কেন মাদকে আসক্ত হয় সেলিব্রিটিদের ছেলেমেয়েরা

খবরটা আসতে শুরু করেছিল শনিবার গভীর রাত (Late night) থেকে। বিভিন্ন সর্বভারতীয় নিউজ চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছিল, আরব সাগরে এক প্রমোদ তরণীতে কারা নাকি মাদক সেবন করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। তাদের মধ্যে কোনও এক সেলিব্রিটির ছেলেও আছে। কিন্তু রাতে তার নাম জানা যায়নি।
রবিবার সকালে শোনা গেল, ধৃত সেলিব্রিটি-পুত্রের নাম আরিয়ান খান। তিনি বলিউডের প্রথম সারির তারকা শাহরুখ খানের ছেলে। কর্ডেলিয়া নামে এক প্রমোদ তরণী শনিবার রাতে মুম্বই থেকে গোয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। তার ভাড়া ছিল ৬০ হাজার থেকে তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত। বর্তমান ভারতে অত টাকা দিয়ে ফুর্তি করার লোকের অভাব নেই। তাই প্রমোদ তরণীর সব টিকিট বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। যদিও শাহরুখের ছেলের টিকিট লাগেনি। ২৩ বছরের ওই যুবক শাহরুখ খানের ছেলে হওয়ার সুবাদে নিজেও সেলিব্রিটি। প্রমোদ ভ্রমণের উদ্যোক্তারা ভেবেছিলেন, আরিয়ান যদি কর্ডেলিয়ার যাত্রী হন তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে ভ্রমণের আকর্ষণ বাড়বে।
দিন পনের আগে থেকেই নার্কোটিকস কন্ট্রোল ব্যুরোর কাছে খবর ছিল, ওই তরণীতে অনেকে মাদক সেবন করবেন। সেইমতো ব্যুরোর অফিসাররা যাত্রী সেজে কর্ডেলিয়ায় উঠে বসেছিলেন। মাদক সেবন শুরু হতেই তাঁরা ১০-১২ জনকে পাকড়াও করেন। তাঁদের ব্যুরোর অফিসে নিয়ে আসা হয়। সেখানে দীর্ঘ জেরার মুখে পড়তে হয় আরিয়ানকে।
আরিয়ানের সঙ্গে আরও এক বলিউডি অভিনেতা গ্রেফতার হয়েছেন। তাঁর নাম আরবাজ মার্চেন্ট। তাঁর জুতোর মধ্যে মাদক পাওয়া গিয়েছে। আর ছিলেন মুনমুন ধামেচা নামে এক উঠতি মডেল। তাঁর কাছেও মাদক লুকোন ছিল। আরিয়ানের কাছে কিন্তু মাদক মেলেনি। কিন্তু তাঁর মোবাইলের চ্যাট থেকে মনে হচ্ছে, তিনি মাদক কারবারিদের চেনেন।
রবিবার তাঁদের আদালতে পেশ করা হয়। বিচারক নির্দেশ দেন, আগামী ৭ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁরা নার্কোটিকস কন্ট্রোল ব্যুরোর হেপাজতে থাকবেন। আপাতত শোনা যাচ্ছে, জেরার মুখে ভেঙে পড়েছেন তারকা-পুত্র। প্রথমে তিনি বলেছিলেন, শনিবারই জীবনে প্রথম নিষিদ্ধ মাদক সেবন করেছেন। কিন্তু পরে স্বীকার করেছেন, চার বছর ধরে তিনি মাদকে আসক্ত। আগে বিদেশে যখন ছিলেন, তখনও নিয়মিত মাদক সেবন করতেন।
ফিল্মি জগতের সঙ্গে মাদকের যোগাযোগের কথা আগেও বহুবার শোনা গিয়েছে। সেই আটের দশকের শুরুতে মাদক সেবনের দায়ে জেল খেটেছিলেন সুপারস্টার সঞ্জয় দত্ত। প্রয়াত অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের বান্ধবী তথা মডেল রিয়া চক্রবর্তী গত বছরই মাদক সেবনের দায়ে গ্রেফতার হন। এছাড়া আরমান কোহলি, ফারদিন খান, কপিল জাভেরি ও আরও অনেক অভিনেতার নামেই মাদক সেবনের অভিযোগে মামলা হয়েছে। ফিল্মি পরিবারের পুত্র হিসাবে আরিয়ান কোনও ব্যতিক্রম নন।
প্রশ্ন হল, সেলিব্রিটি ও তাঁদের ছেলেমেয়েরা কেন বারে বারে মাদকের প্রতি আসক্ত হয়? একজন গড়পরতা ভারতবাসীর চেয়ে তারা অনেক বেশি ভাগ্যবান। দুনিয়ায় যতরকম বিলাসিতার জিনিস আছে, প্রায় সবই তাদের হাতের নাগালে। তার পরেও কেন তাদের কেবল নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতে ইচ্ছা হয়?
তার চেয়েও বড় কথা, তারা কিশোর বয়সে মাদকের নাগালই বা পায় কী করে? ছোটবেলা থেকে তাদের বাউন্সাররা ঘিরে থাকে। কড়া পাহারা ছাড়া তাদের স্কুল-কলেজেও যাওয়া মানা। সেই পাহারার ফাঁক গলে তাদের কাছে মাদক পৌঁছায় কীভাবে?
আসলে এইসব ছেলেমেয়েরা ছোট থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গ পায় না। তাদের বাবা-মায়ের সন্তানকে দেওয়ার মতো সময় কই? সন্তানপালনের দায়িত্ব তারকারা কার্যত একপ্রকার এজেন্সির হাতে দিয়ে দেন। সেই এজেন্সি বাবা-মায়ের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না। তাই সেলিব্রিটির সন্তানদের সুশিক্ষার অভাব ঘটে। খালি আমোদ করাই তাদের কাছে জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু নির্দোষ আমোদ-প্রমোদে তাদের মন ওঠে না। তারা চায় দ্রুত স্নায়বিক উত্তেজনা। মাদক কারবারিরা সেকথা জানে। তাই তারা নিরাপত্তার ফাঁক গলে সেলিব্রিটিদের ছেলেমেয়ের হাতে পৌঁছে দেয় চরস, গাঁজা, মেফিড্রোন কিংবা এমডিএমএস।
শুধু সেলিব্রিটিদের মধ্যেই মাদকের রমরমা দেখা যায় ভাবলে ভুল হবে। রাষ্ট্রপুঞ্জ জানিয়েছে, গত দশকে ভারতে মাদক সেবন বেড়েছে ৩০ শতাংশ। হতাশায় কিংবা তাৎক্ষণিক আনন্দের লোভে মাদকের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে এখনকার যৌবন। এই প্রবণতা দূর করার জন্য সুশিক্ষার প্রয়োজন। পাশাপাশি যে ড্রাগ পেডলাররা তরুণদের ফাঁদে ফেলার জন্য সবসময় ওত পেতে থাকে তাদেরও কড়া শাস্তি হওয়া দরকার।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More