দেবাঞ্জনদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া উচিত

মানুষ বিপদে পড়লে প্রতারকদের খুব সুবিধা হয়। তারা লোকের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে জালিয়াতির কারবার ফেঁদে বসে। সম্প্রতি কলকাতায় জাল টিকা দিয়ে এমনই একজন ধরা পড়েছেন। তাঁর নাম দেবাঞ্জন দেব। তাঁকে নিয়ে এখন রাজ্য জুড়ে হইচই হচ্ছে। তাঁর বয়স নাকি কুড়ির কোঠায়। এই বয়সেই তিনি মানুষকে ঘোল খাওয়াতে ওস্তাদ। নকল ভ্যাকসিনের ব্যবসা দিব্যি চালাচ্ছিলেন বেশ কিছুদিন ধরে। শেষে এক এমপিকে জাল টিকা দিয়ে ফেঁসে গিয়েছেন।

এই প্রসঙ্গে একটা পুরানো নাটকের কথা বলা যায়। নাট্যকারের নাম বেন জনসন। তিনি শেকসপিয়রের সমসাময়িক। থাকতেন লন্ডনে। ‘অ্যালকেমিস্ট’ নামে একটা নাটকে তিনি বর্ণনা করেছিলেন, লন্ডনে প্লেগ মহামারীর সুযোগে একদল জোচ্চোর কীভাবে লাভের কারবার ফেঁদে বসল।

মধ্যযুগে লন্ডনে প্লেগ দেখা দিলে অভিজাতরা শহর ছেড়ে পালিয়ে যেত। একবার মহামারী শুরু হতে লাভউইট নামে এক ধনী ব্যক্তি লন্ডন ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য রইল তাঁর খানসামা। তার নাম জেরেমি। সে বাবুর অনুপস্থিতির সুযোগে আরও কয়েকজন স্যাঙাৎকে নিয়ে সেই বাড়িতে খুলে বসল লোক ঠকানোর ব্যবসা। তাদের একজন নিজেকে অ্যালকেমিস্ট বলে পরিচয় দিত। সেযুগে ইউরোপে অ্যালকেমিস্ট নামে একদল লোক ছিল যারা দাবি করত মন্ত্রতন্ত্রের সাহায্যে অলৌকিক কাণ্ড ঘটাতে পারে। ক্রমে জেরেমিদের ব্যবসা জমে উঠল।

কলকাতার দেবাঞ্জনবাবুও করোনার সুযোগে বেশ ব্যবসা জমিয়ে তুলেছিলেন। কখনও তিনি সাজতেন আইএএস অফিসার, কখনও বা সাজতেন পুরসভার কর্তা। নীলবাতি জ্বলা গাড়িতে ঘুরে বেড়াতেন। বড় বড় নেতাদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা ছিল। সকলেই ভাবত দেবাঞ্জনবাবু নিশ্চয় একজন কেউকেটা হবেন। এই সুযোগে তিনি অনেককে ফতুর করে ছেড়েছেন।

এহেন গুণধর ব্যক্তিটি গত ২২ জুন কসবায় ভ্যাকসিন শিবিরের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে আমন্ত্রিত ছিলেন খোদ যাদবপুরের সাংসদ মিমি চক্রবর্তী। সাংসদ নিজেও ওই শিবিরে প্রতিষেধক নেন। কিন্তু পরে তাঁর মোবাইলে এসএমএস না আসায় সন্দেহ হয়। তিনি পুলিশকে খবর দেন। তারপরে বিরাট কেলেংকারির কথা প্রকাশ হয়ে পড়ে। দেবাঞ্জনের বিরুদ্ধে এক গুচ্ছ মামলা হয়।

দেবাঞ্জনের মাথার ওপরে খুব প্রভাবশালী এক বা একাধিক ব্যক্তির হাত ছিল নিশ্চিত। তাই তিনি একজন সাংসদকে সুদ্ধু জাল ভ্যাকসিন দিতে সাহস পেয়েছিলেন। এরকম আরও কত জোচ্চোর বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে কে জানে। আপাতত জানা গিয়েছে, কুম্ভমেলার সময় জাল কোভিড সার্টিফিকেট দেওয়ার একটি চক্র কাজ করছিল। মুম্বইতেও জাল ভ্যাকসিন চক্রের হদিশ পাওয়া গিয়েছে।

সোমবার সাংবাদিক বৈঠক করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, মানুষের জীবন নিয়ে যারা খেলে, তারা সন্ত্রাসবাদীদের চেয়েও ভয়ংকর। তাঁর আশ্বাস, দেবাঞ্জনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁকে যারা সাহায্য করেছিলেন, তাঁরাও ছাড় পাবেন না।

মুখ্যমন্ত্রীর এই আশ্বাস যেন দ্রুত বাস্তবে রূপায়িত হয়। করোনাকালে মানুষ এমনিতেই আতঙ্কিত হয়ে আছে। ভুয়ো ভ্যাকসিনকাণ্ডের কথা জানাজানি হতে আতঙ্ক ও প্রশাসনের প্রতি অনাস্থার মনোভাব বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার তৃতীয় ওয়েভ আসবে। তার মানে অতিমহামারীর বিরুদ্ধে এখনও অনেকদিন লড়তে হবে। দেবাঞ্জনের মতো প্রতারকদের জন্য মানুষের মনোবল ভেঙে যায়। শুধু দেবাঞ্জনকে শাস্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়, পুলিশ খুঁজে দেখুক, গ্রামে গঞ্জে আরও কেউ তার মতো লোক ঠকিয়ে বেড়াচ্ছে কিনা। ঠগবাজদের কঠোর শাস্তি হলে তবে মানুষ সাহস ফিরে পাবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More