তৃণমূলের নেতাজি বনাম বিজেপির নেতাজি, ‘জয় শ্রীরাম’-এর পর মেরুকরণ আরও তীব্র

রফিকুল জামাদার

নবান্ন বলছে, দেশনায়ক দিবস। নেতাজির জন্মদিনে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হোক।

সাউথ ব্লক সে কথায় কান দিল না। কথায় কথায় ছুটি ঘোষণা করা এমনিতেই দিল্লির ধাতে নেই। কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকারও নেতাজির জন্ম শতবর্ষে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেনি। তবে এই সরকার বলল, ২৩ জানুয়ারি হবে পরাক্রম দিবস।

দিল্লি আবার জানাল, কালকা মেলের নাম বদলে নেতাজি এক্সপ্রেস করা হল।
অমনি নবান্নের ঘোষণা, আজাদ হিন্দ মনুমেন্ট হবে কলকাতায়।

অর্থাৎ সুভাষচন্দ্র বসুর ঐতিহ্যকে নিয়ে বিজেপি-তৃণমূল তুল্যমূল্য রাজনীতির প্রেক্ষাপট তৈরিই ছিল। শনিবার তা উচ্চতায় পৌঁছল। এতটাই যে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে নেতাজি জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র বক্তৃতার আগে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান উঠল। তাতে দৃশ্যত রেগে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী। বললেন, সরকারি অনুষ্ঠানের অমর্যাদা করা হচ্ছে। তাই শুধু ‘জয় বাংলা, জয় হিন্দ’ বলে তিনি বসে পড়লেন।

নেতাজি জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে জয় শ্রীরাম স্লোগান ষোল আনা বেমানান। প্রাসঙ্গিকও নয়। বিজেপির অতি উৎসাহী কিছু কর্মী জ্ঞানশূন্য হয়ে যে তা করেছেন তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। এর প্রতিবাদ হবে সেটাই স্বাভাবিক।
তবে অনেকে মনে করছেন, বিষয়টাকে শুধু এটুকুতেই দেখা হবে কেন? কেনই বা বড় ক্যানভাসে দেখা হবে না।

বৃহৎ ছবি দেখতে হলে সকাল থেকে শুরু করতে হবে। এদিন সকালে এলগিন রোডে নেতাজির বাসভবনে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই তিনি প্রথম বলেন, পরাক্রম মানে বুঝি না। আমরা বলছি দেশনায়ক দিবস।
পরে শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় থেকে সরকারি উদ্যোগে পদযাত্রা শুরু হয়। সেই অনুষ্ঠানে সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রচুর মানুষ উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তার পরেও সেই অনুষ্ঠান সত্যিই সরকারি নাকি শাসক দলের কর্মসূচি তা অনেকেই ফারাক করতে পারেননি। কারণ, তা সর্বদলের অনুষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি। সেখানে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা, বাম পরিষদীয় দলনেতা বা নেতাজির তৈরি দল ফরওয়ার্ড ব্লকের তেমন কোনও প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি। অথচ অনুষ্ঠানের মেজাজের দাবি ছিল, তা সর্বদলের অনুষ্ঠানে উন্নীত হোক।

দ্বিতীয়ত, মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতায় যতটা নেতাজির প্রতি আবেগ ও তাঁর অনুপ্রেরণাকে পাথেয় করে এগিয়ে চলার কথা ছিল, ততটাই ছিল কেন্দ্র বিরোধিতা। কখনও তা প্ল্যানিং কমিশন তুলে দেওয়ার প্রসঙ্গে, কখনও পরাক্রম দিবস ঘোষণা প্রসঙ্গে। বলে রাখা ভাল, যোজনা কমিশন তুলে দেওয়া হয়েছিল ৬ বছর আগে। তার পর তার প্রতিবাদে হেস্তনেস্ত আন্দোলন তৃণমূলের তরফে দেখা যায়নি।

শুধু তাই নয়, এর পর প্রাদেশিক আবেগ উস্কে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, দেশের চারটি রাজধানী হোক। কলকাতাকেও রাজধানী বানানো হোক। অনেকের মতে, এই দাবিও রাজনীতির ঊর্ধ্বে নয়। একুশের ভোটের আগে বাংলা, বাঙালি ও প্রাদেশিকতার আবেগকে উস্কে দিয়ে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ঢাকার চেষ্টা রয়েছে। তা ছাড়া অনেকের মতে, এ হেন দাবির বিপজ্জনক দিকও রয়েছে।

কাট টু ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল কেন্দ্রের সংস্কৃতি মন্ত্রক। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের প্রশাসনিক পরিচালনার ভার সংস্কৃতি মন্ত্রকের কাছেই রয়েছে। ওই অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ, অভিনেতা, রাজনীতিক মায় অনেকেরই আমন্ত্রণ ছিল। সেই সঙ্গে প্রচুর বিজেপি কর্মীও উপস্থিত ছিলেন। কারণ, বিজেপি কেন্দ্রে শাসক দল হওয়ার সুবাদে তাদের এখানকার কর্মীরা সেই অগ্রাধিকার পেয়েছিলেন। অনেকের মতে, বাংলায় চলচ্চিত্র উৎসব থেকে শুরু করে সরকারি মেলা-খেলায় যেমন তৃণমূল কর্মীরা দর্শকাসন ভরে রাখেন এখানেও একপ্রকার সেইরকমই দেখা যায়।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় অবশ্য ধারালো কোনও রাজনৈতিক লাইন ছিল না। নেতাজির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, তাঁর কথা বাংলায় উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী নিঃসন্দেহে বাঙালি আবেগকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে দিল্লি-কলকাতা চাপান-উতরের পথে হাঁটেননি। তিনি আবার নেতাজির প্রসঙ্গে তাঁর আত্মনির্ভর ভারত প্রকল্পের পিঠ চাপড়ানোর চেষ্টা বাদ দেননি। এমনকি এও বলেছেন, ভারত যেভাবে (পড়ুন তিনি যেভাবে) মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তা দেখলে নেতাজিও খুশি হতেন।

এখন প্রশ্ন হল, এদিন সন্ধ্যায় ভিক্টোরিয়াতে যা হল তার পরিণতি কী হতে পারে?

পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এর অনিবার্য পরিণতি হতে পারে আরও তীব্র মেরুকরণ। কুণাল ঘোষরা বলবেন, বিজেপি বাংলার সংস্কৃতি জানে না। অসভ্য বর্বর দল। আর বিজেপি বলবে, জয় শ্রীরাম বলা হয়তো ঠিক হয়নি। কিন্তু তাতে অতটাও রাগ দেখানোর কারণ ছিল না। কেন না, জয় শ্রীরাম কোনও গালি নয়। এবং এ কথা বলে, পাল্টা মেরুকরণের চেষ্টা করবে গেরুয়া শিবির।

তাদের কথায়, নাড্ডার কনভয়ে ঢিল ছোড়া আর মমতার বক্তৃতার আগে জয় শ্রীরাম স্লোগান তোলার মধ্যে ফারাক নেই। কোনওটাই শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ছে না। ঢিল মারার মধ্যে যেমন একটা মেরুকরণের চেষ্টা রয়েছে—দেখো আমরাই মারতে পারি। আবার মমতাকে রাগাতে জয় শ্রীরাম ধ্বনি তোলার মধ্যেও তার পাল্টা মেরুকরণের ধুয়ো রয়েছে। ভোট যত এগোবে এই মেরুকরণ ততই তীব্র হতে পারে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More