‘দিদির স্কুটি নন্দীগ্রামে উল্টে গেলে কী করব!’ মমতা সম্পর্কে ধারণাটাই যেন ভাঙতে চাইলেন মোদী

শোভন চক্রবর্তী
রফিকুল জামাদার

রাজনীতিতে কারও সম্পর্কে ধারণাটাই শেষ কথা! সেই ধারণায় আঘাত হানতে পারলে তাঁর রাজনীতিকে পরাস্ত করার পথও প্রশস্ত হয়ে যায়।

রবিবাসরীয় ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যেন পরতে পরতে তেমনই কৌশল নিয়ে এগোলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাস্ত করার লক্ষ্যে, ‘দিদি’ সম্পর্কে ধারণাটাই যেন ভেঙে তছনছ করে দিতে চাইলেন প্রধানমন্ত্রী। তাই কখনও বললেন, শুধু বাংলার কেন দিদি, আপনি তো গোটা ভারতের মেয়ে। আবার কখনও বললেন, দিদির স্কুটি ভবানীপুর যেতে যেতে নন্দীগ্রামে ঘুরে গেছে। এও বললেন, দিদি কেন শুধু একজনেরই পিসি হয়ে থেকে গেলেন!

বাংলায় দশ বছর শাসনের পর তৃণমূল যে তীব্র প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার মুখোমুখি তা হয়তো অনেকেই আন্দাজ করতে পারছেন। উপরি গঙ্গার পাড়ের মতই ভাঙছে তৃণমূল। সম্ভবত সেই কারণেই একুশের ভোটে নতুন মাত্রা জুড়তে চেয়েছেন চৌখস প্রশান্ত কিশোর ও মমতা—এক, বাঙালি বনাম বহিরাগত। এবং দুই—‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’। যাতে সেই তর্কের আড়ালে চলে যায় দুর্নীতি, অনিয়ম, অনুন্নয়ন মায় সমস্ত অভিযোগ। সর্বোপরি দলের ভাঙন মোকাবিলায় নন্দীগ্রামে প্রার্থী হয়ে কর্মীদের আত্মবিশ্বাস যোগাতে চেয়েছেন দিদি।

সেই খেলাটাই রবিবার যেন ভেস্তে দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বোঝাতে চেয়েছেন, আবেগে সুড়সুড়ি দিয়ে আর প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে লুকনো যাবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মা মাটি মানুষের সঙ্গে অন্যায় করার পর এখন নতুন স্লোগান দিয়েছে…(পড়ুন বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়)। আরে দিদি আপনি তো শুধু বাংলার নয়, গোটা দেশের মেয়ে”। তাঁর কথায়, “কদিন আগে যখন আপনি স্কুটিতে উঠলেন। তখন গোটা দেশের লোক চাইছিল আপনি যেন চোট না পান। ভাগ্যিস পড়ে যাননি। নইলে যে রাজ্যে ওই স্কুটি তৈরি হয়েছে, তাদের সঙ্গে শত্রুতা বাঁধিয়ে বসতেন”।

প্রধানমন্ত্রীর এ কথা শুনেই ব্রিগেড গ্রাউন্ডে বহু লক্ষাধিক উৎসাহীর ভিড়ে হাসির রোল ওঠে। মোদীও যেন তাই চাইছিলেন। মানুষ আরও হাসুক। মমতার প্রচারকে লঘু থেকে লঘুতর করে দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য। তাই হাসির রোল থামতেই প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দিদি আপনার স্কুটি তো ভবানীপুরের বদলে এখন নন্দীগ্রামে ঘুরে গেছে। আমি তো সবার ভাল চাই। আমি চাই না কেউ চোট পাক। কিন্তু স্কুটি যদি নন্দীগ্রামে গিয়ে উল্টে যায় আমি কী করব!”

একুশের ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসন বদল করতেই সোশাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগ দিয়ে প্রচারে নেমেছিল বিজেপি–#পালিয়ে গেলেন মমতা। একে তো প্রধানমন্ত্রীও এদিন সেই ইঙ্গিত করতে চান। সেই সঙ্গে এও বোঝাতে চেয়েছেন, নন্দীগ্রামে মমতার পরাজয় অনিবার্য।

মমতার বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামে শুভেন্দুকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। জানা গিয়েছে প্রার্থী চূড়ান্ত করার বৈঠকে শুভেন্দুর উদ্দেশে মোদী বলেছিলেন, ‘মমতা দিদি আপকো নেতা বানাকেহি ছোড়েঙ্গি।’ ব্রিগেডের সভা থেকেও নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর পক্ষে আবহ তৈরি করে গেলেন প্রধানমন্ত্রী।

এখানেই থামেননি পোড় খাওয়া এই রাজনীতিক। তিনি বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে মানুষ যে ধারণা ছিল সেটাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাঁকে দিদি মনে করে বাংলায় পরিবর্তন আনতে চেয়েছিল মানুষ। কিন্তু দিদি কেবল একজনেরই পিসি হয়ে থেকে গেছেন। বাংলায় যেন দুর্নীতির অলিম্পিক হয়েছে। অর্থাৎ যে সততার বড়াই আগে করা হত, সেই ধারণার মুখোশটা জীর্ণ হয়ে পড়েছে কাটমানি, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট চক্রের রমরমায়।

তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এ সবই অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর চেষ্টা হিসাবে দেখতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে বাংলার গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের ধারণা সত্যিই বদলে গেছে কিনা তা একমাত্র বোঝা যাবে ভোট ফলাফলে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More