আমার সেজকাকু মান্না দে (চতুর্দশ পর্ব)

সুদেব দে

গত একটি পর্বে আমি লতা মঙ্গেশকর সম্বন্ধে আমার সেজকাকা মান্না দে’র মূল্যায়ন তুলে ধরেছিলাম। এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার, কাকার সঙ্গে নানা সময়ে আমার যেটুকু কথোপকথন হয়েছে, তারই প্রেক্ষিতে এই লেখা। কিন্তু আমার জন্মের বহু আগে থেকে কাকার সুবৃহৎ কর্মজীবনে, একাধিক সাক্ষাৎকারে, কথোপকথনে কোথায় কখন তিনি কী বলেছেন, তার সবকিছু জানা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। আশা রাখি, এ লেখার পাঠকেরা সেই বিষয়টি মনে রেখেই মূল্যায়ন করবেন।

লতাজি সম্বন্ধে কাকার বক্তব্য আগেই বলেছি। আজ খুব ইচ্ছে হচ্ছে আরেকজনের কথা বলতে৷ তিনি আমাদের সকলের প্রিয় কিশোর কুমার।
কিশোরকুমারকে নিয়ে কত কথাই যে বলতেন সেজকাকু! আমার সঙ্গে গানবাজনা নিয়ে কথা হত যখন, বিশেষ করে গান সংক্রান্ত কোনও পাঠ দিতেন যখন, গান নিয়ে আলোচনা করতেন বা গান শেখাতেন, তখন সেই প্রসঙ্গে এক কথা থেকে কত কথা যে উঠে আসত! একটা সুরের এপ্লিকেশন থেকে, একটা রাগ থেকে, একটা উচ্চারণ থেকে চলে যেতেন আরও নানা প্রসঙ্গে। হয়ত একটা গানের রেফারেন্স থেকে চলে গেলেন কিশোরকুমারের গানে, চলে গেলেন মহম্মদ রফি বা মেহেদি হাসানের গানে। খালি একটা লাইনের ভেরিয়েশন দেখাতেই কেটে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এতটাই পণ্ডিত মানুষ ছিলেন আমার সেজকাকু।

যাই হোক কিশোরকুমার প্রসঙ্গে ফেরা যাক। সম্ভবত ১৯৪৮ বা ৪৬ সাল, কাকা তখন বম্বেতে খেমচাঁদ প্রকাশের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে কাজ করছেন। ‘মুকদ্দর’ ছবিতে গাইতে এল একটি নতুন ছেলে। ছড়ি হাতে মাথায় টুপি পরে ঘুরছে, কে ছেলেটা? সবাই পরিচয় করিয়ে দিল দাদামণির ভাই। খেমচাঁদ প্রকাশ সেজকাকুকে ডেকে বললেন ছেলেটার গলাটা টেস্ট করতে, ও গাইবে। সেজকাকু পরে আমায় বলেছেন, ওইরকম একটা বাচ্চা ছেলে, গানবাজনা শেখেনি, তার গলার আওয়াজ শুনেই আমি অভিভূত হয়ে গেছিলাম। এরকম খোলা দরাজ গলা! এত সুন্দর কণ্ঠ নিয়ে একটা ছেলে এসেছে।

সদ্য তরুণ কিশোর কুমার

কথা বলে কাকা জেনেছিলেন, ছেলেটি মূলত অভিনয় করতেই এসেছে। সঙ্গে গানও গাইবে। সায়গল সাহেবের গান সেসময় খুব পছন্দ ছিল কিশোর কুমারের। সায়গল সাহেবের গানই গাইতেন। সেই প্রথম দিনই কিশোর কুমারের গলায় গান শুনে মুগ্ধ হয়ে গেছিলেন সেজকাকা। তারপর আলাপ জমল। একসঙ্গে একাধিক কাজ করলেন দুজনে।

কাকা বলেছিলেন, প্রথম কিশোরের সঙ্গে ডুয়েট গেয়েছিলাম ‘আমির গরীব’ ছবিতে। লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলালের সুরে সেই গানটা ছিল ‘মেরে পেয়ালে মে শরাব ডাল দে ফির দেখ তমাশা’। কাকা বলছেন, আমরা তো ক্ল্যাসকাল গান শিখেছি, সুরের এপ্লিকেশন কীভাবে কর‍তে হয় দেখেছি, যেখানে যেমন দরকার গলাকে মডিউলেট করে গান গাওয়ার তালিম পেয়েছি আমরা। একটা গানকে খুবসুরত করার জন্য সেটাই ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীতের বাতলে দেওয়া পথ। তো এই গানটা যখন লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলাল তোলালেন, তখন কাকা যেরকম নোটেশন করে গান তোলেন, সেভাবেই তুললেন। তারপর নিজের গায়কী দিয়ে নিজের মতো করে সে গান যখন গাইলেন সেজকাকু, তা শুনে লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলাল তো একেবারে অভিভূত। বলেছিলেন, ‘মান্নাদা, কী খুবসুরত গাইছেন আপনি! গানটার মধ্যে একটা অন্যরকম কালার এসে গেছে।’

