‘উদাসীন মল্ট’ : স্বপন রায়ের গুচ্ছ কবিতা

স্বপন রায়

##

উড়ে যাওয়ার পরেই পাখি হলাম। সারংশময় এক সাঁতারু আকাশের। তুমি যাওয়ার পরেই। ডানা বৈষ্ণব, ঠোঁট শাক্ত পদাবলী। কখন তুমি চলে গিয়েছ কে জানে, শুধু বৃষ্টি বেজেছিল পায়ের পাতার মতন, লিখেই ভেজা বাইলেনে কে যেন, ডাকল। বৃষ্টিফেরার ডাক। চলে গেল ট্রামের মাথায় জড়িয়ে। এই মিয়াঁ তো ওই মালহার, চা ফুটছে। রাস্তার আর কি, জল চুষবে। আকাশ বদলাচ্ছে, তাই।

পাখি হয়েই ডানা ঝাড়লাম। হাত ডানার কবরে শুয়ে আছে। তুমি হাতের ব্যবহার নিয়ে বলতে।কত পুরনো আমাদের সভ্যতা, বলতে।তোমার বুকে আমি একটা শব্দ আর একটা গন্ধ পেতাম। গন্ধটা হিমনাশক। শব্দটা পাল্কির। হু হু হু হু হুমনা। অসভ্য, বলতে। আমার বাড়ি এখন পাখির বাসা। বাড়ি আর বাসার মধ্যে শুধু একটা গান।‘মন খারাপ করা বিকেল মানেই মেঘ করেছে..’। শধু এই গানটা, আমি পেরোতে চাইছি…

১৪.

মৌকাল, একটা বাংলোর নাম। আজ চাঁদ আর চার্চের বিয়োগব্যথায় শাদা। শালের পাতায় মহুয়া ঢুকে বসে আছে। শালশরাবী রাত আজ, হাতি এলে সেই হস্তীনির কথাও ভাববো যে প্রথম ভালবেসেছিল।‘কি কি হবে’ থেকে ‘কি হবে’ অব্দি এই জঙ্গল। নেশা পাতা, নেশানিমীল পাতায়। চোখ এবার সায়র হবে, দিঘি হবে, আমি রাস্তার ধারে আলকায়দা। না, আলকায়দা নয়, আলটপকা ব্লুজ। বাংলো শব্দটা সেক্সি। কেন, বাংলো খুলে ঢুকতে হয় বলে?- তুমি। ঢুকে বন্ধও করতে হয়, বললাম। তুমি উঠে এলে। চাঁদ আর চার্চের মাঝখানে, হোমস আর ওয়াটসনের মাঝখানে। সারা গায়ে রহস্যকাতার। খুলোনা, থাক। পাইপের ধোঁয়া ঘুরছে, বাইসন ঘুরছে, চিতাবাঘ ঘুরছে, হাতিও। আর মৌকাল, মৌকাল নামটা?

আমি ডেকে উঠলাম। তুমি শুনলে কি শুনলে না, চার্চের মাথায় চাঁদ লটকে গেল। বাঘ ফুরিয়ে যাচ্ছে। বাঘের প্রেম। আমি তাই ডাকলাম। বাঘ গড়ে উঠছে যেন।তুমি কি ভয় পেলে, বাঘ কখনো রেপ করেনা, ভয় নেই। বলেই দেখলাম, বাঘিনী দাঁড়িয়ে আছে।

দূর দূর তক ইহাঁ কোই নহি হ্যায়, মনে হল বলছে বাঘিনীটা..

১৫.

বাকি ইস্তাম্বুলে, দিয়ে বললাম। কি দিলাম আমি, কি দিতে পারি যখন ট্রাম্প আর পুতিন মাছ ধরছে। কুয়াশা থাকায়, দিঘির একটাই রঙ। মাঝে মাঝে ধাক্কা দিচ্ছে শাদা হাঁসেরা, কুয়াশাকে।

রাজহাঁস, সঙ্গে দিঘি। অপেরামেরুণ বলশয়, আমি তার কাছে কয়েকশো হাঁসের জলছবি নিয়ে, প্লেন ড্রেসে, যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে আমি স্বপন। আমার বাড়ি খড়গপুরে। আর আমি মাছ খেতে ভালবাসি। ট্রাম্প আর পুতিন মাছ ধরছে। ওডেট আর ওডিলও এল। একই নাম, সেই কবে থেকে। আমি পাল্টে দিলাম। হিয়া আর চূয়া। ওরা খুব খুশি। আমায় প্রিন্স ট্রিন্স ভাবছে নাতো? বলে দিলাম, আমি ইস্তাম্বুলে চলে যাবো, তার আগে হাঁস আর দিঘিটা মেপে নিচ্ছি। ট্রাম্প পুতিনকে কি যেন বলছে। নাক ডাকা নিয়ে। পুতিন হাসল। নাক নিয়ে কোন সমস্যা নেই, রাশিয়ার। চাইকোভস্কি জাগিয়ে রাখবে।

সরু সরু আত্মহত্যার রেশ বলশয়ে। হাঁসেরা রাজপরিবারে উড়ছে। মাছ ধরার ছিপে চারা পুঁতে দিচ্ছে নুডলসবিহারী লালঝাণ্ডা। ব্যালেরিণা, ফুটে ওঠার প্রকাশ দিল। নেভানিভু  বলশয়ের শিহরাতুর চেলো, অনাদি ভায়োলিন, শরণাগত পিয়ানো। মাছের সাঁতার ব্যালেরিণার পায়ে। ট্রাম্প, পুতিন, স্বপন, নাজমুল, পিওতের, স্তেফান। কোন মানে নেই, নামগুলো চলে যাচ্ছে এখন। রাত হল। খিদে বাড়ল মানবজাতির।

বাকি ইস্তাম্বুলে। কবিতাকে নিয়ে পালাচ্ছি। কবিতা ব্যালেরিণা। কবিতা মীণ। কবিতা শিকার। ইস্তাম্বুল একটা জায়গা। উচ্চারণ করতে ভাল লাগে, তাই…

১৬.

রাস্তা কিসের। যদি আচমকা দেখা না হয়..

হবে না। কে যেন বলল। রাস্তায় যেমন হয়, বলাবলি। আশাকে আসা বলা, বাসাকে বাশা।সামান্য টানে গড়ে ওঠে তিল। টোল পড়ে যায় হাওড়া ব্রিজের। রাস্তায় যে ধূসর, তাকে জানলায় দেখেছিলাম কাল, হাসপাতালের। পুলিশ? বিষাদ জড়ানো বিটে আসানবোনির কথা ভাবছে। আসানবোনিতে গাছের বাবা গাছ। গাছের মা বৃক্ষা। গাছের বৌ রোপিতা। গাছের বোন কুঁড়ি। গাছের ছেলে মেয়ে, রোদ আর আলো।আর কিছু নেই। এখানে আর কেউ নেই পুলিশের। সে গান গাইছে, পাতা বলছে সা, শাখা বলছে রে। রাস্তায় চোর নেই, মন্ত্রী নেই। জোরকদমে মেঘ ঘনাতেই ছায়াপ্রচারিত শাঁপলায় ফোঁটা পড়ল আসমাবেগমের। শান্তি, সেতো এইমাত্র হল, তাইনা?ওই ফোঁটা থেকে কার যেন মৃত্যুরহস্য পর্যন্ত, শান্ত শুধুই শান্তি।

আমি এবার বাইরে। জল ও বাতাসের দুনিয়া, বাইরের একটা লোক কিভাবে বলবে কত ধানে কত চাল হয়? রাস্তা কিন্তু সব নিয়েই জট পাকাচ্ছিল। দেখা হলে দেখা হবে। দেখা যাক..

আচমকা কে যেন। তুমি? তুই? পুরো রাস্তা তাকিয়ে আছে, এগিয়ে আসছে পুলিশের জীপ। জল খেলাম। হাওয়া ভরলাম খাঁচায়। জীপটা থামলো না। চলে গেল রাস্তা দিয়ে। আমার হাতে কার যেন আবছা হয়ে আসা ঠিকানা। রাস্তা নেই যার। নামও।আর বুলবুলি যে পাখি, কোন মেয়ে নয়, জানি এটা….

১৭.

অন্য তার মনস্কতা। ঝিলের ওপরে পাখিভাঙা আসর, রিড রিড জলবাহার হতে পারে। বা, ইলেকট্রনিক মূর্ছা সেজুঁতির ডান গাল ছুঁয়ে। কালকের বৃষ্টি আজ বর্ষা হয়েছে। মনস্ক তার কাটুমে চিবুকপানা ডৌল, বাসের জানলায় টিট্টহি টিট্টহি

তার নাম কিভাবে মন খুলে দেবে। নাম একটা প্রতীক। মন প্রতীকের কেউ না। দূর দূর অবধি কেউ না। নামের ভেতরে মন নেই, মনের শধু পড়ে যাওয়া নাম, খালবিলে, মদের দোকানে, সব্জির ঝাঁকায় এত নাম, একটিই সেজুঁতির।

কে, জানিনা।যখন সেঁজুতির নাম হচ্ছিল বাসের জানলায়, সেঁজুতি কারো নাম নয় এই প্রচারও ছিল টায়ারে টায়ারে।

চাপা একটা চিৎকার ঘনগহনমোহে পড়ে রইলো অনেকক্ষণ

কাশ এভাবেই হয় শাদা, সব রক্ত বেরিয়ে যাওয়ার পরে..

স্বপন রায়ের প্রকাশিত বই  : কবিতা— আমি আসছি [সাংস্কৃতিক খবর প্রকাশনী, ১৯৮৪] চে [সাংস্কৃতিক খবর প্রকাশনী, ১৯৯০] লেনিন নগরী [কবিতা ক্যাম্পাস প্রকাশনী, ১৯৯২] কুয়াশা কেবিন [কবিতা ক্যাম্পাস প্রকাশনী, ১৯৯৫] ডুরে কমনরুম [কবিতা ক্যাম্পাস প্রকাশনী,১৯৯৭] মেঘান্তারা [নতুন কবিতা প্রকাশনী, ২০০৩] হ থেকে রিণ [নতুন কবিতা প্রকাশনী, ২০০৮] দেশরাগ [নতুন কবিতা প্রকাশনী, ২০১১] সিনেমা সিনেমা [নতুন কবিতা প্রকাশনী, ২০১৫] আইসক্রিম

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More