ঈর্ষা

সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কাঁসারিপাড়া লেন দিয়ে সোজা ঢুকে এলে শেষ বাড়িটার গায়ে এখনও লালে-সাদায় ৫/এ লেখা ফলকটা ঝুলে আছে।
ফলকটা অবশ্য একটু বেশিই বাঁকা হয়ে ঝুলছে। ঠিক যেমন রংচটা দরজার গায়ে রংচটা লেটার বক্সটা কায়দা করে ঝুলে আছে, এটা তার তুলনায় কিঞ্চিৎ অধিক পতনোন্মুখ। দরজার ওপর আলকাতরা দিয়ে ছোট-বড় অক্ষরে লেখা রেবা পোদ্দার। এই কাঁসারিপাড়া লেনের ৫/এ বাড়িটা যে রেবা পোদ্দারের এটা ঘটনা। রেবা পোদ্দার বেঁচে আছেন কিনা দেবত্রী ঠিক জানে না। রেবা পোদ্দার বহু বছর নিখোঁজ। বাড়িটা খুব বড়। চারতলা। কিন্তু উত্তর কলকাতার পুরনো বনেদি বাড়ি বলতে মনে যে ছবিটা ভেসে ওঠে, বাড়িটার সঙ্গে সেই ছবির কোনও মিল নেই। বাড়িটা বার বার হাতবদল হয়েছে আর কোনও সময়েই সঠিক মালিকানার তত্ত্বাবধান পায়নি। ওই একতলাটাই একটু রোম্যান্টিক চরিত্রের। লাল মেঝে। কালো থাম। টানা বারান্দা, খড়খড়ি দেওয়া জানলা, লোহার জাফরিকাটা রেলিং। দোতলা থেকে বাড়িটাকে যেমন তেমন বর্ধিত করা হয়েছে। এই করে করে পঞ্চাশ বছরে চারতলা বাড়িটার যা চেহারা হয়েছে তা কহতব্য নয়, বর্ণনা দেওয়াও মুশকিলের। সবশুদ্ধ ইট, কাঠ, পাথরের একটা ইমারত যার পেটের ভেতর আছে একটা কলেজের ছেলেদের মেস, একটা হোসিয়ারি ব্যবসার স্টোর, স্টক, অফিস, বই বাঁধাইয়ের ব্যবসা, উড়িষ্যার এক ভদ্রলোক পাখির খাঁচা তৈরি করেন এখানেই একটা বড় ঘরে। ওই ঘরেই থাকেন, খান, রাঁধেন, বাড়েন আর মাঝেমধ্যে দেশে চলে যান। এছাড়া আরও বেশ কয়েক ঘর ভাড়াটে আছে। কেউ কেউ স্ত্রী ছেলেমেয়ে নিয়েও থাকেন। দেবত্রী এই বাড়ির ছাদের একটা ঘর, ঘর সংলগ্ন রান্নাঘর আর বাথরুমের ইউনিটটার বাসিন্দা এবং কতকটা আইনগত হকদারও বটে। দেবত্রীর মায়ের একমাত্র অকৃতদার কাকা এই ছাদের ঘরের ভাড়াটে ছিলেন। যেহেতু রেবা পোদ্দার নিখোঁজ আর এখন ভাড়াটেদের অংশগুলোর দখলদারি তাদেরই হয়ে গেছে, প্রায় সেই হেতুই দেবত্রীর মায়ের কাকার দখলে থাকা অংশ এখন দেবত্রীর। কাকা থাকতেন মা’র কাছে। মৃত্যুকালে এই অংশটার দখল মাকেই দিয়ে গেছেন উনি। দেবত্রী সেই ইউনিভার্সিটির দিনগুলোয় বহরমপুর থেকে এখানে এসে উঠেছিল। এটাই এখন তার বাসস্থান। ক’দিন পর সে তিরিশে পড়বে। বাইপাসের একটা বেসরকারি স্কুলে বাংলা পড়ায় দেবত্রী এবং সে একজন কবি। একাধিক কবিতার বই আছে। এবং সে নামিদামি কাগজে সাহিত্য, শিল্প ও সমাজ নিয়ে লেখে। কাগজে তার নাম বেরোয়। এসব কারণে তার এই একার জীবনযাপন নিয়ে এই বাড়ির বাসিন্দাদের কৌতূহল আছে, ইন্টারফেয়ারেন্স নেই। বয়স কম তবু তাকে লোকজন বেশ মান্যই করে বলা যায়।
কেউ কেউ হঠাৎ করে নিজের ভেতর কবিত্ব খুঁজে পেয়ে আত্মপ্রকাশের জন্য ছটফট করছে।
সেদিন কলকাতা শহরে একটা খুব বড় মিছিল বেরিয়েছে। শাসক দলের মিছিল। আগের দিন রাত থেকেই শহরের পথে বাস, ট্যাক্সির সংখ্যা কমে গেছে। সমস্ত জেলাগুলো থেকে লোক আসছে উজিয়ে মিছিলে যোগ দেবে বলে। যানজটের ভয়ে শহর জুড়ে একটা অঘোষিত ছুটির বাতাবরণ। দেবত্রীর স্কুল খোলা আবার বন্ধও। ছাত্রীরা কেউ আসবে না। বাইপাসে এইরকম দিনে যাওয়ার কথা ভাবাই যায় না। দেবত্রী তাই আর স্কুলে যায়নি। সকালে উঠে স্নান-টান করে সে ছাদের এককোণে পাতা চেয়ারে বসে চা-টা খেয়েছে। কিছু খাতা দেখার ছিল। দেখেছে। একটা সুন্দর স্যান্ডউইচয়ের ফিলিং বানিয়ে ফ্রিজে রেখে দিয়েছে। দু’দিন স্কুলের টিফিন হয়ে যাবে সেটা দিয়ে। চিকেন ম্যারিনেট করে রেখে দিয়েছে। বেলা বাড়লে রাঁধবে। জামাকাপড় কেচে ছাদে মেলা হয়ে গেছে টানটান করে। পিয়ালি তার ইউনিভার্সিটির বান্ধবী, বেস্ট ফ্রেন্ড। পিয়ালি বিয়ে-টিয়ে করে থাকে কাছেই শোভাবাজারের শ্বশুরবাড়িতে। কিন্তু পিয়ালির বর থাকে মুম্বাই। এই জন্য পিয়ালি অনেক ফ্রি। ছুটির দিন-টিন হলে অনেক সময় সকাল সকালই পিয়ালি চলে আসে এই কাঁসারিপাড়া লেনের রেবা পোদ্দারের বাড়ির ছাদের আস্তানায়। দুজনে খুব গল্প করে, খিচুড়ি বানায়। বিছানার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ফেসবুক করে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখে, গান