ফ্যাশন খুঁজতে শূন্যতে

 
তিনি মানেই মেনসওয়্যার। রঙিন ধুতি। কিন্তু এখন মেয়েদের পোশাকেও তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন তিনি। কী হবে আজকের ফ্যাশন? ডিজাইনার শর্বরী দত্তর অন্য রকম ভাবনা শুনে এলেন শ্রাবণী।

অ্যাপ ক্যাবটা বুক করার ঠিক আগে কী মনে হল একটা ফোন করলাম, “আমি আসছি, ঠিকানাটা ওই ব্রড স্ট্রিট তো?”

হাঁ হাঁ করে উঠলেন ফ্যাশন ডিজাইনার শর্বরী দত্ত। “ব্রড স্ট্রীট কেন? তুমি তো আমার স্টুডিও “শূন্য”-তে আসবে। ভাগ্যিস বললে…”

"উইমেনস ওয়্যার বাই শর্বরী দত্ত"

তিরিশ মিনিটে পোঁছে গেলাম ওঁর নতুন স্টুডিওতে। অসম্ভব সুন্দর ইন্টেরিয়র। নীতীশ রায়ের করা। প্রতিটা কোণে বনেদিয়ানার স্পষ্ট ছাপ। আর তার মধ্যেই সাজানো সারি সারি পোশাক। চোখ ধাঁধানো সব ডিজাইন। শুধু পুরুষের পোশাক নয় কিন্তু। এবার মেয়েরাও সাজতে পারবে শর্বরী দত্তের পোশাকে। কারণ সদ্য লঞ্চ করেছে ‘উইমেনস ওয়্যার বাই শর্বরী দত্ত’।

চা, সিঙাড়া, মিষ্টি নিয়ে গুছিয়ে বসে, স্টোরের একটা কোজি কর্নারে শুরু হল আড্ডা।

‘আসলে কী বলতো। আমি কেন পুরুষদের ট্র্যাডিশনাল পোশাক ডিজাইন করা শুরু করলাম, এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে গেছি! যে সমস্ত পুরুষ ডিজাইনাররা মেয়েদের পোশাক বানিয়ে ফাটিয়ে দিচ্ছেন, কই, তাদের তো কেউ জিজ্ঞেস করে না…আপনার মেয়েদের পোশাক বানানোর পেছনে সাইকোলজিটা কী? তার মানে…কোথাও একটা বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়ে আছে যে সাজগোজ ব্যাপারটা শুধুই মেয়েদের। আমি সেই ধারণাটাই ভাঙতে চেয়েছি। আমি বলতে চেয়েছি যে পুরুষ, নারী দুজনেই খুব সুন্দর। দুজনেরই সাজসজ্জার সমান অধিকার রয়েছে। দুজনেরই প্রশংসিত হবার সমান অভীপ্সা রয়েছে।’

মেয়েদের পোশাক বানানো নিয়ে এখন সবাই কী বলছে?

আমি একজন টোটাল ডিজাইনার। ছেলেদের পোশাক বানাই, মেয়েদের পোশাকও বানাই, কেউ বললে ইন্টেরিয়রও করে দেবো। কিন্তু অনেকেই শর্বরী দত্ত বললেই বোঝেন ছেলেদের পোশাক। অথচ আমি বরাবরই প্রথাগত ধারণা ভেঙেছি। ’৯১তে খেলার ছলে প্রথম এগজি়বিশন করেছি। কেউ একটাও রঙিন ধুতি কেনেনি। আমি তো সেই সব জিনিস নিয়ে কাজ করা শুরু করেছি যেগুলো সাধারণের কাছে আউট অফ ফ্যাশন… ধুতি, পাঞ্জাবী, চাদর।

রঙিন ধুতির আইডিয়া কী ভাবে এল?

আমি তো আলাদা কিচ্ছু করিনি। এদেশে সন্ন্যাসীরা, তান্ত্রিকরা, পুরোহিতরা রঙিন ধুতি পরেন। শিবের তো নামই নীলাম্বর। মহাভারতে লোকে দেখছে শকুনি বেগুনি ধুতি পরছে, কিন্তু নিজেরা পরছে না। কারণ তারা বুঝতে পারছে না যে তাদের কাছে এত অপশন আছে। আমি তাদের এই অপশনগুলোই চিনিয়ে দিয়েছি, ইনহিবিশনটা ভেঙে দিয়েছি। আমি ফ্যাশন স্টেটমেন্ট দিয়েছি। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মাঝে একটা সেতু তৈরি করেছি। সেই রঙিন ধুতিই এখন ট্রেন্ড হয়ে গিয়েছে।

