বহে নদী নিরবধি

শবরী মজুমদার
লাচেন

গ্যাংটক থেকে লাচেন ১০৭ কিলোমিটার। মার্চের শেষ আরামদায়ক ঠান্ডায় এবারের পরিক্রমণ উত্তর সিকিমে। পাঁচ ঘণ্টার লাচেনের পথ শুরু হল সকাল ন’টায়। পথ বাতলে দিয়েছিলেন উৎপলদা ও শমিতাদি। সিকিমের আনাচেকানাচের ভূগোল-ইতিহাস যাঁদের নখদর্পণে। আর নাড়ির টান সেই তিস্তাপারের মানুষজনের সঙ্গে। তিস্তার আগুপিছু সব পথের হদিশ করে করেই তাঁরা ওখানকার জনমানসের একান্ত আপনার জন হয়ে গেছেন। তাঁদের অবিরাম উৎসাহেই এবারের ভ্রমণ। আমি, সুমন ও আমাদের কন্যা ইমন। সঙ্গে নরবু— শান্ত, ধীর সহৃদয় মানুষ, আমাদের গাড়িচালক। আর পথের সম্বল তিস্তা নদী। সারাপথেই যার সঙ্গ আর সৌন্দর্য সব ক্লান্তি দূরে সরিয়ে দেয়। লাচেনের কুড়ি কিলোমিটার নীচে চুংথাং-এ লাচেন চু আর লাচুং চু— এই দুই নদী মিলিত ধারায় হয়েছে তিস্তা। নীচের দিকে তিস্তা বয়েছে মঙ্গন, সিংটাম, রংপো হয়ে দার্জিলিং দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে। আর ওপরে লাচেন চু বা তিস্তার উৎস ৫৩৩০ মিটার উঁচু তিব্বতের সীমানার সোলামো লেকে। সেখান থেকে তার জল মিশেছে গুরুদংমার লেকে। নীচে আরও দক্ষিণমুখী নদী যাংগুচু হয়েছে লাচেন চু।


লাচুং এর রাতের আকাশ

লাচেনে প্লাস্টিক জলের বোতল নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে ৫০০ টাকা জরিমানা। লাচেনে ঢোকার প্র‌ধান ফটকের বাইরে দেখলাম স্তূপাকার প্লাস্টিক পড়ে আছে। শহরে আজও আমরা যা করতে পারিনি।

লাচেন খানিকটা ন্যাড়া ন্যাড়া পাহাড়ি গ্র‌াম। গাছপালা কম। পাহাড় এখানে অন্দরে প্র‌বেশ করে ধাপে। ধাপে খাপে খোপে ঘরবাড়ি, ছাদ, সিঁড়ি, উঠোন সাজিয়েছে। এক বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠে পাশের বাড়ির উঠোনে বেরোনো যায়। লোকবসতি আছে বেশ। সেরকমই এ বাড়ি ও বাড়ি উঁচু-নিচু দিয়ে ঢুকে এলাম পিপনের দোতলা কাঠের বাড়ির উঠোনে— রডোডেনড্রন গাছের তলায়। পিপনের স্ত্রী বহিনী আমার হাত ধরে দ্রুত ফায়ারপ্লেসের পাশে এনে বসিয়ে দিলেন। সিকিমে জুমসা অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্র‌ধান শাসক হলেন পিপন। সহজ কথায় অর্থ‌— গ্রামপ্র‌ধান। নাম তার ছো-এবজার। গম্ভীর চালে আলাপ শুরু করলেন। বহিনী শান্ত, অভিজাত চেহারা। অতিথিপরায়ণা। নিজের হাতে রেঁধেবেড়ে খাইয়েদাইয়ে সাজিয়েগুছিয়ে আমাদের ঘরের মানুষ করে নিলেন। বাক্স খুলে নিজের বহুমূল্য ট্র্যাডিশনাল পোশাক পরিয়ে আমাদের সাজিয়ে ছবি তুললেন। তাঁদের দুই কন্যা ও এক পুত্র। সকলেই প্র‌তিষ্ঠিত শহরে। এঁরা বুদ্ধের উপাসক। বাড়িতে বিভিন্ন বড় বড় আকারের বাসনপত্র দেখে জানলাম লামারা এখানে এসে পূজাপাঠ করেন মাঝে মাঝে। তাঁদের দেখভাল, রান্নাবান্না সবই একা হাতে।


লাচেন নদী
গুরুদংমার যাত্রা

পিপনের আরামদায়ক কাঠের ঘরের ওম ছেড়ে ভোরবেলা উঠে পড়লাম টান টান উত্তেজনায়। আজই তো গুরুদংমার। ৫১৮৩ মিটার উচ্চতার সেই লেক। গুরু পদ্মসম্ভব অষ্টম শতাব্দীতে সেখানে এসেছিলেন। দংমার কথাটির অর্থ প্র‌থম। প্র‌থম তাঁর চরণচিহ্ন পড়ে সেখানে। অতি পবিত্র এই লেক। তৈরি হয়ে বেরিয়ে দেখি সঙ্গে চলেছেন পিপন নিজেও। ২৭৫০ মিটার উঁচু লাচেন থেকে মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় এতটা পথ! ওঁর নিজেরও হাই অলটিটুড সিকনেস হয়। তবুও চলেছেন আমাদের তিস্তার উৎসের কাছে নিয়ে যেতে। সঙ্গে বোতলে গরমজল ভরে দিলেন বহিনী।

"পাহাড়। ওখানে ছবি তোলো। ওই যে দূরে ইয়াক চরছে। ছবি তোলো। "

ভোর পাঁচটায় লাচেন গ্র‌াম ছাড়িয়ে এগোলাম। ক্রমশ রাস্তায় গাছপালা কমছে। বাড়িঘরগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে দূরে সরে যাচ্ছে। মাথায়-গায়ে বরফ মেখে পাহাড়ও দূরে সরে গেল। টিবেটান প্ল্যাটো অঞ্চল। ধূ ধূ প্র‌ান্তরে বড় বড় পাথরের চাঁই। ছোট জানলাওয়ালা একটা-দুটো ইতস্তত বাড়ি। রাস্তা কিন্তু কংক্রিটের। এবং লা জবাব। সারাপথ পিপন দেখাতে দেখাতে নিয়ে চলেছেন। ‘‘ওই যে রাজা-রানি পাহাড়। ওখানে ছবি তোলো। ওই যে দূরে ইয়াক চরছে। ছবি তোলো। ইয়াক রেসের সময় অবশ্যই এসো তোমরা। এখান থেকে কত কত ট্রেক রুট আছে। এসব ছেড়ে লাচুং যাওয়ার কী মানে? লাচেনেই বেশি দিন থাকা উচিত ছিল...।’’ ধূ ধূ প্র‌ান্তরে পাথুরে একজায়গায় তাঁর জমিও দেখালেন। ওঁর দেখলাম টিবেটান ম্যাস্টিফ-এর খুব শখ। গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় এক সেনা অফিসারকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘‘আপনার সঙ্গে এটা কি টিবেটান ম্যাস্টিফ? কোথায় পেলেন বলুন তো?’’ জবাব এল— হিমাচল থেকে। অদ্ভুত অতিথিপরায়ণ এই পিপন ও বহিনী। উনি ছিলেন গ্যাংটকে— লাচেনেরই কাজে। আমরা আসায় তড়িঘড়ি লাচেনে ফিরে এসেছেন। পিপনের ধ্যানজ্ঞান লাচেন। তার সংস্কৃতি, ইতিহাস, রাজনীতি এবং মানুষজন নিয়েই তাঁর জগৎ। তাই পরম মমতায় নিজের সন্তানসম লাচেনকে মেলে ধরছেন আমাদের কাছে। সঙ্গ দিয়েছেন এই দুর্গম যাত্রায়।


গুরুদংমার

গুরুদংমার পৌছে গেলাম প্র‌ায় সাড়ে চার ঘণ্টায়। ১০৭ কিলোমিটার পথে একজায়গায় গাড়ি থেকে নেমে স্যুপ খাওয়া হল। বাইরে হুহু করা হাওয়া ক্রমশ বাড়ছে। তাপমাত্রা মাইনাস পাঁচ ডিগ্রি‌। বরফমোড়া চারপাশ। রাস্তা অবশ্য পরিষ্কার ছিল। আর্মি ক্যাম্প ছাড়িয়ে লেকের দিকে এগোলাম। সেখানে সাংঘাতিক হাড়কাঁপানো বাতাস। বেলা বারোটার পর সে হাওয়ার রুদ্ররূপ। চলে বিকেল পর্যন্ত। তাই বারোটার মধ্যেই লেক ঘুরে ফেরার পথ ধরেন সকলে। অল্পবিস্তর শ্বাসের কষ্ট বা মাথা যন্ত্রণা হচ্ছিল সবার। গাড়ি থেকে নামলাম লেকের কাছে পৌঁছে। লেকের চার ভাগের তিন ভাগ জলই বরফ। সেই বরফের ওপর খেলে বেড়াচ্ছে নাম না জানা পাখিসব। বাকি এক ভাগ সবজে-নীল স্থির জল। সামনে বরফের পাহাড়ের ওপর নীল রোদ্দুরে আকাশ। সেই আকাশ-পাহাড়ের ছায়া নীল জলে ভাসমান। লেকের চারপাশে বৌদ্ধ পতাকা, লাল-নীল-হলুদ, সব পতপত করে উড়ছে— যেন স্বর্গের কাছে এসে পৌঁছলাম। অপার্থিব সে দৃশ্য। দশ মিনিটের বেশি একটানা গাড়ির বাইরে দাঁড়াতে পারছি না ঠান্ডা হাওয়ায়। নরবুও মাথার যন্ত্রণায় কাহিল। একা সুমন পিপনের সঙ্গে লেক প্র‌দক্ষিণ করতে গেল। লাচেন থেকে দুজন স্থানীয় মানুষ এসেছিলেন আমাদের গাড়িতে। তাঁদের একজনও ওদের সঙ্গেই গেলেন। আর একজন মহিলা, বেশ বয়স্ক, গাড়ি থেকে নেমে দু-তিনটে পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে চললেন নিজের ঘরের দিকে। আমি অনেক চেষ্টা করেও আশেপাশে ঘরদোর দেখতে পেলাম না। অনেক দূরে চারদিকে বরফের পাহাড়ের মাঝে একটা পতাকা উড়ছিল। ইঙ্গিতে দেখালেন— ওইটিই তার বাড়ি। গুরুদংমারের সেই ভীষণ প্র‌াকৃতিক রুক্ষতায় মানবজীবনের প্র‌তীক ওই পতাকা। একাকী এক বয়স্ক মহিলার কঠোর জীবনসংগ্র‌ামের একমাত্র নিশান। আমার সভ্য, শহুরে চেতনায় যেন ঝড় এনে দিল।

আর এক নোম্যাড বা যাযাবর, যিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন, তাঁর জীবিকা ইয়াক চরানো। লাচেন গ্র‌াম থেকে ইয়াক চরিয়ে এতদূর চলে আসেন। গুরুদংমার ছাড়িয়ে আরও উঁচুতে তিববতের সীমানায় সোলামো লেক। সেই দিকে তাঁর ঘরবাড়ি। শীতকালে আবার ওপর থেকে ইয়াক নিয়ে নীচে লোকালয়ের দিকে নেমে যান। গুরুদংমার ছাড়িয়ে আরও খানিকটা ওপরে সোলামোর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলাম আমরা। কিন্তু আর্মির নির্দেশে বেশি এগোতে পারলাম না। সুমন বরফের মধ্যে হেঁটে ওই লোকটির ঘরবাড়ি দেখতে চলে গেল। বাড়ি তো নয়— বাঙ্কার। ভিতরটা পুরোপুরি অন্ধকার গুহার মতো। মাটির তলায় স্বল্প পরিসর সেই স্থানে ভর্তি মরা ইয়াক ঝুলছে। তার সঙ্গে ওই জনহীন প্র‌ান্তরে একা একটি মানুষ। ঘরে ঢোকার জন্য মাটির ওপর একটা গর্ত। সেখান দিয়েই সূর্যের আলো প্র‌বেশ করে। ঠান্ডায় পাথর দিয়ে সেই রাস্তাও বন্ধ করে দিতে হয় কখনও। মাটির ওপরে পাথরে ঘেরা কিছুটা স্থান— ইয়াকদের থাকবার জন্য নির্দিষ্ট।

ফেরার পথে দেখলাম খুবই তৎপর আর্মি ক্যাম্প রয়েছে। প্র‌য়োজনমতো অক্সিজেন, জল, ডাক্তারের পরামর্শ— সবই দিচ্ছেন জওয়ানরা। লেকের ধারে বেশি উৎসাহী কিছু মানুষ ছোটাছুটি করে প্র‌ায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর্মি ক্যাম্পে তাঁদের প্র‌াথমিক চিকিৎসা চলে। খানিকটা নেমে বরফঢাকা এক বাড়িতে চা পান করলাম। কিছুটা সুস্থবোধ হল। চায়ের কাপটি ঢাকনা দেওয়া— পাছে পরিবেশনমাত্রই জুড়িয়ে যায়।

গুরুদংমার ফেরত ওই সন্ধ্যায় এলাম লাচুং। দু’ঘণ্টার পথ লাচেন থেকে। উত্তর সিকিমের কোলে লাচেন-লাচুং যেন দুই সহোদরা। দু’জায়গার মানুষদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক আর আত্মীয়তার বাঁধন। তবে রেষারেষিও কম কিছু নেই। সবাই নিজের জায়গাটাই সব চেয়ে ভালো ভেবে থাকেন। এঁরা সবাই মূলত ভুটিয়া।

"রুটি, ডাল, ডিমের ঝোল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।"

লাচুং-এর আলো-জ্বলা পাহাড় দেখতে দেখতে যেখানে পোঁছলাম সেটা আসলে মোটেই লাচুং নয়। সিংগ্রিং। লাচুং-এর এক কিলোমিটার আগেই একটা পাহাড়ি বাঁকে হঠাৎ গাড়ি উঠে পড়ল। বলা যতটা সহজ, পথ খুঁজে পাওয়া ততটাই কঠিন ছিল। ঠিকানা ছিল পেমার বাড়ি। রিমপোচের পাশে। পেমাকে ফোন করায় বলল, পাহাড়ের ওপর সোজা উঠে এসো। সন্ধে ছ’টা-সাতটা হবে। চারদিক অন্ধকার। পাহাড়ের কয়েকটা বাড়ির খাঁজে সরু একটা ফোকর দিয়ে আমরা তো উঠে পড়লাম। তারপর ঘরদোর সব উধাও। চারদিকে কালো কালো উঁচু পাইন বন আর চাপ চাপ অন্ধকার। উঠছি তো উঠছিই। জঙ্গলে হারিয়ে যাব না তো! নরবুও ভয় পেয়ে গেল। কিছু পরে পাহাড়ের বাঁকে একটা পরিত্যক্ত গাড়ি দেখে আশ্বস্ত হলাম। আবার বাঁক ঘুরতেই ছোট্ট একচিলতে বাড়ি। বিজলি বাতি নেই। গেটের বাইরে পেমা হাসি হাসি মুখে। চারপাশে পাহাড়, পাইন বন, আকাশভরা তারা আর চাঁদের আলোয় মায়াবি বাড়ির ছোট্ট কাঠের গেট। পাইন কাঠ কেটে ইতস্তত ছোট ছোট বসার জায়গা। এই মায়াবী বাড়িতে চখাচখির স্বপ্নের সংসার। দুটি ঘর অতিথিদের জন্য। একটি বসা, খাওয়া ও রান্নার পরিসর। পেমার বউ রিনচেন মিষ্টি মেয়ে। সঙ্গে তিনটি বেড়াল ও লোমওয়ালা কালোভুলো কুকুর।

মোমের আলোয় কাঠের ঘরে প্র‌বেশ করলাম। চারপাশটা খানিক বুঝে আর বেশ খানিকটা না বুঝেই আমাদের খুব ভালো লেগে গেল। রুটি, ডাল, ডিমের ঝোল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সারা আকাশ ছিল তারায় ভরা। খানিক তারা ভোর সাড়ে তিনটেয় সুমনের ক্যামেরাবন্দি হল।

পরদিন সকাল চারটে পনেরো। উৎপলদার লাগাতার উৎসাহে আমরা কাটাও চললাম। সূর্যোদয় দেখব। ঘুটঘুটে অন্ধকার। নরবুর পথ জানা নেই। অন্ধকারে ও কেমন করে পথ না চিনেই চিনে চিনে চলল। যেন সূর্যের সঙ্গে এক অসম প্র‌তিযোগিতায় মেতে উঠে পথ চলা। ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই পাহাড়চুড়োয় পৌঁছতে হবে। অবাক বিস্ময়ে মোড়া এই পথ। বরফঢাকা পাহাড় দূরে দূরে। যত উঁচুতে চড়ছি, বরফের মাদুর বিছানো পাহাড় পথের পাশে, কাছে, আরও কাছে এগিয়ে আসছে। আলো-আঁধারিতে চারপাশ গভীর রহস্যে মোড়া যেন। একদম ওপরে কাটাও গেটে পৌঁছনোর আগেই আকাশে আলো এল। কাঞ্চনজঙ্ঘায় সেই আলো ঝিকমিকিয়ে উঠল। অপার্থিব এক জগৎ। কিন্তু আর্মি গেট বন্ধ থাকায় আর ওঠা গেল না। জওয়ানরা জানাল, রাস্তা এ পর্যন্তই। এক কিলোমিটার বাকি পথ অধরা রেখেই নেমে এলাম। তখন বুঝিনি। পরে জানলাম, ক’দিন আগেই ধস নেমে দু-তিনজন জওয়ানের মৃত্যু হওয়ায় রাস্তা বন্ধ।

কাটাও ফেরত ইয়ুমথাং আরও দেড় ঘণ্টা। যাওয়ার সময় ব্রিজের ওপর হাত বাড়িয়ে গাড়ি থামাল এক মহিলা। ইয়ুমথাং-এ নাকি তার চা, কফি, মোমোর দোকান। দোকান খুলতে ভারি দেরি হয়ে গেছে তাই লিফ্‌ট চায়। এল সঙ্গে। জানলাম, প্র‌তিদিনই যায়— এভাবেই। ভালো টুরিস্টদের সঙ্গ চেয়ে। রোজই দেরি হয়ে যায় কিনা! সরকারই নাকি বলেছে, টুরিস্টদের নিয়ে যেতে হবে। যদিও কোনও জবরদস্তি নেই।


ইয়ুমথাং

ইয়ুমথাং-এ বিশাল উপত্যকা। চারদিকে পাহাড়ের পাঁচিল। অনেকটা কাশ্মীরের মতো। লেকের ধারে ঘণ্টা নাড়িয়ে ইয়াক চরছিল মাঠে। অজস্র‌ পাখি। হট স্প্রিং আর বরফের রাজ্য দেখে নিয়ে দুপুরে সিংগ্রিং ফিরে এলাম। রিনচেন খাওয়াল চিকেন ফ্রায়েড রাইস আর নুডল্‌স। রিনচেন-পেমার স্বপ্ন— এই হোম-স্টে অনেক বড় করবে। বিকেলে রিনচেনের উৎসাহে গেলাম রিমপোচের বাড়ি। রিমপোচে তখন ছিলেন না। গিয়েছেন গ্যাংটকে। তিনি বড় লামাদের থেকেও সম্মাননীয় ব্যক্তি। মাঝে মাঝে এখানে আসেন। তখন গ্র‌ামের মানুষ তাঁর কাছে যায় আশীর্বাদ নিতে, সমস্যার সমাধান চাইতে। রিমপোচের বাড়িতেই ওই পাহাড়ের রাস্তা শেষ। ওই পাহাড়ে মাত্র তিনটিই বাড়ি ছিল। এই যে আমরা তিনজন আর রিনচেন গেলাম— সঙ্গে গেল মিমি ও আরও দুটো বেড়াল, ভালু ও আরও একটি সাদা-কালো কুকুর। ওখানে কথা বলা বারণ। রিমপোচের বাড়িতে থাকেন এক বৃদ্ধা নান। তাঁকে দেখা গেল না। কুকুর-বেড়াল শুদ্ধু নিঃশব্দে বাড়ি প্র‌দক্ষিণ করে বেরিয়ে এলাম।

"সাদা সিল্কের উত্তরীয় তিনজনের গলায় পরিয়ে বিদায় দিল রিনচেন।"

সেই সন্ধ্যায় পাহাড়জুড়ে তুমুল বর্ষণ। ঘরবন্দি আমরা তিনজন। জীবনস্মৃতি পাঠ হল। আমার পরম পাওয়া— সেই বর্ষণমন্দ্রিত সন্ধ্যায় হিমালয়ে কোলে বসে এক হিমালয়প্র‌তিম কবিমানসের জীবনদর্শন আমার এগারো বছরের কন্যাকেও গভীর আবেগে আচ্ছন্ন করেছিল। ও বারবার আরও পাঠ করবার জন্য আবদার করতে লাগল। সেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি চলল রাতভর। সকালে দেখি একমুখ হাসিমাখা ঝকঝকে সকাল। ভুলো কুকুরটা— ভালুকের মতো লোমশ— তার সব লোম ভিজে চুপচুপে। শুনলাম সারারাত সে বাগানে খোলা আকাশের নীচেই ঘুমোচ্ছিল। এমন কালঘুম নাকি তার প্র‌ায়ই হয়। ভোররাতে ঘুম-টুম ভেঙে লাফিয়ে ভিজে-টিজে একশা হয়ে বারান্দায় উঠে আসে। আহা বেচারা!

বাইরে দেখি দূর পাহাড়ের গায়ে বরফের আলোয়ান আরও পুরু হয়েছে। পাইনের মাথায় মাথায় অদেখা ম্যাগপাই সব সুরে সুরে হাতছানি দিচ্ছে। কী মোহময় সকাল! একটু পরেই বিদায় নিতে হবে। গায়ে চাদর জড়িয়ে পেমা-রিনচেনের আধফোটা বাগানে খানিকক্ষণ পাইন বনের নরম মখমলি আদর মেখে নিলাম। প্র‌াতরাশ সেরে বেরোলাম দশটায়। সাদা সিল্কের উত্তরীয় তিনজনের গলায় পরিয়ে বিদায় দিল রিনচেন। সঙ্গে দিল আমার প্রি‌য় রডোডেনড্রনের শুকনো ডালপালা। পাহাড়জোড়া লাল ফুলের চোখজুড়ানো আবেশ পিছনে ফেলে নামতে শুরু করলাম।

জঙ্গু

‘চারি চাট্টাপারি ভুরুরু খোলি দিরে কি’— নেপালি গান। নরবুর সংগ্র‌হ। ঘুরেফিরে ওই সুর গাড়িতে বাজছে। গুনগুন করে আমরাও গাইছি। দু’দিন লাচুং-এ কাটিয়ে চলেছি লেপচা বন্ধুদের কাছে। গন্তব্য জঙ্গু (Dzongu) । লাচুং থেকে তিন ঘণ্টার রাস্তা। দু-তিনটে ঝরনা দেখা গেল। পথে পড়ে মঙ্গল। সেখানে নর্দেন অপেক্ষা করছিল। মঙ্গল থেকে তিস্তার গা ঘেঁষে একপাশে জঙ্গল রেখে পঁয়ত্রিশ মিনিটে পৌঁছলাম নর্দেনের বাড়ি। একদম জঙ্গলের পাশে। আমাদের ঘরে ঢুকে দেখি জানলার ওপাশে তিস্তা। সেই ঘরে পাথরের ওপর টলোমলো পায়ে হেঁটে যাওয়া তিস্তার কলকল শব্দে শহুরে নার্ভগুলো আপনিই ঘুমিয়ে পড়ে। শান্তির ঘুম। আমরা যদিও ঘুমোলাম না। ওই জঙ্গল আর মোহময়ী তিস্তার উত্তেজনায় দুপুরের খাওয়া সেরেই বেরিয়ে পড়লাম পাহাড়ি পথে।

"তিস্তা বইছে। শান্ত শ্রী। ছুঁয়ে এলাম।"

এলাকাটা পুরোই লেপচাদের। কাঞ্চনজঙ্ঘা রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে। আমরা এসেছি জঙ্গুর সংকলন সম্পোয়। সম্পোর অর্থ সেতু। তিস্তা নদী এখানে মিশেছে ধোলুংচু-র সঙ্গে। লেপচারা বলেন রংইয়ংচু। তিস্তার সবুজ আর ধোলুংচু-র খয়েরি রং মিশে মিলিত ধারা খানিকটা যেন মাটি মাটি। হেঁটে চললাম জঙ্গলের গা বেয়ে চলা বাঁধানো রাস্তা দিয়ে, একপাশে উঁচু উঁচু গাছ। অন্যপাশে নীচে নদী। গাছের গায়ে গায়ে লেগে থাকা অর্কিডের ছড়াছড়ি। কত রকমারি ফার্ন। গাছের মগডালে, আড়ালে, আবডালে অসংখ্য পাখির লুকোচুরি। ড্রঙ্গো, সুলতান টিট, গ্রি‌ন ম্যাগপাই, হোয়াইট আই, আরও কত কী! দশ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সুমনের ঘণ্টা কাবার। বড় লেন্সের চোখের সামনে যে বিশাল সাম্র‌াজ্য! আর অজস্র‌ প্র‌জাপতি। ঘন পাতার আড়ালে শুধু রঙের ছটা উড়ছে, ফিরছে, নাচছে।

হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম বনদপ্তরের অফিস ও নার্সারি। সেখানে সেদিন কিছু মানুষেরও ভিড় ছিল। জানলাম, অফিস থেকে স্থানীয় মানুষদের বনমুরগি দেওয়া হবে। পালবার জন্য। অফিসের পিছনে লতাগুল্ম আর পাথর বেয়ে বেয়ে নামলাম নীচে। তিস্তা বইছে। শান্ত শ্রী। ছুঁয়ে এলাম।

নর্দেনের বাড়ির আদর আপ্যায়ন খুবই আন্তরিক। নর্দেন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্সের স্নাতক। জঙ্গুতে চাকরি করছে। সঙ্গে অতিথিদের গাইডের কাজ। ওর মা তাসি অবসরপ্র‌াপ্ত শিক্ষিকা। তিনিই এই হোম-স্টে চালু করেন। এঁরা সবাই উৎপলদার কাছের মানুষ। নর্দেন খুবই ছটফটে স্মার্ট ছেলে। অসাধারণ ছবি আঁকে। আমরা লেপচা পরিবারটিতে আপনজনের মতোই কাটালাম। নর্দেনের দাদা-বউদি আছেন। বাড়িতে তিনটি বাচ্চা। কিয়ং, কাইমা দুরন্ত ভাই-বোন। বয়েস পাঁচ-ছয়। আর বড়টি আমার কন্যাসম লাকিত। ওদের পালিত কন্যা। সবাই মিলে সারা সন্ধ্যা হট্টগোল করে কাটাল।

পরদিন সকালে ঠিক হল আমরা ছোটখাটো একটা ট্রেক করব। নর্দেন অনেক ট্রেক রুট জানে। ব্রেকফাস্ট করলাম খুরি দিয়ে। লেপচা ট্র্যাডিশনাল ফুড খুরি। অনেকটা নোনতা পাটিসাপটার মতো। বাখ হুইট দিয়ে বানানো বাইরের পাতলা নরম আবরণের ভেতর কুচোনো বাঁধাকপি, গাজরের পুর ভরা। দিব্য খেতে।


কাটাও থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা

গাড়ি নিয়েই বেরোলাম আপার জঙ্গু। সঙ্গে নর্দেন। পাসিংডাং-এর ওপর দিয়ে চলেছি। দু’বছর আগে এখান সাংঘাতিক ল্যান্ডস্লাইড হয়েছিল। দিনেরবেলায়। শুকনো দিনে, কোনও বর্ষাবাদল ছাড়াই। প্র‌াণহানি হয়নি। তবু গ্র‌াম, বাড়ি, ঘরদোর ভাসিয়ে সে পাহাড় মুহূর্তেই তিস্তা চাপা দিয়ে দিল। ঘরছাড়া, গ্র‌ামছাড়া হল কত প্র‌াণ। প্র‌ধান রাস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল পাহাড়কোলের কিছু গ্র‌াম। চাপাপড়া তিস্তা ওখানে শান্ত কোমল গ্র‌ামের লাজুক মেয়েটির মতো সবুজ এক লেকের জন্ম দিল। তার আশেপাশে বিস্তীর্ণ প্র‌ান্তর চর পড়া। প্র‌কৃতির ভয়ানক খেলার প্র‌মাণস্বরূপ সেই ফাঁকা চরে হাঁটাহাঁটি করতেই গা শিউরে উঠল সেই দিনটার কথা ভেবে। একজায়গায় দেখলাম লেপচা মানুষদের তৈরি ট্র্যাডিশনাল বাঁশের সাঁকো। বেশ লম্বা কিন্তু ভারি মজবুত।

ট্রেকিং শুরু হল টিংভং স্কুলের খেলার মাঠ থেকে। জঙ্গলের পথ। মাঝখানে কোথাও পাথরের ধাপ উঁচু-নিচু। অজস্র‌ ছোট ছোট ঝরনা আর ছোট বাঁশের সাঁকো। অনেক চড়াই-উৎরাই ভেঙে পৌঁছলাম টিংভং মনাস্ট্রিতে। পরদিন ওখানে উৎসব। লামা সাজসজ্জায় চারপাশ গুছিয়ে তুলছেন।

"পাহাড়ের ধাপে ধাপে ক্লাসরুম। পাথরের গায়ে গায়ে রাইম্‌স আঁকা ও লেখা।"

ফেরার পথে আরও খানিকটা ঘুরে এলাম কুসুং গ্র‌াম। জঙ্গুর সর্বোচ্চ উচ্চতার গ্র‌াম। বেশিরভাগ মানুষ চাষাবাদ করেন। ধান, বাখ হুইট, এলাচ, আদার খেত চারপাশে। জংলি পথে কিছু লোক ঝুড়িতে পাতা তুলছে ডাল ভেঙে, পাতায় স্পর্শ না করেই। জেনে চমকে উঠলাম— বিছুটি পাতা। গরমকালে ধুয়ে, ফুটিয়ে ওরা খায়। লেপচাদের ট্র্যাডিশনাল খাবার। নর্দেন আমাদের জন্যও রাতের খাবারে বাড়িতে বানিয়েছিল বিছুটি পাতার স্যুপ। অনায়াসে হজম করে ফেলেছিলাম।

ট্রেকিং ফেরত রাস্তায় পড়ল হট স্প্রিং-সহ বিশাল লিংজা ফল্‌স। ওখানেই ঝরনার পাশে জনশূন্য জঙ্গলে বসে দুপুরের খাওয়া হল। নর্দেন এনেছে এক হাঁড়ি পোলাও। অসম্ভব মমতায় গায়ের কম্বলে জড়ানো। মুখে দিয়ে দেখি উষ্ণ অমৃত। বড় তৃপ্তি করে খেলাম পাঁচজন।

পরদিন আমাদের ফেরার পালা। ভোরবেলায় ওদের বাড়ির মেয়ে লাকিতের সঙ্গে আমাদের কন্যা ইমন চলল একাই। লাকিতের স্কুল দেখতে। পাঁচ কিলোমিটার দূরে স্কুল। শুনলাম এখানে রাস্তাঘাট বেশ নিরাপদ। ওরা ফিরে এল ঘণ্টা দুয়েক পরে। পাহাড়ি পথে ঘুরে ঘুরে উঠে স্কুল দেখে তো সে থ। পাহাড়ের ধাপে ধাপে ক্লাসরুম। পাথরের গায়ে গায়ে রাইম্‌স আঁকা ও লেখা। চারপাশে খেত। প্র‌তিটি ক্লাসের দায়িত্ব একটি করে খেত করবার। তার যাবতীয় দেখাশোনা ছাত্রছাত্রীদেরই করতে হয়। লাকিতের ক্লাস টমাটো ফলিয়েছে এবার। গতবার ওদের ভার পড়েছিল এলাচ খেতের। পড়াশোনার পাশাপাশি প্র‌কৃতির হাজারো পাঠ চলে এখানে। সপ্তাহে একদিন তারা ট্র্যাডিশনাল পোশাকে স্কুলে যায়। নিজেদের সংস্কৃতির গুরুত্ব লেপচাদের কাছে অত্যন্ত দামি। ওই স্কুল এ বছর নর্থ সিকিমের সেরা গ্রি‌ন স্কুলের শিরোপা পেয়েছে। শহরে বসে আমরা ভেবেই উঠতে পারি না।

বেরোনোর আগে ভাত না খাইয়ে ছাড়ল না নর্দেন। সঙ্গে ফার্ন শাক, চিজ আর চিকেন। বিদায় নিতে মন চাইছিল না। যেন নিজের বাড়ি, ভাইবোন ছেড়ে চলে আসছি শহরে।

জঙ্গু তো কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে এক নিষ্পাপ শিশু। শহুরে বিষাক্ত বাতাস তাকে স্পর্শ করেনি। নিজেদের ঐতিহ্য সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছেন লেপচারা। জঙ্গুতে প্রবেশের আগে ছাড়পত্র দেয় মঙ্গল সরকারি দপ্তর। ওখানে তাই ইতস্তত গজিয়ে ওঠা ঘরবাড়ি, হোটেল নেই। শহুরে চাকচিক্যও নেই। যা আছে তা মুক্ত প্র‌কৃতি— অফুরন্ত উদার সবুজ আর শুদ্ধ বাতাস। এই শুদ্ধতা রক্ষায় লেপচারা বড়ই যত্নশীল। শান্তি আর স্নিগ্ধতায় অনেক ভালোবাসা নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।

আহা, ভালো থাকুক লেপচারা। অক্ষত থাক হিমালয়ের কোল।


জঙ্গুর নর্দেন লেপচা
ছবি - সুমন মল্লিক
শেয়ার করুন: