মরালগ্রীবা, মৃণালভুজ

শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়
‘উঁহ্‌–হুঁ–উঁ–উঁ.‌.‌.‌ সুড়সুড়ি লাগছে তো!‌‌’
তৃষার স্তনসন্ধি থেকে ঠোঁট সরিয়ে নিল রেবন্ত। মাথাটা একটু নামিয়ে আলতো করে চিবুক রাখল তৃষার শরীরের মাঝ বরাবর। মুচকি হেসে বলল, ‘তোমার তো সব জায়গাতেই সুড়সুড়ি লাগে!‌ তা হলে চুমুটা খাই কোথায়!‌’ তৃষা চিত হয়ে শুয়ে খাটের ওপর। বুকের আঁচল সরানো। বিছানার জংলাছাপ চাদরের সঙ্গে মিশে গেছে শাড়ির সবুজ–লাল ডুরে। ব্লাউজের বোতাম খোলা। লাল ব্লাউজ গুটিয়ে আছে দু’ধারে, বাহুমূলের খাঁজে। অন্তর্বাস পরে নেই তৃষা। জোড়া ফলের মতো নিখুঁত, নিটোল, স্বর্ণাভ তৃষার বুক সোহাগে উদ্ধত। তার ওপারে দেখা যাচ্ছে তৃষার আদুরে চিবুক, নাকের পাটায় জ্বলজ্বল করা হিরের নাকছাবি, গালের থেকে সামান্য উঁচু হয়ে থাকা দুই হনুর হাড়, যেন তুলির টানে আঁকা দুই ভুরু আর কপালের সামান্য আভাস। তৃষার দৃষ্টি নীচের দিকে, রেবন্তর মুখের ওপর স্থির হয়ে আছে। সেই চাহনিতে অবাধ প্রশ্রয়। আর রেবন্তর চোখে-মুখে দুষ্টুমি।
বাজে বাংলায় ‘বেচুবাবু’
এমনই হওয়ার কথা। নতুন বিয়ের পর এমনই তো হয়। এখনও তিন মাসও পুরো হয়নি তৃষা আর রেবন্তর বিয়ে হয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার বিত্তবান এলাকার অভিজাত বাড়ির মেয়ে তৃষা হাতে সিঁদুরগাছ আর রুপোর কাজললতাটি ধরে, লাল বেনারসি–চেলি আর চন্দনের ফোঁটায় অপরূপ সাজে এসে পা রেখেছে মফস্‌সল শহরের শ্বশুরবাড়িতে। ওর বর রেবন্ত পেশায় মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ। বাজে বাংলায় ‘বেচুবাবু’। রেবন্তর বাবা রাজনীতির লোক ছিলেন। এলাকার মাতব্বর গোছের। বার তিনেক পুরভোটে দাঁড়িয়ে জিতেওছিলেন। এছাড়া ইমারতি মালপত্র জোগাড়ের সাইনবোর্ডহীন কারবার ছিল একটা। দুর্জনে বলে, পুরপ্রতিনিধি হওয়ার পুরো ফায়দা ওইভাবেই তুলে নিতেন তিনি!‌ ফলে কখনও কোনও চাকরি করার দরকার পড়েনি। কিন্তু চৌত্রিশ বছরের সরকার দুম করে পড়ে গেল!‌ তাতে অবশ্য কোনও অসুবিধে ছিল না। আরও অনেকের মতো রেবন্তর বাবাও এলাকার উন্নয়নযজ্ঞে সামিল হতে দলবদলের জন্য পা বাড়িয়েই ছিলেন। কিন্তু তার আগেই হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক এবং ঝামেলা শেষ। বাড়িতে এখন লোক বলতে তাই রেবন্ত এবং রেবন্তর মা।
কিন্তু রেবন্ত আর তৃষার এই বিয়েটা আসলে হয় না। স্রেফ হওয়ার কথা নয়, এতটাই ফারাক দুই বাড়ি এবং দুই পরিবারে। তৃষার বাবা ডাক্তার। ভালই পশার। মা কলকাতার নামি কলেজের অধ্যাপিকা। তৃষার পড়াশোনা, বড় হয়ে ওঠা, মেলামেশা, সবই সাধারণের থেকে সামান্য উঁচু স্তরে। রেবন্তর মতো মফস্‌সলের এক সাধারণ ছাত্র, সামান্য চাকুরে এবং সীমিত সামর্থের ছেলের তার ধারেকাছে পৌঁছনোর কথা নয়। কিন্তু সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দিল ফেসবুক। শহুরে বড়লোকের সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে মফস্‌সলের সাদামাটা ছেলের প্রেম এবং বিবাহের চিত্রনাট্য লিখে দিল গোপনে। রেবন্ত নেহাতই সাধারণ, কিন্তু তার একটি গুণ, সে ভাল ছবি তোলে। আর তৃষা বছরে অন্তত একবার বাবা–মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যায়। তখন সেও প্রচুর ছবি তোলে। সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে। এরকমই এক ছবির তারিফ করার সূত্র ধরে রেবন্তর সঙ্গে তৃষার আলাপ, বন্ধুত্ব।
তার পর যেমন হয় সব প্রেমের গল্পেই
তার পর, জীবনদেবতার যতটা সদয় হওয়া সম্ভব রেবন্তর ওপর, সেই আলাপের বছরেই পুরীর সমুদ্রসৈকতে তৃষার সঙ্গে রেবন্তর হঠাৎ দেখা! যদিও তারও কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। কারণ, প্রথমত তৃষার বাবা–মা ঠিক ওই পুরী, দীঘা, দার্জিলিং বেড়াতে যাওয়ার লোক না। কিন্তু সেবার তৃষার বাবার বেশিদিন ছুটি নেওয়ার সুযোগ ছিল না, ফলে পুরী। কিন্তু আমজনতা থেকে দূরে, প্রাইভেট বিচ–সমেত পাঁচতারা হোটেল। সুইমিং পুল আছে দু’খানা, কাজেই সমুদ্রে না গেলেও চলে। আর রেবন্ত মাকে নিয়ে স্বর্গদ্বারের ঘিঞ্জি ভিড়ে সস্তার সি–ভিউ লজ। তা সত্ত্বেও দেখা হয়ে গেল দু‌জনের। রেবন্ত ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়েছিল ছবি তুলতে। হাঁটতে হাঁটতে সেই প্রাইভেট বিচে, যেখানে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে উদাস বসেছিল একলা তৃষা। এবং ললাটলিখন থাকলে যা হয়, প্রথম সাক্ষাতেই একে অন্যকে চিনতে পেরেছিল নির্ভুল। বালির ওপর পাশাপাশি বসে প্রচুর গল্প সেই বিকেলে। আলাপটা পুরীর সৈকত থেকে দুজনেই বয়ে নিয়ে এল বাড়িতে। তার পর যেমন হয় সব প্রেমের গল্পেই। বিয়ের কথা ওঠায় অবশ্য তৃষার বাবা–মা মেয়ের আড়ালে একটু খুঁতখুঁত করেছিলেন রেবন্তর মফস্‌সলের বাড়ি, তার মামুলি চাকরি আর নেহাতই মধ্যবিত্ত সামর্থ্য নিয়ে। কিন্তু মেয়ের ইচ্ছেতে শেষ পর্যন্ত বাধ সাধেননি। আর তৃষা তো তখন ছেঁড়া শাড়িতে, রোজ নুন–ভাত খেয়ে থাকতে হলেও রেবন্তর সঙ্গে বাকি জীবন কাটাতে রাজি!‌