শোনে। বিকেলে কখনও মিত্র ক্যাফেতে যায় চপ, কাটলেট খেতে। কখনও শ্যামবাজারের দিকের কোনও রেস্টুরেন্টে যায়। এছাড়া দেবত্রীর আরও দু-একজন ভালো বন্ধুবান্ধব আছে। যেমন রঞ্জন, কুন্তল, পারমিতা। তবে শুধু আড্ডা দিতে আসে এরকম বন্ধুর সংখ্যাও কম নেই তার। অনেক সময় বন্ধুর বন্ধুরাও এসে দিব্যি পাঁচ-সাত ঘণ্টা আড্ডা দিয়ে খেয়েদেয়ে চলে যায় যাদের হয়তো তার আগে পর্যন্ত নামই জানত না দেবত্রী। এই বন্ধুবান্ধবরা মোটামুটিভাবে সাহিত্য জগতের ছেলেমেয়ে। কেউ কেউ খুব সিরিয়াস লেখক, কবি। কেউ কেউ হঠাৎ করে নিজের ভেতর কবিত্ব খুঁজে পেয়ে আত্মপ্রকাশের জন্য ছটফট করছে। আবার কেউ কেউ দু-একটা কবিতা জোর করেই লেখে কারণ এই জগতটার সঙ্গে উঠতে, বসতে ভালোবাসে। স্বচ্ছন্দ বোধ করে। আজকাল সবাই ফেসবুকে খুব কাব্যচর্চা করছে। এরকম ফেসবুক কবিরাও এই আস্তানায় আসে-যায়। আসলে এই ছাদের ঘর, খোলা ছাদ, দেবত্রীর একার স্বাধীন জীবনে সকলের প্রবেশাধিকার— এগুলোর একটা আকর্ষণ আছে। দেবত্রী নিজেও জানে না কতদিন সে এরকম একলা থাকবে। হয়ত তূণীরকে অচিরেই বিয়ে করে নেবে সে। বিয়ে করে দিল্লি চলে যাবে। যতদিন বিয়ে না করছে ততদিন এই জীবনটাকে সে সাপটে খেতে চায়।
মা-বাবা তাকে নিয়ে চিন্তা করে না। কারণ একুশ বছর বয়েস থেকেই সে এইরকম জীবনে অভ্যস্ত। কিন্তু কখনও কাউকেই তার জন্য কোনওরকম বিপাকে পড়তে হয়নি। মোটামুটি এই ন'বছর একটানা তার জীবনযাত্রা স্বচ্ছ। হয়তো কিছুটা বোহেমিয়ানিজম আছে। কিন্তু শেষ অব্দি একটা টাইম বাউন্ড চাকরি, দায়িত্ব, লেখার চাপ এসব তাকে এক ধরনের নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যেই আবদ্ধ করে রেখেছে। আর তূণীরকে অসম্ভব ভালোবাসার কারণে সে খুব একটা অন্য পুরুষকে জীবনে ঠাঁই দেয়নি। তূণীরকে ভালোবাসা, তূণীরকে অতটা কাছে না পাওয়ার মধ্যে যে দুঃখ আছে সেটা দেবত্রী একরকম উপভোগ করে বলে মনে হয়। তূণীর আই পি এস। এই মুহূর্তে খুব ব্যস্ত। বিয়েটা করার মতো ফাঁকাই হতে পারছে না গত দু’বছর। হলেই বিয়েটা হয়ে যাবে।
আসবি না কি তুই?

দেবত্রীর ঘরে টিভি নেই। কিন্তু আজকাল ফেসবুকেই সব চ্যানেল পাওয়া যায়। মিছিলের লাইভ কভারেজ দেখতে দেখতে সে পিয়ালিকে ফোন করল, ‘আসবি না কি তুই?’

‘কী করে আসব?’

‘কেন? এখন তো প্রায় বারোটা বাজছে। এখন তো এদিকটা একটু স্টেবল।’

‘সে সমস্যা না। শাশুড়ি হঠাৎ প্রেশার কমে গিয়ে মাথা-টাথা ঘুরে পড়ে গেছে। এখন ডক্টর কল দেওয়া হয়েছে। আসবে কিনা ঠিক নেই। কলকাতা শহরে এখন কল দিলে ডক্টর বাড়িতে আসে-টাসে না। আমার বর বলছে নার্সিংহোমে নিয়ে চলে যেতে। ড্রাইভার এলেই বেরোব। আর যদি তার মধ্যে ডাক্তার এসে যায় তো বাঁচোয়া।'

‘আসব নাকি?’

‘না রে। ননদ রয়েছে তো। অসুবিধা হবে না।’

ফোন রেখে দিয়ে দেবত্রী একটা সিগারেট ধরাল। খুব কমই খায় সে সিগারেট। থাকেও না সঙ্গে। এখন একটা রয়েছে। খাটে পা ঝুলিয়ে বসে সে সিগারেট টানতে লাগল। রোদটা ছাদের দিক থেকে সরতে সরতে এখন ঘুরে গেছে এমনভাবে যে জানলার ধারে রাখা তার প্রশস্ত লেখার টেবিলের ওপর এখন একটা এ ফোর সাইজ কাটিং রোদ। খুব দাম্ভিকতার সঙ্গে রোদটা নিজেকে মেলে দিয়েছে তার টেবিলের ওপর। দেবত্রী একদৃষ্টিতে দৃশ্যটা দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে মোহিত হয়ে গেল দেবত্রী। এখন তার মনে হচ্ছে রোদ নয় ওটা, টেবিলের ওপর চকচকে র‍্যাপিং পেপারে মুড়ে রাখা একটা বড়সড় বই। কিন্তু বইটা এবার একটু বেঁকিয়ে রাখল যেন কেউ। সে জানে, বছরের এই সময় যত বেলা বাড়বে এই রোদের টুকরোটা আরও একটু বেড়ে গিয়ে তারপর ক্রমশ ছোট হতে হতে হঠাৎ জানলা দিয়ে পালিয়ে যাবে। তখন আর দাম্ভিকতা থাকবে না রোদটার মধ্যে। যেন তিনটে-চারটের সময় আচমকা স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়া কোনও কিশোর রাস্তা-বেরাস্তা ঘুরে বাড়ির পথ ধরেছে। বহু বছর আছে তো এই ঘরটায় দেবত্রী। সে জানে, ঠিক আর কিছুক্ষণ পরই এই ঘরটা ছায়াছন্ন হয়ে যাবে। তখন আর ছাতের কার্নিশে কার্নিশে কোনও এঁটো রোদ্দুর নেই। তখন ঘরে রোদ নেই, আলো কম। শুধু এই পাড়ার অদ্ভুত সব কারুকেতায় গেঁথে তোলা বাড়ি, ছাদ, জলের ট্যাঙ্ক, ভাঙা লোহার পাইপ, দেয়াল ফাটিয়ে গজিয়ে ওঠা বট, অশ্বত্থ, কপালে ‘1905’ কিংবা ‘1947’ লেখা বাড়ি, এই সব কিছুর সঙ্গে কাসুন্দির মতো ঝাঁঝালো রোদের মাখামাখির দিকে চোখ মেলে দূর থেকে তাকিয়ে থাকতে তার কী যে ভালো লাগে! এই ভালোলাগাটাও তার অভ্যেস। যখনই দেখে মোহিত হয়েই দেখে।

আজ টেবিলের ওপর রোদটা হঠাৎই দেবত্রীকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতে লাগল। অনেক লেখা পড়ে আছে। ছুটির দিন-টিন হলে সে তিনটের পর টেবিলে গিয়ে বসে। কারণ রোদটা সরে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করতে হয়। ওই রোদটা খাতার পাতায় মাখিয়ে লিখতে ইচ্ছে করলেও উপায় নেই। চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আজকাল ল্যাপটপেই লেখে যাবতীয় লেখাপত্তর। শুধু কবিতাটা সে ল্যাপটপে লেখে না। লিখতে পারে না। কারণ কবিতার শরীরে যে কাটাকুটিগুলো করে সে, তার নীল কালির পেন দিয়ে, তার মধ্যে দিয়েই কোনওভাবে সে বুঝতে পারে তার কবিতাটা নিজেকে প্রকাশ করতে পেরেছে কিনা। এটা সবার হয় না হয়তো, দেবত্রীর হয়। এখন রোদটা দেখতে দেখতে দেবত্রীর মনে হল ঠিকই তো, এখনই তো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। এখনই তো তাকে ওই টেবিলের রোদটার মধ্যে খাতা খুলে বসে কবিতাটা লিখে ফেলতে হবে। টেবিলের জানলাটা দিয়ে খুব কাছ থেকে, মানে এই ফুট দশেক দূর থেকে উলটো দিকের বাড়ির তিনতলার ল্যান্ডিংটা দেখা যায়। রংবিহীন দেয়ালের মধ্যে শিক লাগানো লম্বা একটা জানলা। ওটাই ল্যান্ডিংয়ের জানলা। অনেক আগের লোহার রেলিং আর কালো রঙের সিঁড়ি। জানলার মুখোমুখি ওদিকে আর একটা জানলা। সেই জানলাটা দিয়ে চোখটা চলে গিয়ে ঝপ করে পড়ে যায় একতলায়। সেখানে একটা উঠোন। উঠোনে অনেক লোকের আনাগোনা, চৌবাচ্চা থেকে জল তোলা, কাপড় কাচা, মেলা, তোলা, বাসনমাজা, মহিলাদের দাঁড়িয়ে গল্প করা এসব দিব্যি দেখা যায়। কিন্তু কোনও শব্দ পাওয়া যায় না।। এই শব্দহীন নড়াচড়াটা দেখতে দেবত্রী যারপরনাই ভালোবাসে। যেদিন দেখে উঠোনটা একদম ফাঁকা সেদিন তার কবিতাগুলো একটু শুকনো শুকনো লেখা হয়। আসলে জমজমাট একজন কবি বলে দেবত্রীর খ্যাতি আছে। ‘মিনির কাছে ধরা পড়ে গেছি’ নামের কবিতার বইটা সম্পর্কে সমালোচক বারীন সেনগুপ্ত একটা বড় পত্রিকায় ঠিক এই শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন। ‘দেবত্রী সরকারের কবিতার প্রধান উপাদান নাটক এবং তার জমজমাট পরিবেশনা।’ দেবত্রী টেবিলে এসে চেয়ার টেনে বসল। খাতা খুলল।
ছাদে ওঠার শেষতম সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছেন মাধব বিন্ধ্য বসুরায়!

রুলটানা, ফিনফিনে কাগজ। পেনের নিব ছোঁয়াতে না ছোঁয়াতে ঘন করে কালি টেনে নেয়। সে খাতা খুলেছে রোদের ওপর। একটা সিরিজ লিখছে, ‘শেষের অসুখ’ বলে। রোদে ঝলসে যেতে থাকা পাতাগুলো দেখে তার মনে হল ‘শেষের অসুখ’ সিরিজের এই শেষ দিকের কবিতাগুলো আমূল বদলে যাবে না তো? রোদটার মধ্যে এত উদ্দীপনা, এ তো তার স্বর বদলে দেবে, ভাব বদলে দেবে?

সামান্য একটা-দুটো শব্দ সে লিখেছে, এমন সময় ছাদে ওঠার মূল দরজায় টোকা পড়ল। তারপর মৃদু ধাক্কা। এই সময় কে? এ বাড়ি কেউ সারায়-টারায় না। ওই কখনওসখনও জলের ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে লোকজন লাগানো হয়। তারা আসে ছাদে। নইলে ছাদে কেউ আসে না। আর মূল দরজাটা সে-ই রাতে তালা দিয়ে রাখে। সকালে আজ সেই তালা মোটে খোলাই হয়নি। ‘কে?’ জিজ্ঞেস করল দেবত্রী এবং চাবি নিয়ে গিয়ে খুলেও দিল দরজা। খুলেই অবাক হয়ে গেল। ছাদে ওঠার শেষতম সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছেন মাধব বিন্ধ্য বসুরায়! সে চরম অবাক হল। তার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, ‘মানে আপনি?’

‘আসব?’

এমনিই এই সময়ের সবচেয়ে খ্যাতিমান কবি মাধব বিন্ধ্য বসুরায়ের গায়ের রং পদ্মের মতো। এবং রোদের তেজে মুখ লাল, কপালে ঘাম। মাধব বিন্ধ্য ভুলে গেছেন যে তিনি এখন একটা বাড়ির ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন। উদ্গ্রীব ভঙ্গিতে ব্রাউন পোলকা ডট ছাতাটা ধরে আছেন মাথার ওপর। এই ছাতাটা নিশ্চয়ই ওঁর স্ত্রীর। সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা একদম পাট ভেঙে পরে এসেছেন। জুঁইয়ের কুঁড়ির মতো ঠোঁটটা একটু ফাঁক করে মাধব বিন্ধ্য বসুরায় বললেন, ‘ভেতরে আসতে পারি না?’

আমারও তোমার প্রতি সামান্য মুগ্ধতা ছিল

‘আসুন। আসলে আমি এত অবাক হয়েছি। কী করে চিনলেন?’ বলল দেবত্রী। ঘরের মধ্যে নিয়ে আসার পর ছাতাটা সে নিজেই নিয়ে বন্ধ করে দিল। অমনি মাধব বিন্ধ্য বললেন, ‘দেবত্রী, আমার হাত তুমি ফাঁকা করে দিলে। ভুল করলে। আমি অনেক ভয়ে ভয়ে এসেছি ঠিকই কিন্তু এই মুহূর্তে আমার সাহসের কোনও অভাব নেই। তুমি যদি খুব অপমান কর তাহলে আমি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাব। আমার নারীর প্রতি দুর্বলতা আছে। কিন্তু যাদের প্রতি আছে তারা আমার প্রেমিকা। তারা আমার প্রেমে ডুবে আছে। তোমার আমার প্রতি কোনও প্রেম নেই এটা যেমন সত্যি, কাল সন্ধের আগে অব্দি আমারও তোমার প্রতি সামান্য মুগ্ধতা ছিল, তোমার কবিতাকে ভালো বলে ক’দিন আগেও কী মশগুল হয়ে তোমার বই থেকে আমার বউকে কবিতা পড়ে শোনালাম, ওর কত ভালো লাগল, কিন্তু আমার কাল তোমাকে অনেকক্ষণ ধরে মদ্যপান করে ওইরকম বিলাপের ঢঙে একের পর এক কবিতা পড়ে যেতে দেখতে দেখতে এমন একটা নেশা ধরে গেছে, দেবত্রী আমি এখন তোমাকে আবার দেখতে চলে এসেছি। যদি তুমি একটু প্রশয় দাও, যদি তোমার কবিতা নিয়ে তোমার সঙ্গে খেলা করি, যদি তুমি আমার বুকের ওপর পড়ে কবিতাগুলো পড়, কিংবা আমি যদি তোমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে শুনি, আসলে অপরাধ নিও না, আমার তোমার সঙ্গে প্রেম করতে ইচ্ছে করছে, শরীরে যদি আপত্তি থাকে প্রেমেও আপত্তি থাকার কথা, তবু দেবত্রী?’

একনিশ্বাসে মাধব বিন্ধ্য কথাগুলো বলে গেলেন। দেবত্রী মৃদু মৃদু হাসছিল। এবার বেশ ভালোই হেসে উঠল সে।

‘আমার বউকে বলতে ও-ই কোন বান্ধবীর থেকে তোমার ঠিকানাটা জোগাড় করে দিল। তোমার এই আস্তানাটার খ্যাতি আছে দেখলাম। আর বাহ্, বেশ চমৎকার একটা ব্যবস্থা। আমাকে বরং এখানে ক’দিন তুমি থাকতে দাও।’

‘আগে আপনি একটু বসুন তো। মাধবদা, আপনি সত্যি অনেক বড় কবি। আমাকেও তো একটু বুঝতে দিন যে আপনি আমার বাড়িতে, আমার এই আটপৌরে ঘরটাকে আলো করে এই মুহূর্তে আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। এই সময় আমার কীই-বা করা উচিত। আমার ফিয়ান্সেকে ফোন করে একটা পারমিশন নেওয়া উচিত যে আমি কি আপনাকে চুমু খেতে পারি? বা, আপনি যদি তখন একটু বাড়াবাড়ি করেন তখন আপনাকে কতটা অ্যালাও করব সেটা...!’

যে কারণেই ভালো লাগুক, একটু ছুঁতে ইচ্ছে করে।

‘একটু বসব? না চলে যাব বলো?’

‘বসুন মাধবদা। যদি সত্যি প্রেম করতে চান করুন। আপনাকে দেখে বুঝতে পারছি আমি আপনাকে কখনওই বাধা দেব না।’

দেরি না করে মাধব সত্যিই তাকে ছুঁলেন। কালকে যেভাবে তাকাচ্ছিলেন একটা ঘরোয়া আসরে, ঠিক সেই চোখটা ফিরে এল দৃষ্টিতে। মাধব তার গাল স্পর্শ করলেন, ‘যে কারণেই ভালো লাগুক, একটু ছুঁতে ইচ্ছে করে। রূপ হোক, যৌবন হোক, মেধা হোক। সরলতা হোক। ছুঁতে ইচ্ছে করে।’

বলতে বলতে তার গালের পাশ দিয়ে মাধব বিন্ধ্যের চোখ গিয়ে পড়ল তার লেখার টেবিলের ওপর। ‘তুমি কি লিখতে বসেছিলে?’

‘হ্যাঁ।’

‘কী লিখছিলে?’

‘কবিতা।’

‘সাদা টেবিলের ঢাকনা, রোদ পড়ে আছে খোলা খাতার ওপর, ঢাকনা খোলা পেন, কালির শিশি, নরম একটা আলো তোমার ঘর জুড়ে। রান্না করনি না? খাওনি বুঝি তুমি?’

‘না।’

‘তুমি বসে লিখছিলে। কবিতা। আহ্‌, আরাধ্য আমাদের। আর আমি তখন এসেছি ছলেবলে কৌশলে তোমাকে নষ্ট করব বলে। এই সময়টা তো আমারও লেখার টেবিলে বসার কথা। আমার তো এখন এই সময় এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়।’

‘মাধবদা। আপনি কত বড় কবি। আপনি তো ফাঁকি দেননি। ফাঁকি দিলে কি আর এরকম সব উচ্চারণযোগ্য কবিতা লিখে যেতে পারতেন?’

‘না, না।’ মাধব বিন্ধ্য কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন। ‘আমি কোনওদিন পারব না দেবত্রী এভাবে হেরে যেতে। একটা লেখার টেবিল আমার সামনে, একটা খোলা খাতা আমার সামনে, অথচ লেখক অন্য কেউ, আমি নই, এ হতে পারে না।’

মাধব বিন্ধ্য ছাতাটা তুলে নিলেন। আরও কয়েক পা পিছিয়ে বিদুৎবেগে ঘুরে গেলেন দেবত্রীর উলটো মুখে। বললেন, ‘চলি, অ্যাঁ!’

দেবত্রী একের পর এক অবাক হতে হতে এখন সম্পূর্ণ হতবাক। বলল, ‘আমি কিছু বুঝতে পারলাম না মাধবদা? আমার কি কোনও ভুল হল? কী ভুল করলাম?’

ততক্ষণে ছাদের দরজা পার হয়ে, কোনওদিকে না তাকিয়ে, কোনও কথায় কর্ণপাত না করে, একের পর এক সিঁড়ি দ্রুত, আরও দ্রুত টপকে টপকে নীচে নেমে যাচ্ছেন সেই কবি।

অঙ্কন - সৌজন্য চক্রবর্তী
পাঠ - শ্রাবণী খাঁ
অডিও - রাজা সেনগুপ্ত
শেয়ার করুন: