হাফ লাইফ

বিপুল দাস
আমি বললাম, ‘বিয়ার।’
কলকাতায় আজ চল্লিশ ডিগ্রি। এই গরমে চিল্‌ড বিয়ার ছাড়া অন্য কিছু চলবে না। শাশ্বতর ঘরে ফুল স্পিডে ফ্যান, চলছে, তবু যখনই মনে পড়ছে বাইরের উষ্ণতার কথা, জানালার পর্দা একটু সরে গেলে কাচের ভেতর দিয়ে রোদেপোড়া আকাশ একটু দেখা গেলেই মনে হয় দস্যুরোদ ঝাঁপিয়ে পড়বে এই ঘরের ভেতরে। তখন হঠাৎ অলৌকিক হলকার অনুভূতি শরীরে টের পাওয়া যায়।
ভুল সংকেত পাঠায় মস্তিষ্ক। ওই রোদ, এই চল্লিশ ডিগ্রি শরীরের পক্ষে বিপজ্জনক একটা ছবি তৈরি করে। সেই রোদছবিকেই মগজ সত্যি বলে মনে করে। শরীরজুড়ে গরম বাতাসের একপশলা হলকা বয়ে যায়। এরকম হয়। স্বপ্নে সহবাসের দৃশ্যে অনেক সময় লুঙি বা পাজামা নষ্ট হয়। লোডশেডিংয়ের সময় প্রতিমুহূর্তে মনে হয় এই বুঝি এখনই পাওয়ার আসবে। প্রতিটি ইন্দ্রিয় উন্মুখ হয়ে থাকে। তখন যে কোনও শব্দকেই মনে হয় ফ্যানের শব্দ। গাড়ির হেডলাইটের একঝলক ঘরে এলে বিশ্বাস হয় পাওয়ার এসেছে। তা ছাড়া, সেই যে— হাত নেই, তবু সেই হাতে মশা কামড়ানোর গল্পটা খুব শোনা যায়। শরীর তীব্রভাবে যা চায়, মগজ তাকেই প্রক্ষেপিত করে। নিশ্চয়ই আরও অনেক জটিল রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ব্যাপার আছে। কমন পিপল শুধু লুঙি নষ্ট হয়ে যাওয়া বুঝতে পারে।
দীপেন অ্যাকচুয়ালি একটু ভিতু টাইপের।
কলকাতায় আজ চল্লিশ ডিগ্রি। আমি বলেছিলাম চিল্‌ড বিয়ারের কথা। দীপেন জানলার সামনে গিয়ে পর্দাটা আরও কিছুটা সরিয়ে দিলে অনেকটা আলো ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। আকাশ নয়, দীপেন সামান্য ঝুঁকে নীচে তাকিয়ে আছে। ওই অবস্থাতেই বলল, ‘আমি হুইস্কি।’
আমরা জানি দীপেন হুইস্কিই চাইবে। দীপেন অ্যাকচুয়ালি একটু ভিতু টাইপের। সে আমরা অনেকদিন ধরে ওকে চিনি বলেই জানি। বরাবর ভিড়ের আড়ালে থাকা পাবলিক। কোথাও ঝামেলা দেখলে কৌতূহলে এগোয় বটে কিন্তু কোনও লম্বা লোকের পেছনে পজিশন নেয়। ফাঁক দিয়ে কাছিমের মতো মুণ্ডু বার করে ঘটনার গন্ধ শোঁকে। কিন্তু ওর ভয়েসটা বেশ ভারী, গমগমে। ঠিক কার মতো বলা মুশকিল। মোটামুটি বলা যায় হেমন্ত, রাজা মুরাদ আর অমরেশ পুরির যোগফলের তিন ভাগের এক ভাগ। ফলত, কোথাও প্রথম সম্ভাষণেই দীপেন ওজনদার কেউ হয়। ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। ভারী গলায় দীপেন যখন বলে যে, ডিমনিটাইজেশনের একটা পজিটিভ সাইডও আছে— অনেকেই বিশ্বাস করে বসে। কিংবা টুসকি দিয়ে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে ব্যারিটোন ভয়েসে বলে যে, কারেন্ট-পাস-করানো আড়াই প্যাঁচের তামার তারের আংটি পরলে অর্শ সারতে বাধ্য— তখন অনেকেই জানতে চায় উক্ত দ্রব্য কোথায় পাওয়া যেতে পারে। আমাদের কাছে একবার গল্প শুনিয়েছিল নর্থবেঙ্গলের কোন ফরেস্টে নাকি এমন গাছ আছে, খোঁচা দিলে টপটপ করে রক্ত পড়ে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন অরিজিনাল ব্লাড। কিন্তু গ্রুপ জানা যায়নি। আমরা খুব একটা পাত্তা দিইনি।
ওর গলার আওয়াজ শুনলে কেউ বিশ্বাসই করবে না এই লোকটাই কোথাও ঝামেলা দেখলে চট করে আড়ালে চলে যায়। গলা শুকিয়ে যাওয়ার ফলে গমগমে ব্যাপারটা নেতিয়ে পড়ে। আমার মনে হয় ভিতু বলেই দীপেন আমাদের সামনে বসে হুইস্কি খেতে চায়। ভয়েস দিয়ে সবকিছু হয় না। সে খাক, কিন্তু দু’পেগের বেশি সহ্য করতে পারে না। পারসোনাল ব্যাপারগুলো এমন খোলাখুলি বলতে শুরু করে যে শুনতে আমাদেরই অস্বস্তি হয়। তার প্রেমিকার সঙ্গে কী কেলো করেছিল, সে না হয় শোনা যায় কিন্তু ঘটনা নিজের ঘরে, নিজের বিছানায় টেনে আনলে আর শোনা যায় না। ফুলশয্যার রাতে কেমন পুরুষসিংহ হয়ে উঠেছিল— তার সটিক বাখান— বাড়াবাড়ি করত দীপেন। ওর গ্লাস উলটে দিতাম আমরা। আরও খেলে আরও ডিটেইলসে চলে যাবে। হাজার হোক আমরাও তো রক্তমাংসের মানুষ। অবশ্য আমার খুব সন্দেহ হত, দীপু ঘটনায় জল মেশাচ্ছে। বিয়ে আমরাও করেছি, চিরকালের শুকদেব গোসাঁইও কেউ নই। কিন্তু দীপেন যেমন বলে, ওরকম হয় না। হয় দীপু মিথ্যে বলে, অথবা চূড়ান্ত স্যাডিস্ট। মিথ্যে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ভিতু দীপেন তলাপাত্রর মনে তীব্র গোপন বাসনা অ্যালকোহলের সঙ্গে বিক্রিয়ায় মনোহর কাহানি তৈরি করে।
শাশ্বত ভেতরে গিয়ে চেঞ্জ করে এসেছে। কালো বারমুডা আর লাল হাতকাটা গেঞ্জি পরে আয়েশ করে বসল। ‘আমি ভদকা’, বলল শাশ্বত। ও বরাবর ভদকাই পছন্দ করে। একটা পাতিলেবুর স্লাইস গ্লাসে ফেলে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করবে। নাকি ম্যারিনেট করে। শাশ্বত যে বারমুডা আর গেঞ্জি পরে বসবে— আমি জানতাম। হুমদো স্বাস্থ্য শাশ্বতর। হাতে-পায়ে, কাঁধে-পিঠে ডুমো ডুমো মাংসপেশি কিলবিল করে। রেগুলার জিম করে শাশ্বত।
লাগালে অনেক কিছুই লাগানো যায়।

‘এসি লাগাচ্ছিস না কেন?’ সেন্টার টেবিলটা একটু সামনে টেনে সোফায় বসে বলল দীপেন। একটা কাজু মুখে ফেলল। আজ পনেরোই আগস্ট। কাল রাতে বৃষ্টি হয়েছে। বাতাসে জলরেণু থাকায় আর্দ্রতাও ভালোই রয়েছে। ভ্যাপসা গরমে সবার হাঁসফাঁস অবস্থা। শাশ্বতই ফোন করে আমাকে আর দীপেনকে আজ সন্ধেবেলা আসতে বলেছিল। বলেছিল একজনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে। ইন্টারেস্টিং লোক।

‘লাগালে অনেক কিছুই লাগানো যায়। কেন, ফ্যান চলছে, অসুবিধার তো কিছু নেই। বললে আর একটা পেডেস্টাল এখানে নিয়ে আসছি।’

‘না, তা নেই। একটু বাদে তুই-ই তো ঘেমেনেয়ে গেঞ্জি খুলে বসবি।’

তা ঠিক। একটু বাদেই শাশ্বত ঘামতে শুরু করবে। গেঞ্জি খুলে খালি গায়ে বসবে। ওর গলায় সোনার চেনের সঙ্গে ওর গুরুদেবের ছবি ঘামে বুকের সঙ্গে লেপটে থাকবে। ওই অবস্থায় একদিন লোডশেডিং হয়েছিল। খুব সামান্য আলো পড়ছিল শাশ্বতর ঘামেভেজা শরীরের ওপর। একটু নড়াচড়া করলেই ঘামের বিন্দুগুলো ঝিলমিল করে উঠছিল। অন্ধকারে মোচড় দিচ্ছে কোনও সরীসৃপ— এরকম মনে হয়। কম আলো থাকার কারণে স্পষ্ট বোঝা না গেলেও মনে হয় তখন শাশ্বত ইচ্ছে করেই ওর পেশিগুলো নাচায়। আমরা যেন ক্রমশ নেশাগ্রস্ত হতে থাকি। মুগ্ধ হই। শাশ্বত নিশ্চয়ই ব্যাপারটা টের পায়। ওর ফর্সা খালি গা, সিক্স প্যাকের মোচড়, আলো-আঁধারিতে সাপ হয়ে যাওয়া— মিথ্যে বলব না, কখনও মুগ্ধতা ছাপিয়ে আমি যৌন উত্তেজনাও টের পেয়েছি। ঈশ্বর জানেন কেন ওর বউ ওকে ছেড়ে গেছে।

বাদ দে না, ওর পারসোনাল ব্যাপার

সেদিন আমার লজ্জাই করছিল। ওরকম হুমদো চেহারার মানুষকে কাঁদতে দেখলে যে দেখে, তারই লজ্জা করে। সেদিন আমরা সবাই কোটার বেশি খেয়ে ফেলেছিলাম। গত বছর ওর কোম্পানিকে অনেক টাকার ব্যাবসা এনে দিয়েছিল। এবার নাকি অনেক টাকা বকশিশ পেয়েছে। সেই অনারে শাশ্বতই মালের খরচ দিয়েছিল। নইলে আমরাই চাঁদা তুলে ব্যবস্থা করি।

দীপু বরাবরের গান্ডু। হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল, ‘একটা সত্যি কথা বল তো শাশ্বত, রুমা তোকে ছেড়ে গেল কী জন্য। শালা, তোর মতো ফিগার আর টাকা থাকলে আমি তিনটে বউ রাখতে পারতাম। আর তুই একটাকেই রাখতে পারলি না।’

‘বাদ দে না, ওর পারসোনাল ব্যাপার’— আমি দীপুকে থামানোর চেষ্টা করলাম। শাশ্বত কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার একটা পেগ ওর গ্লাসে ঢালল।

‘টাকা আর ফিগার থাকলেই সব হয় না। আমার সঙ্গে রুমার পোষাল না, ব্যাস। আমি আটকাইনি ওকে।’

‘তুই কিছু চেপে যাচ্ছিস, আমার মনে হয় রুমার কোনও আলাদা ব্যাপার আছে। তুই সেখানে থার্ড পারসন, সিঙ্গুলার নাম্বার, নিউট্রাল জেন্ডার হয়ে গেছিস।’

এক লাফে দীপুর ঘাড়ের ওপর গিয়ে পড়ল শাশ্বত। মাটিতে গড়িয়ে পড়লে দীপুর গলা চেপে ধরল শাশ্বত। মুহূর্তেই দীপুর মুখ ছাই-ছাই হয়ে গেছে। দু’চোখ ঠেলে বাইরে এসে গেছে। আমরা বুঝলাম দীপু এখনই মরে যাবে। দীপু এটা ঠিক করেনি। বন্ধুর বউয়ের ক্যারেকটার নিয়ে কমেন্ট করা ওর অন্যায় হয়েছে। কিন্তু, আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, শাশ্বতর ওইরকম বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়া, পেশিগুলোর জেগে ওঠা আর দীপুর চোখে মৃত্যুভয়— সব মিলিয়ে আমার কেমন একটা সেক্সুয়াল প্লেজার হচ্ছে। এক ঝটকা মেরে দীপুকে ছেড়ে দিল শাশ্বত। গলায় হাত ডলতে ডলতে শাশ্বতর দিকে ভয়ের চোখে তাকিয়ে আছে দীপু।

