পূর্ব বর্ধমানে ভোট পরবর্তী হিংসার বলি চার, নিহত এক মহিলাও

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০২১ এর হাই ভোল্টেজ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরেই শুরু হয়ে গেছে উত্তেজনা, বিক্ষিপ্ত অশান্তি। জেলায় জেলায় উত্তেজনা, সংঘর্ষের ছবি উঠে এসেছে। পূর্ব বর্ধমানে ভোট পরবর্তী হিংসায় বলি হলেন মোট চারজন। তৃণমূলের তিনজন কর্মী এবং বিজেপি কর্মীর পরিবারের একজন মহিলাও প্রাণ হারান এই ঘটনাতে। সংঘর্ষে জখমও হন বেশ কয়েকজন। এছাড়াও রায়নার সমসপুর ও জামালপুরের নবগ্রামে সংঘর্ষের কারণে চলেছে গুলিও। এই ঘটনার জেরে উত্তপ্ত রয়েছে গোটা এলাকা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় মোতায়েম করা হয়েছে বিশাল পুলিশবাহিনী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী।

নিহতরা হলেন গনেশ মালিক (৬০), কাকলি ক্ষেত্রপাল (৪৭), শাজাহান শা ওরফে সাজু (৩৮) এবং বিভাস বাগ ওরফে বিনোদ (৩০)। মৃতদের মধ্যে একমাত্র গনেশ মালিকের বাড়ি রায়না থানার সমসপুর গ্রামে। অন্য নিহতদের মধ্যে কাকলি ও বিভাসের বাড়ি জামালপুরের নবগ্রামের ষষ্ঠিতলা ও উড়িষ্যা পাড়ায়। আর সাজু শেখের বাড়ি জামালপুরের ভেড়িলি গ্রামে। গুরুতর জখম মানু ক্ষেত্রপাল ওরফে রূপো এবং অনিল ক্ষেত্রপালকে বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। আহত মিঠু রহমানের চিকিৎসা হয় জামালপুর ব্লক হাসপাতালে।

ভোটের ফল ঘোষনার পর রবিবার রাতে সমসপুর গ্রামে বিজেপি ও তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। তা দেখে এলাকার বাসিন্দা গনেশ মালিক থামাতে যান। তখনই তাঁর মাথায় কেউ বাঁশের আঘাত করে। তাতে তিনি গুরুতর জখম হন। গনেশ মালিককে উদ্ধার করে রাতেই পাঠানো হয় বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। নিহতের ছেলে মনোজ মালিক দাবী করেছেন, তাঁর বাবা গনেশ মালিক তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য। তাঁরা গ্রামের একটা মাচায় বসে সবাই গল্পগুজব করছিলেন। রবিবার সেখানে বসে থাকা তৃণমূল কর্মীদের উপরে চড়াও হয়ে হঠাৎই বিজেপি কর্মীরা মারধর শুরু করে। তখন গনেশ মালিক তাঁদের থামাতে যান। ওই সময়েই হামলাকারীরা তাঁর বাবার মাথায় বাঁশ দিয়ে আঘাত করে। মনোজ মালিক জানিয়েছেন, মাথায় গুরুতর আঘাত লাগাতেই তাঁর বাবার মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে রায়না থানার পুলিশ তিন জনকে গ্রেপ্তার করেছে ।

অন্যদিকে সোমবার বেলা থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে জামালপুর থানার নবগ্রামের ষষ্ঠিতলা ও উড়িষ্যা পাড়ায়। এই এলাকায় হওয়া সংঘর্ষের ঘটনার এদিন বিজেপি কর্মী পরিবারের মহিলা কাকলি ক্ষেত্রপাল ও তৃণমূলের দুই কর্মী সাজু শা ও বিভাষ বাগের মৃত্যু হয়। জখম হন তৃণমূলের মিঠু রহমান এবং কাকলির স্বামী অনিল ক্ষেত্রপাল ও দেওর রূপো ক্ষেত্রপাল ।

এই ঘটনা বিষয়ে জামালপুর ব্লক তৃণমূলের সভাপতি মেহেমুদ খান জানিয়েছেন, মৃত ও জখম তৃণমূলের কর্মীরা সহ কয়েকজন নবগ্রাম থেকে ফিরছিল। ফেরার সময়ে তাঁরা জয়বাংলা শ্লোগান দিয়েছিল। পথে নবগ্রামের উড়িষ্যা পাড়ার কাছে সশস্ত্র বিজেপি মহিলা ও পুরুষ কর্মীরা তৃণমূল কর্মীদের উপরে হামলা চালায়। প্রথমে তাঁরা তৃণমূলের কর্মীদের বাইকে ভাঙচুর কর। পরে টাঙ্গি, তরোয়াল, রড়, লাঠি নিয়ে তৃণমূলের কর্মীদের ব্যাপক মারধর করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁদের উদ্ধার করে জামালপুর ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় সাজু ও বিভাসকে বর্ধমান হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন। মিঠু রহমানের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হলেও সে এখন বিপদ মুক্ত বলে মেহেমুদ খান জানিয়েছেন। ভোটে হেরে যাওয়ার বদলা নিতেই বিজেপি কর্মীরা পরিকল্পনা মাফিক জামালপুরে সন্ত্রাস চালানো শুরু করেছে বলে মেহেমুদ খান অভিযোগ করছেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ যদিও মানতে চাননি বিজেপির নবগ্রামের কর্মকর্তা আশিষ ক্ষেত্রপাল। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর বাড়ি নবগ্রামের ষষ্ঠি তলায়। আশিষ বলেন, এদিন বেলা ১১ টা নাগাদ গ্রামের তিনি ও তার সতীর্থরা মাচায় বসে ছিলেন। ওই সময়ে সবুজ আবিরে মাখামাখি হয়ে উড়িষ্যা পড়ার দিক থেকে বেশ কয়েকটি বাইকে চেপে তৃণমূলের কর্মীরা তাঁদের কাছে এসে জয় বাংলা, খেলা হবে এইসব শ্লোগান দেওয়া শুরু করে। আশিষ ক্ষেত্রপাল বলেন, তিনি ও তাঁর সতীর্থরা তাড়া দিয়ে ওই তৃণমূল কর্মীদের এলাকা থেকে সরিয়ে দেন। এর কিছুক্ষণ পরেই ওই তৃণমূলের কর্মীরা অন্যপথ দিয়ে ঘুরে এসে তাঁর বাড়িতে চড়াও হয়। তখন তাঁর বাবা, মা, কাকা, কাকিমা সবাই বাধা দেয়। কিন্তু সশস্ত্র তৃণমূলের কর্মীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে টাঙ্গি ও তরোয়াল দিয়ে তাঁর পরিবারের সবাইকে আঘাত কর। আশিষ জানিয়েছেন টাঙ্গির আঘাতে গুরুতর জখম হয়ে তাঁর মা কাকলি মারা যান। আর বাবা অনিল ক্ষেত্রপাল ও কাকা রূপো ক্ষেত্রপাল মারাত্মক জখম হয়েছেন। গ্রামের ১৬-১৭ টি বাড়িতেও তৃণমূলের কর্মীরা ভাঙচুর চালিয়ে তছনছ করে দিয়েছে বলে আশিষ ক্ষেত্রপাল বলেন। যদিও সংযুক্ত মোর্চার পক্ষে বিবৃতিতে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু দাবি করেছেন, নিহত কাকলি ক্ষেত্রপাল সিপিএমের দীর্ঘ দিনের কর্মী।

এদিকে এই ঘটনার পর থেকেই নবগ্রাম এলাকা জুড়ে ধর পাকড় অভিযান শুরু করে পুলিশ। এদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশ নবগ্রাম এলাকা থেকে মোট ২৩ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে গিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, উত্তেজনা থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনায় জড়িত থাকা বাকি অভিযুক্তদের খোঁজ চলছে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More