একটু আগে আদর শেষ হল ওদের। দুটো শরীর এখন সম্পূর্ণ নিরাবরণ, ঘামে ভেজা, পাশাপাশি। এমন সুযোগ ওরা সবসময় পায় না। তৃষার শাশুড়ি যেহেতু একা মানুষ, এবং তিনি কোনও কাজের লোক রাখবেন না, রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ঘরের যাবতীয় কাজে হাত লাগাতেই হয় তৃষাকে। দিন–রাতের অনেকটা সময় তাতেই খরচ হয়। তার পরে যেটুকু সময় পড়ে থাকে, তৃষা সারা দিনের কাজকর্মের শেষে ক্লান্ত, গায়ে সংসারের তেল–হলুদ গন্ধ। রেবন্তও দিনভর সারা দুনিয়া ঘুরে, বাস, অটো, আর লোকাল ট্রেন ঠেঙিয়ে হাক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে। ওদের তখন আর প্রেম পায় না। তার মধ্যেই এরকম এক একটা দিন এসে যায়, রেবন্ত হয়তো অফিস যায় না, বা দেরি করে বেরোয়। সেই দিনগুলোয় তৃষাও সংসারের কাজে ফাঁকি দিয়ে বার বার চলে আসে নিজেদের ঘরে। চুরি করে খাওয়া একটা চুমু, একটু আদর কখনও কখনও পৌঁছে যায় পরিপূর্ণতায়, দুটো শরীরের তুমুল সোহাগে।

চোখ খোলে রেবন্ত। তৃষার বুকের নীচ থেকে সূক্ষ্ম রোমের রেখা নেমে গেছে নাভি পর্যন্ত, তার রং হালকা বাদামি। জানলার ভেজানো পাল্লার ফাঁক দিয়ে আসা আলো পড়ে সেটা সোনালি মনে হচ্ছে। লম্বা দাগের মতো একফালি আলো পড়ে আছে তৃষার শরীরের মাঝে বিভাজন রেখাটি বরাবর। রেবন্ত সেই আলোর সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায়। ঠোঁট ঘষটে তৃষার নাভি থেকে স্তনসন্ধি হয়ে গলায় পৌঁছে যায়। শঙ্খের মতো গভীর বেড় তৃষার গলায়। এক এক করে তিনটে দাগেই চুমু খায় রেবন্ত। প্রতিবারই শিউরে ওঠে তৃষা। দু’হাতে আঁকড়ে ধরে রেবন্তর মাথা। অস্ফুটে বলে, ‘আর না। এখন আর না। মা’র হয়তো পুজো শেষ হয়ে গেছে এতক্ষণে।’

আজ একাদশী। তৃষার শাশুড়ির উপোস। এইদিন আর হেঁসেলের কাজে হাত লাগান না তিনি। দীর্ঘক্ষণ পুজো করেন। সেই সময়টাই কাজে লাগিয়েছে ওরা। কিন্তু রেবন্ত কথা শুনছে না। গভীর আশ্লেষে ফের তৃষার গলায় চুমু খেল রেবন্ত। তৃষার আবারও মাথা থেকে পা শিউরে উঠল। রেবন্ত মুখ তুলে বলল, ‘কী? সুড়সুড়ি?’

তৃষা আহ্লাদী গলায় বলল, ‘না, অন্যরকম। ভাল।’

রেবন্ত তৃষার নিজের শরীর থেকে নিজেকে আলাদা করল। কনুইয়ে ভর দিয়ে কোমর থেকে শরীরটাকে একটু তুলে, তৃষার দিকে ফিরে উত্তেজিত গলায় বলল, ‘তা হলে ইন্টারনেট ব্যাটা তো ঠিক বলেছে!‌’

মজা পেল তৃষা। ‘কী বলেছে তোমার ইন্টারনেট?’

‘বলেছে, মেয়েদের শরীরের সব থেকে স্পর্শকাতর জায়গা হল মেয়েদের গলা। আর তোমার মতো মরালগ্রীবা হলে তো আদর আর শেষই করা যায় না!’‌‌

‘তুমি বুঝি আজকাল ইন্টারনেটে এইসব বিষয়ে গবেষণা কর?’ ঘাড় কাত করে তাকাল তৃষা। ওর গলায় দুষ্টুমি। লজ্জা পেল রেবন্ত। ‘আরে গবেষণা করব কেন!‌ মাঝে মাঝে এরকম লিঙ্ক চলে আসে। সেরকমই একটা লিঙ্ক ক্লিক করতে সেদিন লেখাটা পড়লাম.‌.‌.‌’

‘আর কী কী জেনেছ শুনি?’

‘বলব কেন তোমাকে!‌ ওগুলো আমার ট্রেড সিক্রেট। কাজে করে দেখাব।’

অ্যাই আস্তে, মা শুনতে পাবে!‌

তৃষা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তাড়াতাড়ি ওর মুখে হাত চাপা দিল রেবন্ত। ‘অ্যাই আস্তে, মা শুনতে পাবে!‌’

হাসি থামিয়ে দিল তৃষা। যদিও ওর শাশুড়ি স্বামীহারা হয়েছেন বছর পাঁচেক আগে। কিন্তু তিনি এখনও শোকে কাতর। পুত্র-পুত্রবধুর দাম্পত্যের সামান্যতম উচ্ছ্বাসও সহ্য করতে পারেন না। তৃষাকে তাই সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। হলই বা ওর বিয়ের বয়স মাত্র তিন মাস।

‘কিন্তু মায়ের কথাটাও একটু ভাবো। একেবারে একা হয়ে গেছেন।’— এর আগে কথাটা ওকে বেশ কয়েকবার বলেছে রেবন্ত। তৃষা যদিও বুঝতে পারেনি, ওদের হাসিখুশি থাকাটা কীভাবে রেবন্তর মায়ের একাকিত্বের কষ্টকে বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু ও কথা বাড়ায়নি। মাঝে মাঝে মায়ের সঙ্গে গল্প করতে করতে রাত হয়ে গেলে রেবন্ত মায়ের কাছেই ঘুমিয়ে পড়ে। তৃষাও ওদের ঘরে, একলা বসে অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে একসময়। পরদিন সকালে কিন্তু একটি কথাও রেবন্তকে কখনও বলেনি তৃষা।

দুই
উফ, কী প্রচণ্ড সেক্সি লেগেছিল

‘অ্যাই দ্যাখো দ্যাখো, ইন্টারনেটে এই রিপোর্টটা কী বলছে। মেয়েদের কাছে ছেলেদের শরীরের সব থেকে আকর্ষণীয় অংশ হচ্ছে ফোর আর্ম। কবজি–সমেত হাতের সামনের অংশটা। আমেরিকার কয়েকটা কলেজে জানতে চাওয়া হয়েছিল মেয়েদের কাছে। কেউ বলেছে চোখ, কেউ চোয়াল, কারও আবার ছেলেদের ঘাড়, পিঠ দেখে পছন্দ হয়। কিন্তু সব থেকে বেশি মেয়ে, সিক্সটি এইট পার্সেন্ট বলেছে, ছেলেদের হাত। কী অদ্ভুত জান, আমিও তোমাকে পুরীতে যখন সেই প্রথমবার দেখলাম, তোমার হাতটাই আমার প্রথম চোখে পড়েছিল। বালির ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে তুমি আসছ, ডানহাতে বুকের কাছে ধরে আছ ক্যামেরাটা, তোমার কবজি একটু বেঁকে ওপর দিকে উঠে আছে, আর বাঁহাতের আঙুলে ধরা সিগারেট.‌.‌.‌ উফ, কী প্রচণ্ড সেক্সি লেগেছিল!‌’

‘আজকে মায়ের স্নানের জল গরম হতে দেরি হয়েছিল?’ কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রাখতে রাখতে নিরস, বিরক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল রেবন্ত।

তৃষা একটু হকচকিয়ে গেল। ও এতক্ষণ যা বলছিল, তার থেকে এতটাই আলাদা রেবন্তর প্রশ্নটা, এতটাই সম্পর্কহীন, যে বুঝতে একটু সময় লাগল। হ্যাঁ, ঠিক। আজ মায়ের স্নানের জল গরম হতে অন্যদিনের থেকে মিনিট পনেরো দেরি হয়েছিল। তৃষা বিব্রত গলায় বলল, ‘আমারই ভুল। জলের বালতিতে ইমারশান হিটারটা ডুবিয়ে সুইচ অন করতে ভুলে গিয়েছিলাম। পরে যখন খেয়াল করলাম.‌.‌.‌’

‘কেন? কিসে ব্যস্ত ছিলে? ফেসবুক?’ রেবন্তর গলা একইরকম শুকনো। তবে এবার তাতে একটু বিদ্রূপের ছোঁয়া। ফেসবুক শব্দটা যেভাবে উচ্চারণ করল যেন সেটা খুব নিকৃষ্ট একটা কাজ।

তৃষার মাথাটা গরম হয়ে গেল চট করে। দুপুরে ও–ই খেয়াল করেছে যে সুইচটা অন করা হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে অন করে দিয়েছে। যে কারণে বাড়তি সময়টা লেগেছে। গরম জলের বালতিটা শাশুড়ির বাথরুমে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ও নিজেই বলেছে, যে ভুল হয়ে গিয়েছিল। মহিলা তখন চুপচাপ ছিলেন। কিছু বলেননি। কিন্তু এখন ছেলে বাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই নালিশ করেছেন!‌ ওর শাশুড়ি এরকমই অদ্ভুত! পারতপক্ষে মুখে কিছু বলেন না।‌ কিন্তু রাগ পুষে রাখেন। তৃষা ঠিক করল, ও এই ব্যাপারটা বাড়তে দেবে না। কোনও উত্তর দেবে না রেবন্তর কথার।

কিন্তু রেবন্ত যেন ঝগড়া করবে বলে মরিয়া। ‘কি, জবাব দেওয়ার দরকার মনে করছ না?’

তৃষা শান্ত গলায় বলল, ‘মিনিট পনেরো হয়তো দেরি হয়েছে ওনার স্নান করতে।’

খিঁচিয়ে উঠল রেবন্ত, ‘তোমার মনে হচ্ছে মাত্র পনেরো মিনিট, আসলে আরও বেশি। তার পর মায়ের খেতে দেরি হয়েছে, দুপুরে বিশ্রাম নেওয়ার সময় কমেছে.‌.‌.‌ আমার বাড়ি এসে এগুলো শুনতে ভালো লাগে না!‌ তুমি যদি না পার তো বলো, মায়ের দেখাশোনার জন্যে আলাদা লোক রেখে দেব।’

আর ধৈর্য রাখতে পারল না তৃষা। বিরক্তিতে চোখ কুঁচকে রেবন্তর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাই রাখো। একবেলার আয়া তিনশো টাকা, মাসে আঠেরো হাজার। অবশ্য খোঁজ করলে তোমাদের এখানে হয়তো তার থেকে সস্তায় রাতদিনের কাজের লোক পেয়ে যাবে।’

রেবন্ত ক্ষুব্ধ গলায় বলল, ‘হঠাৎ টাকার কথা তুলছ কেন!‌ খোঁটা দিতে চাইছ যে আমি যা মাইনে পাই তাতে মাসে আঠেরো হাজার টাকা অ্যাফোর্ড করতে পারব না?’

তৃষা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘না। জাস্ট মনে করিয়ে দিলাম যে তোমার মায়ের জন্যে আমি যে ফ্রি সার্ভিসটা রোজ দিই, তার মার্কেট রেট কত‌। শুডন্ট টেক এনিথিং ফর গ্রান্টেড। তোমার মা নিজের বাথরুমে গিজার বসাতে দেননি, কারণ উনি নাকি ঠান্ডা–গরম জল ঠিক মাপে মেশাতে পারবেন না!‌ ওনার এই উদ্ভট যুক্তি সুসন্তান হিসেবে তুমি সাপোর্ট করেছ। আমি কিছু বলিনি। আমাদের বাথরুমে গিজার আছে কিন্তু তার জল উনি ব্যবহার করবেন না। নাকি জমে থাকা বাসি জল!‌ আমি অনেক বুঝিয়েছি যে প্রত্যেকদিন গিজারের জল খরচ হলেই আবার নতুন জল ঢোকে। জমে থাকা জল নয়। কিন্তু উনি বুঝতে চাননি। আমি সেটাও মেনে নিয়েছি। রোজ দুপুরে বালতিতে ফ্রেশ জল ভরে গরম করে দিই। আজকে সেটা পনেরো মিনিট দেরি হয়েছে বলে তুমি বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে এসে লাগিয়েছেন!‌ হাউ ডেয়ার শি!‌’

উনি আমার মা!‌

তৃষার কথা শুনতে শুনতে রেবন্তর চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। প্রায় তেড়ে আসার ভঙ্গিতে ও এগিয়ে এল তৃষার দিকে। চেঁচিয়ে উঠল, ‘উনি আমার মা!‌’

‘আর আমি তোমার স্ত্রী। আমার সঙ্গে কাজের লোকের মতো ব্যবহার করা তোমার উচিত নয়। ফর দ্যাট ম্যাটার, কাজের লোকেদেরও মানসম্মান থাকে। তাদেরও সেটা পাওনা।’

‘খোকন, এই অফিস থেকে ফিরলি, হাত–মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নে। আমি চা বসাচ্ছি।’

