ক্যাসেটের ফিতেয় কবে জড়িয়ে গেছিল আমার ভবিষ্যৎ

অনুপম রায়
বাংলার সীমানা পেরিয়ে এখন তাঁর পরিচিত গোটা ভারত জুড়ে। তাঁর লেখা, সুর করা গানে মজেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। সেই গান নিয়েই তাঁর ভাবনার কথা লিখলেন এই প্রজন্মের অন্যতম সফল সুরকার-গীতিকার অনুপম রায়।

গান বয়ে চলেছে রক্ত স্রোতের মতো আমার শরীর জুড়ে, হৃদয় থেকে শুরু করে মস্তিষ্কে। নাকি মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে হৃদয়ে? তখন বয়স ছিল অল্প, তাই এত কিছু ভাবার আগেই ভিজে গেছি সঙ্গীতের জ্যোৎস্নায় আর ক্যাসেটের ফিতেয় জড়িয়ে গেছে শৈশব থেকে কৈশোর থেকে কলেজ, অফিস, ভবিষ্যৎ।

ঘুমোতে যাওয়ার আগে মায়ের গাওয়া গান, ঘুম থেকে উঠেই স্কুলে গিয়ে প্রার্থনা সঙ্গীত, গান থেকে পালানোর কোনও রাস্তা কিন্তু আসলে নেই আমাদের। কত গান স্কুলে, বাড়িতে, পাড়ায় শেখানো হয়েছে, অথচ আমার যেন কোনও কিছুই ভালো লাগেনি তখন। একটু একটু করে বয়স বাড়ছে, এদিকে বোধ-বুদ্ধির সূক্ষ্মতা বাড়ছে কি না সেটা বোঝা যাচ্ছে না। মায়ের শেখানো গান গাইতে ভালো লাগছে না, প্যান্ডেলে যে গান বাজছে সেটাও ভালো লাগছে না, কী যে শুনতে চাইছি কে জানে? আমি যে গান খুঁজে বেড়াচ্ছি, সেরকম কিছুই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বাজারে। স্কুলে গান শিখিয়েছে - “আই কাম ফ্রম অ্যালাব্যামা, উইথ আ ব্যাঞ্জো অন মাই নি”, কোথায় যে অ্যালাব্যামা, ব্যাঞ্জোই বা কী জিনিস, এটা কোন দেশের গান কিছু জানি না। সুরটা মজা লেগেছে, তাই গাইছি।এদিকে মা শিখিয়েছে “আমার সোনার হরিণ চাই”, কী যে চপল, চরণ কিছু বুঝতে পারছি না। তার মধ্যে একটা লাইন ভুল শুনে, “বাবার জিনিস হাটে কিনিস” বলে একদিন খুব বকুনি খেলাম। স্কুল বাসে সিনিয়র দাদারা শেখাচ্ছে, “হাওয়া হাওয়া এ হাওয়া, খুশবু লুটা দে”। র‍্যান্ডম গানের ককটেল পান করে আমার মারাত্মক অম্বলটাই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু টিকে গেলাম। তারপর নানা মুনির নানা মত, তিন বছর তবলা, ছ মাস গিটার করতে করতে একদিন কলেজ শেষ! কেলেঙ্কারি করেছে! আমার স্টাইল মেরে কানে হেডফোন গুঁজে, ওয়াকম্যানে পিঙ্ক ফ্লয়েডের লুনাটিক অন দ্য গ্রাস শুনতে শুনতে অটো থেকে নামা, তবে কি শেষ?

"সত্যিই কোনও গান শোনার ট্রেনিং নেই।"

চাকরিতে ঢুকে সত্যিই মন মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম সবার জীবনে সঙ্গীত মোটেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। প্রচুর স্বপ্নভঙ্গ হলো আবার অনেক নতুন স্বপ্নের জন্মও হলো। আমি যে গান বানানোর চেষ্টা করি, তাই নিয়ে পৃথিবীর কিছু যায় আসে না।ধরা যাক আমার অফিস টিমে ৫০ জন ভারতীয়, নানা প্রদেশের মানুষ, নানান রকম রুচি। ৪০ জন বলিউড শোনে, ১ জন কার্নাটিক রাগ সঙ্গীত, ৩ জন ইংরাজি গান আর বাকিরা কিছু শোনে না। এবার এই যে ৪০ জন বলিউড শোনে তাদের কিন্তু সত্যিই কোনও গান শোনার ট্রেনিং নেই। এমনিই শোনে। কী ভালো লাগছে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। সবাই দেখি কানে হেডফোন লাগিয়ে কাজ করে। আমি আবার গান শুনতে শুনতে কোনও কাজ করতে পারি না। আমার কাছে গান শোনাটাই একটা বিশাল কাজ, এত রকম ইনফর্মেশন কানের ভেতর প্রবেশ করতে থাকে, সেগুলো বাছতেই ব্রেন পাগল হয়ে যায়। সেই বিষয়ে পরে বলছি।

ওই পঞ্চাশ জনের একজন একদিন একটা প্লেলিস্ট বানিয়ে পরপর গান শুনে যাচ্ছে। শনিবারের দুপুর, এমনিতেই অফিসে লোক কম, তার উপর আবার ছেলেটি ফুল ভলিউমে শুনছে। তার সঙ্গে জমিয়ে সার্কিট বানাচ্ছে, সিমুলেশন চলছে, তুমুল কাজ করছে। আমি আর আমার এক প্রিয় সিনিয়র পাশের কিউবিকলে গজগজ করছি। প্রথমে শুনলাম দু’পিস জগজিৎ সিং, তারপর মেটালিকা, তারপর একটা কিশোর কুমার, আর ডি বর্মন, তারপরেই গুপ্ত, কায়ামত সে কায়ামত তক, ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ করে হঠাৎ লিন্‌কিন পার্ক! আমার বন্ধু সিনিয়রটির সহ্যের সীমা পেরিয়ে গেছে তখন। উঠে গিয়ে বেচারা ছেলেটিকে এক ধমক। ইয়ার্কি হচ্ছে! এভাবে কেউ গান শোনে? শুক্তো দিয়ে কেউ দোসা খায়? বিরিয়ানিতে কি কেউ চাটনি ছিটিয়ে খায়? ছেলেটি খুব ঘাবড়ে যায়। মরাল ডিলেমায় পড়ে যায়। কী অন্যায় করেছে, কিছু বুঝতে পারল না। ওর সত্যিই কিছু এসে যায় না, ও তো মূলত বানাচ্ছে সার্কিট, কানে কিছু একটা চলছে। আর ও সত্যিই গান শুনতে ভালবাসে তাই জন্যেই কানে লাগিয়ে শুনছে। কিন্তু কেন ভালো লাগে এই প্রশ্নের উত্তর ওর জানা নেই এবং এই বয়সে এসে আমার মনে হয়, জানার কোনও প্রয়োজনও নেই। সবাই তো আর সিরিয়াস শ্রোতা হবে না। সবাইকে যে গান শুনতে হবে তাও নয়।

"তবে যখন যা শুনেছি, শুধু সেটাই শুনেছি।
এক ক্যাসেট একশো দুশোবার করে।"

আমি যেহেতু নিজে গান বানাই, তাই আমার এই বিষয়ে লেখাপত্র একটু বোরিং এবং কাঠখোট্টা মনে হতে পারে। আমার কাছে একটা গান বানানো ইমোশন, ক্রাফট, স্কিল এবং বিজ্ঞানের মিশ্রণ। আমি আস্তে আস্তে সে ভাবেই দেখতে শিখেছি। তাই আবার ক্ষমা চেয়ে নিই যদি সত্যিই বোরিং হয়ে ওঠে এই গদ্য।

আমার গান শোনা বিভিন্ন পিরিয়ডে ভেঙে ফেলা যায়। তবে যখন যা শুনেছি, শুধু সেটাই শুনেছি। এক ক্যাসেট একশো দুশোবার করে। সেই ক্যাসেট এখন চালালেও কত কিছু ধরা পড়ে যা সেই বয়সে ধরা পড়েনি। তার মানে নিশ্চয়ই এখনো অনেক কিছু বাকি আছে, যা এখন শুনে বুঝতে পারছি না, কয়েক বছর বাদে পারব। একটা মানুষের একটা গান কেন ভালো লাগে কিছুতেই বোঝা যায় না। আমি নিজেরটা বোঝার চেষ্টা করেছি বারবার। নিজে যখন গান বানাই চেনা গত, চেনা ফর্মুলা কিছু তো আছেই। সুরটা কীভাবে পাল্টাবে, কোন কর্ড ছুঁয়ে গেলেই গানটা আরও বেশি মনোগ্রাহী হবে, এইসব মাথায় ঘোরে। কিন্তু সবই যদি বোঝা যেত তাহলে সব গানই সমান জনপ্রিয় হতো, তা তো হয় না। হঠাৎ করে নিয়ম ভেঙে কিছু গান মানুষের খুব ভালো লেগে যায়। আর এটা বারবার হতেই থাকে।

