এত অসহিষ্ণুতা কেন

মানুষ যখন মনে মনে অপরাধবোধে ভোগে, তখন সে বাইরের সমালোচনাকে খুব ভয় পায়। ভাবে, ওই সমালোচনার জন্যই তার পতন ঘটবে। কেন্দ্রে মোদী সরকার যেভাবে গত কয়েকমাস ধরে সোশ্যাল মিডিয়াকে লাগাম পরানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে, তাতে মনে হচ্ছে, মন্ত্রীরা সমালোচনাকে ভয় পাচ্ছেন।

টুইটার, ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপে গত কয়েক মাস ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রবল নিন্দেমন্দ চলছিল। অনেকেই লিখছিলেন, কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য দায়ী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর সহকর্মীরা। সরকারের কর্তারা সম্ভবত নিজেরাও উপলব্ধি করেছেন, অতিমহামারী নিয়ন্ত্রণে তাঁদের প্রস্তুতির অভাব ছিল। এই নিয়ে যাতে বেশি সমালোচনা না হয়, সেজন্য তাঁরা সামাজিক মাধ্যমের গলা টিপে ধরতে চাইছেন। এমনকি কেউ সামাজিক মাধ্যমে কার্টুন পোস্ট করলেও তাঁদের গায়ে জ্বালা ধরছে।

জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট মঞ্জুল সম্প্রতি মোদীকে নিয়ে কয়েকটি কার্টুন এঁকে টুইটারে পোস্ট করেছিলেন। জুনের শুরুর দিকে জানা যায়, সরকার টুইটারকে বলেছে, ওই অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ওই হুকুম শুনে খুশি হয়নি টুইটার। তারা মঞ্জুলকে সরকারি নির্দেশের কথা জানিয়ে বলেছে, আপনি ইচ্ছা করলে আইনি পরামর্শ নিতে পারেন।

টুইটারের সঙ্গে সরকারের বিরোধ চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। বিরোধের কেন্দ্রে আছে একটি আইন।

সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের জন্য গত ২৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় বৈদ্যুতিন ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক একটি আইন আনে। টুইটার, হোয়াটস অ্যাপের মতো সংস্থাকে বলা হয়, তিন মাসের মধ্যে নয়া বিধি মেনে চলার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। বিধি ঠিকমতো মানা হচ্ছে কিনা দেখার জন্য নিয়োগ করতে হবে একজন চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, একজন নোডাল কনট্যাক্ট পার্সন ও একজন গ্রিভান্স অফিসার। তাঁরা থাকবেন ভারতেই।

১৮ মে বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র টুইটারে একটি স্ক্রিনশট পোস্ট করে বলেন, মোদী সরকারের বিরুদ্ধে কংগ্রেস টুলকিট বানিয়েছে। তাতে কোভিড মোকাবিলা নিয়ে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ‘ব্যর্থতার’ অভিযোগ করা হয়েছে। কংগ্রেস দাবি করে, ওই টুলকিট ভুয়ো। ২০ মে টুইটারও কার্যত কংগ্রেসের বক্তব্যই সমর্থন করে। ২৫ মে দিল্লির কাছে গুরগাঁওতে টুইটারের অফিসে হানা দেয় পুলিশ। টুলকিট মামলায় তদন্ত করার জন্য টুইটার কর্তৃপক্ষকে নোটিশ ধরানো হয়।

তার পরদিন, অর্থাৎ ২৬ মে থেকে চালু হয় নতুন আইন। সরকার টুইটারকে চিঠি দিয়ে জানতে চায়, তারা নতুন আইন মানছে না কেন? এরপর উপরাষ্ট্রপতি বেঙ্কাইয়া নায়ডু, আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত ও সঙ্ঘের আরও কয়েকজন নেতার ভেরিফায়েড টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে ব্লু টিক সরিয়ে নেয় টুইটার। এতে রীতিমতো অসন্তুষ্ট হয় কেন্দ্রে শাসক দল। কয়েক ঘণ্টা পরে অবশ্য ওই অ্যাকাউন্টগুলির পাশে ব্লু টিক ফিরে আসে। টুইটার ব্যাখ্যা দেয়, ওই অ্যাকাউন্টগুলিতে গত বছরের জুলাই মাস থেকে কিছু পোস্ট করা হয়নি। তাই ব্লু টিক সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

২৭ মে টুইটার অভিযোগ করে, কেন্দ্রীয় সরকার বাক্‌স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। অন্যদিকে সরকার পালটা মন্তব্য করে, দেশের আইন মানতে চাইছে না টুইটার। তারা নিজেদের খুশিমতো চলতে চাইছে।

সর্বশেষ খবর, সরকারি বিধিনিষেধ মানতে রাজি হয়েছে টুইটার।

সরকারের সঙ্গে টুইটার বিরোধে জড়িয়ে পড়ার পরে আগাগোড়া সোশ্যাল মিডিয়ার পক্ষ দাঁড়িয়েছে কংগ্রেস। কিন্তু আঞ্চলিক দলগুলি এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয়ভাবে চুপ। তারা কারণে-অকারণে মোদী সরকারের সমালোচনায় গলা ফাটায়। কিন্তু বাক্‌স্বাধীনতার প্রশ্ন উঠলে টু শব্দটি করে না।

আসলে আঞ্চলিক দলগুলি নিজেরাও যথেষ্ট অসহিষ্ণু। কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে ভীষণ রেগে যায়। নির্যাতন চালিয়ে প্রতিবাদীর মনোবল ভেঙে দিতে চেষ্টা করে। পশ্চিমবঙ্গে অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্রের ঘটনা এখনও অনেকে ভোলেননি। তাঁর অপরাধ ছিল, ফেসবুকে তৃণমূলনেত্রী ও তাঁর দলের তৎকালীন এক শীর্ষ নেতাকে নিয়ে আঁকা কার্টুন ফরোয়ার্ড করেছিলেন। তাতেই তাঁর লাঞ্ছনার সীমা ছিল না। অতীতে অন্যান্য আঞ্চলিক দলও এমন কীর্তি করেছে। সামাজিক মাধ্যম নিয়ে কেন্দ্র কড়াকড়ি করলে তাদের আপত্তি নেই। তারা সরাসরি মোদী সরকারের পক্ষে দাঁড়াতে পারছে না বটে, কিন্তু বিরুদ্ধেও কিছু বলছে না।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বলা হয়, বাক্‌স্বাধীনতা একরকম সেফটি ভালভের মতো। মানুষ যদি মন খুলে সরকারের সমালোচনা করতে পারে, তাহলে দেশে অশান্তি কম হয়। কিন্তু শাসকের বিরুদ্ধে বলা বন্ধ করে দিলে অনেকে হিংসাত্মক পথের দিকে আকৃষ্ট হতে পারে। তাতে উগ্রপন্থার জন্ম হয়। পরিণামে দেখা দেয় নৈরাজ্য।

আমাদের রাজনীতিকরা অবশ্য অত তলিয়ে ভাবতে রাজি নন। তাঁরা যা খুশি করবেন, কেউ সমালোচনা না করলেই হল। তা হলেই তাঁরা খুশি।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More