দরজাটা খোলা ছিল। রেবন্তর মা কখন এসে দাঁড়িয়েছেন, তৃষা খেয়াল করেনি। কিন্তু কথাটা শুনে ওর মাথায় রক্ত চড়ে গেল। ও চেঁচিয়ে উঠল, ‘শেষ কবে আপনার খোকনের জন্যে আপনি চা বসিয়েছেন? আর খোকনের বিশ্রামের জন্যে যখন এত চিন্তা তখন বাড়ি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমার নামে গিয়ে না লাগালেই তো পারতেন!‌’

রেবন্ত এত জোরে তৃষার গালে চড়টা মারল, যেন এছাড়া ওর আর কিছু করার ছিল না। ঠাস করে শব্দটা হওয়ার পরই ‌সব কিছু কেমন চুপচাপ হয়ে গেল। ঘন ঘন নিশ্বাসের আওয়াজ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। বিশ্বসংসার যেন বধির হয়ে গেছে, এমন তীব্র এক স্তব্ধতা। প্রথম সাড় এল রেবন্তর শরীরে। মাথা নিচু করে সরে গেল তৃষার সামনে থেকে। একেবারে ঘরের বাইরেই বেরিয়ে গেল। পেছন পেছন ওর মা। তৃষা কিছুক্ষণ শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে রইল ওদের চলে যাওয়ার দিকে। তার পর ধীরে ধীরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি আটকে দিল। রেবন্ত এখন আর ফিরবে না এই ঘরে। অন্তত আজ রাতে আর ফিরবে না। ওদের দু‌জনের গত ছ’মাসের যৌথযাপনে এরকমই হয়ে এসেছে। রাগারাগি হলে মান–অভিমানের কোনও সুযোগ নেই। মান ভাঙানোরও না। রেবন্ত পালিয়ে যায়। মায়ের কোলের খোকা মা’র কাছে গিয়ে শুয়ে থাকে। মাঝে উঠে ওরা নিজেদের মতো রাতের খাওয়াদাওয়াও সেরে নেয়। তৃষাকে কেউ ডাকে না। অভুক্ত তৃষা নিজের ঘরে বসে রান্নাঘরে বাসনপত্রের আওয়াজ পায়। মা–ছেলের মৃদু গলায় কথা। ঘরের ভেতর থেকে বোঝা যায় না, কী বলছে ওরা। তার পর সারা বাড়ি, গোটা পাড়া চুপ হয়ে গেলে, তৃষা বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

আজকেও সেরকমই একটা রাত। তৃষা গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। রেবন্তর সরু, লম্বা পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেছে গালে। অন্যমনস্কভাবে তার ওপর একবার হাত বোলাল তৃষা। ছোটবেলায় দুষ্টুমির জন্য মায়ের কাছে মার খেয়েছে। সেই শেষ। একটু বড় হওয়ার পর তৃষা কখনও এমন কিছু করেনি, যার জন্যে ওর গায়ে হাত তুলতে হয়। তবে এই প্রথম কোনও পুরুষমানুষের কাছে ও মার খেল। অবিশ্বাস্য লাগছে কেমন। রেবন্ত ওকে চড় মারল!‌ আবার খুব আলতো করে দাগগুলোকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল তৃষা। রেবন্তর আঙুলগুলো খুব সরু আর লম্বা। এমন আঙুল নাকি শিল্পীদের হয়। যারা খুব কল্পনাপ্রবণ, সৌন্দর্যপ্রিয় আর রোম্যান্টিক হয়, তাদের। শুধু রেবন্তর হাত নয়, তৃষা ওর আঙুলেরও প্রেমে পড়েছিল। যখন আঙুলগুলো খেলে বেড়াত ওর নিরাবরণ শরীরে, উফ, কী অসহ্য আনন্দে বেজে উঠত শরীর। বার বার রেবন্তর হাত নিজের মুখের সামনে তুলে ধরে হাতের পাতায় চুমু খেত তৃষা। সাহিত্যে বলে ‘মৃণালভুজ’। পদ্মের ডাঁটির মতো হাত। রেবন্তর হাত অতটা মেয়েলি নয়, কিন্তু ওই উপমাটাই তৃষার মনে আসত। ভাবতে ভাল লাগত। মৃণালভুজ।

তিন

‘না গো মা, জলে নেমে পদ্মফুল তোলার বিপদ অনেক। পদ্মের ডাঁটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কালো কুচকুচে সাপ। ভয়ংকর বিষ তাদের দাঁতে। আমাদের গ্রামের কত বাচ্চা ছেলেমেয়ে ওই সাপের কামড়ে মরেছে, তার লেকাজোকা নেই!’‌

তৃষার পায়ে আলতা পরাতে পরাতে বকবক করে যাচ্ছিল হরি নাপতেনি। রেবন্তদের এই মফস্‌সল শহরে হালফ্যাশনের বিউটি সালোঁ আর স্পায়ের পাশাপাশি এখনও নাপিত–নাপতেনির চল আছে। ডাক পেলে তারা এসে বাড়ির মেয়েদের নখ কেটে দিয়ে যায় নরুণ দিয়ে, ঝামাপাথর দিয়ে পা ঘষে পরিষ্কার করে, আলতা পরিয়ে দিয়ে যায়। তৃষা যদিও গত এক বছরে হরি নাপতেনির সামনে কোনওদিন বসেনি। কিন্তু আজ নিশ্চয়ই বিশেষ কিছু আছে। নাপতেনি সাতসকালে বাড়ি এসে হাজির। শাশুড়ি হুকুম দিলেন, তৃষা যেন একটা পরিষ্কার শাড়ি পরে এসে বসে। ওকে আলতা পরানো হবে।

যতদিন এই বাড়িতে তৃষা আছে, এভাবেই ও থাকবে। এটা ওর সিদ্ধান্ত।

এমনিতে তৃষা আলতা পরে না। ওর বাপের বাড়িতে এসব আলতা, শাঁখা–পলা পরার চল নেই। কিন্তু রেবন্তদের বাড়িতে থাকার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম নিজের জন্যে নিজেই তৈরি করে ফেলেছে তৃষা। তার মধ্যে একটা হল, যেসব নিয়মকানুন মানতে ওর খুব একটা অসুবিধে হয় না, যা ওকে কোনও নৈতিক সমস্যার মুখে দাঁড় করিয়ে দেয় না, সেগুলো বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া। এমনকী তার জন্যে যদি নিজের বিশ্বাসের বা বোধবুদ্ধির সঙ্গে একটু আপোস করতে হয়, তা হলেও তৃষা মেনে নেয়। তাতে অনেক সমস্যা মিটে যায় শুরুতেই। ফলে মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত অথবা ইতুপুজো— তৃষা বিনা তর্কে হাতজোড় করে বসে পড়ে। বৃহস্পতি–শনি নিরামিষ খেতে হয়— আচ্ছা বেশ। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি গেলে শাড়ি— অবশ্যই। সে যদি লোকাল ট্রেনের ভিড়ের চাপে লাট খেয়ে একশা হয়, তা হলেও। তৃষা ওই ছোট ছোট মানিয়ে নেওয়াগুলোর বিনিময়ে বাকি সময়টা নিজের মনে থাকতে পারে। যতদিন এই বাড়িতে তৃষা আছে, এভাবেই ও থাকবে। এটা ওর সিদ্ধান্ত।

কিন্তু আর কতদিন আছে তৃষা? এই বাড়িতে? ও নিজেও ঠিক জানে না। রেবন্ত একটা প্রেম করছে। অবশ্য নিছক প্রেম বলা যায় না ব্যাপারটাকে। দস্তুরমতো একটা নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছে। মেয়েটা সম্ভবত ওর অফিসের কেউ। ওর মতোই সেলসের কাজ করে। তবে কলকাতায় নয়। হয় গুয়াহাটি অথবা জামশেদপুর। কারণ গত তিন মাসে রেবন্ত এই দুটো জায়গাতেই অন্তত বার পাঁচেক অফিস ট্যুরে গেছে। যেটা স্বাভাবিক নয়। রেবন্তকে এত বেশি ট্যুরে যেতে হয় না। যাওয়ার কথা নয়। রেবন্তর সেল্‌স টেরিটরি খুব ছোট। ওয়েস্ট বেঙ্গল, বিহার, আর ঝাড়খণ্ড। এক যদি না অফিসে প্রোমোশন পেয়ে নর্থ ইস্টও ওর আওতায় এসে থাকে। জানে না তৃষা। রেবন্ত ওকে আর এসব কিছু বলে না। ওদের মধ্যে কোনও কথাই প্রায় হয় না আজকাল। তৃষাও কোনও আগ্রহ পায় না গায়ে পড়ে কিছু জিজ্ঞেস করার। ইদানীং ট্যুরে যাওয়ার আগে রেবন্ত নিজের ব্যাগ নিজেই গুছিয়ে নেয়। এমনকী ট্যুরে যে যেতে হবে, সেটাও জানায় না। কিন্তু তৃষা বুঝতে পারে সব। ছুটির দিন বাড়ি থাকলে দুপুরে, রাতে ফোন আসে। রেবন্ত গলা নামিয়ে কথা বলতে বলতে বারান্দায় কিংবা ঘরের বাইরে চলে যায়। কাজের ছুতোয় বাড়ির বাইরে গিয়ে অনেকক্ষণ পর ফেরে। গভীর রাত অবধি হোয়াটস্‌ অ্যাপে কথা বলে।

তৃষা এখন আর এসব গায়ে মাখে না, কারণ ওর জীবনেও দ্বিতীয় একজন পুরুষ এসেছে। কৌশিক। ওর বাবার ছাত্র ছিল ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে। এম ডি করতে ইংল্যান্ড গিয়েছিল। ফিরে এসে তৃষার বিয়ে হয়ে গেছে শুনে ওদের বাড়ি থেকে ঠিকানা নিয়ে ছুটে এসেছিল এখানে। ভাগ্য ভাল, সেদিন কেউ ছিল না বাড়িতে। রেবন্ত অফিসের ট্যুরে আর শাশুড়ি যেন কোন আত্মীয়ের বাড়ি গিয়েছিলেন। তৃষার পা জড়িয়ে ধরে, পায়ের পাতায় চুমু খেয়ে কৌশিক বলেছিল, ইংল্যান্ডে গত তিন বছরে ও নাকি প্রতিদিন তৃষার কথা ভেবেছে!‌ ও নাকি বুঝতে পেরেছে, তৃষাকে ছাড়া ও বাঁচবে না!‌

তৃষার তখন চোখের তলায় কালি, কণ্ঠার হাড় জেগে উঠেছে, গাল বসা, চুল রুক্ষ। আয়নার সামনে দাঁড়ালে খুব অসুন্দর লাগে নিজেকে। ঘেন্না হয় খুব। তার পরেও কেউ ওকে অমন আকুল করে চাইছে.‌.‌.‌ নিজেকে আটকাতে পারেনি তৃষা। আটকাতে চায়ওনি। বরং ওর ক্ষণস্থায়ী দাম্পত্য জীবনের ফাঁকফোকরে পড়ে থাকা শূন্যতা কৌশিকের ওই অপরিমিত প্রেম দিয়ে ভরিয়ে দেওয়ার সাধ হয়েছিল। ওর আর রেবন্তর যুগলশয্যার রিক্ততার মধ্যেই তৃষা মিলিত হয়েছিল কৌশিকের সঙ্গে। কৌশিক যখন ওকে আদর করছে, খুব কেঁদেছিল তৃষা। না, অপরাধবোধ থেকে নয়। ওর মনে হয়েছিল, সমস্ত গ্লানি, সব হতাশা, শরীর–মনে জমে ওঠা ক্লেদ ধুয়ে যাচ্ছে চোখের জলে। তৃষা একটা নতুন মানুষ হয়ে উঠছে।

তার পর কৌশিকের সঙ্গে আরও দু’বার দেখা করেছে তৃষা। কলকাতার এক পাঁচতারা হোটেলের ঘরে। সেখানে ওরা বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে গল্প করেছে, আদর করেছে, ভালবেসেছে, আবার সারা রাত শরীরে শরীর মিশিয়ে শুয়ে থেকেছে চুপচাপ। বুকে মাথা রেখে এ ওর হৃৎপিণ্ডের ধুকপুক শব্দ শুনেছে। দু’বারই অফিস ট্যুরের নাম করে বাড়ির বাইরে ছিল রেবন্ত। তৃষাও বাপের বাড়ি যাওয়ার নাম করে চলে এসেছিল কলকাতায়। বাবা–মায়ের কাছে থেকেওছে তখন। শুধু আগে অথবা পরে দুটো দিন–রাত কৌশিকের সঙ্গে। দু’সপ্তাহ আগে কৌশিক ইংল্যান্ডে ফিরে গেছে। তিন মাস পর আবার আসবে। তখন ঠিক হবে তৃষা আর রেবন্তর ডিভোর্সটা কবে, কীভাবে হবে। আজ সকালেও মেসেজ এসেছে কৌশিকের— ‘আমি ভাবতেই পারি না, এতগুলো বছর তোমাকে ছাড়া আমি থাকলাম কী করে!‌’ মেসেজটা দেখে তৃষা মুখ টিপে হেসেছে আর ভেতরে ভেতরে লজ্জায় মরেছে। কান লাল হয়ে গেছে ওর, সারা শরীরজুড়ে অবাধ্য রক্তকণিকারা ছুটোছুটি বাড়িয়ে দিয়েছে।‌ আর শরীরের আরও গভীরে কোথাও একটা রক্তপিণ্ডে স্পন্দন জেগেছে গোপনে।
তৃষা অবাক গলায় বলল, ‘কেন?’

‘এই নাও। চট করে স্নান সেরে এই শাড়িটা পরে নাও।’

চমকে মুখ তুলে তাকাল তৃষা। আলতা পরানো হয়ে গেছে, ও খেয়াল করেনি। হরি নাপতেনি নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে তুলছে বেতের চুবড়িতে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে রেবন্ত। পরনে ধুতি–পাঞ্জাবি। ‌শাশুড়ি দাঁড়িয়ে তৃষার সামনে। বাড়িয়ে ধরা হাতে একটা লালপাড় গরদের শাড়ি। তৃষা অবাক হল। আজ তো কোনও পুজো–পার্বনের ব্যাপার নেই। তা হলে রেবন্ত হঠাৎ ধুতি–পাঞ্জাবি কেন!‌‌ কেনই বা ওর জন্যে লালপাড় শাড়ি!‌

তৃষা নিশ্চল বসে আছে দেখে শাশুড়ি বিরক্ত হলেন। শাড়িটা ছুড়ে ওর কোলে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘মানসিক করেছি গোপালজিউর কাছে। শাড়িটা পরে তুমি আর খোকন মন্দিরে যাও। পুরুতমশাইকে বলা আছে। গোপালের স্নানের জল ধরে রেখেছেন উনি। মাথায় ঠেকিয়ে তুমি আর খোকন খাবে।’

তৃষা অবাক গলায় বলল, ‘কেন?’