আমি একদম শুরুর দিকে, সুর ভালো লাগলে গান শুনতাম। একবার মন দিয়ে “খোঁপার কাঁটা, মাছের কাঁটা” এসব শুনছি, এক বন্ধু এসে বলল, এরকম খারাপ লিরিক শুনছিস কী করে? তখন একটা বোধ জাগল, ভালো লিরিক ছাড়া গান শুনব না। কিন্তু ভালো লিরিক কাকে বলে, সেটা বুঝতেই অনেক সময় গেল। প্রচুর গান বাদ পড়ল। সেটা শুনতে শুনতে এমন বোরিং কিছু গানের মধ্যে ঢুকে গেলাম, সেখানে দেখি লিরিক ছাড়া আর কিছুই নেই। গান হচ্ছে না মন্ত্রপাঠ হচ্ছে বুঝতে পারছি না। তারপর বেছে নিলাম গান যার কথা-সুর দুটোই ভালো। সাধারণ মানুষ, আমি যতদূর বুঝি, মূল মেলোডিটা শোনে। সুর ভালো লাগলে গান হিট। আর যারা একটু অ্যাকাডেমিক গোছের (সংখ্যায় অনেক কম) তারা জোর দেয় লিরিকের উপর। সঙ্গীত ভাবনা এদের অনেকের মধ্যেই নেই, কিন্তু যেহেতু পড়াশোনাটা ঠিক করে করেছে তাই প্রচুর বক্তব্য এবং যুক্তি দিয়ে অনেক বাজে সুরের ভালো লিরিকের গানকে এরা বাঁচিয়ে রাখবে।

"বিখ্যাত গান “স্পেস অডিটি”, সাল ১৯৬৯।"

এবার আসি যন্ত্রানুসঙ্গে। গান তো শুধু লিরিক আর মেলোডি নয়। কত কী বাজছে তার সঙ্গে। মানে একটা রান্নায় তো কত রকম উপকরণ দিয়ে তবে একটা দারুণ স্বাদ আনা যায়, তাই না? মানুষের কানের অডিও রেঞ্জ হল ২০ হার্জ থেকে ২০ কিলোহার্জ। এমন ভাবে আমাদের গানটাকে সাজাতে হবে, যাতে সব রকম ফ্রিকোয়েন্সি মানুষের কানে পৌঁছয়। তবে তৈরি হবে একটা সম্পূর্ণ অনুভূতি। শরীর মন আনন্দে বা দুঃখে ভরে উঠবে।এবার রাগ সঙ্গীতই শোনা হোক, বা লোকগান বা আধুনিক পপ, কানে কী কী আসছে সেটা বোঝার শুরু। এর জন্য সত্যি ট্রেনিং লাগে। না হলে হারমনি, বেস লাইন, তাল কিছু বোঝা সম্ভব নয়। এই রসে ইজি লিসেনাররা বঞ্চিত হবেই। যারা মোবাইল ফোনের স্পিকারে গান শোনে, জেনে রাখা ভালো ওই স্পিকারে কোনদিন লো ফ্রিকোয়েন্সি বের হয় না। চিনচিন করে বাজতে থাকে। তারা কোন গানের বেসলাইন কোনদিন শুনতে পাবে না। এবার তারা হয়তো বলবে আমাদের বয়ে গেছে বেস লাইন শুনতে। যা শুনছি তাই গান। হ্যাঁ সেটাও গান, তবে অসম্পূর্ণ একটি গান। অনেক ইনফরমেশন মিসিং।গাড়ির ফাটা স্পিকারে ট্যাক্সিওয়ালা গান শুনছে, ঝ্যারঝ্যার করে বাজছে, আমার কষ্ট হচ্ছে শুনতে কিন্তু তার কিছু মনেই হচ্ছে না। দিব্যি লাগছে, সেটাই গান তার কাছে। তাই বলে আমরা যখন গান বানাবো, আমরা তো কিছু বাদ দিয়ে বানাতে পারি না। কলেজে প্রেমিক-প্রেমিকা পাশাপাশি বসে গান শুনছে। একটা ইয়ার ফোন ছেলেটার কানে, অন্যটা মেয়েটার কানে। এটা যে কেউ করতে পারে আমি কল্পনা করতে পারি না। আমরা স্টিরিও মিক্স করে গান রিলিজ করি। মানুষের দুটো কান। গান এমন ভাবে সাজানো হয় যাতে মনে হয় মাথার ভেতরে বাজছে। চোখ বন্ধ করে শুনলে বোঝা যায় ডান দিক বা বাঁ দিকের কানে কী বেজে উঠছে। একটা কান চলে গেলে, অনেক ইনফরমেশন বেরিয়ে যায়। হয়তো গিটারের একটা দারুণ পার্ট বাঁ কান না থাকায় বাদ পড়ল। আগেকার দিনের গান, ধরুন ডেভিড বাউই শুনছেন। বিখ্যাত গান “স্পেস অডিটি”, সাল ১৯৬৯। গান শুরু হলো -
১) ডান কানে বাজছে আকুস্টিক গিটার
২) বাঁ কানে ঢুকলো বেস আর ড্রামস
৩) একটা সিন্থ টোন বাজে সেন্টারে, মানে একদম ডান কান, বাঁ কান মিলিয়ে, মাথার ভেতর
৪) মূল কণ্ঠ আবার ডান দিকে
৫) এরপর হারমনি শোনা যায় বাঁ দিকে

এই রকম ভাবে তৈরী গান যদি শুধু ডান কানে শোনা হয়, তাহলে সে গলা, গিটার আর একটা প্যাঁ মতো আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই পাবে না। সে জানবেই না গানটায় ড্রাম বেজেছিল, হারমনি ছিল। এতটা সাহসী মিক্স আমরা করি না আজকাল। সাধারণ মানুষ সত্যি কেয়ার করে না এসবের। কিন্তু সাধারণ মানুষকে যত বোকা ভাবা হয় তত বোকাও নয়। যদি সত্যি টেকনিক্যালি খারাপ হয় গানটা, মানুষ হয়তো এক্স্যাক্ট কারণটা বুঝতে না পেরেও গানটা বাতিল করে দিতে পারে। তারপর প্রকৃত গুণী শিল্পীরাই চিৎকার করবে “মানুষ আমার গান শুনছে না। এত সুন্দর কথা লিখলাম তবু কেউ শুনল না।”। তারা বুঝতে চাইবে না, ওই সুসজ্জিত ঘরটা আসলে সত্যিই সুন্দর, কিন্তু কেউ পৌঁছতে পারেনি। ওই ঘরটায় যাওয়ার পথটা সুবিধের ছিল না। সিঁড়িটা অন্ধকার। সরু। ময়লা পড়েছিল চারিদিকে। একমাত্র যারা ভালবাসে তারাই আসতে পেরেছে। বাকিরা সব পালিয়েছে।

"যার যেটা শুনতে ইচ্ছে করবে তাকে সেটা তার মতো শুনতে দেওয়া হোক।"

এইসব লিরিক, সুর, যন্ত্রানুসঙ্গ ছাপিয়ে যে মাথা তুলে দাঁড়ায়, মানুষের মনে গিয়ে প্রবেশ করে, সে গান। মানুষ যখন গান শোনে, শুধুমাত্র ভালো লাগলে তবেই শোনে। পরোয়া করে না, কার সুর, কার কথা, ভায়োলিন বাজছে না তবলা, কে গাইছে, কিচ্ছু যায় আসে না। তাদের জীবনে নানা সমস্যা, সেগুলোই তাদের প্রায়োরিটি, গান নয়। গান শুধুমাত্র সিরিয়াস সঙ্গীতানুরাগীদের জীবনের প্রায়োরিটি।

কবিতা, উপন্যাস, গল্প, সিনেমা আমাকে উন্মুক্ত করে, আমাকে ভাবায়, চিত্রকলা আমাকে মুগ্ধ করে, বিজ্ঞান করে তোলে সচেতন আর আমাকে সবচেয়ে আরাম দেয় গান। সঙ্গীতের ওই সুরের ওঠা নামায় কী যে মাদকতা রয়েছে তা কোনওদিন লিখে বোঝাতে পারব না। কেন কেউ ভারতীয় রাগ সঙ্গীত শুনতে পছন্দ করে, কেউ বা জ্যাজ়, কেন কেউ রক অ্যান্ড রোল, এর কোনও উত্তর পাওয়া যায় না, খুঁজতে যাওয়াও বোকামি। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে উদার করে। যে কোনও ফারাককে সম্মান করতে শেখায়। নিজের চেয়ে অন্যরকম কিছু হলেই সেটাকে গুলি করে মেরে না ফেলে সেই যে অন্য রকম হওয়ার মজা, সেটা উপলব্ধি করতে শেখায়। পৃথিবীতে কোনও একটা ধর্ম নেই, কোনও একটা ভাষা নেই, তাই কোনও একটা সত্যি খুঁজতে যাওয়াই ভুল। সব রকম গান এই জল-হাওয়ায় মিশে আছে তারপর যার যেটা শুনতে ইচ্ছে করবে তাকে সেটা তার মতো শুনতে দেওয়া হোক।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু সরকার
শেয়ার করুন: