সতর্ক না হলে কোভিডের তৃতীয় ঢেউকেও পরাস্ত করা যাবে না

সব কিছুরই শেষ আছে। ভারতে করোনা গ্রাফ আপাতত নিম্নমুখী। গত সোমবার দেশে সংক্রমিত হয়েছেন ১ লক্ষ ৯৫ হাজার ৮১৫ জন। তার আগের দিন ওই সংখ্যাটা ছিল ২ লক্ষ ২২ হাজার ৮৩৫। মৃত্যুহারও কমছে। রবিবার কোভিডে মারা গিয়েছিলেন ৪৪৫৫ জন। সোমবার মৃতের সংখ্যা ছিল ৩৪৯৮।

বিশ্বে এখন ভারতেই সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। যে দেশটিতে এযাবৎ সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন, সেই আমেরিকায় দৈনিক সংক্রমণের হার ১৯-২০ হাজারে নেমে এসেছে। ব্রাজিলও একসময় কোভিড আক্রান্তের সংখ্যার বিচারে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। সেখানে এখন দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা ৩৬-৩৭ হাজারে নেমে এসেছে।

আমেরিকায় এখনও পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৩ কোটি ৩৯ লক্ষ ২২ হাজার ৯৩৭ জন। ভারতে সংক্রমিতের সংখ্যা ২ কোটি ৬৯ লক্ষ ৪৮ হাজার ৮৭৪ জন। যদি প্রতিদিন দু’লক্ষের বেশি মানুষ সংক্রমিত হতে থাকে, তাহলে শীঘ্র আমরা সংক্রমিতের সংখ্যায় বিশ্বে শীর্ষস্থানে পৌঁছব। এক্ষেত্রে শীর্ষে পৌঁছানো মোটেই গৌরবের হবে না।

ভারতের করোনা সংকট নিয়ে ইতিপূর্বে সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। কোভিড সামলাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে ভারত সরকার। এই সমালোচনা অকারণ নয়। কোভিডের প্রথম ঢেউ স্তিমিত হওয়ার পরে আমরা ভেবেছিলাম, অতিমহামারীকে পরাস্ত করা গিয়েছে। সাধারণ মানুষ মাস্ক ছাড়া চলাফেরা করছিল। সামাজিক দূরত্বের নীতি উঠেছিল শিকেয়। আমাদের রাজপুরুষরাও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন।

গত ২৮ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মন্তব্য করেন, কোভিড অতিমহামারী থেকে ভারত বিশ্বকে বাঁচিয়েছে। ৭ মার্চ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন বলেছিলেন, আমরা করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শেষের পর্যায়ে পৌঁছেছি। এই সময় কুম্ভমেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। চারটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত পুদুচেরির বিধানসভা নির্বাচনে বহু সংখ্যক জমায়েত করা হয়েছিল। সেখানে দলমতনির্বিশেষে রাজনৈতিক নেতারা অংশগ্রহণ করেছিলেন।

এপ্রিলের শুরু থেকে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দেয়। ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক সংক্রমণ ন’হাজারে নেমে এসেছিল। কিন্তু ৯ এপ্রিল দেশে অ্যাকটিভ রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ১০ লক্ষ। ১২ এপ্রিল সংক্রমণের সংখ্যার নিরিখে ব্রাজিলকে টপকে যায় ভারত।

প্রতিটি অতিমহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ আসে। প্রথমবারের চেয়ে তা বেশি বিপজ্জনক হয়। ১০০ বছর আগে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। এবারও অনেকে সতর্ক করেছিলেন, কোভিড সংক্রমণের সংখ্যা কমে গিয়েছে বলে আত্মতুষ্টির কারণ নেই। দ্বিতীয় ঢেউ আসছে। কিন্তু সরকার বা জনতা, কেউ সেই সতর্কবার্তাকে সিরিয়াসলি নেয়নি। গতবছর কোভিড মোকাবিলায় যেসব অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছিল, তার অনেকগুলি পরবর্তীকালে অচল হয়ে পড়ে। যথেষ্ট পরিমাণে অক্সিজেন এবং ভ্যাকসিনেরও ব্যবস্থা ছিল না। এর ফলে বহু মানুষের প্রাণরক্ষা করা যায়নি। নানা জায়গায় গণচিতায় কোভিড রোগীদের দেহ পুড়িয়ে ফেলতে হচ্ছে। উত্তরপ্রদেশে গঙ্গায় ভাসছে দেহ।

স্প্যানিশ ফ্লুয়ের সময়েও নাকি কলকাতায় বিভিন্ন শ্মশানের বাইরে দেখা গিয়েছিল মৃতদেহের দীর্ঘ লাইন। অনেক দেহ সৎকার না করে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল গঙ্গায়। এইভাবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটুক, কেউই চায়নি।

প্রাকৃতিক নিয়মেই একসময় ভাইরাসের শক্তি কমে আসে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউও স্তিমিত হয়ে আসছে। লকডাউন করে ভাল ফল হয়েছে মনে হয়। কিন্তু ফের যদি আমরা অসতর্ক হই, করোনাকে জয় করে ফেলেছি ভাবি, অচিরেই বিরাট ক্ষতি করে দেবে তৃতীয় ওয়েভ।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জুলাই মাসে দ্বিতীয় ওয়েভ স্তিমিত হয়ে পড়বে। তৃতীয় ওয়েভ আসবে তার ছয় থেকে আট মাস পরে।

দ্বিতীয় ওয়েভে প্রায় সকলেই কোনও না কোনও বন্ধু তথা প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। এবার আর ভুল করা উচিত নয়। লকডাউন একসময় শেষ হবে। কিন্তু তার পরেও খুব কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে কোভিড বিধি। মানুষকে প্রতিষেধক দিতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। সতর্কতা আর ভ্যাকসিন, দুইয়ের জোরেই তৃতীয় ওয়েভকে ঠেকানো যাবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More