শাশুড়ি এবার আরও বিরক্ত। ‘এত কেন, কী জন্যে জানার তো কিছু নেই!‌ বিয়ের পর বছর ঘুরতে চলল, এখনও নাতি–নাতনির মুখ দেখার ভাগ্য হল না!‌ কেন, সে তো তুমি বলবে!‌ গোপালের স্নানজল খেয়ে অনেক বাঁজা বউয়ের পেট হয়েছে। তুমি চেষ্টা করে দ্যাখো, কপালে কী আছে।’

এবার ব্যাপারটা মাথায় ঢুকেছে তৃষার আর ঘেন্নায় সারা শরীর গুলিয়ে উঠেছে। রেবন্তদের কয়েকটা বাড়ি পরেই গোপালের মন্দির। দেড়হাতি একখানা কষ্টিপাথরের বালগোপাল, সে নাকি খুব জাগ্রত। তার গা–ধোওয়া জল খেলে নাকি সন্তানলাভ গ্যারান্টেড। আশপাশের মেয়ে–বউরা ঝাঁকে ঝাঁকে আসে গোপালের স্নানজল খেয়ে গর্ভবতী হওয়ার আশায়!‌

উঠে দাঁড়াল তৃষা। কোল থেকে শাড়িটা ঝপ করে পড়ল মেঝেতে। ভ্রূক্ষেপ না করে চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘ওসব তুকতাক আর বুজরুকিতে আমার বিশ্বাস নেই মা। গোপালের গা–ধোওয়া জল খাওয়াতে হয় আপনার ছেলেকে খাওয়ান। আমার ওসব খাওয়ার কোনও দরকার নেই। আর আমি খেতে পারবও না। আমার ঘেন্না করবে!‌’

শাশুড়ি বিস্ফারিত চোখে তৃষার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এসব কী বলছ কী তুমি!‌ কী বলতে চাইছ?’

ভয়ংকর বিরক্তির মধ্যেও তৃষার হাসি পেল। সামনে দাঁড়ানো রেবন্তর দিকে একঝলক তাকিয়ে শাশুড়ির দিকে ফিরে বলল, ‘আমি যা বলতে চাইছি তাতে খুব বেশি কিছু বোঝার তো নেই মা!‌ আপনার ছেলের সঙ্গে গত পাঁচ মাস আমার কোনও শারীরিক সম্পর্ক নেই। বাড়ি থাকলে রাতে হয় ও আপনার কাছে শুয়েছে অথবা বাধ্য হয়ে আমার সঙ্গে এক খাটে, কিন্তু উল্টোপাশ ফিরে। কিন্তু যখন সেরকমটা ছিল না, যখন আমাদের নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক ছিল, তখনও আপনার ছেলে ফলপ্রসূ কিছু করে দেখাতে পারেনি। ফলপ্রসূ কথাটার মানে বুঝলেন মা? যা থেকে ফল প্রসব হয়। পারেনি আপনার ছেলে। কাজেই ওসব জল–টল আপনার ছেলেকে খাওয়ান।’

সে আর শুনে কী করবেন!‌
তবে আপনি ঠিকই বলেন। সবই আসলে কপাল।

‘কেন!‌ কেন তোমার খাওয়ার দরকার নেই? কেন?’ তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠলেন তৃষার শাশুড়ি।

একটা নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল তৃষার ঠোঁটে। অজান্তেই ও একবার হাত ছোঁয়াল নিজের তলপেটে। শান্ত গলায় বলল, ‘সে আর শুনে কী করবেন!‌ তবে আপনি ঠিকই বলেন। সবই আসলে কপাল।’

তৃষার কথার রেশ তখনও মেলায়নি, রেবন্ত খ্যাপা ষাঁড়ের মতো দৌড়ে এল ওর দিকে। ওর কাঁধদুটো ধরে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেল ঘরের ভেতরে। প্রবল এক ধাক্কায় খাটের ওপর ফেলে ছিটকিনি তুলে দিল দরজার। তারপর দৌড়ে গিয়ে, দু’দিকে হাঁটু গেড়ে চেপে বসল তৃষার শরীরে। দু’চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে রেবন্তর, কষে ফেনা জমেছে। দু’হাতে তৃষার মুখটা চেপে ধরে হিসহিসিয়ে উঠল, ‘কে? কে? নাম বলো‌!‌’

খিলখিলিয়ে হেসে উঠল তৃষা। অপ্রকৃতস্থ মানুষের মতো সেই হাসি। দম আটকে যাচ্ছে হাসির চোটে, তবু তৃষা থামতে পারছে না। হাসতে হাসতেই ফিসফিস করে বলল, ‘বলব না। সিক্রেট!‌ তোমার যেমন সিক্রেট, তেমন আমারও। কাউকে বলব না!‌’

রেবন্তর হাত তৃষার গাল থেকে নেমে এল গলায়। রাজহাঁসের মতো সুন্দর গলায় চেপে বসল পদ্মের ডাঁটির মতো পেলব আঙুলগুলো। শেষ পর্যন্ত যখন তৃষা নিস্তেজ হয়ে গেছে, ওর ঠেলে বেরিয়ে আসা চোখে প্রাণের ইশারাটুকুও নেই, দম নেওয়ার জন্যে হাঁ করা মুখ আর বন্ধ হয়নি, রেবন্ত হাঁফাতে হাঁফাতে হাত সরিয়ে নিল। শঙ্খের বেড়লাগা উদ্ধত মরালগ্রীবায় কেটে বসে গেছে কালশিটের দাগ। পদ্মের ডাঁটির গায়ে সঙ্গোপনে জড়িয়ে থাকে যে বিষধর সাপেরা, তারা চিহ্ন রেখে গেছে।

অঙ্কন - সৌজন্য চক্রবর্তী
শেয়ার করুন: