সরকার যেন বরাবরই এরকম সংযত থাকে

0

ইংরেজিতে একটা ইডিয়ম আছে, ‘হু উইল ব্লিঙ্ক ফার্স্ট’। তাঁর অর্থ, লড়াইয়ের ময়দানে চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে দুই প্রতিপক্ষ। যার চোখে পলক পড়বে আগে, সে হেরে গেল। দিল্লিতে কৃষক সমাবেশ নিয়েও ওই কথা বলা যায়।

প্রায় এক মাস ধরে রাজধানী দিল্লির জায়গায় জায়গায় অবস্থান করছেন কয়েক হাজার কৃষক। আবহাওয়া অফিস বলছে আগামী চারদিন দিল্লিতে শৈত্যপ্রবাহ চলবে। এখনই সেখানে কনকনে শীত। তার মধ্যে খোলা আকাশের তলায় রাত জাগছেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও মহিলারা। বেশ কয়েকজন ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন। কিন্তু কৃষকরা অনড়। তাঁদের দাবি, নতুন যে তিনটি কৃষি আইন হয়েছে, সেগুলি বাতিল করতেই হবে।

তিনটি আইন সত্যি সত্যি বাতিল করলে সরকার বিপদে পড়বে। প্রমাণিত হবে সরকার দুর্বল। তখন নানা মহল থেকে ন্যায্য, অন্যায্য নানা দাবি উঠতে শুরু করবে। অনেকেই ভাববে কোনওরকমে একবার দিল্লিতে গিয়ে ধরনায় বসে পড়তে পারলেই হল। তাহলেই দাবি আদায় হয়ে যাবে।

সরকারের সামনে আর একটা রাস্তা খোলা আছে। সরকার পুলিশ দিয়ে কৃষকদের হটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তার পরিণাম হবে আরও খারাপ। আন্দোলনকারীদের প্রতি অনেকের সহানুভূতি আছে। তাঁরা ক্রুদ্ধ হবেন। নিজেরাও দেশের নানা জায়গায় আন্দোলনে নেমে পড়বেন। বিজেপির অনেক শরিকও বিরূপ হবে। এমনকি কোনও কোনও শরিক এনডিএ ছেড়ে দিলেও আশ্চর্যের কিছু থাকবে না।

বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কৃষক আন্দোলন দমন করলে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও হবে খারাপ। ইতিমধ্যে কানাডা ও ব্রিটেনের মতো দেশের রাজনীতিকরা ভারতের কৃষক আন্দোলন নিয়ে মুখ খুলেছেন। খোদ রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিবের মুখপাত্র বলেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করার অধিকার সকলেরই আছে।

রাষ্ট্রপুঞ্জের মুখপাত্র নিশ্চয় ঠিক বলেছেন। আন্দোলন করার অধিকার সকলেরই আছে। কিন্তু একটি দেশের রাজধানীকে দিনের পর দিন অবরুদ্ধ করে রাখার অধিকার কারও আছে কিনা, সে প্রশ্ন তোলাই যায়।

দিল্লিতে দিনের পর দিন ধরনা চলার পরেও সরকার এখনও সংযত। প্রথমদিকে কৃষকদের দিল্লিতে আসা বন্ধ করার জন্য হরিয়ানা সীমান্তে জলকামান ব্যবহার করা হয়েছিল। রাস্তাও কেটে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তারপর থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বিনয় ও ভদ্রতার অভাব ঘটেনি।

সরকার ইতিমধ্যে কয়েকবার কৃষক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে। মন্ত্রীরা তাঁদের নানা প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু নেতাদের গোঁ, কৃষি আইন বাতিল করতেই হবে। এছাড়া কোনও কথাই হবে না।

কৃষকদের ভয়, নতুন কৃষি আইন কার্যকরী হলে তাঁরা ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পাবেন না। কিষাণ মান্ডিগুলি অচল হয়ে পড়বে। কৃষির ওপরে কর্পোরেটদের একচেটিয়া অধিকার জেঁকে বসবে। আম্বানি-আদানিরা যা বলবেন, কৃষককে তাই মেনে নিতে হবে নতমস্তকে।

সরকার বার বার বলেছে, এরকম হবে না। তাও কৃষকরা যদি চান, নতুন আইনে কয়েকটি রক্ষাকবচের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু কৃষক ইউনিয়নের নেতারা এককথায় সেই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন।

সুতরাং আন্দোলন চলছে। কৃষক নেতারা রোজই হুমকি দিচ্ছেন, আরও জোরদার লড়াইয়ে নামবেন। রাজধানীর সঙ্গে সড়কপথে অন্যান্য জায়গার যোগাযোগ বন্ধ করে দেবেন। সরকার কিন্তু আশ্চর্যরকম সংযত রয়েছে।

ইতিমধ্যে খবর আসছে, পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় কৃষকরা তাঁদের জমি থেকে জিও-র টাওয়ার সরিয়ে নিতে বলছেন। আম্বানি ও আদানিদের নানা অফিস ঘেরাওয়ের কর্মসূচি নিচ্ছেন। এই উগ্রতার জবাবে সরকার বিনীতভাবে ৪০ টি কৃষক ইউনিয়নকে প্রস্তাব দিয়েছে, আসুন আমরা আরও একবার কথা বলি। কখন কোথায় আলোচনায় বসবেন তা আপনারাই ঠিক করুন।

অল ইন্ডিয়া কিষাণ সংঘর্ষ কো-অর্ডিনেশন কমিটির তরফে হান্নান মোল্লা বলেছেন, সরকার কেবল সময় নষ্ট করছে। সে একবারও তিনটি আইন বাতিল করার কথা বলছে না। তার সঙ্গে আলোচনায় বসে লাভ কী?

হান্নান মোল্লার দল সিপিএম কতদূর কৃষক দরদী তা সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম ও নেতাইয়ের মানুষ হাড়ে হাড়ে জানে। তাঁরাই এখন জাতীয় স্তরে কৃষকদের মুরুব্বি হয়েছেন।

মনে হয় সিপিএমের মতো দল চাইছে, সরকার একটা চরম পদক্ষেপ নিক। মারপিট করুক। গরম গরম বিবৃতি দিক। সামনের বছরেই পশ্চিমবঙ্গ ও আরও কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা ভোট আছে। এই সময় কৃষক আন্দোলন নিয়ে অশান্তি সৃষ্টি হলে ভোটে নিশ্চিতভাবেই তার প্রভাব পড়বে।

সরকার যেন এই ফাঁদে পা না দেয়। এখনকার মতো বরাবরই যেন সংযত থাকে। তাতে হয়তো আন্দোলনের নিষ্পত্তি হতে কিছুকাল দেরি হবে। কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশে এটুকু ধৈর্য ধরা ছাড়া উপায় নেই। উগ্রতার সঙ্গে লড়াইয়ে সংযম সবসময়ই জয়ী হয়। কৃষক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তাই হবে। মোদী সরকার যদি মাথা ঠান্ডা রাখে, আন্দোলনকারীরা একসময় যুক্তির পথে আসতে বাধ্য হবেন।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.