পদ্মশ্রী পদ্মাবতী, ভারতের প্রথম মহিলা এয়ার মার্শাল আবার চিকিৎসক-বিজ্ঞানীও

পদ্মাবতী বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতীয় বায়ুসেনার প্রথম এয়ার ভাইস মার্শাল, এয়ার ফোর্স মেডিক্যালের প্রথম মহিলা এডিজি (অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল), এবছরেই পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। দেশের গর্ব এয়ার মার্শাল পদ্মাবতী বন্দ্যোপাধ্যায় অবসর নিয়েছেন অনেকদিনই। কিন্তু এখনও তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্যালুট জানায় ভারতীয় বায়ুসেনা বাহিনী।

চৈতালী চক্রবর্তী

১৯৭১ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের দুন্দুভি বেজেছে। পঞ্জাবের হালওয়ারা বায়ুসেনা ঘাঁটিতে এয়ার ফোর্সের মেডিক্যাল অফিসারদের টিমে এক কমবয়সী তরুণী। ভারতীয় সেনাবাহিনীর জাঁদরেল অফিসারদের মাঝে এই তরুণী একটু বেশিই বেমানান। অবাক হলেন অনেকেই। তরুণী কিন্তু ডাকাবুকো। শিরদাঁড়া সোজা করে সেনার মেজাজে আর নিয়মানুবর্তিতায় মন জিতলেন সকলেরই। ভারত-পাক যুদ্ধে হালওয়ারা এয়ার বেসে তাঁর অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য কম বয়সেই ঝুলিতে এল বিশিষ্ট সেবা মেডেল।

পদ্মাবতী বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতীয় বায়ুসেনার প্রথম এয়ার ভাইস মার্শাল, এয়ার ফোর্স মেডিক্যালের প্রথম মহিলা এডিজি (অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল), এবছরেই পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। দেশের গর্ব এয়ার মার্শাল পদ্মাবতী বন্দ্যোপাধ্যায় অবসর নিয়েছেন অনেকদিনই। কিন্তু এখনও তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্যালুট জানায় ভারতীয় বায়ুসেনা বাহিনী।

অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা করেছিলেন প্রতিবেশী মহিলা ডাক্তার পদ্মাবতী, তাঁকে দেখেই মেডিক্যালে ঝোঁক

১৯৪৪ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের তিরুপতিতে জন্ম পদ্মাবতীর। পদ্মাবতী স্বামীনাথন। বাবা ভি স্বামীনাথন কড়া হলেও মেয়ের শিক্ষার ব্যাপারে যথেষ্টই উদার ছিলেন। পরাধীন ভারতের গোঁড়া পরিবারে জন্মেও পর্দার আড়ালে থাকেননি পদ্মাবতী। স্কুলের পাঠ তখন জোরকদমে চলছে, পদ্মাবতীর মা যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলেন। একটু একটু মাকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে দেখেছেন। সেই সময় তাঁর মায়ের চিকিৎসা করতেন এক প্রতিবেশী মহিলা ডাক্তার। তাঁরও নাম ছিল পদ্মাবতী। লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপিকা ডাক্তার এস আই পদ্মাবতী। তাঁর সংস্পর্শে এসেই ডাক্তার হওয়ার সাধ জাগে কিশোরী পদ্মাবতীর মনে।

আর্মড ফোর্স মেডিক্যাল কলেজ সবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, এন্ট্রান্সেই বাজিমাত করলেন পদ্মাবতী

মেয়েকে উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বাবা। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিরোরি মল কলেজ থেকে পাশ করেই পুণের আর্মড ফোর্স মেডিক্যাল কলেজের (এএফএমসি) এন্ট্রান্সে বসলেন পদ্মাবতী। একবারেই সুযোগ। প্রবেশিকা পরীক্ষায় মেয়ের মেধা দেখে অবাক শিক্ষকরা। সেটা ১৯৬২ সাল। এএফএমসি সবে গড়ে উঠেছে। প্রথম ব্যাচেই ছাত্রী পদ্মাবতী। বাড়ি থেকে দূরে হস্টেলে থেকে পড়াশোনা। সহপাঠীরা বেশিরভাগই ছাত্র। কিন্তু বাধ সাধল পরিবার। মায়ের অসুস্থতা, আত্মীয়দের চাপে পরীক্ষা দিতে পারলেন না পদ্মাবতী। তবে পিছিয়ে গেলেন না। হার না মানা জেদ তাঁর শিরায় শিরায়। দ্বিতীয় ব্যাচে আবার নতুন উদ্যোমে শুরু করলেন। ১৯৬৮ সাল। পাঁচ বছরের কোর্স শেষ করে পদ্মাবতী যোগ দিলেন বায়ুসেনা বাহিনীতে।

আরও পড়ুন: পাকিস্তানের রণতরী ডুবিয়ে করাচি বন্দর ছারখার করে দিয়েছিল ভারতীয় নৌসেনা: অপারেশন ট্রাইডেন্ট

প্রথম প্রেম, বদলে গেল পদ্মাবতীর জীবন

বেঙ্গালুরুর এয়ার ফোর্স হাসপাতালে ইনটার্ন হিসেবে যোগ দিলেন পদ্মাবতী স্বামীনাথন। ট্রেনিং চলছে জোরকদমে। একদিন হঠাৎ দেখা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সতীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সতীনাথ তখন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার। প্রথম দেখাতেই প্রেম। বন্ধুত্ব বাড়ে ধীরে ধীরে। সাত পাকে বাঁধা পড়েন অচিরেই।  ১৯৭১-এর যুদ্ধ সতীনাথের পোস্টিং পঞ্জাবের হালওয়ারা বায়ুসেনাঘাঁটিতে। পদ্মাবতীও গেলেন তাঁর সঙ্গে। মেডিক্যাল অফিসারদের টিমে কমবয়সী পদ্মাবতীকে দেখে প্রথমে তাজ্জাব হয়েছিলেন অনেকেই। তবে মেয়ের দক্ষতা দেখে আর সন্দেহের কোনও অবকাশই থাকে না। যেমন চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর অসামান্য জ্ঞান, তেমনি এক সেনা অফিসারের মতো দুর্জয় সাহস। স্বামী-স্ত্রী দু’ জনকেই বিশিষ্ট সেনা মেডেলে সম্মানিত করা হয়েছিল।

১৯৭৫ সালে অ্যাভিয়েশন মেডিসিনে স্পেশালাইজেশন করেন পদ্মাবতী। ১৯৭৮ সালে ডিফেন্স সার্ভিস স্টাফ কলেজের এন্ট্রান্সে ফের চমক দিলেন মেয়ে। ডিফেন্স সার্ভিস স্টাফ কলেজের প্রবেশিকা পরীক্ষা ছিল বেশ শক্ত। এখান থেকে পাশ করা মানেই একধাপে ডিফেন্স ফোর্স অফিসারের র‍্যাঙ্ক। পদ্মাবতীই প্রথম মহিলা যিনি একবারেই এই কোর্সে সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। অ্যারোস্পেস মেডিক্যাল সোসাইটির প্রথম মহিলা মেডিক্যাল অফিসার পদ্মাবতী।

বায়ুসেনার প্রথম এয়ার মার্শাল, ইতিহাস গড়লেন পদ্মাবতী

ভারত-পাক সম্পর্ক তখন ফের তলানিতে। উত্তেজনার চরম আবহ চলছে। ওয়েস্টার্ন এয়ার কম্যান্ডে ডেপুটি প্রিন্সিপাল মেডিক্যাল অফিসার (স্পেশালিস্ট) হিসেবে পোস্টিং হল পদ্মাবতীর। কার্গিল যুদ্ধে সমস্ত বায়ুসেনা ঘাঁটিতে ঘুরে ঘুরে তদারকি করেছিলেন তিনি।

২০০০ সালের ২৬ জুন। ইতিহাস গড়লেন পদ্মাবতী বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতীয় বায়ুসেনা বাহিনীর প্রথম এয়ার মার্শাল হলেন পদ্মাবতী। এয়ারফোর্স মেডিক্যাল ইউনিটের কম্যান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব এল তাঁরই কাঁধে। এয়ারফোর্স মেডিক্যাল কম্যান্ডিং অফিসারের দায়িত্বে অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য ২০০২ সালের ২৬ জানুয়ারি অতি বিশিষ্ট সেবা মেডেলে সম্মানিত করা হয় তাঁকে। উন্নতির প্রতিটা ধাপ ছিল পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের। লিঙ্গবৈষম্যের আড় ভেঙেছিলেন পদ্মাবতী। পরবর্তীকালে এয়ারফোর্স মেডিক্যাল সার্ভিসের অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেলও হয়েছিলেন তিনি।

এয়ার মার্শাল, এয়ার মেডিক্যাল ইউনিটের কম্যান্ডিং অফিসার পদ্মাবতী ছিলেন বিজ্ঞানীও

এয়ার মার্শাল পদ্মাবতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেধার পরিধি ছিল সমুদ্রের মতোই। বায়ুসেনা সূত্রই জানিয়েছে, বিজ্ঞানচর্চাতেও ছিল তাঁর ঝোঁক। ডিফেন্স ইনস্টিটিউট অব ফিজিওলজি অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সে উইং কম্যান্ডার হিসেবে পোস্টিংয়ের সময় উত্তর মেরুতে দীর্ঘদিন গবেষণা চালিয়েছিলেন তিনি। এর জন্য তাঁকে ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছিল। নিউ ইয়র্ক অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের সদস্যও হয়েছিলেন পরবর্তীকালে। ২৩টি রিসার্চ প্রজেক্ট আছে তাঁর, ২৭টি পাবলিকেশন আচে তাঁরই নামে। এয়ার ফোর্স ওয়াইভস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ট্রফিও (AFWWA) দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। চলতি বছর পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হয়েছেন পদ্মাবতী।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More