তিন মহারথি, মান্না দে, মহম্মদ রফি আর কিশোর কুমার

কাকার পরে কিশোর কুমারকেও গানটা তোলানো হল। এরপর কিশোর কুমার তাঁর নিজস্ব স্টাইলে সেই ভগবান প্রদত্ত খোলা গলায় গান গেয়ে শোনালেন। কিন্তু এই গানের মধ্যে যে গায়কী তার মধ্যে একড়া স্টাইল ইনপুট করে সুরটাকে মীরের মতো গাওয়া সেটা খোলাগলায় থাকে না। এটা একমাত্র ট্রেনড সিঙ্গারদের মধ্যেই থাকে। কিশোরকুমার খোলা গলায় স্ট্রেট ওয়েতে নোট লাগিয়ে গানটা যখন গাইলেন, তখন লক্ষ্মীকান্তজি তাঁকে বলেছিলেন- ‘হ্যাঁ ভালোই হচ্ছে, তবে একটু মান্না দে’র মতো করে গানটা করুন না!’ কাকার মুখে শুনেছি, এই কথা শুনে না কি খুব রেগে গেছিলেন কিশোর কুমার। তিনি বলেছিলেন, “দেখুন, মান্নাদা একজন ট্রেনড আর্টিস্ট, আর আমি ন্যাচারাল আর্টিস্ট। আমি আমার গান আমার মতো করেই গাইব। যদি মনে হয়, আমার গান আমার মতো করেই রেকর্ড করবেন, তাহলেই আমায় নেবেন। নাহলে আমাকে বাদ দিন। মান্না দে’কে নিয়েই গানটা করুন।”
আমি ছোট বড় নিয়ে কিছু বলছি না। নিজের কাজের পারফেকশন নিয়ে শিল্পীদের নিজস্ব ইগো থাকতেই পারে। সে প্রসঙ্গ আলাদা। কিন্তু লক্ষীকান্ত প্যারেলাল যে কথাটা বলেছিলেন, তার গুরুত্ব হচ্ছে, গানের মধ্যে গায়কী ইনপুট করে গাওয়ার যে কৌশল, সেটা মিউজিক ডিরেক্টর হিসাবে তাঁদের বেশি পছন্দ হয়েছিল। যাই হোক পরবর্তী ক্ষেত্রে কিশোর কুমার তাঁর নিজের স্টাইলেই গেয়েছিলেন। আজ সেজকাকুর স্টাইলে সেজকাকু গেয়েছিলেন।

কাকা পরবর্তীকালে বলেছিলেন, দেখ একটা জিনিস, জগতে এর উত্তর কোনওদিনও পাবে না, আমরা গানবাজনা শিখে যেভাবে সুরের এপ্লিকেশন করি ওপেন সিঙ্গিং বা উদাত্ত কণ্ঠের গানে সুরের সেই মারপ্যাঁচ বা কারুকাজগুলো সেভাবে থাকেনা। কিন্তু গানের মূল উদ্দেশ্য তো আনন্দ পাওয়া। তাই সাধারণ জনগন যারা নিছক আনন্দ পাওয়ার জন্য গান শোনেন, তাদের ৯০% বেশি মানুষই কিন্তু সেই উদাত্ত গলার স্ট্রেট গানই পছন্দ করেন। গানের মধ্যে যে কারুকাজ, যে মারপ্যাঁচ, যে গায়কী সেসব খুব কম লোকই বোঝেন। আমাকে গান শেখাতে শেখাতে এই গল্পটা করেছিলেন সেজকাকু। আজ আপনাদের সামনে তাঁর বলা কথাগুলোই আরেকবার তুলে ধরলাম।

‘পড়োশন’ ছবির ‘এক চতুর নার’ গানটা তো ভারতীয় সিনেমহলে রীতিমতো ইতিহাস হয়ে গেছে। শ্রদ্ধেয় মেহমুদ সাহেব খুব পছন্দ করতেন সেজকাকুকে। তিনি বলতেন তাঁর গান সবথেকে ভালো এক্সপ্রেস করতে পারেন মান্না দে। তাই মেহমুদ সাহেব প্রোডিউসারদের বলতেন আমার গান যেন মান্না দা গান। যখন এই ডুয়েট গান গাওয়ার প্রস্তাব আসে, প্রথমে কিছুটা সতর্ক হয়ে গেছিলেন কাকা। তারপর যখন রাহুল দেব বর্মন মানে পঞ্চমবাবুর কাছ থেকে গানটার কম্পোজিশন শোনেন, তখন কাকা বলেন, হ্যাঁ এটা বেশ শক্ত গান। কিশোর কিশোরের মতো গাইবে, আমি আমার মতো গাইব। তবে এটা আমার গ্রিপের গান। এরপর অনেকদিন ধরে রিহার্সাল হওয়ার পর রেকর্ড হয় ‘এক চতুর নার’। বাকিটা তো ইতিহাস।

ক্রমশ…

মেল যোগাযোগ – [email protected]

আমার সেজকাকু মান্না দে (ত্রয়োদশ পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More