কমফর্ট আর স্মার্টনেসের কথা মাথায় রেখে সারা বছরে তিনশো দিন যদি আমাদের ছেলেরা ওয়েস্টার্ন পরে, পঁয়ষট্টি দিন অন্তত ইন্ডিয়ান পরুক। আজকের প্রজন্ম কিন্তু এটা ছেলেদের রং, এটা মেয়েদের রং বলে ডিফারেনশিয়েট করে না। তারা কিন্তু এখন ফ্লন্ট করে ট্র্যাডিশনাল পরে। আসলে একজন ডিজাইনারের প্রধান ও প্রাথমিক কাজ এটাই। টেস্ট ক্রিয়েট করা।

"মকবুল ফিদা হুসেনের মেয়ে তার বাবার জন্যে আমার ডিজাইন করা পোশাক নিয়ে গেছিলেন।"

আপনার সেলিব্রিটি ক্লায়েন্টেল তো ঈর্ষা করার মতো!

সিনেমার লোকেরা তো পোশাকনির্ভর, ওরা তো কিনবেই। আমি খুব আনন্দ পেয়েছিলাম যখন মকবুল ফিদা হুসেনের মেয়ে তার বাবার জন্যে আমার ডিজাইন করা পোশাক নিয়ে গেছিলেন। তারপর মকবুল ফিদা হুসেন আবার আরেকটা চেয়ে পাঠালেন। ভালো লেগেছে যখন কপিল দেব, শচীন তেন্ডুলকর, সুনীল গাভাস্কার, রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলি, পরেশ মাইতি, গণেশ পাইনের মতো মানুষজন আমার পোশাক পছন্দ করেছেন।

লোকে বলে আপনার নাকি ডিজাইন করার সময় ইরেজার লাগে না!

আমার ইরেজার নেই-ই। অনেকে জিজ্ঞেস করে, এত দামি কাপড়ের ওপর সোজা আঁকেন! আপনার ভয় করে না? আমার সত্যিই করে না। আমি ডালে ফোড়ন দেওয়ার ফাঁকেও আঁকি। ভুল করলে ভুল থেকে নতুন কিছু ফর্ম করি… অ্যান্ড ইয়েস, আয়্যাম প্রিটি ফাস্ট। আমাকে অনেকে বলে যে তুমি কাউকে বোলো না তুমি এত তাড়াতাড়ি ডিজাইন করো, লোকে ভাববে তোমার কাজটা খুব সহজ। (হাসি)

ডিজাইন রিপিটও তো করেন না!

রিপিট করি, যদি কেউ বলে। অন রিকোয়েস্ট।

নতুন স্টুডিওর নাম শূন্য রাখলেন?

আমি দর্শনের ছাত্রী। খুব কমবয়সে বিয়ে হয়েছে, শ্বশুরবাড়িতেই মানুষ হয়েছি বলা যায়। বিয়ের পরে বিএ করেছি, মা হওয়ার পর এমএ করেছি। শূন্য-র ব্যাপারটা ওই দর্শন থেকেই। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম। ব্যোম হল শূন্য। আরেকটা দিক হল মাইথোলজিকাল। শিব তাণ্ডব করে একদিকে সৃষ্টি করছেন, একদিকে ধ্বংস, মাঝখানে শূন্য। যে কোন সৃষ্টির জন্যেই শূন্যতা লাগে। শিল্পী ছবি আঁকবেন। প্রথম বিন্দুটা দেওয়ার আগে অবধি সব শূন্য। কুমোর চাকায় প্রথম মাটিটা তোলার আগে সব শূন্য। যে কোন ক্রিয়েশনের আগেই আসলে শূন্য হতে হয়। আর আরেকটা দিক হল অঙ্কের। শূন্যের চেয়ে শক্তিশালী ডিজিট আর কি কিছু আছে? ডানদিকে বসাও, সে অনন্ত।

পুজোয় নতুন কিছু বানালেন?

পুজোর ফ্যাশন বলে আসলে কিছু হয় না। পুজোর জন্য আলাদা কোন হিট রং-ও হয় না। ও ভাবে বিপণনটা হয়। মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি। পুজোর কি আলাদা কোনও সাহিত্যও হয়? বর্ষাকালে লেখা উপন্যাসটাই শরতে পুজোসংখ্যায় বেরোয়। আর ফ্যাশন জিনিসটা বছর বছর পাল্টেও যায় না, বিশেষত আমাদের আর্থসামাজিক পরিকাঠামোয় সেটা সম্ভবই নয়। আমরা তো বড় ভাইয়ের পোশাক রেখে দিই ছোট ভাইয়ের জন্যে। ছেঁড়া ফাটা জামা রেখে দিই দোলে পরবো বলে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে জাস্ট গত বছরে কেনা একটা জামা এ বছরেই অবসোলিট হয়ে যেতে পারে না।

"ফ্যাশনের মূলমন্ত্র হচ্ছে আত্মপ্রত্যয়।"

ফ্যাশন টিপস?

টিপস দেওয়া আমি পছন্দ করি না। কারণ ফ্যাশনের মূলমন্ত্র হচ্ছে আত্মপ্রত্যয়। যতক্ষণ না সেটা আসবে ততক্ষণ আমি বয়কাট চুল কেটে ফেলতে বললেই বা হিপ স্কার্ট পরতে বললেই কেউ পরে ফেলবে তা কিন্তু নয়। আর এখন মিডিয়া বুমের জন্য সবাই সব কিছু জানে... মিলানে কী হচ্ছে, প্যারিসে কী হচ্ছে, আমাকেই সবাই শিখিয়ে দেব। আমার টিপ বলতে এটাই যে স্বাধীন ভাবে, নিজের পছন্দমতো কোনও ইনহিবিশন না রেখে পোশাক পরো। আর ছেলেদের বলবো... কলোনিয়াল ইনফ্লুয়েন্সে আমরা দুশো বছর ধরে আপন করে নিয়েছি ওয়েস্টার্ন পোশাক। বলতে পারো দাসত্বের পোশাক, তবু তার কমফর্ট, স্মার্টনেস অতুলনীয়। কিন্তু তোমাদের ওয়ারড্রোবে দেশি পোশাক, কুর্তি, পাঞ্জাবী, চাদর, ধুতিও যেন থাকে। মেয়েরা কিন্তু আমাদের দেশের অপশনগুলো ভুলে যায়নি। ইন্দো-ওয়েস্টার্ন ফিউশন করে হলেও দেশি পোশাক পরো। ফ্যাশন তো হাতি ঘোড়া কিছু নয়। কনভেনশনকে ভাঙাই হল ফ্যাশন।

শর্বরী দত্ত তো একটা ঘরানা। কাউকে শিখিয়ে যাবেন না এই সবকিছু?

কী শেখাবো? ডিজাইন? আমার তো মনে হয়, আমি ডিজাইনের থেকে রান্নাটা বেশি ভালো পারি। শুক্তো, মোচার ঘন্ট থেকে, চাইনিজ, লেবানিজ, কন্টিনেন্টাল সবেতেই আমার প্রবল ঝোঁক। আমার তো কোন ডিজাইনার ডিগ্রি নেই, আমি তো মূর্খ। যদিও আমার মতো পৃথিবীর বহু বিখ্যাত ডিজাইনারেরই ডিগ্রি নেই। রিতু কুমারের নেই, অনামিকা খান্নার নেই। সত্যজিৎ রায় কিংবা ঋত্বিক ঘটক কি আর পুণে থেকে পাশ করে ছবি বানিয়েছেন? দেখো, গ্রামের ছেলে ফুটবল খেলে নেশায়। তার পায়ে যে নিখুঁত, নিটোল শিল্প, সেটা কি কেউ শিখিয়ে দেয়? নাকি দিতে পারে? মাঠই তার আসল শিক্ষক।

"কারোর আমাকে দরকার হলে ঠিক খুঁজে নেবে।"

ইন্টারভিউটা ছেপে বেরোলে দেখবেন কিন্তু…

রেশমী দেখাবে নিশ্চয়। আসলে আমার তো স্মার্ট ফোন নেই, খুব বেসিক ফোন। মেসেজ করা, দেখা আর ফোন করা ছাড়া আমার অন্য কিছুর দরকার পড়ে না। কারোর আমাকে দরকার হলে ঠিক খুঁজে নেবে। এই যেমন তুমি…অন্য ঠিকানায় চলে যেতে যেতেও ঠিক পৌঁছে গেলে…শূন্যে।

পোশাকের ছবি সৌজন্য: শূন্য
ছবি ও ভিডিও: ইমন নিধারিয়া
গ্রাফিক্স ও ভিডিও এডিটিং: দিব্যেন্দু সরকার
শেয়ার করুন: