আফগানিস্তানে শক্ত হচ্ছে পাকিস্তানের মুঠি, আরও সতর্ক থাকতে হবে ভারতকে

ব্যাপারটা কী? তালিবান কাবুল দখল করেছে প্রায় তিন সপ্তাহ হয়ে গেল, এখনও সরকার (Government) গঠন করছে না কেন? ইতিমধ্যে আমেরিকার সেনাবাহিনী দেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। তালিবান আগ বাড়িয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলকে আশ্বাস দিচ্ছে, এবার আর আগের মতো কড়াকড়ি করবে না। আবার ঘোর প্রদেশে তারা এক মহিলা কনস্টেবলকে গুলি করে মেরেছে বলে শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ আফগানিস্তানে অনেক কিছুই ঘটছে, শুধু সরকারটা হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না?

একটা কথা খুব কৌশলে চাউর করে দেওয়া হয়েছে, তালিবানের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বই এর কারণ। তালিবান সরকারে যিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে, সেই মোল্লা আবদুল গনি বরাদরের সঙ্গে নাকি হাক্কানি নেটওয়ার্কের বিরাট মন কষাকষি চলছে। তা থেকে মারামারি পর্যন্ত হয়েছে। খোদ মোল্লা বরাদর নাকি সেই সংঘর্ষে চোট পেয়েছেন। তালিবানের উপদলীয় কোন্দল থামাতে ইসলামাবাদ থেকে তড়িঘড়ি কাবুলে উড়ে গিয়েছেন আইএসআই প্রধান ফৈয়াজ হামিদ।

তালিবানের এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের খবর ডাহা মিথ্যা বলে মনে হয়। তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল বাহিনী। নইলে আদ্যিকালের অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আমেরিকাকে নাস্তানাবুদ করতে পারত না। তালিবান যোদ্ধারা কথায় কথায় নিজেদের মধ্যে মারপিট করবে, নেতাকে আঘাত করবে, একথা বিশ্বাস হয় না।

মনে হয়, তালিবানের সরকার গড়ার পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে পঞ্জশির। সেখানে স্থানীয় উপজাতিদের সঙ্গে আছে ভুতপূর্ব আফগান সরকারের সৈনিকরা। তাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র কম নেই। তার ওপরে পঞ্জশিরের ভূ-প্রকৃতি গেরিলা যুদ্ধের পক্ষে খুবই অনুকূল। সেখানে রাস্তাঘাট বিশেষ নেই। উঁচু উঁচু পাহাড়ের মধ্যে গিরিপথ দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। সরু গিরিপথে যখ শত্রু সেনা ঢোকে, ওপর থেকে হামলা চালায় গেরিলা বাহিনী।

ইতিহাসবিদরা বলেন, যিশু খ্রিস্টের জন্মের চারশ বছর আগে এই পঞ্জশিরে বিরাট বিপদে পড়েছিলেন দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার। সেখানকার গিরিপথ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর অনেক সৈন্য মারা পড়েছিল। বাধ্য হয়ে তাঁকে অভিযানের গতিমুখ ঘুরিয়ে দিতে হয়।

ত্রয়োদশ খ্রিস্টাব্দে পঞ্জশিরে হানা দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন দুধর্ষ চেঙ্গিস খান। স্থানীয় গেরিলাদের হাতে তাঁর শত শত মোঙ্গল সেনা নিহত হয়েছিল। বিংশ শতকের সাত ও আটের দশকে সোভিয়েত সেনাকে হারিয়ে দিয়েছিল পঞ্জশির। এবার তালিবানের পালা।

সম্ভবত পঞ্জশির দখল নিয়ে শলাপরামর্শ করতেই কাবুলে গিয়েছেন আইএসআই প্রধান। তালিবান বড় গলায় বলছে বটে তারা পঞ্জশির দখল করেছে, কিন্তু সেকথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তারা হয়তো পঞ্জশিরের প্রাদেশিক রাজধানীতে ঢুকেছে। কিন্তু কৌশলগত জায়গাগুলি এখনও বিরোধীদের দখলেই।

অর্থাৎ পঞ্জশির কাঁটার মতো বিঁধে আছে তালিবানের গলায়। সেই কাঁটা উপড়ে ফেলার আগে তারা সরকার গঠন করতে চাইছে না। কারণ সরকার তৈরি হয়ে গেলে পঞ্জশিরে যুদ্ধ চালানো অসুবিধাজনক হয়ে উঠবে। সারা বিশ্ব দেখবে, তালিবান সরকারকে নিজের দেশের মধ্যেই লড়াই করতে হচ্ছে।

পঞ্জশিরের যুদ্ধে আফগানিস্তানকে সাহায্য করছে পাকিস্তান। এর ফলে ওই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির ওপরে ইসলামাবাদের মুঠি আরও শক্ত হবে। সেখানেই ভারতের ভয়। পাকিস্তানের মদতে যারা কাশ্মীরে হামলা চালায়, তারা হয়তো আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে গড়ে তুলবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। জেহাদিরা তালিবানের থেকে অস্ত্রশস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ করে ঢুকতে চাইবে কাশ্মীরে। এমনিতে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ এবং নানা কড়াকড়ি নিয়ে কাশ্মীর উপত্যকার বাসিন্দাদের একাংশ ক্ষুব্ধ। তার ওপরে যদি তালিবান আর পাকিস্তান উস্কানি দিতে থাকে, পরিস্থিতি খারাপ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা।

কাশ্মীর নিয়ে তালিবান নেতারা নানারকম উল্টোপাল্টা বলছেন। হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতা আনাস হাক্কানি বলেছেন, তাঁরা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাতে চান না। তার কয়েকদিন বাদেই তালিবানের মুখপাত্র সুহেইল শাহিন বলেছেন, কাশ্মীরের মুসলিমদের নিয়ে তাঁরা সরব হবেন।

তালিবানের একটি অংশ ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছে। গত সপ্তাহে দোহায় ভারতের প্রতিনিধি দীপক মিত্তালের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন তালিবানের শীর্ষস্থানীয় নেতা শের মহম্মদ আব্বাস স্তানেকজাই। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, আফগানিস্তান থেকে ভারতীয়দের নিরাপদে ফিরে যেতে দেবেন।

প্রশ্ন হল তালিবানের এইসব আশ্বাসে কতদূর আস্থা রাখা যায়? হাক্কানি নেটওয়ার্ক ২০০৮ সালে কাবুলে ভারতীয় দূতাবাসে বিরাট বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। এক কূটনীতিক সহ ৬০ জন মারা গিয়েছিলেন। ‘৯৯ সালের শেষে ভারতীয় বিমান হাইজ্যাকের ঘটনাতেও তালিবানের যোগসাজশ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ছিনতাইকারীরা দিল্লিগামী বিমানটিকে নিয়ে গিয়েছিল কান্দাহারে। কারণ জঙ্গিরা জানত, তালিবান শাসিত আফগানিস্তানে তারা নিরাপদ। বিমানের যাত্রীদের বিনিময়ে যে তিনজনকে মুক্ত করা হয়, তাঁদের একজন হলেন মৌলানা মাসুদ আজহার। তিনি মুক্তি পেয়ে জয়েশ-ই-মহম্মদ নামে সংগঠনটি তৈরি করেন। গত দু’দশক ধরে কাশ্মীরে সন্ত্রাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে জয়েশের বিশেষ অবদান আছে।

কাবুল দখলের পরে তালিবানের চরিত্র পুরোপুরি বদলে গিয়েছে ভাবলে বোকামি হবে। ভারত আপাতত ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ পলিসি নিয়েছে। অর্থাৎ কিছুদিন চুপচাপ বসে দেখা হবে, তালিবান কী করতে চায়। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।

ভয় একটাই, অপেক্ষা করতে গিয়ে অনেক দেরি না হয়ে যায়। তালিবান যে ধরনের সংগঠন, তারা আফগানিস্তানে একটু গুছিয়ে বসার পরে আর সময় নষ্ট করবে না। তথাকথিত জেহাদে মদত দিতে থাকবে। না দিয়ে তাদের উপায় নেই। কারণ জেহাদ চালানোর জন্যই তালিবানের জন্ম।

ভারতের উচিত এখনই তালিবানের বিপদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হওয়া। এক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে যেমন ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে, সেই সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে। আফগানিস্তানের পশ্চিমে আছে ইরান ও ইরাক। উত্তরে আছে তাজকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান। তালিবানের উত্থানে তারা সকলেই চিন্তিত। ভারতের উচিত এই দেশগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলা। তাহলে তালিবানের যে কোনও অপকর্মের জবাব দেওয়া সহজ হবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More