশ বাঁচাতে হবে!

সেই দিল্লি সফরে মমতা-মোদী বৈঠক হয়েছিল। হতেই পারে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাজ্যের দাবিদাওয়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী দেখা করবেন এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই।
কিন্তু…
দিল্লি থেকে ফেরার কয়েক সপ্তাহ কাটতে না কাটতেই দেখা যায় তৃণমূল সুর বদলাচ্ছে। হঠাৎ করেই প্রথমে কংগ্রেসকে আক্রমণ করা শুরু করেন মমতা, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা। সর্বভারতীয় স্তরে যে কংগ্রেস একাধিক রাজ্যে সরকার চালাচ্ছে, একাধিক রাজ্যে বিরোধী দল, ২৫০-এর বেশি লোকসভা আসনে যে দলের প্রবল উপস্থিতি—তৃণমূল মনে করছে সেই দলকে দিয়ে কিস্যু হবে না। শুধু মনে করছে না, তা বলছেও সোচ্চারে। চোখা চোখা শব্দে।

কিন্তু কথা ছিল যে যেখানে শক্তিশালী সে সেখানে লড়বে! ত্রিপুরায় বিরোধী দল সিপিএম। তৃণমূল মনে করছে, সিপিএম পারবে না। গোয়ায় বিরোধী দল কংগ্রেস। গত নির্বাচনে একক বৃহত্তম দলও বটে। কিন্তু তৃণমূল বলছে, কংগ্রেস পারবে না। পারবে কে? তৃণমূল। অভিষেক বলেছেন, অন্যরা যদি পারত তাহলে তৃণমূলের অন্য রাজ্যে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না।

ত্রিপুরার বাস্তবতা কী? যে কোনও সুস্থ মানুষ এটা বুঝবেন, ত্রিপুরায় লড়াই বিজেপির সঙ্গে সিপিএমের। এখনও সেটাই বাস্তব। তৃণমূল সেখানে নেহাতই শিশু। বড় জোর কিছু ভোট পেতে পারে। তাও সেটা আগরতলা শহরে। তার বাইরে বেরোলে তৃণমূলের কিচ্ছু নেই। যে তৃণমূল বাদল অধিবেশনের সময়ে বলল, পিনারাইকে ব্রিগেডে ডাকবে, নেতৃত্বের ব্যাটন নিয়ে লালায়িত নয়, শীত অধিবেশনের আগে সেই তৃণমূলের পাল্টে গেছে মত আর বদলে গেছে পথ। হরিয়ানায় বিজেপির মনোহরলাল খট্টর সরকারকে গতবার কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল বর্ষীয়ান ভুপেন্দ্র সিং হুডার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস। মমতা মঙ্গলবার দিল্লিতে দাঁড়িয়ে হিরিয়ানার তৃণমূলের ভিতপুজো করেছেন। দলে এনেছেন প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অশোক তানওয়ারকে। এবারের দিল্লি সফরে সনিয়ার সঙ্গে দেখাই করেননি মমতা। উল্টে বুধবার বলেছেন, দিল্লি এলেই সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে হবে এটা কোথায় লেখা আছে? সংবিধানে এমন ধারা আছে নাকি?

কী এমন ঘটনা ঘটল যে এত দ্রুত চব্বিশের লক্ষ্যে কৌশল বদল করল তৃণমূল। কেন এই ছবি নির্মাণের চেষ্টা হচ্ছে, আর কেউ লড়ছে না? যা করছে তৃণমূলই করছে। গোটা দেশ জানল ত্রিপুরায় পুরভোট হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টে মামলা, অমিত শাহের দফতরের সামনে ধর্না, শাহকে দিল্লিগামী মমতার তোপ, দিদির বিমান যখন মাঝ আকাশে তখন অমিত শাহের সময় দেওয়া এবং তৃণমূল সাংসদদের বিবৃতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন ত্রিপুরায় আর সন্ত্রাস হবে না—এ সবই কি ঘটনার পরম্পরা নাকি সুনিপুন চিত্রনাট্য? যা হয়তো আগে থেকেই ঠিক হয়ে রয়েছে!
রাজনীতিতে সামনাসামনি যা দেখা যাচ্ছে সেটাই সব নয়। তার বাইরেও যা কিছু দেখা যাচ্ছে না সেটাও ধারণা নির্মাণে কাজ করে। প্রশ্ন হল কে কী ভাবে দেখবেন। অনেক সময়ে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু চোখ কচলে নিয়ে ফের তাকালে আরও কিছুটা স্পষ্ট হয়। কৌতূহল জাগে।

এই যেমন অনেকের মধ্যেই এখন কৌতূহল জাগছে, তৃণমূল কি সত্যিই বিজেপিকে গদিচ্যুত করতে চায়? নাকি বিজেপি চায় সর্বভারতীয় স্তরে কংগ্রেস নয় তৃণমূলই হোক প্রতিপক্ষ! এ ব্যাপারে কোনও তথ্য প্রমাণ স্কডল্যান্ড ইয়ার্ডও পাবে না। কিন্তু কৌতূহল তো আর প্রমাণের অপেক্ষায় বসে থাকে না। সে ছুটে বেড়ায়। প্রশ্ন গুলিয়ে ওঠে, কেন গোয়া ফরওয়ার্ড পার্টির যে নেতাকে দল তৃণমূলের সঙ্গে জোট আলোচনা করতে পাঠাল সেই তাঁকেই তৃণমূল জোড়াফুলের ঝান্ডা ধরিয়ে দিল। কেন পরপর কংগ্রেস থেকে আসা দুই ভিন রাজ্যের নেতানেত্রীকে বাংলা থেকে রাজ্যসভার টিকিট দিল দিদির দল? দুটো অঙ্ক খুব প্রাসঙ্গিক। এক, বিজেপি এটা জানে সর্বভারতীয় স্তরে কংগ্রেস দুর্বল হলে তাদের কী ফায়দা। আর তৃণমূলের সর্বভারতীয় হওয়ার আকাঙ্খাও এখন মারাত্মক! বিশেষ করে অভিষেক দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরের পর্যায়ে। একইসঙ্গে এটাও বাস্তব, বাংলায় শাসকদলের নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় এজেন্সি যে চিতার গতিতে ছোটা শুরু করেছিল বিভিন্ন কেলেঙ্কারির উৎস খুঁজতে, হঠাৎ সেই চিতা কচ্ছপে পরিণত হয়েছে। নিন্দুকরা সব কিছুকে মিলিয়ে দেখছেন।

ফলে গোয়ার রাস্তায় মমতার হাসিমুখে ছবি দেওয়া নভি সকালের ঢাউস হোর্ডিং হোক বা আগরতলার রাস্তায় তৃণমূলের তৃণমূলের ঢক্কানিনাদ—সবটাই ওই প্রথম দৃশ্যের মতো। কোচবিহারের রাস্তায় মিমের হোর্ডিং যেমন ছিল।

বিধানসভা ভোটের আগে বাংলায় সিপিএমের প্রচারে এসেছিলেন মানিক সরকার। বর্ধমানের সেই সভা থেকে ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা তথা সিপিএম পলিটব্যুরোর বর্ষীয়ান সদস্য বলেছিলেন, যান গিয়ে ত্রিপুরায় দেখে আসুন, সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। সেই কথাকে বাংলায় সিপিএম যা না প্রচার করেছিল তার চারগুণ প্রচার করেছিল তৃণমূল। মমতা একাধিক সভায় বলেছিলেন, শুনেছেন তো মানিক সরকার কী বলেছেন। ত্রিপুরার সর্বনাশ করে দিয়েছে বিজেপি!

কিন্তু হঠাৎ এখন তৃণমূল বলতে শুরু করেছে ত্রিপুরায় সিপিএম পারবে না। ছ’মাস আগে যে পার্টির নেতার বক্তৃতা উদ্ধৃত করে ভাষণ দিচ্ছিলেন দিদি।

ল্যাবরেটরিতে ফর্মুলা বানিয়ে ধারণা নির্মাণের চেষ্টা হচ্ছে বটে। কিন্তু তা বোধহয় বাস্তব নয়। ত্রিপুরায় বিপ্লব দেবের বিরুদ্ধে বিরোধী মুখ এখনও মানিক সরকারই। যাঁকে আগরতলা থেকে লংতরাই চেনে। সুবল ভৌমিকরা সেই ওজনের ধারেকাছে আসেন না। বিজেপির লড়াইও বাস্তবের মাটিতে সিপিএমের বিরুদ্ধেই। কিন্তু চিত্রনাট্যে বোধহয় অন্য সংলাপ লেখা রয়েছে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকাসুখপাঠ

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.