মহানগরীর এই জল যন্ত্রণা কবে কমবে

0

প্রতিবছরই বর্ষায় নিয়ম করে কয়েক দিন জলবন্দি (water logging) হয়ে থাকে কলকাতা। আবহমান কালের এই ছবিটা এবছরেও বদলাল না।  পুরসভা আগের মতোই প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে, এবার আর শহরের পথঘাটে জল দাঁড়াবে না। কিন্তু মঙ্গলবার দুপুর অবধি পাটুলি থেকে বাইপাস, ঠনঠনিয়া, মোমিনপুর সহ উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্য কলকাতার এক বিরাট অংশ জলমগ্ন হয়ে আছে। কোথাও হাঁটুজল, কোথাও গোড়ালি অবধি জল পেরিয়ে যাতায়াত করছে মানুষ। এই কোভিড পরিস্থিতিতে তপসিয়ার এক টিকাকরণ কেন্দ্রেও জমে আছে জল। তার মধ্যেই মানুষ লাইন দিয়ে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য প্রতীক্ষা করছেন। মুকুন্দপুরের যে অঞ্চলে অনেকগুলি হাসপাতাল রয়েছে, সেখানেও জল জমে আছে। রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা সমস্যায় পড়ছেন।

গত সোমবার রাত ১০ টা থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত কলকাতায় বৃষ্টিপাত হয়েছে গড়ে ১২৭ মিলিমিটার। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে ধাপায়। ১৯০ মিলিমিটার। তপসিয়ায় বৃষ্টি হয়েছে ১৪৯ মিলিমিটার। উল্টোডাঙায় বৃষ্টি হয়েছে ১৩৯ মিলিমিটার।

শেষ বর্ষার অতি ভারী বর্ষণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে পুরো দক্ষিণবঙ্গ। সপ্তাহের শুরুর দিনেই হাওড়া, দুই ২৪ পরগণা, নদিয়া ও মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অংশের মানুষ জল যন্ত্রণায় নাকাল হয়েছেন। দক্ষিণবঙ্গে ৫৭৭ টি ত্রাণশিবির খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ১ লক্ষ ৪১ হাজার মানুষ। নবান্নয় চালু হয়েছে কন্ট্রোল রুম।

সোমবার বিকালে কলকাতা পুরসভা বলেছিল, দুপুর সাড়ে তিনটেয় লকগেট খুলে দেওয়া হয়েছে। সাড়ে আটটার মধ্যে জল বেরিয়ে যাবে। কিন্তু পরে ফের জোরালো বৃষ্টি আসে। পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে।

মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত পুরসভা তেমন আশার কথা শোনাতে পারেনি। পুরকর্তারা বলছেন, সোমবার সারা দিন পাম্প চালিয়ে শহরে জমে থাকা জল ফেলা হয়েছে গঙ্গায়। কিন্তু পাম্পের জল ব্যাক ফ্লো হয়েছে। অর্থাৎ গঙ্গায় ফেলা জল ফিরে এসেছে শহরে। আপাতত কলকাতার অনেক জায়গা থেকে জল নামছে। কিন্তু নতুন করে বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি খারাপ হবে।

আশার কথা শোনাতে পারছেন না আবহবিদরাও। তাঁরা জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরের ওপরে সৃষ্টি হয়েছে দু’টি ঘূর্ণাবর্ত। তার সঙ্গে অতি সক্রিয় হয়ে উঠেছে মৌসুমী অক্ষরেখা। ফলে এখনই বৃষ্টির দাপট থেকে মুক্তি মিলবে না। মঙ্গলবার গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে প্রবল বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। কলকাতাতেও দিনভর বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হবে। সুতরাং অভাবনীয় কিছু না ঘটলে কলকাতা তথা দক্ষিণবঙ্গের মানুষ আরও দু’-একদিন জলযন্ত্রণায় ভুগবেন।

আমাদের পুরকর্তারা সাফাই দেন, বিশ্বের সব শহরেই জল জমে। নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, রোম, লন্ডন, প্যারিস, কেউ ব্যতিক্রম নয়। অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণে বৃষ্টিপাত হলে পথেঘাটে জল জমা খুবই স্বাভাবিক।

কথাটা ঠিকই। কিন্তু পুরকর্তারা যে কথা বলেন না, তা হল, পাশ্চাত্যের শহরগুলিতে জল যেমন জমে, তেমন দ্রুত নেমেও যায়। কোথাও দেড়দিন, দু’দিন ধরে জল জমে থাকে না। শোনা যায়, ব্রিটিশ আমলে কলকাতার পার্ক স্ট্রিট ও সংলগ্ন সাহেবপাড়াতেও অমন হত। বৃষ্টি থামার কিছুক্ষণের মধ্যেই নেমে যেত জল।

দীর্ঘক্ষণ জল জমে থাকার পিছনে আছে পুরসভার ব্যর্থতা। শহরের জলনিকাশি ব্যবস্থা বহু পুরানো। তার ঠিকমতো দেখভাল হয় না। সর্বোপরি জমা জল বার করে দেওয়ার জন্য পুরসভার নির্দিষ্ট পরিকল্পনারও অভাব আছে। এই দুর্ভোগ তারই অবশ্যম্ভাবী পরিণাম।

পুরসভার ওপরে ভরসা নেই। তাই জলযন্ত্রণা কমার জন্য আমাদের প্রকৃতির ওপরে নির্ভর করতে হয়। বরুণ দেবতা যদি সদয় হন, আপাতত আর বৃষ্টি না দেন, তাহলে কলকাতা তথা দক্ষিণবঙ্গের অবস্থা একটু ভাল হতে পারে।

একটা কথা মনে রাখা দরকার। আমরা এখন অতিমহামারী পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। এমনিতেই শহরের রাস্তায় দীর্ঘক্ষণ জল জমে থাকা অস্বাস্থ্যকর। তার ওপরে কোভিড সংক্রমণের মধ্যে জলমগ্ন শহরে নতুন কোন বিপদের সৃষ্টি হবে কে বলতে পারে। সুতরাং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কলকাতা তথা দক্ষিণবঙ্গকে জমা জলের হাত থেকে মুক্ত করাই এই মুহূর্তের প্রধান কাজ।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.