‘দীপু, রুমাকে নিয়ে বাজে কথা বলা তোর উচিত হয়নি।’ আমি বললাম।

‘সরি শাশ্বত। আমি বুঝতে পারিনি তুই এখনও রুমাকে খুব ভালোবাসিস। রুমার সম্পর্কে বাজে কথা বলা আমার উচিত হয়নি।’ ফ্যাসফ্যাস করছে ব্যারিটোন ভয়েস।

‘ধুর, রুমাকে তুই যা খুশি বল, আমাকে কেন নিউট্রাল জেন্ডার বললি!’

নতুন নেওয়া পেগ থেকে একবারে অনেকটা সিপ দিল শাশ্বত। প্রায় অর্ধেকটা খালি করে গুম হয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ। আমরাও চুপ করে রইলাম। নিউট্রাল জেন্ডার শব্দটার মানে আমার মাথায় ঢুকতে একটু সময় লেগেছিল। তারপরে বুঝলাম ক্লীবলিঙ্গ বলায় ঝামেলাটা হল। শাশ্বতকে ছেড়ে রুমার চলে যাওয়ার পেছনে দীপু ইঙ্গিত করতে চেয়েছে শাশ্বত নিউট্রাল জেন্ডার কিনা। রাগ হওয়ারই কথা।

ধুর, রুমাকে তুই যা খুশি বল, আমাকে কেন নিউট্রাল জেন্ডার বললি!

হঠাৎ দেখি শাশ্বত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বাচ্চারা কাঁদে, ঠিক আছে, কিন্তু এরকম হুমদো চেহারার বড় মানুষকে কাঁদতে দেখলে আমারই লজ্জা করে। সামান্য একটু কেঁদে নিয়ে আবার একটা বড় চুমুক দিল শাশ্বত। একটা সিগারেট নিয়ে মুখের সামনে ধরতেই দীপু লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে দিল সিগারেটটা।

‘তোরা সবাই নিশ্চয় অ্যাডটা দেখেছিস?’ অনেকটা ধোঁয়া ছেড়ে বলল শাশ্বত।

‘কোন অ্যাডের কথা বলছিস?’ আমি জানতে চাইলাম। এখন একটু স্বাভাবিক লাগছে শাশ্বতকে।

‘তেলের অ্যাডটা। কখনও মনোযোগ দিয়ে দেখেছিস?’

‘সে এক-আধবার দেখেছি। ঘরে কেউ না থাকলে।’

‘কী গ্রেস মাইরি সাপটার। ফোঁস করে যখন উঠে দাঁড়ায় না... শরীরটা শিরশির করে ওঠে।’

‘তুই নিশ্চয় ইউজ করতিস?’ দীপু আবার কেলো করল কিনা— আমার ভয় করল।

‘না রে, আমার একটা অন্য প্রবলেম হচ্ছিল। অনেকদিন ভেবেছি তোদের সঙ্গে কথা বলব। হয়ে ওঠেনি। মানে, সত্যি মানুষেরও কি ওরকম হয়?’ আলতো করে সিগারেটে টান দিল শাশ্বত।

‘তোর প্রবলেমটা কী বল তো? মাইক্রো-অর্গান, ইরেকটাইল ডিজফাংশান, নাকি প্রি-ম্যাচিওর ফিনিশ?’ আমার সব জ্ঞান উজাড় করে দিলাম।

‘না, মানে ব্যাপারটা ঠিক কী করে বোঝাব, বুঝতে পারছি না। তুই যা মিন করছিস, সেসব কিছু নয়। ওসব ঠিক আছে... বাট...’

‘বাট... বাট কী ? খুব প্রাইভেট কিছু হলে বলার দরকার নেই।’

‘ব্যাপারটা বুঝলি, খুব পিকিউলিয়ার। ওই সময়েই আমার অ্যাডটার কথা মনে পড়ে। আর, কেমন যেন ভয় করে ওঠে। সব নেতিয়ে যায়। পারি না। মাঝে মাঝে এরকম হচ্ছিল। শেষে ঘন ঘন। রুমা বলেছিল ডাক্তার দেখাতে। আমি বলেছিলাম ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তার দেখাতে সাহস হচ্ছিল না। আমাকে আর একটা দিবি?’

‘আর খাস না। সাপ নিয়ে তোর মনে খুব ভয় আছে, তাই না ? মনে হচ্ছে মেন্টাল কেস।’

‘সে কে না ভয় পায়। আসলে ওই সময় আমার কেমন যেন নিজেকে ব্যাং ব্যাং মনে হয়। কোথাও লুকিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। এফ আর ও জি ফ্রগ। সত্যি সত্যি গায়ের চামড়া কেমন খসখসে হয়ে যায়। সাপের হিস্‌স্‌ শব্দটা স্পষ্ট শুনতে পাই। বুঝতে পারি কাকে বলে মৃত্যুভয়। সব কুঁকড়েমুকড়ে যায়। রুমা অনেক চেষ্টা করত। নির্লজ্জের মতো বাজে গল্প করত, স্ল্যাং ইউজ করত। ভেবে দ্যাখ, তখন আমার কোথায় ফোঁস করার কথা, তা না উলটে আমাকেই ফোঁস দ্যাখায়। চুপ করিয়ে রাখে। তোরা শুনলে হাসবি, কিন্তু আমার কেমন যেন একটা সন্দেহ হচ্ছে।’

‘রুমার ব্যাপারে?’ দীপু কাত হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‘এবার একটা লাথ খাবি তুই। শালা অন্যের বউয়েজ কেচ্ছা শুনতে খুব ভালো লাগে, তাই না?’

‘বাদ দে ওর কথা। তারপর, কিসের সন্দেহ হয় তোর?’

দীপুকে আমরা বেশি পাত্তা দিই না। শাশ্বতর কাছে তো প্রায়ই খিস্তি খায়। দীপু রাগে না, হাসে। মাল্টিন্যাশনাল লুব্রিকেটিং অয়েল কোম্পানির ইস্টার্ন রিজিয়নে উঁচু পদের লোক শাশ্বত। মাঝে মাঝে ওর এই ঘরে, কখনও বাইরের বারে আমাদের মাল খাওয়ায়। ওর ভাষায়— ট্রিট দেয়। সামাজিক বা আর্থিক সঙ্গতির প্রশ্নে আমাদের সঙ্গে শাশ্বতর আড্ডা মারার কথা নয়। এক পাড়ায়, এক স্কুলে পড়েছি বলে ক’জন আর পরে মানে রাখে। আমার মনে হয় আমার আর দীপুর মতো দুজন কালো, রোগা মানুষ ওর দরকার ছিল, নইলে ওর করিশমা ঠিক খোলতাই হয় না। এসব আমি কিছু কিছু বুঝি।

‘সন্দেহটা, হাসবি তোরা, আমার মনে হয় কেউ চায় না রুমা প্রেগন্যান্ট হোক। সাপটার মাথা আমার ঘরে, লেজটা হুই সমুদ্রের ওপারে। শালারা আমাকে লেজে খেলাচ্ছে। না হলে বল, ওই সময়েই কেন আমার অ্যাডটার কথা মনে পড়বে! মনে হয় আমাকে পাকে পাকে জড়িয়ে ধরবে। বিশ্বাস কর, আমি তখন ব্যাং হয়ে যাই।’

আমার অস্পষ্ট মনে হল এরকম একটা গল্প আমি কখনও পড়েছি। মানুষের পোকামাকড় হয়ে যাওয়া।

দুই

আমি আমার ভারী গলায় বললাম, ‘হুইস্কি।’ দীপু ওর সিক্স প্যাক নাচিয়ে বলল আজ ও ভদকা নেবে। শাশ্বত মিনমিন করে বলল, ‘আমি বিয়ার নেব।’

আমার গলার আওয়াজ শুনে আমি নিজে অবাক হলেও দেখলাম ওরা দুজন স্বাভাবিক। যেন এটাই আমার অরিজিনাল ভয়েস। দীপুর বুকে ওর গুরুদেবের ছবি মাদুলির সঙ্গে ঝুলছে। শাশ্বত জানলা দিয়ে ঝুঁকে নীচে কিছু দেখছে।

খুব অস্থির লাগছে। কার আসার কথা ছিল। কে যেন বলেছিল একজনের আসার কথা আছে। কখন আসবে সে? আমরা আর কতক্ষণ অপেক্ষা করব?

অঙ্কন - সৌজন্য চক্রবর্তী
শেয়ার করুন: