এবার অন্তত সকলের শিক্ষা হোক

0

আমাদের, ভারতীয়দের মুশকিল হল, বিপদ আসছে দেখেও সাবধান হতে পারি না। বিপদটা যখন একেবারে ঘাড়ের ওপরে এসে পড়ে, তখন উতলা হয়ে পড়ি। বাঁচার উপায় খুঁজি। কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার, হয়েই যায়।

ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিকে করোনা বেশ কমে এসেছিল। দৈনিক ১৪-১৫ হাজারে নেমেছিল সংক্রমণ। বস্তুত, গত বছর অক্টোবর থেকেই করোনাগ্রাফ ছিল নীচের দিকে। আমরা ভাবলাম, আর ভয় কীসের। করোনাকে জয় করে ফেলেছি। বিশেষজ্ঞরা অনেক করে বলেছিলেন, এরপর সেকেন্ড ওয়েভ আসবে। মহামারীতে তাই হয়। ১০০ বছর আগে যে স্প্যানিশ ফ্লু অতিমহামারী হয়েছিল, তাতেও দ্বিতীয় ঢেউ এসেছিল। প্রথমবারের তুলনায় দ্বিতীয়বারের ঢেউ ছিল বেশি বিপজ্জনক। তাতে মৃত্যুও বেশি হয়েছিল। কিন্তু এই সাবধানবাণীতে কান দিয়েছিল খুব কম লোক।

গত বছরের জুন থেকেই দফায় দফায় আনলক করা শুরু হয়। দলে দলে মানুষ বাইরে বেরিয়ে পড়ে। তাদের উপায়ও ছিল না। রোগের ভয়ে বাড়িতে বসে থাকলে পেট তো শুনবে না। কিন্তু সরকার থেকে বলা সত্ত্বেও অনেকেই মাস্ক পরেনি। অনেকের আবার মাস্ক নেমে এসেছিল থুতনিতে। তারা বলত, সারাক্ষণ মুখে মাস্ক এঁটে রাখলে দম বন্ধ হয়ে আসে। কেউ কেউ বলছিল, যাদের মরার ভয় বেশি, তারা মাস্ক পরুক, আমরা পরব না। এই সব বীরপুরুষের জন্যই দেশে হু হু করে করোনা বেড়েছে।

জানুয়ারি থেকে দেশে কোভিডের ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়। প্রথমে স্থির হয়েছিল স্বাস্থ্যকর্মী ও সম্মুখ সারির কোভিড যোদ্ধাদের দেওয়া হবে। সম্প্রতি জানা গিয়েছে, ফ্রন্টলাইন কোভিড ওয়ারিয়রদের মাত্র ৩৭ শতাংশ ভ্যাকসিনের দু’টি ডোজ নিয়েছেন। ৯১ লক্ষ কোভিড যোদ্ধা নিয়েছেন মাত্র একটি ডোজ।

বছরের শুরুতে অনেকেই ভেবেছিলেন, কোভিড সংক্রমণ যখন কমে আসছে, তখন প্রতিষেধকের দরকার নেই। ভ্যাকসিন নিয়ে নানা গুজবও ছড়াচ্ছিল। অনেক তথাকথিত শিক্ষিত লোক বলছিলেন, ওই প্রতিষেধক কোভিডের বিরুদ্ধে কাজ করবে না। অনেকে আবার ভ্যাকসিন নিয়ে নানা বাছবিচার করছিলেন। তাঁরা বলছিলেন, কোভ্যাক্সিন নেব না। কোভিশিল্ড নেব। আরও নানারকম ছেলেমানুষি হচ্ছিল।

১ মার্চ থেকে দেশে দ্বিতীয় দফার টিকাকরণ শুরু হয়। স্থির হয়েছিল, যাঁদের বয়স ৬০ এর ওপরে তাঁদের টিকা দেওয়া হবে। ৪৫ এর বেশি যাঁদের বয়স এবং কোনও না কোনও প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত, তাঁরাও এই পর্যায়ে টিকা নিতে পারবেন।

প্রথমদিকে দেখা যায়, টিকাকরণ কেন্দ্রগুলি প্রায় ফাঁকা। স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে বসে মাছি তাড়াচ্ছেন।

মার্চের শেষ দিকে সংক্রমণ যখন যথেষ্ট বেড়ে যায়, তখন টিকাকরণ কেন্দ্রগুলিতে আস্তে আস্তে ভিড় হতে থাকে। এখন তো লোক উপচে পড়েছে। অনেক জায়গায় ভোররাতে নাম লেখাতে হচ্ছে। নাহলে টিকা নেওয়া যাচ্ছে না।

ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ‘কো-উইন’ নামে একটি চমৎকার অ্যাপ তৈরি করেছে। সরকারি অ্যাপ সাধারণত এত ভাল হয় না। কিন্তু এখনও পর্যন্ত খুব বেশি লোক ওই অ্যাপের মাধ্যমে নাম রেজিস্ট্রি করায়নি।

কোভিড মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের নানা সমালোচনা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক দেশে তা হতেই পারে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে, ১৩৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে সরকার চাইলেই সব কিছু করতে পারে না। নাগরিকরা যদি সচেতন না হয়, সরকারের যতই সদিচ্ছা থাকুক, কোনও লাভ হবে না।

দেশে এখন দৈনিক সংক্রমণ ৩ লক্ষ ছুঁইছুই। মৃত্যুও বাড়ছে। আর বেপরোয়া মনোভাব দেখানো উচিত নয়। সরকার স্থির করেছে, আগামী ১ মে থেকে দেশে ১৮ বছরের উর্ধ্বে সকলকে টিকা দেওয়া হবে। সকলেরই সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করা উচিত। নইলে সেকেন্ড ওয়েভের পরে আসবে থার্ড ওয়েভ, ফোর্থ ওয়েভ। তাতে কত প্রাণ যাবে কে বলতে পারে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.